এইটে পড়ার অাগে সিরিজের প্রথম এনট্রি ব্রজবুলি ১ : মৎস্যপুরাণ পড়ে নিলে কন্টিনিউটিও থাকবে, বেচারি প্রোডাকশন ডিজাইনারীর চাকরিটাও মকেলে মবেম্বে খেয়ে নেবে না।


ব্রজদা হাত নেড়ে ওদের বিদেয় করে চোখ মুছতে-মুছতে প্ল্যাটফর্ম ছেড়ে বেরিয়ে এসে দেখেন, সাইকেল ভ্যানিশ।

ব্রজদা প্রমাদ গুনলেন। অঙ্কটা রপ্তে বা রক্তে, কোনটাতেই ছিল না বলে বেশিদূর এগোতে পারলেন না অবিশ্যি। নিতাইকে কী জবাব দেবেন তাই ভাবতে-ভাবতে দেখলেন, স্টেশনের ভিতর চিনু ময়রার স্টল, তাতে স্পেশ্যাল নকুলদানা পাওয়া যাচ্ছে সাড়ে তিনরকম ফ্লেভারে। অনেকদিন অাগে দি গ্রেট বার্মুডা নামক সুবিখ্যাত যাদুকরের ট্রাঙ্ক বওয়ার চাকরি করতেন, দিব্যি মাইনে পেতেন, থাকা-খাওয়া ফ্রী। তাঁর কাছ থেকে শেখা ম্যাজিক প্রয়োগ করে ডান কানের পাশ দিয়ে তিনখানা অচল সিক্কা এবং একখানা সচল অাধুলি বার করে এক ঠোঙা মিক্স নকুলদানা নিয়ে অাকাশ-পাতাল চিন্তা করতে করতে স্টেশনের বাইরে বেরিয়ে সোজা একেবারে নিতাইয়ের ঘাড়ে এসে পড়লেন।

ধুলো-টুলো ঝেড়ে উঠে দেখলেন, হতভাগা লেখক নিতান্ত ভুল লেখেননি। মাটিতে নিতাই চিতপটাং, পাশে একটি চার-চাকার পিঁড়ি সাইড হয়ে চুপটি করে শুয়ে অাছে, চাকাগুলো খরখর-খ্যারখ্যার শব্দে থামার চেষ্টা করছে। পিঁড়ির সামনে একটি ফুটো, তাতে একটি মাঞ্জা লাগানো সুতো বাঁধা, সেটি শেষ হয়েছে একটি প্লাস্টিকের হাতলে, যে হাতল প্রাণপণে চিবিয়ে ধরে অাছে ভুলো দ্য ডগ।

নিতাইকে হেল্প করার বিন্দুমাত্র প্রচেষ্টায় না গিয়ে মন দিয়ে ব্রজদা উপরের সী-স্কেলে একটা সিটি ছাড়লেন, তারপর পাশের লোহার ল্যাম্পপোস্টে গিয়ে বসে বাঁ কানের পাশ দিয়ে একটা অাধখাওয়া বিড়ি বের করে রাস্তা ছড়ানো নকুলদানার দিকে করুণ দৃষ্টিতে তাকাতে-তাকাতে ধোঁয়ার রিং ছাড়তে লাগলেন।

নিতাই খানিক্ষণ বাদে ধাতস্থ হয়ে উঠে বসে দেখল, একটা অাধুলি দিব্যি গড়াতে-গড়াতে ব্রজদার কাছে এসে পুট করে একটা লাফ মেরে ডান কানের পাশে সেঁধিয়ে গেল।

“ওটা কী”, নিতাই শুধোল।

“সচল অাধুলি”, একমুখ ধোঁয়া ছেড়ে বললেন ব্রজদা। “ব্যাপার কী, তুমি তো অাজকাল ট্রেন চাপো না। সাইকেল কই?”

“সেটাই তো গোলমাল ব্রজদা, সাইকেল হাওয়া। কিডন্যাপ। চুরি। থিফ।”

ব্রজদা মনে মনে হাঁফ ছাড়লেন। ক্লোজ কল। ধাতানি অাজ কপালে ছিল না। কিরোর পায়ে ভোগ চড়াতে হবে।

“সাইকেল হাওয়া?”, কাঁচা মাছের অাঁশ ছাড়াতে জানেন না এমনভাবে জিগাইলেন ব্রজদা। “কবে? কোথায়? কেন? কে?”, ব্রজদার চোখ বিস্ফারিত।

নিতাই পিঁড়িটাকে সোজা করে অ্যাডজাস্ট করতে-করতে বলল, “অার বলবেন না, সকালে বেরোতে যাব, ছাতা নিয়ে এসে দেখি সাইকেল হাওয়া। কি কুক্ষণেই যে নাম রেখেছিলাম ভিত্তোরিও…”

“সাইকেলের নাম ভিত্তোরিও?”, ধোঁয়া খেয়ে খাবি খেতে-খেতে ব্রজদার ডিম্যান্ড।

“তা অার বলতে”, পিঁড়িতে চেপে বসে নিতাই বলল, “ছিল স্যামসনের, বেচারা মুড়ি ভেজে ভেজে সাইকেল চাপার অার সময় পেত না। অামায বলল, ‘অরে নেত, সরিরটা মন্দীর, বুয়েসিছ, ছাইকেল সালানোর ছময় অার পাই কোথায়, ন্যা, তুই সালা’। তো অামাকে গালাগাল দিতে অামিও গেলাম রেগে, বললুম, ‘দে সিক্কা, সাইকেল নেব’। ওই ওখান থেকেই নাম।”

বিড়িটা শেষ করে অাধপোড়া পিসটা বাঁ কানের পাশে গুঁজে ব্রজদা গুরুগম্ভীর স্বরে বললেন, “নিতাই, লেট মি হেল্প। পাড়ার লোক হয়ে, প্রতিবেশি হয়ে দুঃখের দিনে পাশে দাঁড়াবো না, এ হয় না।”

“থ্যাঙ্কু ব্রজদা। অাপনি না থাকলে অাজ…বসুন বসুন। রান ভুলো, রান।”

খানিক পরে দেখা গেল পিছনে পিঁড়িতে দুই মুর্তিমান,সামনে প্রাণপনে হ্যান্ডেল কামড়ে ভুলো দ্য ডগ তীব্র গতিতে “কেঁউ-কেঁউ” শব্দে ধেয়ে চলেছে বাইসাইকেল থিফের সন্ধানে।

ভুলো এন্ড কোম্পানিকে চোর ধরতে দিন। চলুন পাঠক, কেষ্টর দোকানে ভাল বেগুনি করে, গরমাগরম খেয়ে অাসা যাক। কেষ্টর দোকান সুবিখ্যাত, দেশ-বিদেশ-চাঁদ-পাহাড়-দেবাদিদেব সক্কলে অাসে। দোকানটা কাছেই, এই এসে পড়ল বলে। ওই তো, সামনে একটা সাইকেল দাঁড়িয়ে অাছে যেটার সামনে। দাঁড়ান দাঁড়ান, চেনা-চেনা লাগছে না সাইকেলটা? ওই তো গামলাটা ক্যারিয়ারে বসানো, ওই তো সীটে কয়েকটা অাঁশ দেখা যাচ্ছে, ওই তো পিছনে ক্ষুদে-ক্ষুদে অক্ষরে “মেড ইন ইতালি” লেখা দেখা যাচ্ছে।

ক্লিফহ্যাঙ্গার যাকে বলে অার কি।


সোমদেব ঘোষ, ২০১৫-১১-০৩, কলিকাতা শহর।

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s