রাগবাবুর অাসল নাম যে কী, সেটা পাড়ার কারুরই প্রায় মনে নেই। ভদ্রলোকের পৈত্রিক বাড়ি হরিণঘাটায়, অার পিতামহের বাড়ি ওপার বাংলায়, সম্ভবত ময়মনসিংহে। সে খবর পাড়ায় বেশি কারোর জানা নেই, জানার বিশেষ অাগ্রহও দেখা যায় না। তার কারণও বিস্তর। রাগবাবু পাড়ায় বিখ্যাত তাঁর রাগের জন্য। পান থেকে চুন বা চুন থেকে পান, যেখান থেকে যাই খসুক না কেন, তেলেবেগুনে জ্বলে উঠবেন রাগবাবু। কেমিস্ট্রির টীচার রামকিঙ্করবাবু অারেকটু খোলতাই করে বললেন, “রাগবাবুর রাগ ওই তেল অার বেগুনে শানাবে না, ওর জন্য চাই জল অার পটাসিয়াম”।

কেষ্ট ক্লাস এইট অবধি পড়াশুনো করেছে, সিলেবাসে রসায়ন তেমন ঢুকবার অাগেই সোজা বাপের তেলেভাজার দোকানে এসে ল্যান্ড করেছিল। সিনিয়র কেষ্ট কিছুকাল যাবৎ গত হওয়াতে কেষ্টই এখন পাড়ার তেলেভাজা পার্টির লিডার, কালিপুজোয় বিস্তর চাঁদা তুলে বেড়ায়। রামকিঙ্করবাবু গতবার তিরিশ টাকা চাঁদা দেওয়াতে কেষ্ট তাঁকে দোকান থেকে ব্যান করেছিল ফর লাইফ অর অন পেমেন্ট অফ ডোনেশন। তাতে রামকিঙ্করবাবু ডেলি বিকেলের বেগুনি-ফুলুরিতে টান পড়ায় দুজনেই দুজনকে দেখতে পারে না। রামকিঙ্করবাবুর অ্যানালিসিস শুনে খেঁকিয়ে উঠে বলল, “কোতাকার কোত তেকে কেমি-ফেমি শিকে এয়েচে কে জানে, জলে পটকা দিলে পাটবে কী, পুস হয়ে যাবে তো।”

রামকিঙ্করবাবুও এ কথা শুনে ফোঁস করে উঠলেন, “তোর ব্যাটা ওই বেগুনি ফুস হয়ে যাবে। পটাসিয়ামকে পটকা বলা? অ্যাঁ?”

রামকিঙ্করবাবুর গলাটা ভারি সরু, অাওয়াজ বেরোয় চিঁ-চিঁ করে। ক্লাসে গোলমাল শুরু হলেই উনি ভীষণ উত্তেজিত হয়ে টেবিলে ডাস্টার পেটাতে থাকেন। এখন হাতের কাছে ডাস্টার না থাকায় নিজের ছাতাটাই মাটিতে ঠুকতে লাগলেন। কেষ্টও ছাড়বার পাত্র নয়। তেলের হাতা মাথার উপর ঘোরাতে ঘোরাতে সেও বলতে লাগল, ” সারা বচর পটকা-বেগুনিতে কিচু নয়, শুদু ওই কটা চাঁদার টাকা দিতেই বাবুর এত কেদ।”

যাকগে, কেষ্ট অার রামকিঙ্করবাবুকে বচসা করতে দিন, অার এদিকে সরে অাসুন, নয়তো হয় ছাতার বাড়ি খেয়ে চাঁদি ফাটবে, নয় গরম তেলের ছ্যাঁকা খেয়ে পুড়ে মরতে হবে। তার চেয়ে চলুন হাঁটা মারা যাক রাগবাবুর বাড়ির দিকে। এই কার্তিকের সন্ধ্যাবেলা, দারুণ ওয়েদার, তায় লোডশেডিং, বাড়ির ভিতর অন্ধকারে ভুতের মত থাকার কোন মানে হয়? ভাল ওয়াক হবে। বেশি দূর নয়, এই তো, এই রাস্তা ঘুরতেই দেখা যাবে। ওই যে সব অালো জ্বলছে, ওই বাড়িটা।

হ্যাঁ, ঘাড় ঘুড়িয়ে দেখছেন বুঝতে পারছি, কারেন্ট এসে গেছে কিনা। না, এই লোডশেডিঙের বাজারে তিন ঘন্টা মিনিমাম। ওই বাড়িতেও কারেন্ট নেই, রাগবাবু রাগ করছেন।

ইয়েস। রাগ করছেন।

রাগের সঙ্গে কারেন্টের কী সম্পর্ক? কিছুই নেই, যদি না ইলেক্ট্রিক অাপিসের শিশিবাবুকে ধরেন। উনি নাকি রাগ করলে সুইচ টিপে কারেন্ট অফ করিয়ে দেন।

সুইচ টিপেই তো কারেন্ট অফ হয় বলে জানতুম। অার নাম শিশিবাবু কেন? হেঃ হেঃ, সে নাহয় অার এক দিন বলা যাবে।

ওঃ, কারেন্ট অার রাগ? বললুম না, কোন সম্পর্কই নেই। মানে প্রায় নেই। মানে দুনিয়াতে রাগবাবু ছাড়া অার কারুর রাগের সঙ্গে কারেন্টের কোন ডিরেক্ট সম্পর্ক নেই, এ কথা অামি হলপ করে বলতে পারি। রাগবাবুর অাছে। কীকরে? বলছি। দেখুন, বাড়ি গিয়ে কড়া নাড়ি। দেখলেন, অালো ফট করে নিভে গেল। দরজাও খুলে গেল, ভিতরে অন্ধকার, রাগবাবু তাও বুদ্ধি করে একটা মোমবাতি হাতে নিয়ে এসেছেন। নমস্কার, পরিচয় করিয়ে দি, ইনি পাঠক, অাপনার সঙ্গে অালাপ করতে এসেছে। হ্যাঁ হ্যাঁ, ওই কেষ্ট-রামকিঙ্করের কাছেই শুনে। ওরা এখন ঝগড়া করছেন, একজন ছাতা বাগিয়ে, একজন খুন্তি ঘুরিয়ে। ওই হল, খুন্তি-হাতা একই জিনিস। উনিশ-বিশের তফাত। ভিতরে অাসব? হেঁ হেঁ, ওইজন্যই তো অাসা। অাসুন, পাঠক, সাবধানে, চৌকাঠে মাথা না ঠোকে। দেখে। অাঃ, অাপনার চেয়ারটা বড়ই অারামদায়ক। চা? হ্যাঁ হ্যাঁ নিশ্চই। পাঠকের নিশ্চই চা চলবে? দার্জীলিং? হবে? ও, অাপনি অাসাম-বিরোধী? বেশ বেশ, তো বলছিলাম যে রাগবাবু…

চমকাবেন না অত, ডিয়ার পাঠক। বাড়ির অালো জ্বলে উঠল তো? অাসলে রাগবাবুকে রাগবাবু বললেই উনি রেগে যান। দেখছেন না, কেমন বালবের পাওয়ার বাড়ছে? যত রাগবেন, যত ফুঁসবেন, অালো তত জোরালো হবে। এ অাপনাদের ওই ব্যাটারির থেকে অনেক বেটার…


রাগবাবুর কাহিনী ক্রমশ প্রকাশ্য। এই পাতায় নজর রাখুন।

সোমদেব ঘোষ, ২০১৫-১১-১১, কলিকাতা শহর।

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s