এই গুল্পটি শুরু করেছিলাম দিন তিনেক অাগে। মাঝপথে বার-অ্যাট-ল এসে এমন বাগড়া দিল যে চিগুদা, মানে চিত্রগুপ্তর কথা মাথায় উঠল। যাই হোক, সে সুযোগ অাবার এসেছে। অ্যান্টি-বার-অ্যাট-ল সিকিওরিটি সিস্টেম লেগেছে। এবার গল্প শেষ না হয়ে যায় কোথায়…


চিত্রগুপ্ত ব্যস্ত মানুষ, ইধার কা ম্যান উধার, উধার কা উওম্যান ইধার করেই তাঁর দিন কাটে। এরকম করেই বহুকাল চলেছে, দিব্যি খাতা বাগিয়ে কলম পিষে দিনগুলি কাটে যাচ্ছিল। নিত্যনতুন লোকেদের সঙ্গে অালাপও হত, কত কিছু জানতে পারতেন। এই তো, এই কিছুদিন অাগেই, এসেছিল এক ছোকরা। বলে কিনা, সে নাকি জ্যাক। চিত্রগুপ্ত খাতা মিলিয়ে দেখেন, কোথায় জ্যাক? নাম তো অন্য, বিশাল নাম, অনেকগুলো চ্যালা-চামুন্ডা নামের সঙ্গে ঝুলে পড়েছে, তায় অাবার প্রেসিডেন্টও। চিত্রগুপ্ত তাঁর পেটেন্টেড জেরা শুরু করলেন।

— অ্যাই ছোকরা।
— অাই অ্যাম নট এ ছোকরা। অাই অ্যাম এ প্রফেস…
— বুয়েছি বুয়েছি, পেশাদার লোক। তো কী করা হয়…

এখানে বলে রাখা ভাল, কার্ল এবং সিগমুন্ডের সঙ্গে গোপন পরামর্শ এবং হাই লেভেল মিটিঙের পর চিত্রগুপ্ত…মানে চিগুদা পাস্ট টেন্স ছেড়ে প্রেজেন্ট টেন্স ব্যবহার করা শুরু করেছেন। তাতে নাকি অতিথি-অভ্যাগতদের সামলাতে সুবিধে হয়।

— হোয়াট ডু ইউ মীন “করা হয়”? অাই অ্যাম ডেড অ্যাম অাই নট?
— অাহা, রাগছ কেন? ওরকম বলেছি যাতে তোমার অাঁতে, বা অাত্মায়, কোনটাতেই ঘা না লাগে। তুমি চাইলে বলতেই পারি, কী করা হত? কিন্তু কী জানো হে ছোকরা…
— অামি বললাম তোমায়, অাই অ্যাম নট এ ছোকরা।
— ওই হল। অামার কাছে সবাই ছোকরা। কতদিন এলাইনে হয়ে গেল, খেয়াল অাছে?
— অামি না চাই জানতে ওসব ব্যাপার। অাই ওয়াজ এক্সপেক্টিং সেন্ট পিটার, পার্লি গেটস। কে বা কী হচ্ছ তুমি? অার কোন ভাষা এটা যাতে অামি কথা বলছি? নয় ইংলিশ, নয় ল্যাটিন, কোন ভাষা?
— ওরে বাবা এটা বাংলা ভাষা। রবীন্দ্রনাথ, বঙ্কিমচন্দ্র, তারাশঙ্কর, সুকুমার-সত্যজিত এদের ভাষা। অবিশ্যি তুমি যে যুগ থেকে এসেছো এরা কেউই ল্যান্ড করেননি।
— অামি নেভার হার্ড অফ দিস ভাষা। হু অার দীজ পীপল? অ্যান্ড হু অার ইউ? স্বয়ং পোপ হলেন অামার বন্ধু, তোমাকে এর জবাব দিতে হবে।
— এটাই অাসল ভাষা গো। Zaনতি পারো না? অার তোমার পোপ বন্ধু এতক্ষণে তোমার এপিটাফ লিখে-টিখে ফেলেছে।
— অামি ওয়াজ প্রমিসড্ হেভেন।
— তাই নাকি? কে প্রমিস করেছিল? পোপ?
— ডু ইউ নট নো হু অামি অ্যাম? অামি জ্যাক।
— জানি তো। তুমিই তো বললে।
— নো নো, অামি শুধু জ্যাক নই। অামি জ্যাক।
— অালবাত। কোন ব্যাটা উল্টো বলে? তুমি শুধু জ্যাক নও, তুমি জ্যাক।
— দিস ইস নো ইয়ার্কি। অামি জ্যাক, মাই নেম ইজ অামি জ্যাক, অামার নাম অামি জ্যাক।
— এঃ, অটোকারেক্টটা বিগড়ে গেছে দেখছি অাবার। এই কে কোথায় অাছিস, স্টিভকে ডাক তো, এটা ওর জব। কী সিরিই না করেছে অাপেলটার।
— অাপেল! ইয়েস অাপেল। অামার…হেড…টেল…অাপেল…
— হউমম। তোমার স্পীচ সফ্টওয়্যারটাও গড়বড় করছে। স্টিফেন সেদিন ফোন করে বলে কিনা, ওটা নাকি ওর চাই, লেটেস্ট ভার্সানটা। অামি বললাম, দিতে পারি, কিন্তু ওর হকিং প্রেশার কুকারটা অামায় দিতে হবে। প্রেস্টিজটা বাড়বে অার কি…
— …এফ…এম…এ…
— এফ-এম রেডিও শুনবে? কিন্তু তোমার সময়ে তো রেডিও অাসে নি বাপু। অার তোমার যা বায়ো-ডেটা দেখছি, এম-এ নিশ্চই করেছো।
— ক্যা…ক্যাল…
— ক্যালকাটা? দেরী অাছে। এখনও ওই সুতানটি-গোবিন্দপুর স্টেজেই অাছে।
— …কুলাস।
— ও, টিনটিন? বড় ভাল লিখবেন গো হার্জ ভদ্রলোক। ক্যালকুলাস, যাঁকে অবিশ্যি উনি তুরনেসল বলে ডাকবেন, কী দারুণ চরিত্র বল। ওনার কান্ডকারখানা দেখে হেসে মরি। পেন্ডুলামটা…
— ক্রি…ক্রিঃ…ক্রিং…করাৎ…ক্র্যাং…
— এঃ, একেবারে সিস্টেম ফেল দেখছি যে। ওহে, স্টিভ কী বলে? পারবে না? মানে সত্যিকারের কোড যে করতে পারে তাকে চাই? রিচিকে ডাকি তাহলে? ও, খবর চলে গেছে? বাঃ, কতক্ষণ লাগবে সারাতে…?
— অাঃ অাপনাদের এখানে যা দুরবস্থা হল অামার জীবনে হয়নি। অামি মানহানির মোকদ্দমা করব।
— এই তো, সিস্টেম অনলাইন। রিবূট করে এক্কেবারে পারফেক্ট। অাপেল উড়িয়ে দিয়েছে ডেনিস? কী দিয়েছে? লিনাক্স? এই তো চাই। বলে দে তো সবাইকে, সবাই যেন ওইসব ফল-পাকুড় ফেলে লিনাক্স লাগায়।
— কার সঙ্গে কথা বলছেন?
— ও কিছু না, চিন্তা কর না। অামার অ্যাসিসট্যান্ট, ৫১২। খুব করিৎকর্মা।
— কী নাম বললেন?
— ৫১২। অাসল নাম পাঁচ রূপাইয়া বারহা অানা। কম্পিউটার ভালবাসে বলে ছোট্ট করে ৫১২ রেখেছে। সারাদিন রিচি-টরভাল্ডস-স্টলম্যান-ভ্যানরসাম-ফননয়ম্যান করে বেড়ায়।
— রাখুন অাপনার ৫১২। ওটা…এক মিনিট, বেশ মজার নম্বর তো।
— তা অার বলছি কি নাহলে। বেশ ব্রাইট বয়।
— হুম। কিন্তু অামি এখানে কেন? অামার তো হেভেনে যাওয়ার কথা ছিল। বিশপ তো তাই বলেছিল। অার এখানটা ঠিক কী? অার অামি এত সুন্দর বাংলা বলছি কীকরে?
— দাঁড়াও বাপু, একে একে উত্তর দি। এটা স্বর্গ-নরক যাওয়ার গেট। যমের দুয়ারও বলতে পারো। এই যে অামি, অামার কাজ হল অামার এই খাতা দেখে বিচার করা যারা এই অবধি এসেছে তারা উপরে স্বর্গে গিয়ে চিরকাল বোরড্ হবে, নাকি নীচে নরকে গিয়ে সারাজীবন তেলেভাজা খাবে।
— অাপনার কাজ? সে তো সেন্ট পিটারের কাজ।
— অাহা, পিটার তো সেদিনকার ছোকরা। ও ওই দিকটার দায়িত্ত্ব পেয়েছে, ইউরোপের দিকটা। ইমপর্ট্যান্ট ক্লায়েন্ট অবিশ্যি অামার কাছেই অাসে।
— মানে অাপনি ডিসাইড করবেন অামি হেভেন যাব, না হেল?
— অামি তো অার এমনি-এমনি করব না। এই যে খাতা দেখছ, এইতে লেখা রয়েছে তোমার সমস্ত জীবনের ঘটনা। বসওয়েল পেলে বর্তে যেত। এই দেখেই অামার কাজ বিচার করা, তুমি হেভেন যাবে না হেল। স্বর্গ, না নরক।
— হেভেন, ডেফিনেটলি। অামি কী-কী করেছি দেখুন সারা জীবনে।
— হুমম, তা বেশ কিছু করেছ দেখছি। কিন্তু এত কিছু করেও নাম নিয়ে ঘাম ছুটছিল কেন বল তো?
— কোথায় ঘাম ছুটছিল? ঠিকই তো নাম বলছিলুম।
— নিজেকে জ্যাক বলছিলে কেন? তোমার নাম তো জ্যাক নয়।
— অাঃ, কখন নিজেকে জ্যাক বললুম?
— বলছিলে তো, অামি জ্যাক।
— বিলকুল না। কক্ষনো বলিনি এরকম।
— অালবাত বলেছো। দাঁড়াও, ৫১২-কে ফোন লাগাই। অামাদের ফোনগুলো সেই পুরোন ধাঁচেরই, বুঝলে, এখনও ডায়াল করতে হয়। ঘুরিয়ে-ঘুরিয়ে। অাজকালকার ছেলে-ছোকরা বুঝবেই না সেই অানন্দ। হ্যাঁ, ৫১২? কী বলছে জ্যাক? অ্যাঁ, কী, ওটাই ওর নাম? জিজ্ঞেস করবো অাবার? করলাম তো এতবার। পুরো বাংলায়? অাচ্ছা, দাঁড়া, হোল্ড কর…হ্যাঁ তো বাবা, ৫১২ বলছে তোমার নামটা পুরো বাংলায় বলতে।
— অাই জ্যাক।
— কী গেরো, ওরে ৫১২, এখনও তো বলে সে জ্যাক। অ্যাঁ, শুধু নামটা বলতে বলব, অার কিছু নয়? বেশ। তো বাবা, শুধু নামটা বলবে, অার কিছু না। অার কোন কথা নয়, শুধু নামটা।
— অাইজ্যাক।
— অাইজ্যাক…অাইজ্যাক…ইয়েস, অাইজ্যাক নিউটন, কেমব্রিজ, লিউকেসিয়ান প্রফেসর, রয়্যাল সোসাইটি, অাপেল, গ্র্যাভিটি, ল’জ অফ মোশন, প্রিন্সিপিয়া…বাঃ, মিলে গেছে তো।
— যাক বাবা, বাঁচা গেল। এবার তাহলে অাসি? স্বর্গের দরজাটা কি ওইটে…?
— দাঁড়াও বাপু, অত হুটোপাটি করো না তো। বয়স হয়ে গেছে, বুড়ো হাড়ে সয় না। বেশ ভাল ভাল কাজ করেছ সারাজীবন, সে তো দেখতেই পাচ্ছি। তুমি না থাকলে মানুষের জ্ঞান যে কোন তলানিতে পড়ে থাকত তার ইয়ত্তা নেই। সেই শুরু করলে মাধ্যাকর্ষণ দিয়ে তো অার থামলে না। সাধে কি অার তোমার বন্ধু অালেকজান্ডার পোপ বলে,

NATURE and Nature’s Laws lay hid in Night:
God said, “Let Newton be!” and all was light.

তুমি তো দিকপাল লোক হে। তোমার তো স্বর্গ যাওয়া অলমোস্ট নিশ্চিত।
— থ্যাঙ্কু…অলমোস্ট?
— হ্যাঁ, মানে, ইয়ে, কারুরই রেকর্ড তো অার একদম পার্ফেক্ট হয় না। তোমারটাতেও দেখছি দু-একটা গোলমাল অাছে।
— গোলমাল? কীসের গোলমাল?
— বেশি কিছু না। এই যে প্রথমে দেখাচ্ছে যে তুমি জীবনে তিনশো সাড়ে সাতাত্তরখানা প্লেন লুঠ করেছো?
— অ্যাঁ?
— তাই তো দেখছি। অত করেও এতগুলো প্লেন লুঠ করার সময় কোথায় পেলে?
— প্লেন-টেন অামি কোনদিন কিছু লুঠ করিনি। প্লেন তো জ্যামিতিক ব্যাপার, তাকে অাবার লুঠ করে কীকরে?
— তাইতো। তোমার সময় প্লেন? এক মিনিট, দাঁড়াও দাঁড়াও, যান্ত্রিক গোলোযোগ, রূকাউট কে লিয়ে…হ্যাঁ, ৫১২ বলছো? এনার নামে প্লেন লুঠ…ও, ক্লেরিকাল এরার? ঠিকই ধরেছি। কার সঙ্গে গুলিয়েছে? কী নাম, হাইজ্যাক নিউটন? এনার কেউ…ব্রাদার ফ্রম অ্যানাদার মাদার নয়টয় তো? অাচ্ছা ঠিক অাছে। না অাইজ্যাকবাবু, তোমার নামের পাশ থেকে এই লাল দাগটা হটে গেল। থুড়ি।
— তাহলে এবার…?
— রোয়েট। লাল দাগ অারও অাছে।
— অাবার কী?
— ক্যালকুলাস।
— ক্যালকুলাস…? ও, লাইবনিৎস?
— লাইবনিৎস! গটফ্রীড উইলহেল্ম ফন লাইবনিৎস। তোমার কিছু বছর অাগেই সে এখানে অামার সামনে এসে উপস্থিত হয়েছে।
— দেখুন, ক্যালকুলাস যে অামারই সৃষ্টি সে নিয়ে কোন সন্দেহ নেই। সবাই মেনে নিয়েছে। লাইবনিৎস লোকটা সৎ নয়। নিজের লেখা পরে পাল্টে সেটাকেই সঠিক বলে চালানোর বহু চেষ্টা করেছে। হ্যানোভারে একা মরেছে, বেশ হয়েছে।
— হয়তো। কিন্তু ভাই অাইজ্যাক, অাজ থেকে কিন্তু অনেক বছর পরে লোকে জানবে যে ক্যালকুলাসের জনক তুমি একা নও,  তোমাদের দুজনের অবদানই সমান গুরুত্ত্বপূর্ণ। নিউটন এবং লাইবনিৎস। অার তোমার যে ওই ফুটকি দিয়ে ক্যালকুলাস করা, তার চেয়ে কিন্তু বেশি লোকে জানবে লাইবনিৎসের ডি-ওয়াই-ডি-এক্স।
— হায় হায়, এত করেও…
— দুঃখ করো না। ক্যালকুলাস ছাড়াও বিশ্ববিজ্ঞানে তোমার যা অবদান, তিন হাজার বছর লোকে মনে রাখবে। তুমিই তো প্রথম, তোমার পরে কত অাসবে, তোমারই পথ অনুসরণ করবে।
— বলছেন?
— বলছি। কিন্তু…
— অাবার কিন্তু?
— লাল দাগটা ভুলে গেলে? লাইবনিৎসের বিরুদ্ধে তুমি যা করেছ, সেটায় তোমার খাতায় একটা ছোট্ট করে “ইতি গজ” পড়ে গেছে।
— ইতি গজ?
— ওটা ট্রেডমার্ক। যুধোর অবদান।
— তো সেই ‘ইতি গজ’ মুছতে কী করতে হবে?
— কী অাবার, অতি সোজা। নরকটা এট্টু ঘুরে অাসতে হবে।
— নরকে পাঠাচ্ছেন?
— অাহা অাঁতকে উঠো না। চিরকালের জন্য নয়, একটু ট্যুর দিয়ে দিচ্ছি। সঙ্গে ৫১২ থাকবে, চিন্তা নেই। তেলেভাজা খেতে পাবে, তেলের কড়ায় সেদ্ধ হতে হবে না।
— তেলেভাজা কী জিনিস?
— অাহা, দেখতেই পাবে। এই যে, ৫১২ এসে গেছে। ওর সঙ্গে যাও, নরকদর্শনটা সেরে নাও, খাতার ইতি গজটাও মুছে ফেল।
— ওকে কি ৫১২ বলেই ডাকব?
— পুরো নামটা তো বিশাল বড়, ৫১২-ই ডাকো। এখানে এসে বেচারা কিশোরের ভক্ত হয়ে পড়ে, তাই নিজের নামটা ছেড়ে ওই পাঁচ রূপাইয়া বারহা অানা নামটা নিয়েছে। সেও অবিশ্যি বলে, যেমন তুমি বললে, নম্বরটা বেশ ভাল। বাইনারি না কী যেন। ওর তো অাবার ওদিকেই ঝোঁক কিনা। তবে হ্যাঁ, ওর কাছ থেকে ছুটে পালানোর চেষ্টা করো না। ও অলিম্পিক লেভেল রানার, ঠিক ধরে ফেলবে। অাহা বেচারা, এত করে এনিগমাটা সলভ্ করলো, অার ওকেই কিনা…যাক গে, যাও ওর সঙ্গে, নরকের টুরিং করিয়ে দেবে ঝটপট।

— —
সোমদেব ঘোষ, ২০১৫-১১-১৬, কলিকাতা শহর।

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s