বিধুজ্যাঠার জিকে : লন্ডনের টিউব ম্যাপ

— হ্যারি বেক।
— হ্যারি বেক?
— কে ছিলেন?
— তা কীকরে জানব? অামি কি অাপনার মতো চলমান উইকিপিডিয়া নাকি?

এইখানে বলে রাখি, কথাবার্তা চলছে বিধুজ্যাঠা অার পুলুদার মধ্যে। নকলডানের চাপে পড়লে পড়বেন ঘোষমশাই, অামার অার কী? অামার জন্মের অাগেই বাবা ঠিক করেছিলেন ছেলের নাম রাখবেন পরেশরঞ্জন মিত্র, শেষে ডেলিভারি রুমে ছেলের বদলে মেয়ে এসে পড়ায় একটু ফাঁপরে পড়েছিলেন। ফাইন্যালি পরেশ বেচারাকে ছেঁটে ফেলে রঞ্জনকে ফেমিনিন ট্রান্সফর্মেশনে ফেলে রঞ্জনা মিত্রতে রফা হয়েছিল। পরেশ পোর্শানটা অবিশ্যি নিতান্ত একেবারে ওয়েস্ট যায়নি। পুলুদা তাকে কব্জা করে একটু ধোবিপাট মেরে বেশ সুন্দর কাজে লাগিয়েছে, অাদর করে–উইথ খান দুয়েক গাঁট্টা ফ্রী– অামায় ডাকে পার্শে। মাছ পুলুদার ভীষণ প্রিয় জিনিস, পাতে পিস-দুয়েক না পড়লে তার ভাত খাওয়া হয় না। অবিশ্যি মটোনের মত নয়। মটোন খেলে পুলুদা ইমোশানাল হয়ে পড়ে।

সে যাক গে, পুলুদা শনি-মঙ্গল করে বিধুজ্যাঠার কাছে ঢুঁ মারে। ওর ভাষায়। হত্যে দেয় বললে বেটার। বিধুজ্যাঠার জেনারেল নলেজ কলেজবিখ্যাত। এসপেশালি বইয়ের বা গল্পের জ্ঞান, বিশেষ করে গোয়েন্দা গল্পের জ্ঞান। ওদিকে পুলুদা অাবার গোয়েন্দা কাহিনী লিখে পাড়াবিখ্যাত। তাই দুজনের দিব্যি ঘুঁটে-গোবরে লেগে যায়। মুশকিলটা হল অামাকে নিয়ে। পুলুদা প্রচুর ছাইপাঁশ বেকার রজনী যাপন করে এই সিদ্ধান্তে উপনিত হয়েছে যে, একজন গোয়েন্দা গল্প লেখকের একটি সাগরেদরূপী স্যাটেলাইট পার্শ্বে থাকা নাকি ভীষণ প্রয়োজন। জরুরি দরকার। ডাকনামটাও খানিকটা ওই কারণেই। তাই শনিবার করে ক্রিকেট হোক কি ফুটবল, যে মাঠেই থাকি না কেন, হিড়হিড় করে টানতে-টানতে নিয়ে যায় বিধুজ্যাঠার কাছে। মঙ্গলবার এমনিতে পারে না, কেননা ইস্কুল। কিন্তু এই পুজোর ছুটির মধ্যে তাও চলে না। সুতরাং বিধুজ্যাঠার বাড়ি গিয়ে অামার কাজ স্টেনোগ্রাফারের।

অবিশ্যি বিধুজ্যাঠা বলতে যে অাপন জ্যাঠা তো মোটেও না। পাড়াতুতো না বলে বরং পাশেরপাড়াতুতো বলা যেতে পারে, নেবারিংনেবারহূডজ্যাঠা। অামি প্রথম দিন ওনাকে জ্যাঠা বলাতে উনি জিভ দিয়ে ঠিক পৌনে পাঁচ বার চুকচুক শব্দ করে বলেছিলেন, “শোন হে ভেটকি, অামি শুধু জ্যাঠা নই, জন্মজ্যাঠা। তাই অামাকে বিধুজ্যাঠা বলে ডাকবে, বুঝলে?”

অগত্যা।

— হ্যারি বেক। কে ছিলেন?
— অাপনিই বলুন। বলাটা অাপনার কাজ, শোনাটা অামার অার পার্শের।
— মেট্রোয় চড়া হয়?
— চড়া হবে না অাবার। রেগুলার চড়ি। চড়ে চড়ে জিভে চড়া পড়ে গেছে।
— স্টেশন চিনতে অসুবিধা হয়?
— কী যে বলেন বিধুজ্যাঠা। এতদিন ধরে মেট্রোয় চড়ছি, স্টেশন চিনতে অসুবিধা হবে? কীরে পার্শে, তোর হয়?

নিঃশব্দে মাথা নাড়লাম। মেট্রোয় উঠলে অামিই গাইড, পুলুদা দিব্যি নাক ডাকিয়ে ঘুম দিতে শুরু করে। সে বসে হোক কি দাঁড়িয়ে। জন্মগত ট্যালেন্ট।

— প্রথম যখন মেট্রো চালু হল, তখন কখন কোন স্টেশন এলো, কীভাবে বুঝতে?
— ওই যে, কামরার মধ্যে সুন্দর প্লেটের উপর এনগ্রেভ করা লাইন, তাতে মোটা মোটা ফুটকি, পাশে স্টেশনের নাম। দু-একবার উঠাই সড়গড় হয়ে গিছলো।
— অার নতুন স্টেশন শুরু হওয়ার পর? প্রথমদিকে তো–তখন তুমি নিতান্তই ছোট–টালিগঞ্জ টু এসপ্লানেড বই ছিলই না।
— এখন ব্যবস্থা তো অারও ভাল। স্টেশনের সঙ্গে তো অাজকাল একটু ছোট্ট করে ডেসক্রিপশনও দিয়ে দেয়। কত সুবিধা বলুন?

সুবিধা না ছাই। মহানায়ক উত্তম কুমারে নামবেন টালিগঞ্জ এলাকার জন্য। নেতাজীতে নামবেন কুঁদঘাটের জন্য। মাস্টারদা সূর্য সেন, বাঁশদ্রোণী। গীতাঞ্জলি, নাকতলা। কবি নজরুল, গড়িয়া বাজার। উফফ। তার চেয়ে জায়গার নামে স্টেশন করলেই পারে, ক্ষেতিটা কী ছিল শুনি? কী দরকার অভিনেতা, বিপ্লবী, কবি, মায় কবিতাকে টেনে অানা?

— তোমার কী মনে হয়, ওই যে অতবড় লেখাটা তিন-তিনটে ভাষায় ওইটুকু বোর্ডে লেখা থাকে, মেট্রোর কামরার ভিতর, ওতে যাত্রীর সুবিধা না অাদপে ভোগান্তি?
— সুবিধা না? কত ইনফো পায় বলুন।
— দিল্লী গেছো?
— গেলুম তো। এই তো, গত মে মাসেই তো গেলুম।
— সেখানকার মেট্রো কেমন লাগলো?
— ওরে বাবা, কী গোলমেলে, কতগুলো লাইন, কেয়া বুরবক ব্যাপার। জান কয়লা হয়ে গিছলো।
— তো চড়লে কীকরে?

কারণ গ্রীষ্মের ছুটি ছিল, অার অামি সঙ্গে ছিলুম বলে। যাওয়ার অাগে বুদ্ধি করে উইকিপিডিয়া থেকে দিল্লী মেট্রো ম্যাপের একটি প্রিন্টঅাউট সযত্নে ব্যাগে পুরে নিয়েছিলুম বলে।

— অারে অামার কী অার ওসবে বেশিক্ষণ সময় লাগে? দু-একবার উঠতেই অাইডিয়া পেয়ে গেলুম। এই পার্শেটা তো হারিয়ে যায় অার কি। শেষে ম্যাপ কিনে ওকে সামাল দিলুম।…

শুনেছো কান্ডটা?

— …কত কী লাইন, লাল-নীল-হলদে-সবুজ…

তুমি একটি অাস্ত ওরাং-ওটাং।

— তার মানে ওই ম্যাপ এবং বিভিন্ন লাইনের বিভিন্ন রং থাকাতে সুবিধাই হয়েছে বলো পুলু?
— তা তো বটেই, তা তো বটেই।
— ওই যে ম্যাপ, ওটা কি সাধারণ ম্যাপের মতো দেখতে?
— নয় বলছেন?
— অালবাৎ নট।
— কেন, ম্যাপ তো।
— কিন্তু সাধারণ ম্যাপের সঙ্গে বেশ একটা বড় রকম পার্থক্য অাছে হে পুলু।
— তাই নাকি? অামার মাথাতেও একটা অাইডিয়া এসেছে বটে, অাপনি বলুন, অামি মিলিয়ে নিচ্ছি।

এটা পুলুদার একটা ফেভারিট তরকীব। ভবী নেভার ভোলাফাইস, কিন্তু ওকে বোঝাবে কে? বেল দ্য হূ দ্য ক্যাট?

— ধরো, রেলের ম্যাপ। দেখেছো কখনও, হাতে নিয়ে? গোয়েন্দাকাহিনী লেখকদের এইসব জ্ঞান থাকা অাবশ্যক। তোমার অাজকালকার ছেলেরা তো অাবার…
— দেখেছি বিধুজ্যাঠা দেখেছি।
— রোডম্যাপ, রাস্তার ম্যাপ। নিশ্চই সেটাও দেখা অাছে?
— তা অাছে।
— লক্ষ্য করেছো কী, সেখানে দুটো স্টেশনের মধ্যে, বা রাস্তার কোন দুটি ল্যান্ডমার্কের মধ্যে, যে অাসল দূরত্ব, ম্যাপে বাই স্কেল ঠিক সেটাই দেখানো হয়?
— বাঃ, সে তো হতেই হবে। নাহলে ম্যাপ অাবার কী কাজের?
— মেট্রোতেও কি সেই ব্যাপার?

ঠিক তো! অামিও তো কখনো এরকম ভেবে দেখি নি। চেয়ে দেখি, পুলুদা চুপ। বিধুজ্যাঠাই বলতে লাগলে, “মেট্রোর যে ম্যাপ দেখ–কলকাতার কথা বাদই দিলাম, ওটা ওয়ান ডাইমেনশনাল। দিল্লীর মেট্রো নেটওয়ার্ক এই ক-বছরেই বেশ বেড়ে উঠেছে। একত্রিশ বছর হয়ে গেল, কলকাতা একটা লাইন অার চব্বিশটা স্টেশনের বাইরে বেরোতে পারলো না, অার তেরো বছরেই দিল্লী ছ-খানা লাইন অার ১৫৬-টা স্টেশন বানিয়ে ফেললো? কী লজ্জা।”

বিধুজ্যাঠার একটু এইসব ব্যাপার নিয়ে চায়ের কাপে–বা হরলিক্সের কাপে, উনি ডেলি সাত কাপ খান–তুফান তোলার শখ অাছে। অামরাও মাথা ঝাঁকালুম। সত্যিই, কী লজ্জা।

“সে যাকগে, কী বলছিলুম যেন?”

“হ্যারি বেক,” পুলুদার মুখ খোলার অাগেই অামি ইনসার্ট করে দিলুম। লেকচারটাকে অাবার ঠিক পথে ফিরিয়ে অানাটা পেনের কালি, কীবোর্ডের চাবি, খাতার কাগজ, অামার অাঙুল, এবং পাঠকের ধৈর্যের পক্ষে মঙ্গলের।

“ইয়েস, হ্যারি বেক। থ্যাঙ্কু ত্যালাপিয়া।”

হরলিক্সের পঞ্চম কাপটি এক চুমুকে সাবার করে বিধুজ্যাঠা বলতে শুরু করলেন।

“হ্যারি বেক। পুরো নাম, হেনরি চার্লস বেক। জন্ম ১৯০২ সালে, মৃত্যু ১৯৭৪ সালে। টেকনিক্যাল ড্রাফটার ছিলেন, ওই যে তোমাদের ইঞ্জিনিয়ারিং ড্রয়িং হয়, সেরকম ব্যাপার। লন্ডনের মেট্রো সিস্টেমকে অান্ডারগ্রাউন্ড বা টিউব বলে হয় জানো বোধহয়, তার সিগন্যালস্ অফিসে কাজ করতেন। লন্ডন অান্ডারগ্রাউন্ড প্রথম চালু হয় ১৮৬৩ সালে, অাজ থেকে দেড়শো বছরেরও বেশি অাগে। প্রথমদিকে খুব বেশি স্টেশন ছিল না, কিন্তু যত সময় যেতে লাগল, স্টেশন বাড়তে লাগল, অার বাড়তে লাগল যাত্রীদের দুর্ভোগও। কোন স্টেশন থেকে কোন ট্রেন নিলে কোথায় পৌঁছনো যায়, এ বোঝা প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠল নতুন যাত্রীদের পক্ষে। টিউবের ম্যাপ ছিল না তা নয়, কিন্তু তাতে কাজের কাজ তো হতই না, উল্টে অারও গুলিয়ে যেত। শেষে এই বেক তাঁর তৈরী ম্যাপ পেশ করলেন, এবং তা খুব শিগগিরি জনপ্রিয় হয়ে উঠল। লন্ডনবাসী স্বস্তির হাঁপ ছাড়লেন।”

“তা তো বুঝলুম,” পুলুদা বলে উঠল, “কিন্তু ম্যাপটির বিশেষত্ব কোথায়?”

তাক থেকে একটি ম্যাপের বই নামিয়ে অামাদের সামনে মেলে ধরে বিধুজ্যাঠা বললেন, “এই দেখ, এই সেই ম্যাপ। স্টেশনের মধ্যে ভৌগোলিক দূরত্বের চেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে প্রতিটি স্টেশন অালাদা অালাদা করে স্পষ্ট করে দেখানোর উপর। প্রতিটি লাইন ভিন্ন ভিন্ন রঙে করা, এক লাইন থেকে অন্য লাইনের ট্রানসিট স্টেশনগুলি রুইতনের চিহ্ন দিয়ে বর্ণিত, যাতে এক পলকে যাত্রী বুঝে নিতে পারেন কোথায় ট্রেন পালটাতে হবে। সব লাইন হয় সোজা অাঁকা কিম্বা অাড়াঅাড়ি কোনাকুনি, অাসল লাইন যতই ব্যাঁকাচোরা ভাবে চলুক না কেন। অনেকটা বৈদ্যুতিক সার্কিট বোর্ডের মতো, গ্রিড টাইপের। এই ম্যাপের ডিজাইন অনুসরণ করেই পৃথিবীর বেশিরভাগ মেট্রো ম্যাপ অাঁকা হয়ে থাকে। কলকাতা ছাড়া অবশ্য, একটা লাইনের জন্য তো অার ম্যাপ লাগে না। যত্তসব ছাইপাঁশ ব্যাপার। এই, গুরজাউলি, বল তো নেলোকে অারেক কাপ হরলিক্স দিতে। ”

জন্মজ্যাঠাই বটে।

— —
সোমদেব ঘোষ, ২০১৫-১১-২৪, কলিকাতা শহর।

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s