— বাবু?
— উঁ?
— বাবু, শুনছেন?
— অাঃ, ডিস্টার্ব করছিস কেন? দেখছিস না লেখার চেষ্টা করছি। লেখা না বেরোলে ডিটেকটিভ পারো অার ডেসিডুয়াস পেটাবে যে।
— ও বাবু, ও লেখা পরে লিখবেন। শুনুন না।
— বাবু? ওরে হতভাগা নিতাই, বাবু বলছিস কেন রে হঠাৎ? কখনো তো বলিস না…যদি না কোনও কাজ হাতাবার থাকে। ঝেড়ে কাশ, ঝটপট। কী চাই?
— ছিছি বাবু, এরকম বলতে অাছে? অামি অাপনার নুন খাই, গুন গাই…
— গুণ গাস না হাতি, সবার কাছে কী বলে বেড়াস অামার বুঝি কানে অাসে না? অার বানানটা শুধরে নে, ওটা গুণ হবে, গুন নয়।
— বাবু, কথা কইছি, তাতে বানান কীসের?
— বানান নেই? বলতে চাস?
— কথা কওয়ার সময়…
— বানান ঈজ অলওয়েজ দেয়ার। বানান কি বানানো, যে কথা কইতে শুরু করলে অমনি বুদবুদের মতো উবে যাবে?
— তাই হবে বাবু। অাপনি সর্বেসর্বা, অাপনি হুজুর ধর্মাবতার, অাপনি যা বলবেন তাই ঠিক।
— হুজুর ধর্মাবতার কাদের বলে জানিস?
— কেন বাবু অাপনাকে?
— কোর্টে গেছিস কখনও? অাদালতে?
— না হুজুর ধর্মাবতার, কখনও যাইনি হুজুর ধর্মাবতার, তবে সিনেমায় দেখেছি হুজুর ধর্মাবতার। বচ্চনের সিনেমা, সেই টাকা খেয়ে মিথ্যা সাক্ষী দিতে গেছেন বচ্চন। বলা হয়েছে অাসামীর বিবরণ দাও, বচ্চনও এক হাত বের করে হাইট দেখিয়ে দিয়েছেন। উকিল বলেছেন অাসামী অাসলে একটি মুর্গি, তখন বচ্চনও অন্য হাত এনে মুর্গির হাইট…
— উফফ, রাম রাম। বচ্চনের সিনেমার কথা বলেছো তো জনাবের মাথা খারাপ হয়ে যায়। মুর্গি দিয়ে অামি কী করবো?
— কিছুই না জনাব। না খাওয়ার পরিতৃপ্তি পাবেন।
— না খাওয়ার? জানিস, মুর্গি এনেছি, বাজার থেকে। পুরো তিনশো গ্রাম। কাল খাওয়া হবে, সক্কাল সক্কাল।
— রোসার সঙ্গে বসে বুঝি?
— দ্যাখ নিতাই, নেহাত অামি শান্তিপ্রিয় মানুষ, নয়তো এক্ষুণি তোকে ধরে ঘা কয়েক দিতুম।
— পারতেন না।
— চ্যালেঞ্জ দিচ্ছিস?
— প্রয়োজনই নেই। অাপনার যা ল্যাক্টোজেন খাওয়া চেহারা, ঘা কয়েক কি, একটাই দিতে গিয়ে নিজেই উল্টে পরবেন।
— চপেটাঘাত করতে মুগুর ভাঁজা চেহারা লাগে না রে হতভাগা।
— অালুর, না ভেজিটেবল্?
— মানে?
— মানে অালুর চপ, না…
— তোর সত্যিই অাজ মরণ নিশ্চিত। দাঁড়া, রাগবাবুকে ডাকি, উনি এলে তোকে শক থেরাপি দিয়ে…
— রাগবাবু ব্যস্ত।
— কেন কেন, অামি ডাকব অার উনি অাসবেন না?
— ওনার কাজ অাছে। কন্ট্র্যাক্ট এসেছে।
— কাজ অাছে মানে? উনি তো রিটায়ার করেছেন শুনেছি।
— ভলান্টারি।
— তা হলেও, কাজ অাবার কীসের?
— ছিল না। সপ্তাহ দুয়েক অাগে অবধি ছিল না। এখন হয়েছে। অাপনার দৌলতে।
— অামার দৌলতে?
— অাপনি লিখেছেন না, উনি রেগে গেলে…
— ওয়াটার-পটাসিয়াম রাগ।
— ওই হল। উনি রেগে গেলে যে অালো জ্বলে ওঠে, সে খবর নাকি ছড়িয়ে পড়েছে।
— এই রে, উনি পেটাবেন। পইপই করে বলে দিয়েছিলেন কাউকে না জানাতে। একা মানুষ, একা থাকতেই অভ্যস্ত। খামোখা ঝামেলা চান না…
— সেটাই তো ব্যাপার। একলা থাকেন কেন?
— ইন্ট্রোভার্ট লোক শুনেছি।
— সে তো অাপনিই, অাপনি কি পুরো একলা থাকতে পছন্দ করেন?
— কাজের সময় তো বটেই।
— অার কাজ হয়ে গেলে? ভাল লেখা নামাতে পারলে একটু ঢাক পেটাতে ইচ্ছা করে না?
— হউমম, তা করে।
— তাহলেই বুঝুন। রাগবাবুও সেরকম লোক। সাদাসিধে নিষ্কলঙ্ক জীবন, বিয়ে-থা করেন নি, অাপিস করে এসে বইপত্তর নিয়েই সংসার করতেন। কিন্তু অাপিস যেতেও খুব ভালবাসতেন। সহকর্মীদের সঙ্গে দেখা তো হত রোজ, বিকালে ফেরার অাগে কেষ্টার ক্যান্টিন থেকে ফিসফ্রাই অার স্যালাড তো তুলে অানতেন, কেমিস্ট্রী নিয়ে রামকিঙ্করবাবুর সঙ্গে কথা তো হত দু-একটা…
— রসায়ন নিয়ে?
— অারে রাগবাবুও তো ওই কেমিস্ট্রী নিয়েই কলেজে পড়েছেন। রামকিঙ্করবাবুর ক্লাসমেট ছিলেন তো।
— তো হলটা কী? হঠাৎ স্বেচ্ছা-অবসর কেন?
— ওই যে, ওনার রাগটা বেড়ে গেল। অাগে ঠিকই ছিল, একটু-অাধটু রাগতেন, কিন্তু বেশি কিছু না। অ্যাট মোস্ট একপিস টুনিবাল্ব মিটমিট করে জ্বলত কি জ্বলত না।
— মানে এই ব্যাপারটা ওনার চিরকালের?
— ছোটবেলা থেকে। ছোটবেলায় অারও গুরুতর ছিল, হঠাৎ-হঠাৎ অদ্ভুত রেগে যেতেন। একবার খেলার সময় কে যেন কী বলেছে, হাতে ছিল ওনার ক্রিকেট ব্যাট, টেনে ছুঁড়েছেন।
— কী সাংঘাতিক। তারপর? হাসপাতাল?
— না না, ব্যাট গিয়ে লেগেছে কারুর গাড়িতে, পিছনের টেললাইট ভেঙে একাকার।
— বোঝ।
— বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অবিশ্যি রাগও কমে অাসে রাগবাবুর। দিব্যি শান্তশিষ্ট হয়ে যান, মাইডিয়ার টাইপের লোক।
— অার এক দিন…
— এক দিন অচানক্।
— রাগ বেড়ে ওঠে?
— ফুলেফেঁপে একেবারে। সোজা ফুটন্ত কড়াই থেকে…
— ওয়াটার-পটাসিয়াম।
— ঠিক ধরেছেন। এই জন্যেই তো অাপনাকে রেখে দি অাশেপাশে।
— থ্যাঙ্কু…দাঁড়া, অামায় রেখে দিস মানে? ওরে হতভাগা নিতাই, কাজে তো অামি তোকে রেখেছি।
— তাই নাকি? মাননীয় মান্যবর, বলছেন যখন নিশ্চই ঠিক। মাননীয় মান্যবর কি কখনও ভুল বলতে পারেন?
— দেখাচ্ছি তোকে মাননীয় মান্যবর। এদিকে অায়, ইঁহা অাও, হাম দেখায়েগা, জরুর দিখায়েগা। কাহাঁ ভাগতা…
— ভাগতা অাবার কোথায়, জোরে পা চালালাম তো। অাপনি পারবেন অামাকে ধরতে, ওই ল্যাক্টোজেন খাওয়া চেহারা নিয়ে…
— দেখ হতচ্ছাড়া নিতে, অারেকবার যদি ল্যাক্টোজেন বলেছিস…
— তাহলে কী, জোর করে ল্যাক্টোজেন খাওয়াবেন বুঝি? অাগে ধরতে পারলে তো। তার অাগেই, অালিচাচার ভাষায়, মু লুম্বা লুম্বা ঠ্যাং ফেলু পালাবু।
— অালিচাচা? তিনি কিনি?
— সে কী, অালিচাচাকে চেনেন না?
— নামটা লেখা-লেখা লাগছে, কিন্তু…
— ওই ল্যাক্টোজেনের ফল, মেমরী তো নয়, মাকাল ফল। অারে অাপনিই তো…যাকগে, সে নিয়েই কথা।
— অালিচাচা নিয়ে?
— ইয়েস। বিরিয়ানি।
— দেখ নিতাই, তুই জানিস অামি বিড়ি খাই না, অার বারে বারে বিড়ি অানার কথা বললে…
— বিড়ি নয়, বিরিয়ানি। চাই নাকি?
— অ। তাই বল। বিরিয়ানী কোথায় পাব? ট্যাঁক তো গড়ের মাঠ।
— বিরিয়ানি হাম খিলায়েগা। অালিচাচার বিরিয়ানি।
— অালিচাচা বুঝি বিরিয়ানী বানান?
— বানান মানে? অালবাত বানান।
— অাবার বানান? অার বলেছি না, বানান খেয়াল রাখবি। বিরিয়ানী বানান দীর্ঘ-ঈ।
— ওই হল। অালিচাচার বিরিয়ানি…বিরিয়ানীর গন্ধ পেলে বানান জানান না দিয়েই কামান দেগে নন্দন-কানান পৌঁছে যাবে।
— মটোন বিরিয়ানী? বংপেন-মার্কা, পিওর বাঙালি বিরিয়ানি?
— কী চাই? মটোন-মাটন্-ছাগল-পাঁঠা-খাসি-গোট-গোস্ত…
— খাসা।
— বাইশ রকম বিভিন্ন স্টাইলে বিরিয়ানী করতে জানেন অালিচাচা।
— বলিস কী রে? অামি তো জানতুম ওনলি বিরিয়ানী মটোন বিরিয়ানী, চিকেন-অালু-এগ-ভেজ সব সেকেন্ড-ক্লাস সিটিজেন।
— অাবার ইনটলারেন্স নিয়ে কথা?
— বলব না? চিকেন বলে কী ছাগল নয়?
— অাপনি বদ্ধ পাগল, টি-এম কাছে পেলে করবে অাপনাকে ঢিট।
— অাচ্ছা সে বাদ দে, কালকের হাজার পাওয়ারের ডিটেকটিভ-মার্কা ফিশফ্রাই হজম হয়ে গেছে অনেকক্ষণ, খিদে জব্বর পেয়েছে, বিরিয়ানী কখন খাওয়াচ্ছিস?
— খাওয়াবো খাওয়াবো। যেতে তো হবে।
— তাহলে দেরী কীসের? বেরিয়ে পড়ি। শুভস্য শীঘ্রম্।
— অাপনার কাজ নেই? লেখা নেই?
— ও লেখা পরে হবে। পিটুনি খেলে খাব, বাট অাই ভেরি হাংরি। বিরিয়ানী। অালিচাচার বিরিয়ানী।
— কিন্তু খাওয়ানো তো ভুষি, যাতে লেখা বেরোয়।
— ভুষি? লেখার জন্য ভুষি খাওয়াবি? সাহস তো কম নয়।
— কেন লোকে দেয় তো শুনেছি। কাজ বের করার জন্য…
— ওরে গর্দভ, ওকে ঘুষ বলে, ভুষি নয়।
— অ। শুনতে একই রকম।
— এই নিতাই?
— উঁ?
— তোর সাইকেল হারিয়ে গেছে না?
— সে তো গেছেই।
— তো তা না খুঁজে এখানে যে? ভিত্তোরিও কোথায় যে গেল সেদিকে খেয়াল নেই?
— সে তো অাপনার দোষ। অামাদের তো সেই দশদিন হল কলেজ স্কোয়ারে বসে বসে পায়ে ঝিঁঝিঁ ধরে গেল। বলি এগোবেন কবে? ওইজন্যই তো অালিচাচার টোপ।
— অত সহজ নয়। নট সো ঈজি। ওইরকম ঘোল খাইয়ে পাড়ার দোকান থেকে তেলতেলে বাসি বিরিয়ানী খাওয়াবে অার লেখা বের করবে, ওটি চলবে না। অালিচাচার নাম অাগে শুনিনি কেন?
— কলকাতায় বিরিয়ানী খেতে গেলে কোথায় যান?
— ট্যাঁকে মানি থাকলে যেতুম অারসালান বা রয়্যাল।
— অালিচাচার নাম শোনেন নি তো?
— মানে, লিখেছি বটে, কিন্তু নাম শুনিনি।
— ওটাই তো মজা। নাম ওনার লোকে শোনে নি। ওনার বিরিয়ানী জগদ্বিখ্যাত নয়, শহরখ্যাত নয়, পরশিপাড়া বা পাড়াখ্যাতও নয়। কেউই ওনার কথা শোনেন নি। কিন্তু বিরিয়ানী পেলে সবাই সুড়সুড় করে ঠিক পৌঁছে যান অালিচাচার দোকানে। কীভাবে পৌঁছোন, তা তারা নিজেরাও জানেন না। অনেকটা অাপনার সেই হরিশঙ্কর পত্রনবিশের ডায়াগন অ্যালির মতো…
— হরিশ…অ, হ্যারি পটার। বললেই হয়।
— বাংলা নামটা শুনতে বেটার।
— হউমম। তো এই যে অালিচাচা, নাম না থাকা সত্ত্বেও এত নাম, দোকান কবেকার? কেউ নাম শোনেনি হয় কীকরে?
— দোকান? বহু পুরনো। কত পুরনো, কেউ জানে না। সে এক রহস্য। শুনতে চাইলে চলুন, বিরিয়ানী খেতে খেতে শুনবেন।
— তুই খাওয়াবি? ট্যাঁক…
— …গড়ের মাঠ তো, জানি। অালিচাচার গল্প শুনতে চাইলে অালিচাচা নিজেই খুশি হয়ে খাইয়ে দেবেন।
— তাই নাকি, তাহলে অার বিলম্ব নয়। টু দ্য পিঁড়িমোবিল!

— —
সোমদেব ঘোষ, ২০১৫-১১-২৮, রাত অাটটা কুড়ি, কলিকাতা শহর।

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s