“কঁক-কঁক-কঁক্কোর-কোঁক…”

বিলিতি চা-কচুরির দোকানে বসে অাছি, সেই সকাল থেকে। বিলিতি বলতে মধুদার দোকান, ছিল মধুদার বাবা, হরিজেঠুর। সেই অাশি সালে খুলেছিলেন হরিজেঠু, গতবছর ডেঙ্গুতে হঠাৎ মারা যাওয়া অবধি রোজ দোকান দিতেন। সকালে এসে ঝাঁপ খুলতেন, সারাদিনে বোধহয় ভাত খাওয়ার জন্য মিনিট দশেক বাজারের ভিতরে যেতেন। রাতে ঝাঁপ বন্ধ করে বাড়ি যাওয়া অবধি পুরো সময়টা দোকানেই কাটতো। । একদিনও নড়চড় হত না। হরিজেঠি–ওনার অাসল নামটা কেউ জানত না, মধুদার মা বলত কিম্বা হরিজেঠি, অামি হরিজেঠিই বলতাম–কচুরি করতেন, বাড়ি থেকে সেই কাকভোরে কচুরির তরকারি তৈরি করে অানা হতো। হরিজেঠু, এবং পরে একটু বড় হলে মধুদা, সাইকেলে করে সেই তরকারির হাঁড়ি বয়ে নিয়ে অাসতেন। দোকানের নামটা হরিজেঠু বোধহয় বৃটিশ রাখতে চেয়েছিলেন। যাকে দোকানের নাম লিখতে বলেছিলেন তাকে “বৃটিশ চা-কচুরি” বলতে সে “বিড়ি তিরিশ চা-কচুরি” লিখে-টিখে অাধফোকলা হাসিমুখে এসে দাঁড়িয়েছিলো। শেষে হরিজেঠু নিজেই রঙতুলি নিয়ে “বিলিতি” অবধি লেখার পর রং-ও ফুরিয়ে যায়, অার দোকানের নামও শুধু “বিলিতি”ই রয়ে যায়।

সকাল থেকে সেই দোকানের সামনে ঘাপটি মেরে পড়ে অাছি। লক্ষ্য, বঙ্কাদা। বঙ্কাদা অটো ইউনিয়নের প্রেসিডেন্ট, বছরতিনেক অাগে অামাকে একটা অটো চালানোর বন্দোবস্ত করে দিয়েছিল। দাদা মারা যাবার পর অামার উপর সমস্ত বাড়ির ধাক্কাটা অাসে। বৌদি-ভাইপো-ভাইঝি-মা-বোন সকলে অামার ঘাড়ে পড়ে। দাদা কাজ করতো রেলে, একদিন লাইন ইন্সপেকশনে কী ভেবে গিয়েছিলো একা, লাইনে পা অাটকে অাছড়ে পড়ে সেন্সলেস হয়ে গেল, অার তখনই একটা ট্রেন এসে…। অামার এম-এ পরীক্ষা তখন জাস্ট শেষ হয়েছে, রেজাল্ট বেরোতে দেরি, দাদার তেমন জমানো টাকাও ছিল না, চাকরি তক্ষুণি দরকার, কিন্তু সাইকোলজি ব্যাচেলারকে কে অার চাকরি দেবে? বঙ্কাদা তখনও ইউনিয়ন প্রেসিডেন্ট হয়নি, কিন্তু পাড়ায় তার কথা সবাই মানে। তার কাছে গিয়ে হাতে-পায়ে ধরলুম। সে অামার চেহারা দেখে কি একটা মনে-মনে হিসেব করে নিয়ে কিছু শর্তের বিনিময়ে অামাকে একটা অটো পাইয়ে দিলো। কিছুদিন পর থেকেই ইউনিয়নে কিছু ঝামেলা দলবাজি হলেই বঙ্কাদা অামায় ডেকে পাঠাতো। অামার কাজ খুব সহজ–যারা ট্যাঁ-ফো করছে, তাদের গলা দিয়ে বেশ কিছুদিন ট্যাঁ-ট্যাঁ ছাড়া কোন শব্দ না বেরোয়। ডায়লগ অামার নয়, বঙ্কাদার। মিঠুনদার বড় ফ্যান, পারলেই ফাটাকেষ্ট বা গুন্ডা লেভেলের ডায়লগ ঝাড়ে। যাই হোক, শরীরচর্চার দিকে অামার বরাবরের নজর, জিম করি রোজ। সেই ষোল বছর বয়স থেকে ডেভিডের জিমে যাচ্ছি, বছরদুয়েকের মধ্যেই একটু লোকজনকে দেখিয়ে-টেখিয়ে দিতাম। ছয়-চার চেহারা এবং জিম-টিম করে তদনরূপ চওড়া ছাতি-ফাতি দেখে লোকে ভাবতো সত্যিই বুঝি ইন্সট্রাকটর। ডেভিডের জিমের অামি ছিলাম ম্যাস্কট–জিমটা ভালো, অামার চেয়ে ভাল বিজ্ঞাপন যে ডেভিড পাবে না, সেটা ও বুঝে গিছলো। তাই একদিন অফার দিলো যে জিমে কোনওদিনও অামাকে চাঁদা দিতে হবে না যদি অামি রেগুলার প্যাংলাগুলোকে টিপস্ দি। অামিও রাজি, পকেটমানি সবটাই যেত ডেভিডের পকেটে, এবারে মনীষাকে একটা সিনেমা দেখানোর প্ল্যান করা যাবে।

দাদা মারা যাওয়ার পরে পুরো পিকচারটা পাল্টে গেল। সুমিতা–মনীষা অনেকদিন অাগেই কেটে গেছে–এম-এ-কে বিয়ে করতে পারে, কিন্তু অটো ড্রাইভার, ছোঃ! মেয়েমানুষ জাতিটাই এমনি। তিন বছর ধরে গায়ে-গতরে জং ধরিয়ে অটো চালালুম, কাটাতেলের চুলচেরা হিসেব করতে-করতে প্র্যাক্টিকাল সাইকোলজি শিখে ফেললুম। রাতে একটু বাংলা হলে অাজকাল অার চলে না, মারধর করতে হলে তো অারও। মাতাল হওয়ার সুবিধে হল, বৌদিও তখন স্রেফ একটি মেয়েমানুষ।

কিন্তু অটো অনেক হল। বঙ্কাদার প্রচুর খিদমত করেছি। গতকাল একটা বেশ বড় কাজ ছিল–অপারেশন বলি–চারজনকে অন্তত পনেরো দিনের জন্য ভাঙড়ে পাঠিয়ে দিয়েছি। বঙ্কাদা অাজ সকালে হাসপাতাল গিয়ে তাদের দেখে অাসবে, চিকিৎসার খরচা দেওয়ার কথা দেবে। হিরো হবে। অাজকাল তো মনে হয় পার্টির দিকে ঝুঁকছে। অামাকে ছাড়া চলতো ওর, পারত অাসতে এতটা? সময় হয়েছে রিটার্ন পাওয়ার। অার অটো নয়। এবার ট্যাক্সি। ভাঙড় থেকে বাজার অাসবে, এটা শিওর। ভজাদার কাছ থেকে রোজ ওর বরাদ্দ পাঁচশো ভেটকি অার শঙ্করদার দোকান থেকে চারশো মুর্গি। এই কয়েকদিন অাগে অবধি টাকা দিতো, এখন দেখি অার দেয় না।

অামি যেখানে ঘাপটি মেরে বসে অাছি, তার ঠিক উলটো দিকে শঙ্করদার মুর্গির দোকান। সকালে থেকে প্রচুর খদ্দের হয়েছে–রোববার অফিসের বাবুরা বাড়ি থাকবেন, অার অাজকাল সকলেই হেল্থ কনশাস, পাঁঠা গেলার মুরোদ নেই। তাই লাইন দিয়ে মোস্টলি বাড়ির বৌ-রা এসে এসে চিকেন নিয়ে যাচ্ছে, অফিসবাবুরা শনিরাতে বুড়োবাবা গলায় ঢেলে এখন টেনে ঘুম দিচ্ছেন। বৌগুলো সিনারিটাকে বেশ ফ্রেশ করে রেখেছে, বোর হচ্ছি না। শঙ্করদা বার তিনেক এসে চা-বিড়ি টেনে গেছে, গোটা চারেক কচুরি নামিয়ে দিয়েছে, অামাকে তাকিয়ে থাকতে দেখে দুয়েকবার দূর থেকে একটু বাঁকা হাসিও দিয়েছে। খবর কিছুই অামার থেকে গোপন থাকে না, কে ঠিক কী করে সেটা জানা অামার দায়িত্বের মধ্যে পড়ে–বঙ্কাদার শর্ত। এই যে শঙ্করদাও দাঁত কেলিয়ে বৌগুলোকে “অাবার অাসবেন” বলে মুর্গি ধরিয়ে দেন, বঙ্কাদা ছাড়াও অার একজনের কাছ থেকে টাকা নেন না, সেটা পুরনো খবর। তাঁর হাজবেন্ডের কাপড়ের বিজনেস, সারাদিন দোকান করে রাতে বাড়ি এসে গলায় লিকুইড ঢেলে ভোঁস-ভোঁস করে ঘুমোয়। বৌটি অাগে কেঁউমেউ করতো, ইদানীং নিজেই বানিয়ে দেয় ড্রিঙ্কটা, সঙ্গে মেশায় ফিফটি পাওয়ারের অ্যালপ্র্যাক্স। হাজবেন্ড একটা পেগেই কাত, ঘুম ভাঙে তার পরের দিন সকালে। শঙ্করদা বাড়ির দরজায় পৌঁছোয় তার অাধঘন্টা বাদে।

পাঁচ নম্বর চা-টা হাতে নিয়েছি, এমন সময় দেখি একটা প্যাংলা এসে দাঁড়ালো শঙ্কর চিকেনের সামনে। শঙ্করদার দোকান রাস্তার উপরে, একটা বড়সড় ভ্যানের মধ্যে। ভ্যানেই মুর্গি বন্দী থাকে, ভ্যানেরই ভিতর কাটা হয়, ওজন করা হয়। ভ্যানের ছাতটা মোটামুটি ফুটসাতেক উঁচু হবে, ফ্লোরটা কোমর হাইটে। এক সময় শঙ্করদা শহর ঘুরে চিকেন বেচতো। পুলিশ-ট্রাফিকের সঙ্গে গোল বাঁধায় বাজারে এসে পার্মানেন্ট বেস ফেঁদেছে।

ভ্যানের এই সাইডটা, মানে যেটা বিলিতির দিকে পয়েন্ট করা, অামার চোখের সোজাসুজি, সেইদিকে খাঁচার দরজা গোটাতিনেক। উপরনীচে থরেথরে একের-পর-এক তিনটি খাঁচা, প্রত্যেকটি ফুটখানেক উঁচু, মুর্গি ভর্তি, ঠ্যাসাঠেসি-গাদাগাদি। প্যাংলাটা অাসার মিনিটখানেক সেই বৌটি এসে কিলোদেড়েক চেয়েছে, অার শঙ্কর চিকেনের নতুন ছেলেটি–অকর্মার ঢেঁকি একটা–খাঁচা খুলে একটা ছোট সাইজের মুর্গি বের করে সেটাকে দিয়েছে হাত থেকে ফেলে। ব্যস, অার যায় কোথায়, সে ব্যাটাও ছাড়া পেয়ে কোঁ-কোঁ করতে করতে পালানোর চেষ্টা করেছে। ছেলেটি বারদুয়েক চেষ্টা করেছে ধরার, কিন্তু মুর্গিটি লাস্ট মোমেন্টে লাফ মেরে বেরিয়ে গেছে। শেষে শঙ্করদা ছেলেটিকে কয়েকটা চোস্ত গাল পাড়তে পাড়তে নিজে এসে মুর্গিটাকে বাজেয়াপ্ত করেছে। ধরার পড়তেই মুর্গিটা “কক-কক-কক্কোর-কোঁক…” করে কী শোরগোল। শঙ্করদা কায়দা জানে, ঠ্যাঙ ধরে উলটো করে ঝুলিয়ে দিতেই বাবাজি চুপ। তারপর দাঁড়িপাল্লায় বসিয়ে ওজন করে এক নিমেষে মুন্ডুটা কচাৎ। লাস্ট একটা “কোঁক” বেরিয়েছিল হতভাগার মুখ থেকে, দেখলাম প্যাংলাটা সেটাকে খুব মন দিয়ে শুনলো। পুরো ঘটনাটাই দেখেছে বলে মনে হল, দোকানে এসে শঙ্করদাকে পাঁচশো দিতে বলে পলাতক মুর্গিটার কাটামুন্ডুটা হাতে নিয়ে চোখটা বেশ খানিকক্ষণ দেখলো। ফিসফিস করে কী যেন বললও, মনে হল বলছে “সবুজ”। মুর্গির চোখ সবুজ হয় জানতুম না, শঙ্করদাও দেখলাম মুর্গি কাটতে কাটতে প্যাংলাটার দিকে ব্যাঁকা চোখে তাকাচ্ছে। “বড় পিস হবে না ছোট” জিজ্ঞেস করাতে প্যাংলা উল্টে শঙ্করদাকেই জিজ্ঞেস করলো, “খাঁচার দরজা তো খোলা, পালায় না কেন?”

খোলা তো রোজই থাকে। কেন থাকে সেটা অামিও জানি। শঙ্করদাকেই জিজ্ঞেস করেছিলাম এক দিন।

“ও খাইয়ে খাইয়ে যা মোটা করা হয়েছে, খোলা থাক না, পালাতে পারবে না।”

অামার কথা শুনে প্যাংলা অামার দিকে সোজা তাকালো। চোখের দৃষ্টিটা কেমন অদ্ভুত, অার কী স্বচ্ছ চোখ, ক্লীয়ার চোখ, ক্রিস্টাল ক্লীয়ার চোখ। তবে শিগগিরি বোধহয় জন্ডিস থেকে উঠেছে, কেমন একটা হলদেটে অাভা…

“চোখ সবুজ নয় তো, পালাবে কী করে? সবকটার চোখ হলুদ।”

পাগল নির্ঘাত। জন্ডিস হয়ে মাথাটা গেছে। শঙ্করদা দেখলাম হাঁমুখ বন্ধ করে প্যাকেটটা এগিয়ে দিয়েছে, “ষাট টাকা দেবেন” বলে দিয়েছে। প্যাংলারও দৃষ্টি ঘুরে গেল, অামিও হাঁফ ছেড়ে বাঁচলুম। বাপরে, কী চোখের দৃষ্টি। ভয় লেগে যায়। পুরুষমানুষের ভয়? ছ্যাঃ ছ্যাঃ। নিজেকেই মনে মনে ধমকালাম। ছ’নম্বর চা-টা অর্ডার দিতে যাব, দেখি বঙ্কাদা। বেঞ্চি ছেড়ে উঠে তাকে পাকড়াও করব বলে উঠেছি, দেখলাম প্যাংলা দাম মিটিয়ে সেই খোলা খাঁচার সামনে দিয়ে যেতে গিয়ে বেশ জোর গলায় মুর্গিগুলোকে একটা কথা বলে গেল। মাথা ঘুরিয়ে দেখলাম, অামি একা হাঁ করে তাকিয়ে নেই।

রাস্তা পেরিয়ে এসে দেখি, বঙ্কাদা বাইক পার্ক করে মোবাইলে কী কথা শেষ করছে, কিন্তু দৃষ্টি শঙ্কর চিকেনের দিকে। অামি এসে পড়ায় মোবাইল বন্ধ করে ওদিকে ঘাঁড় নাড়িয়ে জিজ্ঞেস করলো, “লোকটা কী বলে গেল রে?” বুঝলাম ফোন চলাতে শুনতে পায়নি।

প্যাংলা ততক্ষণে বাজারের ভিতর ঢুকে গেছে। সেদিকে তাকিয়েই বললুম, “বলল, ‘ওরে খাঁচা তো খোলা, তোরা সব পালাস না কেন? ওরে তোরা পালাস না কেন?’ ”

সোমদেব ঘোষ, ডিসেম্বর মাস, সন ২০১৫, কলিকাতা শহর।

Advertisements

15 thoughts on “হলুদ তিন : মুরগি

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s