প্রিয়ে,

জানি, নিজেকে চিঠি লেখাটা কেমন একটা বিদ্ঘুটে ব্যাপার। লোকে বলবে, ডায়েরি লিখলেই তো পারো। সবাই লেখে তো। অামি বলি, না, অাজকাল কেউ লেখে না। অাজকাল সকলে ব্লগার, ডায়েরি লিখতে তো কালি-কলম-কাগজ-সময় এগুলো চাই, অাজকাল কার অাছে এসব শুনি? অাজকাল ব্লগার মানেই তো কোলে ল্যাপটপ পাশে চায়ের কাপ ঘরে ওয়াই ফাই। ব্যস!

না গো, ডায়েরি অামিও এককালে লিখেছি। কিছু নতুন, এই কয়েক বছর অাগে অবধি অাছে। কিছু পুরনো, বছর কুড়ি-তিরিশেক, কিঞ্চিৎ ধুলো পড়েছে, কাগজ হলদেটে হয়েছে, লেখা অাবছা হয়েছে। অারও পুরোনোগুলো তো অালমারিতে বুককেসে রাখাই অাছে। তোমার সময়তেও থাকবে, অারেকটু পুরনো হবে সেগুলো, এখনকার বাকি ডায়েরিগুলোও উঠে যাবে বুককেসে অালমারিতে। তখন তুমি যখন পড়বে, তোমার মনে পড়বে এখনকার তুমি কেমন ছিলে। কী মজা না?

কিছুদিন অাগে অামার পুরনো বইয়ের কালেক্শান ঘাঁটতে গিয়ে ব্র্যাম স্টোকারের ড্রাকুলা বইটি পেলুম। অনেক অনেক অাগে পড়েছি বইটি, পড়ে নিজের মনে উত্তেজনা এবং কিঞ্চিৎ হতাশার যে সংমিশ্রণ ঘটেছিল তা লিপিবদ্ধ অাছে বুককেসের অনেক পুরনো একটি ডায়েরিতে। ইচ্ছে হলে পড়ে নিও, ইন্ডেক্স তো করাই অাছে। বইটি অারেকবার পড়লুম, জানো? স্টোকারসায়েব যেভাবে গল্পটাকে সাজিয়েছেন–প্রধান চরিত্ররা একে অপরকে চিঠি লিখছে টেলিগ্রাম করছে নিজে ডায়েরি লিখছে হাতেকলমে বা ফোনোগ্রাফের সাহায্যে–অামার খুব মনে ধরল গো। তাই এবার থেকে ঠিক করলুম যে ডায়েরি লেখা অাজ থেকে বন্ধ। এবার থেকে চিঠি লিখবো। তোমাকে। নিজেকে।

ব্যাপারটা কি জানো, ডায়েরি বস্তুটিই কিঞ্চিৎ নৈর্ব্যক্তিক, ইম্পার্সোনাল। লিখে গেলাম, কে পড়ল না পড়ল…। জানি তুমিই পড়বে, তাও কেমন একটা প্রাণের স্পন্দনের অভাব বোধ করি। চিঠিতে সেরকম কিছু নেই। অামি সরাসরি তোমার সাথে কথা বলছি। যা মনে অাসছে স্পষ্ট করে লিখতে পারছি। এর মধ্যে ডায়েরি নামক কোন মিড্লম্যান নেই। অামার মতে এটাই ভাল। তুমি অবশ্য কী ভাববে বলতে পারছি না। সেদিনের অামি কি বুঝতে পেরেছিলাম যে অাজকের অামি ডায়েরি ছেড়ে চিঠিতে চলে অাসব? এই তো, দেখ না, একটা ডায়েরি এন্ট্রিও অাছে, পড়েই বুঝবে কত পুরনো, অামিই লিখছি…

“প্রিয়ে,

অাজ নতুন ডায়েরি শুরু করিলাম। এর সুবাস অতি মনোহর। কোনওদিনও এই অতুলনীয় অভ্যাস ছাড়িব বলিয়া ভাবিতে পারি নাই…”

অার অাজ দেখো। সেই ‘অতুলনীয় অভ্যাস’ অাজ ত্যাগ করছি। কি জানি, একদিন হয়তো তুমিও চিঠি লেখা ছেড়ে অন্য কোন মাধ্যম গ্রহণ করবে।

অামার কাজ খুব ভাল এগোচ্ছে গো। মানুষ অামায় প্রায় ভুলতে বসেছিল, জানো? সত্যিই, মনুষ্যজাতির স্মরণশক্তি কত দুর্বল। তাতে অামার কোন অাপত্তি নেই অবশ্য। নিজের প্যাশনে ফিরতে কে না চায় বলো? অাস্তে অাস্তে অাবার গড়ে তুলব, জানো? ধীরে ধীরে রসিয়ে রসিয়ে। ছিপের টোপে মাছ খেলিয়ে খেলিয়ে। বোকাগুলো খেলবে। খেলতে তো ওদের হবেই। সবকটা তো মুর্গি। খোলা খাঁচার দরজা দেখলেও বসে বসে কচুকাটা হওয়ার জন্য অপেক্ষা করে। ঠিক অাছে, অামি তো অাছিই। কচুকাটা করতে কতক্ষণ? ভয় সকলেই পায়। একজন ছাড়া যদিও। তার কোনও খবর নেই জানো? সে কর্পূরের মত উবে গেছে। শেষ সেই পাহাড়ের সরাইখানায়…মনে অাছে? একমাত্র যে ভয় খায় না। ইচ্ছাশক্তি যে এতটা প্রবল হতে পারে কারুর মধ্যে…জানা ছিল না। যোগ্য প্রতিদ্বন্দ্বী।

জানো, অামার মনে হয়, ট্যাক্সিওয়ালাটাকে কোথাও যেন দেখেছি। কোথায় ঠিক মনে পড়ছে না। তবে ঠিক মনে পড়ে যাবে। শেষ অবধি তো যেতে বাধ্য, তাই না? লেভেল ক্রসিংটায় অার ফিরিনি। জানই তো অামি দ্বিতীয়বার সেই জায়গায় ফিরি না।

তবে কি, এসব তো খুচরো ব্যাপার। তার নজরে পড়ল না। বোধহয় সে এমন একটা কাজে ব্যস্ত যে এই বিন্দুগুলো সে ঠিক জোড়া দিয়ে উঠতে পারেনি, জয়েন দ্য ডটস্ খেলার জন্য হয়তো যথেষ্ট ডট বোর্ডে উপস্থিত নয় এখনও। তাই গত কিছুদিন একটু ইন্টারনেট ঘাঁটলাম, লাইফহ্যাকার বলে একটা সাইট অাছে, সেখানে কিছু অার্টিকেল পড়লাম, অ্যান্ড্রয়েড স্টুডিও অার এসডিকে টূলস্ ডাউনলোড করে ইনস্টল করলাম–কি জানি তুমি যখন এটা পড়বে হয়তো এই কাজগুলো করা অনেক সহজ হবে। এইসব করে শেষে অ্যাপটা বানাতে বেশিক্ষণ লাগলো না। বেশি খটমট তো নয়, সাধারণ অ্যাপ। বানাতে বেশি সময় লাগে না। ফোনে নামিয়ে লাগিয়ে চালালেই স্ক্রীনটা হলুদ। লোকে অার চোখ ফেরাতেই পারবে না। কী মজা ভেবে দেখ! লোকে ধরো গাড়ি চালাচ্ছে, রেডিওতে শুনল এই অ্যাপটার অ্যাড, সিগন্যালে দাঁড়িয়ে অ্যাপটাকে নামিয়ে নিল–অ্যাড শুনলে তো ডাউনলোড করতেই হবে–নামিয়ে লাগিয়ে নিল, সিগন্যাল ছেড়ে দিলো, সে অ্যাপটা চালু করলো, চোখ অাটকে গেল, সামনের গাড়িতে ধাক্কা মারলো…কী মজা!

ভাবলাম একটা ট্রায়াল রান দি। ফোন করলাম অানন্দবাজারের অ্যাড সেকশনে। তারা অামাকে এ কানেকশন থেকে ও কানেকশনে পাঠায়, খালি বলে ‘হোল্ড অন’। অার কাঁহাতক সওয়া যায় বলো। শেষে এক ছোকরাকে অামার অ্যাডটা দিতে বাধ্য করলাম। পরের দিনই ইয়ার প্যানেলে–ফ্রন্ট পেজের উপরের কোনে–একটা ছোট্ট হলুদ সাড়ে চার বাই তিন রেক্ট্যাঙ্গেল বেরিয়ে গেল। এককোনে একটা কিউ-অার কোড। লোকে দেখছে, অার বাধ্য হচ্ছে কোডটা স্ক্যান করতে। অ্যাপ চলে অাসছে। হলুদের রাজত্ত্ব শুরু। কী মজা, না?

হ্যাঁ, এটা ঠিক অামার ধরণ বা কার্যপদ্ধতি কোনটাই নয়। এম-ও নয়। তুমি হয়তো এই চিঠি পড়ে অাশ্চর্যই হবে, কী এমন হয়েছিলো তোমার অত বছর অাগে যে তুমি এরকম সবার উপর একসঙ্গে খেলাটা ছড়িয়ে দিলে? অাসলে অামি…হ্যাঁ অামি, অামি, শ্রীমান অামি, অামি হলুদ নিজে, অামি কোথাও একটা ভয় পেয়েছি। ভয় পেয়েছি, কারণ এতদিন ধরে সে কখনও একনাগাড়ে চুপ থাকেনি, দেখা সে দিয়েছেই। এবারটা কেমন একটা অালাদা ব্যাপার মনে হচ্ছে, কোথায় যেন একটা তাল কাটছে। একটা অজানা অাতঙ্ক অামাকে কব্জা করেছে। তাকে খুঁজে বের করতে হবে। সে কোথায় লুকিয়ে অাছে, কোথায় গা ঢাকা দিয়েছে, জানতেই হবে অামাকে। যতদিন না সে দেখা দেবে, অামার শান্তি নেই। অার যতদিন না অামার শান্তি হবে ততদিন মুর্গিগুলো মরবে। প্রথমে খবরের কাগজ। এর পর রেডিও। ইন্টারনেট। টিভি। সর্বত্র অ্যাপের অ্যাড। দেখি সে কতদিন চুপ করে থাকতে পারে। দেখি হলুদের রাজত্ত্বে ডক্টর বৈদ্য কতদিন ঘুমিয়ে থাকতে পারেন।

এটা হলুদের চ্যালেঞ্জ।

সোমদেব ঘোষ, ডিসেম্বর মাস, সন ২০১৫, কলিকাতা শহর।


হলুদ সিরিজের পঞ্চম কিস্তি। না, এটা হলুদ সাত-ই, নামকরণে ভুল নেই। কারণ অাছে। ক্রমশ প্রকাশ্য।

হলুদ এক
হলুদ দুই
হলুদ তিন
হলুদ পাঁচ

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s