পেনটা সাধারণ, শাদা। বোতামটা টিপে দিলুম। লাল-হলদে-সবুজ কাঁপা কাঁপা অালোর খেলা, সঙ্গে একটি রিনরিনে কন্ঠস্বর, “মারা গেছি তাহলে?”


 

— কী রে সমর, কী খবর তোর?

গলাটা একসময়ে ভীষণ চেনা ছিল। একটু ভারিক্কি হয়েছে, শরীরের সঙ্গে সঙ্গে গলার অাওয়াজও যে মোটা হয় জানতুম না।

— প্রেগন্যান্ট? ক’মাস হল?

অামি একটু ওই ডিরেক্ট খেলতেই পছন্দ করি। প্রায় চার বছর বাদে দেখা, তাও ওইটেই অামার ওপেনিং লাইন।

— তোর ইয়ার্কি করার স্বভাবটা অার গেল না। যেখানে যেটা বলার নয়, ঠিক সেটাই…

কিন্তু এরকম ডিরেক্ট ওপেনিং-য়ে সুবিধে অাছে। ফর্মালিটি কাটিয়ে ভিতরের মানুষটা বেরিয়ে পড়ে। বেরিয়ে পড়াটা অামার কাজের পক্ষে অবশ্যই জরুরি। ধৈর্য নামক বস্তুটি অামার কোনকালেই ছিল না…

— থাইরয়েড?

রেখা থতমত। বোধহয় ভাবছে বুঝলাম কী করে। ওর গুষ্টির রেকর্ড যে অামার হাতের মুঠোয় সেটা জানলে কী করতো বলা যাচ্ছে না। রেখা অলওয়েজ একটা যাচ্ছেতাই সীন তৈরী করার ক্ষমতা রাখতো। তাই বুঝেসুঝে সমর, ওয়াচ ইয়োর স্টেপ।

— দু বছর ধরা পড়েছে। কমছে না। ভাল ডাক্তার দেখিয়েছি, কিন্তু…অাসলে কী জানিস, অাজকাল ভাল ডাক্তার যে দেখাবো, অাটশোর কমে তো কারুর ফীজ-ই নয়…

একটা ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে ষাট হাজার প্লাস ইন্টারেস্ট; দুটো এফ-ডি, দু বছরের মধ্যে ম্যাচিওর করবে, প্রত্যেকটা পাঁচ লাখ করে। অারেকটা ব্যাঙ্কে তিন লাখ সেভিংসে, দশ এফ-ডিতে। এছাড়াও মিউচুয়াল ফান্ড, এল-অাই-সি, ফলতায় পৈত্রিক বাড়ি…সব নিজের নামে। টাকার অভাব রেখার? সামথিং ইজ নট রাইট হিয়ার…

— তোর কর্তা তো শুনেছি উইপ্রোতে বেশ ভাল চাকরী করে, ভালই অায় করে নিশ্চই…

উইপ্রোতে ছিলেন। মাসখানেক হল ছেড়ে ক্যাপজেমিনি জয়েন করেছেন, উইথ স্যালারি হাইক।

— হ্যাঁ, তা করছে। তাও, চাইতে বাধা লাগে…

এর মানে স্বপন বাসু যে চাকরি বদলেছেন সেটা রেখা কাউকে জানাতে চায় না…নাকি অামায় জানাতে চায় না? নাকি সে নিজেই জানে না? হাইলি অানলাইকলি।

— চাইতে বাধা লাগে কেন? হাজবেন্ডের কাছে চাইতে সংকোচ কোথায়?

রেখা মুখ ঘুরিয়ে নিলো। দেখলাম, দৃষ্টি এক মুহূর্তের জন্য হলঘরের অন্যদিকের পোকার টেবিলের উপর বুলিয়ে নিলো। মাথা ঘোরানোর প্রয়োজন হল না, ঘরে ঢুকেই মার্ক করে নিয়েছিলুম। টেবিলে খেলোয়াড়দের সংখ্যা সাত, খেলাটা টেক্সাস হোল্ডেম পোকার, দুটো পকেট কার্ডস্, ফেসডাউন। ফ্লপে অারো তিনটে, কমিউনিটি কার্ডস্। টার্ন, একটা কার্ড। রিভার, একটা কার্ড। দুটোই ফেস অাপ, কমিউনিটি। বেস্ট হ্যান্ড–অর বেস্ট ব্লাফ–উইন্স। অামার পছন্দের খেলা। খেলোয়াড়দের মধ্যে অন্যতম হলেন স্বপন বাসু, যাঁর বর্তমান স্ত্রী রেখা বাসু তাঁর কলেজবন্ধু সমর শিকদারের সঙ্গে বাক্যালাপে ব্যস্ত। স্বপনবাবু পোকার খেলতেন সে খবর অাছে–জুলিয়ানই অানঅফিশিয়াল সংবাদদাতা, দুবোতল টীচার্সের বিনিময়ে–তবে পোকার অ্যাডিক্ট জানতাম না। রেখার এক পলক নজর ফেলাতেই সেটা বোঝা গেল। ইশশ, টীচার্সের দাম অাজকাল সাংঘাতিক, জুলিয়ান ব্যাটাকে…

— বাদ দে রে সমর। তার অাগে বল, কী করছিস অাজকাল?

হুইস্কির গ্লাসটা এক নিঃশ্বাসে শেষ করার অছিলায় একবার ঘুরে টেবিলের অবস্থাটা বুঝে নিলাম। স্বপন বাসু বসে অাছেন টেবিলের একাবারে অন্যপ্রান্তে, মুখ তুললেই অামাদের দেখতে পাবেন। মুখ তোলার মতো অবস্থা তাঁর তেমন নেই বলেই তো মনে হল। কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম, হাত কচলাচ্ছেন অনবরত, গায়ের জ্যাকেটটা খুলে চেয়ারের গায়ে এলানো। হারছেন যে, এবং একেবারে গো-হারা, সেটা তাঁর সামনের চিপের স্ট্যাকটা দেখলেই বোঝা যায়। অার বড় জোর গোটাচারেক বিগ ব্লাইন্ড পারবেন, যদি না অবশ্য ভাল হাত অাসে বা ব্লাফ করেন। ব্লাফ করতে পারেন কি অাদৌ? যেরকম নার্ভাস, দেখে তো মনে হয় না।

— সেল্সম্যান। মারুতিতে। রবীন্দ্র সরোবর স্টেডিয়ামের কাছে একটা ডিলারশিপ অাছে, সেখানে কাজ করি।

রেখা দেখলাম বেশ অবাক।

— তুই সেল্সম্যান? তুই তো বলেছিলি লেখালেখি করবি। অার কোন শোরুম, ভান্ডারি?

— ভান্ডারি? না না, সে তো বালিগঞ্জ ফাঁড়িতে। এটা অটো হাই টেক।

— হ্যাঁ হ্যাঁ শুনেছি। তা তোর কাজ কী, লোককে মারুতি গাড়ি গছানো?

— অালবাত। অ্যান্ড অাই অ্যাম গুড অ্যাট মাই জব। তোর চাই? ভাল প্রাইস দেবো কিন্তু।

জানি চাই না। স্বপন বাসুর ফোর্ড ইকোস্পোর্ট অাছে, বউয়ের জন্য কিনে দিয়েছেন একটা অাই টুয়েন্টি। অার যাই হোক, এদের মারুতি লাগবে না। অার লাগলেও পোকারের দৌলতে…

— না রে, এক্ষুণি লাগবে না। তবে পরে যখন গাড়ি পাল্টাবো তোকে দিয়েই করাবো।

এই অাশ্বাস ক্ষণিকের, সন্ধ্যাটা–বা রাতটা–স্থায়ী। কাল সকালেই সব খরচের খাতায়। অামার অাশ্বাস চাই না অবশ্য, চাই যেটা সেটা হল টেবিলের অষ্টম চেয়ারটিতে বসার অনুমতি। অার এই হ্যান্ডটা খেলা প্রায় শেষ, স্বপন বাসুর বেশি কিছু করার সুযোগ অাছে বলে তো মনে হয় না।

— রেখা, তোর কর্তার সঙ্গে অালাপ তো করা।

মুখে কী একটা খেলে গেলো মিসেস বাসুর। হতাশা? কিছু একটা বলার চেষ্টা করছিল অামায়? নাকি কিছু চাইছিল? এমন কিছু যা মিস্টার বাসু দিতে অনিচ্ছুক, নাকি অপারগ, অক্ষম? সময় থাকলে এই রাস্তায় হাঁটাই যেতো, কিন্তু কাজের সময় এটা অহেতুক ডিস্ট্র্যাকশন। পরে হয়তো, কাজ হাসিল হলে…

— বিয়েতে তো এলি না, কত করে বললুম। অায় অালাপ করিয়ে দি।

রেখা নিজের হাতের মোহিতোর গ্লাসটা ট্রেতে দিয়ে অামার হাতটা একবার অালতো করে ছুঁয়ে দিয়ে হাঁটা লাগালো পোকার টেবিলের দিকে। রেখার ছোঁয়ায় সবসময় একটা স্পার্ক থাকতো, অাজ দেখলাম সেটা নেই। যাক, ডিস্ট্র্যাকশনের পথ বন্ধ। গুড।

— শুনছো, তোমাদের দান শেষ হলো?

দান যে শেষ বোঝাই যাচ্ছে। মিস্টার বাসু বেট করেছিলেন নিশ্চই, হেরেওছেন সেরকম, চিপের স্তুপটা অারেকটু ছোটর দিকে না?

— এ সমর শিকদার, অামার কলেজের বন্ধু। স্বপন বাসু, অামার হাজবেন্ড।

হাতে হাত মিললো। মিসেসের ডাক শুনে ভদ্রলোক টেবিল ছেড়ে উঠে এসেছিলেন, তাও অামাদের অালাপের ঘটনাটা দেখলাম টেবিলে বাকি ছজনের কারুর চোখ এড়ালো না। গুড।

— মিঃ শিকদার, অাপনার পোকারে রুচি অাছে?

বাব্বা, এ দেখছি অামার চেয়েও বেশি ডিরেক্ট। রেখার মুখে অাপনার কথা শুনেছি, এখন কী করছেন–এসব কাটিয়ে স্ট্রেট টু দ্য পয়েন্ট। একেই বলে বোধহয় পোয়া বারো।

— টেক্সাস হোল্ডেম খেলছেন নাকি?

— অালবাত। রেখা, তোমার বাল্যবন্ধুকে একটু ক্যাপচার করছি, ডোন্ট মাইন্ড। অাসুন মিঃ শিকদার, অালাপ করিয়ে দি, ইনি রিম্যান পট্টনায়ক, অার্ট কালেক্টার। অার ইনি সমর শিকদার, অা চাইল্ডহুড ফ্রেন্ড অফ মাই ওয়াইফ, অ্যান্ড অা সীজন্ড পোকার প্লেয়ার, অ্যাজ হী জাস্ট কনফেস্ড।

প্রথমত, অামি রেখার কস্মিনকালেও বাল্যবন্ধু নই। কলেজ ক্যান্টীনে অালাপ, কলেজ ছাড়ার পর থেকে তেমন দেখা-সাক্ষাৎ নেই। দ্বিতীয়ত, অামি সীজন্ড পোকার প্লেয়ার নিশ্চই, তবে সেটা মিস্টার বাসুর জানবার কথা নয়। ব্লাফ? মেবী। থার্ড, রীম্যান পট্টনায়ক। কেউকেটা লোক, পাঁচটা শহরের অার্ট সার্কেলে ঘোরাফেরা। তবে রিসেন্টলি দু-একটা বাজে ইনভেস্টমেন্ট করে প্রধান বিজনেস–তেলের শেয়ার লেনদেন–একটু তলানির দিকে। নাঃ, জুলিয়ানকে দুটো টীচার্স ওয়াজ ওকে।

— হাউ ডু ইউ ডু?

রীম্যান পট্টনায়ক, দেবদত্ত চৌধুরি (ইনভেস্টমেন্ট ব্যাঙ্কার, জোকা অাই-অাই-এম), লীনা সেন (Traveil Books–ইন্ডিপেন্ডেন্ট পাবলিশিং হাউস–এর কর্ণধার), রোকেয়া রহমান (দক্ষিণাপণের জাভেদ পাটশিল্প দোকানের থার্ড জেনারেশন মালিক), অার কবীর সুনীল (সুফি গায়ক, প্রমিসিং কেরিয়ার)। হাউ ডু ইউ ডু? নমস্কার। হাই। হ্যালো। ভাল তো? মানুষের হাই-হ্যালো থেকে বুঝে নেওয়া যায় তার অনেকটা চরিত্র। অবশ্য এখানে দরকার নেই। জুলিয়ানকে সত্যিই থ্যাঙ্কস্।

সবার সঙ্গে অালাপ করানোর পর মিস্টার বাসু তাঁর পাশে বসা ব্যক্তির দিকে ফিরলেন। সম্পূর্ণ শাদা ড্রেস, শান্ত, বুদ্ধিদীপ্ত চোখ। অামার টার্গেট। মার্ক।

— অার ইনি ডক্টর বৈদ্য। জেনারেল ফিজিশিয়ান।

হাতে হাত মিললো। চোখে চোখ মিললো। সম্ভাষণের প্রয়োজন হলো না। দুজনে দুজনকে মেপে নিলাম। একে সামলে চলো সমর। কাজটা হাসিল করো যত তাড়াতাড়ি সম্ভব। অামার দৃষ্টি ক্ষনিকের জন্য নীচে নামলো, বুকে অাটক শাদা পেনটাকে দেখে নিল, তারপর ক্ষিপ্রগতিতে ফিরে এলো নিজের জায়গায়। রীম্যান পট্টনায়কের গলা শোনা গেল।

— নেক্সট হ্যান্ড প্লীজ। মিঃ শিকদার, অাপনি ডঃ বৈদ্য অার মিস্টার বাসুর মাঝখানে বসুন বরঞ্চ, একটা চেয়ার খালি অাছে। অ্যান্টে অাপ।

দ্য গেম ইজ অন।

সোমদেব ঘোষ, তেসরা জানুয়ারী, ২০১৬ সাল, কলিকাতা শহর।


‪#‎কুড়ি_শব্দে_কল্পবিজ্ঞান‬ লিখতে গিয়ে উপরের অাইটালিক করা অংশটি লেখা। সেটাকেই একটু ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে এই প্রচেষ্টা। সিরিজের এটি প্রথম কিস্তি।

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s