— জেএনইউতে কী হচ্ছে দেখছেন?

কার্লসবার্গের বোতলটা অালতো করে টেবিলে রেখে যিনি এই কথাটি বললেন, তাঁকে অামি অাগে কখনও দেখিনি। দেখলেও যে মনে থাকতো তা নয়। দেখতে সাধারণ, পোশাকেও অভিনবত্ব নেই। কাল সকালে একদঙ্গল লোকের মধ্যে এনাকে চিনিয়ে দিতে বললে পারবো না।

— কীসব স্লোগান-টোগান দিচ্ছে ছাত্ররা। পড়াশুনো করবে না কি রাজনীতি? অাফটার অল, ওদের পড়াশুনোর খরচ তো জনগণের ট্যাক্স থেকেই অাসছে তাই নয় কি?

চেয়ার টেনে বসেই পড়লেন ভদ্রলোক। বাধা দিলাম না। কেন দিলাম না বুঝলাম না, নিজের টেবিলে অন্য কেউ বসে পড়লে বিরক্ত লাগে, তাই দেখেশুনে মাঝখানের দুচেয়ারওয়ালা টেবিল নিয়ে বসি। ভীড়ও খুব একটা নেই, ফাঁকা টেবিল প্রচুর অাছে। অন্য সময় হলে নির্ঘাত প্রতিবাদ করতাম।

— এইসব কলেজ-ইউনিভার্সিটিতে এই যে দেশবিরোধী কার্যকলাপ চলছে, এ নিয়ে অাপনার কোন মত নেই? দুনিয়াশুদ্ধু লোকের তো অাছে, সে ফেসবুকে হোক কি চায়ের অাড্ডায়। বা ইভেন এই অলিপাবে। হে হে হে।

কথা বলার ধরণ, বসার ভঙ্গিমা, এসব খুবই সাধারণ, যদিও অলিপাবের এই অাধা-অালো অাধা-অন্ধকারেও ভদ্রলোক কালো চশমা পরে অাছেন। দামী কোন ব্র্যান্ড নয়, দামী ব্র্যান্ড অামি দেখলেই চিনতে পারি, পকেটে রেব্যান, তার ডাঁটিটা বুকপকেট দিয়ে উঁকি মারছে।

— অাসলে ব্যাপার কী জানেন, এই দেশের প্রচুর শত্রু। সক্কলে ঈর্ষা করে, দেশ এত ভাল করছে, উন্নতি করছে, বিশ্বের দরবারে প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে। সয় না, বুঝলেন, সয় না। টেনে নামাতে হবে। সব ব্যাটা কূপমন্ডুক। অাগন্তুক দেখেছেন?

অস্বস্তি লাগছিলো। লোক চিনে বেড়ানোই অামার কাজ, ক্যারেক্টার না বুঝতে পারলে মুশকিল, চোখ দেখে বুঝে নিতে হয় ব্লাফ করছে কিনা। চোখ ঢাকা থাকলে মুশকিল, বোঝা যাবে না। না বুঝতে পারলে চিত্তির, পুরো সন্ধ্যেটাই মাটি।

— উৎপল দত্ত ঘ্যামা রোল করেছেন। কূপমন্ডুক বলে বাচ্ছাটাকে যেভাবে ভোকাল টনিক দিলেন, একেবারে পিকে। অাজকালকার এইসব ছেলেছোকরাদের সোজাপথে অানতে গেলে এইরকম ভোকাল টনিকই লাগবে বুঝলেন?

অস্বস্তিটা বাড়ছে। বিরক্তিটাও। কি ইরিটেটিং। ওল্ডমঙ্কটা প্রায় শেষ করে এনেছিলাম, অার মিনিট পাঁচেকের মধ্যেই উঠে পড়তাম, কাজ অাছে, সন্ধ্যেটা শুরু হল বলে। কোত্থেকে অাপদ জুড়ে বসলো। কি জ্বালা সত্যি।

— এই অর্ণব গোস্বামীর কথাই ধরুন না। কী ঝাড়লো না ওই মোসলা ছেলেটাকে? ঠিক হয়েছে। দেশের টাকায় পড়বে অাবার দেশের টাকাতেই দেশবিরোধী স্লোগান তুলবে? ঠিক করেছে অর্ণব, ধুনে দিয়েছে। বেশ করেছে। অাবার করুক। অামি সাপোর্ট দেবো।

কমিশনটার জন্য দেরী হলে মুশকিল হবে। রেখার অাগেই পৌঁছতে হবে, জায়গাটা ভাল করে স্কোপ করে রাখতে হবে, অার মার্ক ঠিক কোথায় বসবে সেটাও ঠিক করে রাখতে হবে। মিস্টার বাসুর পাশে উনি না বসলে কমিশন ফেল। নেক্সট সুযোগ তৈরি করতে প্রচুর সময় লাগবে, অত দেরী হলে ক্লায়েন্ট অখুশি হবেন।

— অার অাজ কাগজে পড়লাম এই যাদবপুরেও মশাল-টশাল জ্বালিয়ে অাফজাল গুরুর নামে স্লোগান দিচ্ছে। এরা পড়ুয়া? এরা দেশের সর্বনাশ নিয়ে অাসছে, সব ওই অাইএসঅাই-চীনের ষড়যন্ত্র। ভিতর থেকে দেশের ফাউন্ডেশন নড়িয়ে দিতে চায়। থ্রেটেন্ড ফীল করে, বুঝলেন, থ্রেটেন্ড ফীল করে।

রেখাকে প্রথমে ম্যানেজ করতে হবে। তারপর তাকে দিয়ে মিস্টার বাসুর–রেখার হাজব্যান্ড–সঙ্গে অালাপ করতে হবে। পোকারপ্লেয়ার পেলে বর্তে যাবে, টেবিলে বসিয়ে নেবে, মার্কের পাশেই। অাট নম্বর পোকার প্লেয়ার কেন অাসতে পারেন নি সে প্রশ্ন উঠবে না, ওঠার কথাও নয়। পেনটা যদি পকেটেই থাকে…

— সব ভয় পাওয়ানোর ধান্দা, বুঝলেন। ভয়। এই ভয় নামক ইমোশানটাকে বাগে অানা বড়ই কঠিন, পোষ মানে না। ওয়াইল্ড অ্যানিমাল কি অার ডোমেস্টিকেটেড হয়? বাঘের বাচ্ছাকে বাড়িতে পুষলেও একদিন না একদিন ঠিক কামড়ে দেবে। ডেঞ্জারাস। তাই পোষ মানানোর চেষ্টা করতে নেই, সঙ্গে নিয়ে চলতে হয়। অাগুনের মতো, সাবধানে হ্যান্ডেল করতে হয়, একটু চূণ থেকে পান খসলেই বিপদ, সে অাপনাকেই খেয়ে নেবে। ভয় অমন ভয়ঙ্কর জিনিস, বুঝলেন সমরবাবু?

চমকে উঠলাম। নাম জানলেন কীভাবে। অামি তো একটাও কথা বলিনি। বলিনি, না বলতে পারিনি? সামনে তাকালাম। কার্লসবার্গ শেষ, বোতলটা পাশে সরানো। কালোচশমাটা খোলা, চোখের চাউনিটা কেমন যেন। হঠাৎ ভয় পেলাম। অামি, সমর শিকদার, বহু প্যাঁচালো পরিস্থিতিতে পরেছি, মাথা ঠান্ডা করে একবিন্দু ভয় না পেয়ে বেরিয়ে এসেছি, সেই অামি অাজ ভয় পেয়েছি। কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমছে বুঝতে পারছি, অলিপাবের এসিটা অার কাজ করছে না।

— অাট নম্বরের তো ইয়েলো ফীভার হয়েছে, তাই না সমরবাবু? সেৎসিটা যে সাপ্লাই করেছেন তাঁকে অামার অভিনন্দন এবং স্বাগতম। অনেকদিন বাদে গেম খেলতে নেমেছেন। অাই মিস্ড হিম। তাঁকে এসএমএস করে বলে দেবেন তৃতীয় খেলোয়াড়ও বোর্ডে উপস্থিত, এবং খুব শিগগিরি তাঁর সঙ্গে সাক্ষাত হবে অাপনার ক্লায়েন্টের। অাপনার সঙ্গে অবশ্য অাজ রাতেই হবে। শাদা পেনটা থাকবে, চিন্তা নেই। ওটা হাতাতে পারবেন কিনা সেটা অাপনার হাতযশ। হাতিয়ে সোজা বেরিয়ে অাসবেন, অামি বাইরেই থাকবো। পেনটা অামায় দেবেন। পেনটা নিয়ে কী করবো তা অার নাই জানলেন। সে তো অাপনার ক্লায়েন্টের সঙ্গে অামার বোঝাপড়া। তারপর একটা ট্যাক্সি ডাকবেন, উবের-ওলা নয়, হলুদ ট্যাক্সি। কাছেই দাঁড়িয়ে থাকবে একটা, উঠে পড়বেন। রবীন্দ্র সরোবর মেট্রো স্টেশনে নামবেন। প্ল্যাটফর্মে ঢোকার অাগে এসএমএসটা করে রাখবেন। এসপ্ল্যানেডের টিকিট কাটবেন, তারপর ট্রেনের জন্য অপেক্ষা করবেন। ট্রেন ঠিক টাইমেই অাসবে, অাপনিও ঠিক টাইমেই…ওকে?

চিৎকার করার চেষ্টা করলাম। ব্যর্থ চেষ্টা। গলা দিয়ে একটি শব্দও বেরোল না। শুধু বুঝলাম, অাজকের কমিশানটা অামায় ঠিক এনার কথামত করে যেতে হবে। নির্দেশ পালন করতে হবে অক্ষরে অক্ষরে। এ ছাড়া উপায় নেই।

কালো চশমাটা হাতে নিয়ে উঠে পড়লো লোকটা। ওয়ালেট থেকে দুটো একশো টাকার নোট টেবিলে রেখে শেষ বারের মতো খোলা চোখে তাকালো অামার দিকে। কালোচশমায় ঢেকে নেওয়ার অাগে স্পষ্ট দেখলাম, চোখ দুটি হলুদ।

সোমদেব ঘোষ, সকাল সাড়ে এগারোটা, সতেরোই ফেব্রুয়ারী, ২০১৬ সাল, কলিকাতা শহর।

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s