মা? ও মা? শুনতে পাচ্ছো মা? ও মা তুমি কোথায় মা? অামার বড্ড ভয় করছে যে। অামি কোথায়? এটা কোথায়? এটা কী? এটা তো নীল নয়, জল নয়? এটা বড্ড গায়ে লাগছে যে মা। গায়ে বিঁধছে। হলদে দানা দানা এই জিনিসটাকে অামার খুব খারাপ লাগছে। খুব কষ্ট হচ্ছে। মা তুমি কোথায়? অামি জানি না অামি কোথায়। অামি পথ হারিয়েছি। ওরা কারা? ও মা, ওরা কারা? ওরা ছুটে অাসছে, কেন? অামাকে দেখতে? অামাকে তুলে নিলো মা, তুলে নিলো। অামি জলে ফিরতে চাই মা, অামাকে কি এরা জলে ফিরিয়ে দেবে? এদের দেখে তো ভাল মনে হয়, এরা অামাকে তুলে জলে দিক না মা, শান্তি পাই। এরা বোধহয় তাই করবে মা। মা, তোমার কাছে ফিরে অাসবো মা। কী মজা!

এ কী, এরা তো অামায় জলে ছাড়ছে না। কী করছে এরা? পকেট থেকে একটা কী যেন বের করে অামাকে পাশে নিয়ে হাসি হাসি মুখে নিজের দিকে তাক করছে। একটা খচ করে শব্দ হচ্ছে, কীসব তাতে দেখছে, হাসছে, ভুরু কোঁচকাচ্ছে, অাবার খচ করে শব্দ। এহাত থেকে ওহাত, সেহাত থেকে বেহাত। অামায় নিয়ে এরা কী করছে এটা? এদের গলপ তুমি অামায় করেছো, তাই না মা? একবার তোমার সঙ্গে এদেরই একজন বন্ধু হয়েছিল না? তুমি জলে, অার সে ছিল অার একটা বড় বাক্সের মধ্যে, জলের উপর। তার সঙ্গে তোমার ভারি ভাব হয়ে গিছলো, তার সঙ্গে তুমি অনেক গল্প করতে, তাকে গান গেয়ে শোনাতে। সেও নাকি মাথায় ঠুলি পরে সে গান মন দিয়ে শুনতো, অার ক্ষণে ক্ষণে হাসতো, খুশি হত, নিজের সঙ্গে যারা থাকতো তাদের শোনাত। অামি তো ভাবতুম এরা সকলে তোমার বন্ধুর মতই ভাল, এরা অামাকে নির্ঘাত তোমার কাছে ফিরিয়ে দেবে। কিন্তু এরা তো অামাকে নিয়ে টানাটানিতেই ব্যস্ত, অার হাতে পেলে সেই হাসিমুখে খচ। খচ খচ খচ। এরা কি অার কিচ্ছু জানে না মা?

খুব দুর্বল লাগছে মা। এদের খচ খচ কি শেষ হয়নি মা? অামায় জলে দিতে দিক না এবার, অনেক তো হল। খুব কষ্ট হচ্ছে, জানো? ঘুমিয়ে পড়তে ইচ্ছে করছে। ঘুমিয়ে স্বপ্ন দেখবো মা? তোমার পাশে থেকে যা রোজ দেখি? সেই স্বপ্ন নীলের স্বপ্ন হবে তো, অাদিগন্ত অসীম সাগরের হাতছানি থাকবে সেই স্বপ্নে? অামি তোমার পাশে থাকতে চাই মা, স্বপ্নে তোমাকে পেতে চাই, চাই নীলসমুদ্র। চাই না এই বর্বর শব্দ, এই কঠোর হাসি। খুব ঘুম পাচ্ছে মা, অার পারছি না জেগে থাকতে। ঘুমোই।

খচ।

খচ।

খচ।

– – – –

অার্জেন্তিনার সান্তা তেরেসিতা সমুদ্র সৈকত। বহু পর্যটকের ভীড়। তাদের মধ্যেই সাঁতরাতে সাঁতরাতে সৈকতের বালিতে উঠে এসেছিল ছোট্ট ডলফিনটি। উৎসাহের বশে পর্যটকরা তাকে কোলে তুলে নিয়ে সেলফি তুলতে ব্যস্ত হলেন। ছবি তোলার হিড়িকে এবং একোল-সেকোল হতে হতে নিস্তেজ হয়ে যায় খুদে ডলফিন, মারা যায় কিছুক্ষণ বাদেই। তাতেও ক্ষান্ত হয়নি জনগণ, মত্ত সেলফিমেনিয়ায় তখনও যোগ দিয়ে গেছে। শেষে যখন বাচ্ছাটির দেহ শক্ত হয়ে গেছে, তখন তাদের সম্বিত ফিরেছে, সৈকতেই তাকে ফেলে রেখে পালিয়ে গেছে।

ডলফিনটি ফ্রানসিসকানা প্রজাতির, অন্য ডলফিনের মতো এরা জলের বাইরে বেশিক্ষণ থাকতে পারে না, ডিহাইড্রেট হয়ে যায়।

ঘটনাটি গতকালের। খবরটি ছেপেছে ১৯শে ফেব্রুয়ারীর অানন্দবাজার পত্রিকার তৃতীয় পাতায়।

সোমদেব ঘোষ, দুপর সোয়া দুটো, ১৯ ফেব্রুয়ারী, ২০১৬ সাল, কলিকাতা শহর।

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s