— হুমম। হুমম। হুমমম।
— ইয়ে, মানে, আপনিই কি…?
— হুমম? হুমমম।
— আপনি কি হুম হুম ছাড়া কথা বলেন না?
— আঃ কি মুশকিল মশাই কইব না কেন। সকালে উঠে এট্টু গার্গেল করবো না? এই বুড়ো বয়সে গলাটার খেয়াল রাখতে হবে তো। গিন্নী মাফলারটা যে কোথায় রাখলো…
— গিন্নী? ইয়ে, মানে, আপনি ম্যারেড?
— না তো কি ব্যাচেলর? আহা, সে বড় সুখের দিন ছিল ভায়া। কত সুখ, কত স্বাধীনতা…তোমরা ছোকরারা বোধহয় আজকাল কোম্পানির ক্লার্ক হওয়াকেই ফ্রীডম বলো, তাই না?
— ক্লার্ক? না, মানে, ইয়ে, আমি তো সেলস-এ আছি। আমাদের কাম্পানি খুব উচ্চ মানের ফ্যান বিক্রী করে, একদম ঠিক দামে। ছ’মাস গ্যারান্টি। কিছু গোলযোগ হলে মানি রিটার্ন…
— রুকো রুকো, কী বিক্রী করে বললে?
— ফ্যান। মানে, পাখা। সিলিং ফ্যান টেবিল ফ্যান মিনি ফ্যান মাইক্রো ফ্যান…জাপানি কোল্যাবরেশা…
— এক মিনিট। উনো মোমেন্তো। ওয়ান মোমেন্ট। ফ্যান বিক্রী করো? পাংখা পুলার্সও সাপ্লাই দাও নাকি? ছিছি, কোম্পানীর গোলাম হয়ে দেশ ও দশকে বিক্রী করে দিলে? ছিছি…
— ইয়ে, মানে, পাংখা পুলার্স মানে? ঠিক…
— কী ব্যাপার গো? কোম্পানী বাহাদুর তো শিক্ষিত লোক ছাড়া নেন না, পাংখা পুলার্স জানো না? অারে যারা দড়ি ধরে…
— ও হ্যাঁ হ্যাঁ, মনে পড়েছে। ইতিহাসে পড়েছিলুম বটে।
— ইতিহাসে পড়েছো মানে?
— ওই তো, বৃটিশদের সময়ে ছিল। কী নির্যাতন বাবারে।
— বৃটিশদের সময়ে মানে…? এটা কোন সাল?
— এটা? ইয়ে, মানে, উনিশশো পঁচাত্তর।
— কী বললে? উনিশশো?
— ইয়ে, মানে, তাই তো জানি। বাংলায় হবে…এক মিনিট…পাঁচশো তিরেনব্বুই বাদ দিলে…
— তেরোশো বিরাশি সাল। মাই গড। মী ঘৎ। এতদিন ঘুমোলাম?
— ইয়ে, মানে, শেষ কবে জেগেছিলেন…?
— সে বহু কাল অাগে। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী তো…যাক গিয়ে, সে ইতিহাস। এরকমই হবে, সে বলেছিল বটে।
— সে? সে কে?
— অারে জিনি রে বাবা। সে ছাড়া কে? চিরকাল তো পাশে পাশে ঘুরলো, ছাড়বে না, বলে কিনা, অাপনার মতো “অাকা” অামি কখনো পাইনি। অবিশ্যি তদ্দিনে নাম ধরেই ডাকতো বইকি।
— জিনি? তাহলে, ইয়ে, মানে, অাপনি জিনি নন?
— কী মুশকিল, অামি জিনি হতে যাব কোন দুঃখে? জিনির বন্ধু ছিলাম, বয়স বাড়লো, কীসব রোগফোগ হল, মরোমরো অবস্থা। জিনি বলল, অামাকে মরতে সে দেবে না। তাই ওই অাংটির মধ্যে অামাকে…মানে অামার অাত্মাটাকে পুরে দিলো। অনেক ঘুরেছি, বুঝলে, এহাত থেকে ওহাত, সেহাত থেকে বেহাত, সারা বিশ্ব দেখা হয়ে গেল।
— জিনি তাহলে অাপনার খুব বন্ধু ছিলেন বলুন।
— বেস্ট ফ্রেন্ড, বুঝলে, বেস্ট ফ্রেন্ড। প্রদীপ থেকে ফ্রী করেছিলুম, সে অামায় লাইফ-ডেথ সাইকেল থেকে ফ্রী করে দিলো। কী গেরো সত্যিই।
— গেরো? অাপনি অবিনশ্বর তো তাহলে। ইম্মরট্যাল।
— হুঁ। নট অা পার্টি, বুঝলে, নট অা পার্টি। অাংটি থেকে বেরোলে পার্টি বটে, ঢুকলে সময়টা কীভাবে কাটে বোঝাই যায় না বটে, বাট স্টিল…
— ইয়ে, মানে, একটা প্রশ্ন ছিল।
— করে ফেলো করে ফেলো, প্রশ্ন পেটে চেপে রাখলে কালাজ্বর হয়।
— কালাজ্বর? ওরে বাবা, সে তো…
— বড়ই কঠিন রোগ।
— হ্যাঁ, মানে, প্রশ্ন হচ্ছে, অাপনি এত ভাল বাংলা জানলেন কীকরে?
— বাংলা? অামি বাংলা বলছিলাম এতক্ষণ?
— এতক্ষণ মানে, এখনো বলছেন তো।
— অামি ভাবলুম বুঝি হিন্দুস্তানি বলছি। গতবার তাই বলছিলুম বটে।
— অাপনি বুঝতেই পারেন নি কী ভাষা বলছেন?
— ওটা এই অাংটির জাদু, বুঝলে। অাপনা থেকেই অাশেপাশের লোক বুঝে ভাষা সেট করে দেয়।
— এই যে “সেট” বললেন, এটা তো ইংরিজি।
— অ। হবে হয়তো। অামি কি অার ওসব জাদুই কারোবার বুঝি? কার্পেট ওড়াতে গেলে কি অার বুনুনি শিখতে হয়?
— কার্পেট? অাপনি উড়ন্ত কা…
— রোসো হে ছোকরা, অামার ইতিহাস পড়ে হবে। অাগে বল তো দেখি, কী চাও। অাংটিটাই বা কোত্থেকে জোগাড় করলে?
— ইয়ে, মানে, ম্যানুয়াল অনুযায়ী, এসব প্রশ্ন অাপনি করতে পারেন না।
— ম্যানুয়াল অনুযায়ী মানে? ম্যানুয়েল? সে হতভাগা বেঁচে এখনো?
— না না, ম্যানুয়েল না, ম্যানুয়াল। মানে ইনস্ট্রাকশান ম্যানুয়াল। এই তো এখানেই বলছে…
— ইনস্ট্রাকশান ম্যানুয়াল? মানে যা পড়ে কীভাবে যন্ত্রপাতি চালানো উচিত নয় বোঝা যায় সেই ম্যানুয়াল?
— ইয়ে…
— হুম, ম্যানুয়ালের কথাই তুললে যখন তখন তুমি নিয়ম জানো দেখছি। ছোকরা হতে পারো, বোকা নও। অাটঘাট বেঁধেই ফীল্ডে নেমেছো।
— বলছি যে অামার একটা চাহিদা ছিল।
— চাহিদা? তোমাদের জেনারেশান অাজকাল একে চাহিদা বলছে নাকি?
— না, মানে, উইশ। অাপনি তো তিনটে উইশ দেন। তিনবর তাজা তাজা…
— অাঃ। কে বলেছে এসব? তোমার ওই ইনটার্সেকশন মডিউল সব ভুলভাল লিখেছে, বুঝলে। অামি তিন বর দি না, অামি তিন দিন দি।
— তিন দিন?
— ইয়েস। এই তিন দিন অামি তোমার অাজ্ঞাবাহী হয়ে থাকবো। তোমার যা ইচ্ছে, যা অভিরুচি, যা অ্যাম্বিশন, তা এই তিন দিনের মধ্যে করিয়ে নিতে পারো অামাকে দিয়ে।
— তিন দিন! তিন দিনে তো অামি…অাপনি পাশে থাকলে…
— দাঁড়াও হে, অতটা এক্সাইটেড হয়েও না। দেয়ার ইজ অা বাট।
— বাট?
— ইয়েস, বাট। তিন দিন অামি সার্ভিস দেবো, ঠিক। অাবার এটাও ঠিক যে অামার অাওয়ার্স ফিক্সড। ন’টা টু পাঁচটা। অাংটি বলছে তোমাদের টাইম পিরিয়ডে এটাই কারেক্ট ওয়ার্কিং অাওযার্স।
— অফিস অাওযার্স? হ্যাঁ, তা বটে, কিন্তু অাপনি ঘন্টা বেঁধে…
— হোয়াই নট? অাংটির ইয়ে বলে কি মানুষ নই?
— ইয়ে, মানে, অবশ্যই, অবশ্যই। তাও, অাট ঘন্টা যথেষ্ট সময়। প্রথমে…
— রোয়েট রোয়েট। সকাল ন’টা বলেছি বটে, কিন্ত সকালের ব্যাপার-স্যাপার তো জানোই, বাস পেতে দেরী অফিস অাওয়ারের রাশ ট্র্যাফিক সিগন্যালের অভাব মেট্রোর তৈরী না হওয়া…অফিস পৌঁছতে একটু দেরী তো হবেই।
— মেট্রো? সে তো বছরখানেক হল কনস্ট্রাকশান শুরু হয়েছে, শেষ হতে হতে…
— অারো ন’বছর। চিন্তা নেই, কলকাতায় কিছু অত সহজে হয় না। সেন্ট্রাল অ্যাভেনিউটা অ্যাভয়েড কোরো কয়েক বছর।
— ইয়ে, মানে, অাপনি কী বলছেন কিছুই বুঝছি না।
— বুঝতে হবে না। সবই অাংটির মায়া। যাই হোক, তো অাপিস পৌঁছতে পৌঁছতে ধরো সাড়ে দশটা…
— অাপিস? অাপনি অামার অাপিসে অাসবেন?
— অাহা তা কেন? মানে কাজে লাগবো অার কি।
— কেন? মানে অাপনাকে তো অার বাসে-ট্রামে চেপে অাপিসে যেতে হবে না, অামি যা বলবো অাপনি তাই করবেন।
— নিশ্চই নিশ্চই, কিন্তু, ওই যে বললুম, অাওযার্স অাছে, টী-ব্রেক অাছে, লাঞ্চ-ব্রেক অাছে, অাফটার লাঞ্চ টী-ব্রেক অাছে, অাফটার অাফটার-লাঞ্চ -টী স্ন্যাক্স ব্রেক অাছে, বৈকালিক চা-বিরতি অাছে, ঈভনিং টী অাছে, বিকেলে গঙ্গার ধারে ঘুরে বেড়ানো অাছে…
— তাহলে কাজটা করবেন কখন?
— কি মুশকিল, ফাইলটা অামার ডেস্কে পাঠিয়ে দেবে, তিন দিন সময়, কাজ হয়ে গেলে ভাল, না হলে…
— না হলে কী?
— না হলে কী হবে সেটা তোমার ইনটারেস্টিং ম্যানিফেস্টোতে নেই?
— না, তা তো নেই।
— ঠিক অাছে, না জানলেও চলবে। চিন্তা নেই, এটা গুড পর্ব তো, এতে ওইসব ডিস্কাস…চলো দেখি, একটু চা খাওয়াও তোমার পাড়ার নাড়ুর দোকানে। অাংটি বলছে সে নাকি হেব্বি চা করে।
— কিন্তু অামার উইশগুলো…?
— অাহা, অত চিন্তা করো কেন, করোনারি হবে? এসো এসো, চা খাওয়াও, মন ভাল হয়ে যাবে। গিন্নী বলে, চা খেলে মন ভাল, অার বিরিয়ানী খেলে পেট ভাল।
— গিন্নী? অাপনার গিন্নী?
— বাদ্রুলবদুর। নাম তো সুনা হোগা।
— ইয়ে, মানে, না। কিন্তু অামার…
— বলো কী হে, গিন্নী তো চটে ব্যোম হবে! চলো চলো সে গল্প শোনাই। অার হ্যাঁ, অাপনারা, ইয়েস অাপনারা যারা এটা পড়ছিলেন এতক্ষণ, কী ভাবছেন, গপ্পের শেষে গুড কেন? চিন্তা নেই, বুঝতে পারবেন কুইকলি, ইয়ে অালাদিন কা প্রমিস হ্যায়।

সোমদেব ঘোষ, সন্ধ্যে সাড়ে ছ’টা, পঁচিশে ফেব্রুয়ারী, ২০১৬ সাল, কলিকাতা শহর।

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s