সিলিন্ডারটা আজই দিয়ে গেছে। পাঁচশো টাকার একটা নতুন নোট দিলাম ডেলিভারি বয়টাকে। প্রথমে খুব অবাক হয়ে, তারপর একগাল হেসে “দিদি বহুত মেহেরবানী” বলে তিনবার সেলাম করে পুরনো সিলিন্ডারটা কাঁধে ফেলে চলে গেল। রেগুলেটর ফিট করে গ্যাস জ্বলছে কিনা ইত্যাদি চেক করে দেয় প্রতিবার, পঞ্চাশটা টাকা দি, খুশি হয়। গ্যাস লীকে অামার ভীষণ ভয়। ছোটবেলায় বাবার মুখে ভোপালের গল্প অনেক শুনেছি। বাবা প্রেস ফোটোগ্রাফার ছিলেন, ভোপালে গিয়ে ছবিও তুলেছিলেন। সেই ছবি দেখে অার বাবার মুখে সেই ভয়াবহ ঘটনার কথা শুনে গ্যাস নিয়ে অামার বরাবরের একটা ফোবিয়া অাছে। তাই নতুন গ্যাস সিলিন্ডার এলে তিনবার গ্যাস লীক চেক না করালে অামার শান্তি নেই। ছেলেটা ভাল, অামার খুঁতখুঁতামি মেনেগুনে নেয়, রোদে পুড়ে তিনতলায় সিলিন্ডার বয়ে নিয়ে এসে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে চেক করে দেয়। পঞ্চাশ টাকা তো নাথিং। অাজ কি মনে হল, একটু বেশিই দিলাম। দিনটা স্পেশ্যাল, তাই অার কি।

ক্যামেরাটায় অনেকগুলো ছবি ছিল। গতকাল প্রিন্সেপ ঘাটে তোলা। একটা শট ছিল বিদ্যাসাগর সেতুর, নীচে কালো জল, তাতে অালোর রিফ্লেকশান…ওয়ান্ডারফুল সেটিং। তুলে ফেললাম বেশ কয়েকটা। পাশে একটা ক্রাউড ছিল, তারাও দেখলাম খুচখাচ ছবি তুলছে। সব মোবাইল ফোনে। একটু করুণা হল। নিকনটার লেন্সক্যাপটা লাগিয়ে ব্যাগে পুরছি, দেখলাম একজন প্রৌঢ় ভদ্রলোক মোবাইলের স্ক্রীনের দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে অাছেন। একটু অবাক হলাম। প্রিন্সেপে এনাদের মতো অনেকেই অাসেন, হয় বসে ঘন্টার পর ঘন্টা অাড্ডা দেন, কিম্বা উদাস দৃষ্টিতে গঙ্গার দিকে তাকিয়ে অাকাশ-পাতাল ভাবেন। এত বছর প্রিন্সেপে অাসছি, এই বয়সি কাউকে একা বসে মোবাইলের দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখি নি। কৌতুহল হল, দূর থেকে খানিকক্ষণ অবসার্ভ করলাম। প্রায় পনেরো মিনিট কেটে গেল, দেখলাম চোখ তুলছেনই না। ক্যামেরাটা বাগিয়ে দূর থেকে কয়েকটা শট নিলাম, অ্যাঙ্গেলটা ভাল এলো না। এগিয়ে গেলুম, শটটা বেটার এল। ওনার মোবাইলের অালোটা হেল্প করলো। হাল্কা হলদে অালো, ভদ্রলোকের মুখে পড়ে একটা ডিফিউজ লাইটিং হচ্ছে। কী এত দেখছেন জানতে ইচ্ছে করলো। অামি বরাবরের স্ট্রেটফরওয়ার্ড মেয়ে, সোজা গিয়ে নিজের পরিচয় দিলাম, ছবিগুলো দেখালাম। ভদ্রলোক ছবি দেখে খুশি হলেন, নিজের পরিচয় দিলেন। মামুলি চাকরি করেন, অফিসের কাজের পরে লোকের ইঙ্কাম ট্যাক্স ক্যালকুলেট করে দিয়ে টেনেটুনে সংসার চলে। সম্প্রতি উস্তির দিকে পারিবারিক সম্পত্তি বিক্রী হয়ে হাতে কিছু টাকা এসেছে, তাই দিয়ে ওই স্মার্টফোনটা কিনেছেন। শুনে অবাক হলাম। টাকাপয়সার টানাটানি, হাতে নগদ টাকা এলো অার ইনি কিনা কিনলেন সোজা স্মার্টফোন! রাগ হয়ে গেল, ক্যামেরাটা ব্যাগবন্দী করে চলে অাসব, হঠাৎ মোবাইলটা জ্বলে উঠলো। স্ক্রীনসেভারটা চালু হল, সেই হাল্কা হলদে অালো, অার তার ঠিক মাঝে একটা কিউ-অার কোড। তাহলে কি ইনি এতক্ষণ স্ক্রীনসেভারের দিকে তাকিয়ে বসে ছিলেন? অাশ্চর্য লোক তো!

ব্লগের হেডার ছবিটি পাল্টালাম। হলুদ ব্যাকগ্রাউন্ড, ঠিক মাঝে কিউ-অার কোড। প্রাইমলেন্স ডট ওয়ার্ডপ্রেস ডট কম শুরু করি পাঁচ বছর অাগে, প্রতি মাসে অন্তত গোটা পাঁচেক পোস্ট করি। প্রতিটার ফরম্যাট একই; কিছু ছবি, অার তার ক্যাপশান হিসেবে একটি গল্প। বানানো নয়, ছবিটি ভিত্তি করে ট্রু স্টোরি। যেমন কালকের ঘটনাটা। ইন্টারেস্টিং ব্যাকগ্রাউন্ড কিছু স্টোরি অাছে, এরকম না হলে পোস্ট করি না। ছবিগুলো সব দিয়ে দিলাম। অার সুযোগ পাবো না, সময় থাকতে থাকতে সেরে ফেলাই মঙ্গল।

হলদে অালোটা ভারি অদ্ভুত। ঠিক স্নিগ্ধ নয়, অাবার ঠিক কড়াও নয়। মিহিকর্কশ, যেন ঠান্ডায় জমে থাকা মধু, বা জীবন্ত অ্যাম্বার। হাতটা অাপনা থেকেই ব্যাগে ঢুকে গেল, মোবাইলটা এক টানে বেরিযে এলো। দেখি উনিও নিঃশব্দে ওনার মোবাইলটা এগিয়ে দিলেন। পাঁচ সেকেন্ডও লাগলো না, কিউ-অার কোডটা স্ক্যান হয়ে গেল। ওনার মোবাইলটা ফেরত দিয়ে নিজেরটা ব্যাগে পুরে প্রিন্সেপ থেকে বেরিয়ে ট্যাক্সি ডাকার জন্য মোবাইল বের করেছি, হলুদ স্ক্রীনসেভারটা অাপনা থেকেই জ্বলে উঠলো। বুঝলাম, অ্যাপটা ডাউনলোড হয়ে গেছে। উবের অার ডাকা হল না, একটা হলুদ ট্যাক্সিতে চড়ে বসে অাবার মোবাইলটা বের করলাম। হলুদ অালোয় ট্যাক্সির পিছনের সীট, এবং তার অারোহী, ভরে গেল।

গ্যাস আভেনের নবদুটো বেশ খানিকক্ষণ খোলা অাছে, জানলা-দরজা সব বন্ধ, বন্ধ রান্নাঘরের দরজা দিয়েও গ্যাসের গন্ধ বেশ অাসছে। গ্যাসের গন্ধটা একেবারেই সহ্য হয় না, এক্ষুণি নাকে কাপড় দিতে হবে, টাইপ করা অার যাবে না। বাবা নাৎসিদের গ্যাস চেম্বারের গল্পও করতেন। কি বীভৎস! ভয়টা সেই ছোটবেলা থেকেই বুকে জমে রয়েছে, ভিতরে ভিতরে গুমরেছে। অাজ তার বন্দীদশা ঘুচবে। নাকে গামছা বাঁধবো, বেঁধে রান্নাঘরের দরজা হাফ খুলে একচান্সে ঘরে ঢুকে দরজা অাটকে দিয়ে মেঝেতে বসে গামছাটা খুলে দেবো। বেশিক্ষণ লাগবে না বোধহয়। অবশ্য অাগে এটিকে পোস্ট করতে হবে। প্রাইম লেন্স ক্যাপচারস প্রিন্সেপ…

(চলবে)

_____________________

#হলুদসিরিজ -এর পঞ্চম কিস্তির প্রথমাংশ। বাকি তিন অংশ ধারাবাহিকভাবে দুদিন অন্তর বেরোবে। বাকি চার কিস্তির লিঙ্ক নীচে দিলাম। পঞ্চম কিস্তি হলেও এটি কিন্তু হলুদ সাত-ই, কোন ভুল নেই।

হলুদ এক : https://ghotibaatea.wordpress.com/2015/11/28/holud-ayk/

হলুদ দুই : https://ghotibaatea.wordpress.com/2015/12/12/holud-dui-no-refusal/

হলুদ তিন : https://ghotibaatea.wordpress.com/2015/12/14/holud_teen_murgi/

হলুদ পাঁচ : https://ghotibaatea.wordpress.com/2015/12/17/holud-pnaach-ad/

_____________________

সোমদেব ঘোষ, দুপুর তিনটে, চৌঠা মার্চ, ২০১৬ সাল, কলিকাতা শহর।

Advertisements

4 thoughts on “হলুদ সাত : ইনফেকশান, প্রথম পর্ব

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s