প্রথম পর্ব

…ঘাটে কোনওদিনও অাসিনি, বুঝলেন? শুনে অাশ্চর্য হতে পারেন, কিন্তু হক কথা। সন্ধ্যের টাইম যে এত ভাল হতে পারে, মাথাতেই খেলেনি কখনো। বসেই ছিলাম, এক মহিলা তো অাবার ছবিও তুলে নিলেন। বললেন নাকি, ছবি তোলাটাই নাকি পেশা। নেশাও। ন্যাশেনাল না কী ম্যাগাতে ছাপে নাকি সেই ছবি। তিরিশ-পঁয়তিরিশ বয়স, হাতে ইয়া বড় ক্যামেরা, দাম নাকি লাখ-দেড় লাখের অাশেপাশে। শুনে তো অামার অাক্কেল গুরুম। বললেন কীসব ব্লগ-মগও নাকি লেখেন। স্মাটমোবাইলটা কোত্থেকে পেলুম জিজ্ঞেস করলেন। বললুম। উস্তির জমিটা নিয়ে অনেকদিন টানাপোড়েন চলছিল, ভাগ্নে বিশু যে শেষমেষ বিদেয় করতে পেরেছে তাই ভাগ্যি। শরিক তো অনেক, হাতে অার কীই বা পেলুম। তাই দিয়েই স্মাটমোবাইলটা কিনেছি শুনে মনে হল রাগ করলেন। তারপর নিজের মোবাইলটা বের করে অ্যাপোর কুইয়ার কোড না কী যেন চাইলেন।

অ্যাপো? কুইয়ার কোড? অামি কি অার অত বুঝি? ছাপোষা মানুষ, মামুলি কেরাণি, মাইনে অল্প, লোকের বাড়ি বাড়ি গিযে ইঙ্কামট্যাক্সের লইয়ারগিরি করে ওই শ-দুশো টাকা বাড়তি যা পাই, তাতেই গিন্নী দুপোলা নিয়ে সংসার। স্মাটমোবাইল ফোন কি অার কেনা পোষায়? বোসপুরানো একটা ছিল বটে, নকিয়ার বোধহয়, গিন্নী টাকা জমিয়ে কিনে দিয়েছিলো। নতুন না, সেকেন্ডহ্যান্ড। পাড়ার বাপনের নাকি নতুন মোবাইল কেনার শখ হয়েছিল, তাই পুরানোটা বেচে দিলো। জলের দরে গিন্নীও নিয়ে নিলো। বড় ভাল ছিল, জানেন? ইঁট একেবারে। ছোট ছেলেটা ওইটে ছুঁড়ে ছুঁড়ে অাম পাড়তো। তাতে পাশের বাড়ির প্রহ্লাদবাবুর কি রাগ, ওনাদেরই অাম গাছ তো। কোনওদিনও ফোনটা গোল করেনি, বুঝলেন? কত বাসে-ট্রামে চেপেছি, নামতে গিয়ে পকেট থেকে রাস্তায় পড়ে ঢাকনা খুলে ধুলো-মুলো লেগে খানখান, তাও অাবার সব পার্টস কুড়িয়ে নিয়ে ওই ধুলোমাখাই  ঢুকিয়ে দিয়ে ঢাকনা লাগিয়ে সুইচ টিপতেই যেই-কি-সেই! সেই সাধের জিনিস নাকি কাল চুরিই হয়ে গেল!

সন্ধ্যেবেলা। অফিস শেষে এস-নাইনে চেপেছিলুম, বুঝলেন? ক্লায়েন্টের বাড়ি যাবো, টেগোর পার্কে। রুবি পার হযে বাস থেকে নেমে পকেটে হাত দিয়ে দেখি, ফোন উধাও! বুকপকেটে ছিল, পড়ে গেল না কেউ উঠিয়ে নিল, বুঝলাম না। ভীড়ের বাস, অ্যাদ্দিন সামলে এনেছি, বড় দুঃখ হলো। গিন্নীকে কী বলবো তাই ভেবে পেলুম না। শেল্ডন হোটেলের সামনে দাঁড়িয়ে কী করবো ভাবছি, এমন সময় পিঠে টোকা। ঘুরে দেখি একটি বাচ্ছা মেয়ে, কুড়ি-বাইশের বেশি বয়স না, হাতে অামার মোবাইলটা নিয়ে দাঁড়িয়ে অাছে। সেও নাকি বাসে ছিল, পকেট থেকে পড়ে যেতে দেখে তুলে নিয়েছিলো, ভীড়ের চাপে দিতে পারেনি। সবেধন নীলমণি ফেরত পেয়ে খুশি হয়ে প্রাণভরে অাশীর্বাদ করতে যাবো, দেখি সে নিজের স্মাটমোবাইল বের করে কী যেন করছে। কাঁচটা রঙীন, রঙ হলদে, বুঝলেন? এরকম হলদে রঙ জীবনে দেখিনি। যেন জীবন্ত, ধ্বক ধ্বক করছে। এক দৃষ্টিতে সে মেয়ে সেদিকে তাকিয়ে অাছে, কী যেন ভাবছে। ডাকলুম, “ও মেয়ে, জিনিস ফেরত দিয়েছো, বুড়োর কাছে এট্টু অাশীর্বাদটুকু নাও, ভাল হবে জীবনে।” চোখ তুলে তাকিয়ে হাসলো একবার। হলুদ অালো, চোখেন মণিও যেন হলুদ। গা-ছমছম করে উঠলো।

বিশুকে ফোনটা কালই লাগিয়েছিলাম, বাড়ি ফিরেই। “স্মাটমোবাইল কোথায় কিনতে পাওয়া যায় বলতে পারিস?” বিশু তো অবাক, মামা হঠাৎ স্মাটমোবাইল? মিথ্যে বললাম, “তোর মামীর জন্য রে, সাপ্প্রাইজ হবে।” সে তখন দোকান বাৎলে দিলে। পরের দিন অফিস যাওয়ার নাম করে সোজা ব্যাঙ্কে, ড্রাফ্ট জমা দিয়ে কড়কড়ে দশটি হাজার টাকা পকেটে পুরে স্মাটমোবাইলের দোকানে। বিশুও হাজির, দোকানটা তার বন্ধুর। দেখেশুনে দুজনে মিলে একটা বেছে দিল অামায়, ঢাকনি খুলে সিম-টিম ওরাই লাগিয়ে দিলো। বললুম, একটা অ্যাপো লাগাবো। শুনে ওদের কি হাসি। “অ্যাপো নয় মামা, অ্যাপ অ্যাপ। কী লাগাবে বলো, অলরেডি অাছে অনেকগুলো ফোনে…”, থামিয়ে দিয়ে বললুম, হলুদ কাঁচ যে অ্যাপোতে হয়, সেই অ্যাপো চাই। শুনে তো দুজনে হাঁ, এমন অ্যাপোর কথা দুজনের কেউই শোনেনি। পকেট থেকে কাগজের কাটিংটা বের করলুম। অাজকের কাগজ, প্রথম পাতার মাথার উপর বিজ্ঞাপণ। তিনদিন বেরোচ্ছে, মেয়েটির ফোনে হলুদ কাঁচের ভিতরে কালো মতো ডিজাইন দেখে চেনা চেনা লেগেছিল। অবিকল এই বিজ্ঞাপণ। বিশু কাটিংটা নিল, বন্ধুকে দেখালো, তারপর স্মাটমোবাইলটা নিয়ে ধরলো ওর উপর খানিকক্ষণ। একটু পরেই দেখলুম, সেই হলুদ অালো, সেই হলুদ কাঁচ। বিশুকে অাশীর্বাদ করে দশহাজারি স্মাটমোবাইল পকেটে পুরে বেরিয়ে এলাম দোকান থেকে।

ঘড়ি দেখলুম। সাড়ে অাটটা। সময় হয়েছে। প্যান্টের পকেটে পেপারওয়েট পাথর পোরা হয়ে গেছে, সব রেডি। বাড়ি ফেরার টাইম পেরিযে গেছে, গিন্নীর ফোনও এসেছে বেশ কয়েকবার। চিন্তা করবে বেচারি। কেন যে প্রিন্সেপে নিয়ে এলুম না। অাহা বেচারি সারাদিন রান্নাঘরে খেটে মরে, ঘরকন্না করে শ্বশুর-শাশুড়ী-স্বামী-বাচ্ছার দেখাশোনা করেই জীবনটা বেরিয়ে গেল। ঘাটে নিয়ে এলে এট্টু ফুরসৎ পেতো। এলাইসী অাছে, দুপোলা মিলে দিব্যি চলে যাবে। তদ্দিনে বড়ও নাহয় একটা কাজ খুঁজে নেবে। নৌকাগুলোতেও এতক্ষণ বাচ্ছা ছেলেমেয়ে চাপছিল, এখন একটু একটু ফাঁকা হচ্ছে। পকেটে পাঁচশো টাকা পড়ে অাছে, ড্রাফ্টটা সাড়ে দশ হাজারের ছিল। খালি নৌকা দেখে উঠে পড়ে মাঝিকে বলবো মাঝ-নদীতে নিয়ে যেতে। নতুন স্মাটমোবাইল, হাওড়া ব্রীজের ছবি তুলবো। মাঝি পান-খাওয়া দাঁতে হাসবে, পাঁচশো টাকার লোভ ছাড়বে না। স্মাটমোবাইলটা নৌকাতেই রেখে যাবো, এতক্ষণ রেকর্ড করলুম, কেউ না শুনলে চলে? বিশুর কাছেই দেখে নিয়েছিলাম কীভাবে রেকর্ড করতে হয়। অাগে হলে এইসব জিনিস শিখতে ভয় পেতুম, এখন বুঝছি, সে ভয় ভয়ই না। ছোটবেলায় সাঁতার শেখানোর খুব চেষ্টা করেছিলেন মা, একবার ডুবে যাচ্ছিলাম, শেষ মুহুর্তে মা এসে তোলে জল থেকে। তখন থেকেই জলের ভয় কাটেনি কখনো। অাজ কাটবে কী? দেখাই যাক। অ্যাদ্দিন তো ডাঙাতেই কাটালাম, বাকিটা, মানে চিরকালটা নাহয় জলেই বাস…

(চলবে)

_____________________

#হলুদসিরিজ -এর পঞ্চম কিস্তির দ্বিতীয়াংশ। বাকি দুটি অংশ ধারাবাহিকভাবে দুদিন অন্তর বেরোবে। বাকি চার কিস্তির লিঙ্ক নীচে দিলাম। পঞ্চম কিস্তি হলেও এটি কিন্তু হলুদ সাত-ই, কোন ভুল নেই।

হলুদ এক 

হলুদ দুই

হলুদ তিন

হলুদ পাঁচ

_____________________

সোমদেব ঘোষ, দুপুর তিনটে, চৌঠা মার্চ, ২০১৬ সাল, কলিকাতা শহর।

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s