প্রথম পর্ব 

দ্বিতীয় পর্ব

…বাসে চাপতে অামার একদম ভালো লাগে না। একদম না। বিশ্বাস না হলে কী করবো বলো। হ্যাঁ, বাসে চড়েই রোজ বাড়ি-টু-কলেজ, কলেজ-টু-বাড়ি যাতায়াত করি। যাদবপুরে পড়ি, ইংলিশ, এম-এ, ফাইনাল ইয়ার। সুদীপও পড়ে। সুদীপ অামার বয়ফ্রেন্ড।

মিমি বকছে অামায়, ম্যাঁও শব্দে বলছে, মিলি,মিথ্যে কথা ডায়েরিতে লিখতে নেই। পাপ হয়। মিমির ম্যাঁও অামি ঠিক বুঝতে পারি। কখন মাছ চাই, কখন দুধ চাই, কখন অাদর চাই — এসব বুঝতে প্রোফেসর শঙ্কুর সেই ইনভেনশা…যন্ত্র অামার লাগে না। মিমি অামার বেস্ট ফ্রেন্ড। অাই লাভ মিমি। মিমি অামার ছোট্টও পুষু।

মিমি অাবার ম্যাঁও করছে। বলছে, ছোট্ট কই, ন’বছর তো হয়ে গেল। সত্যি মিমি, নঅঅঅ বছোওওওর। ভাবা যায়? সময়টা কোত্থেকে যে বেড়িয়ে গে…এঃ, বেড়িয়ে না, বেরিয়ে গেল। মামীমা ডায়েরিটা দিয়ে কন্ডিশা…মানে শর্ত দিয়েছিলেন, যতটা পসি…সম্ভব বাংলায় লিখবি, অার ভুল হলে কাটবি না, ভুল স্বীকার করবি ডায়েরির পে…পাতাতেই। ডায়েরিটা অাজই স্টার্ট…শুরু করলাম। অনেকদিন প্রোক্র্যাস্ট…গ্যাঁদড়ামো করেছি…এই গ্যাঁদড়ামো কথাটে জ্যেঠু বলে, অার করলেই অামাকে অার পদাকে মার লাগাতেন। পদা অামার জ্যেঠতুতো দাদা। পদাদা…অামি পদাই বলি, ছোটবেলায় পদাদাদা বলতে গিয়ে গুলিয়ে ফেলতাম, সকলের কি হাসি। তাই পদাই ভাল।

জ্যেঠুকে অনেক বলেছি, এসি বাসে অাসবো। সারাদিন কলেজ করে এস-নাইনের ভীরে…ভীড়ে চিঁরেচ্যাপ্টা…চিঁরে, নাকি চিঁড়ে, দুত্তোর মামীমা বাংলাতে লিখতে বলে যা প্রবলে…মুশকিল করলো না। এস-নাইনের ভীড়ে গলদঘর্ম হয়ে বাড়ি ফিরে রান্নায় বসতে অার ভাল লাগে, বলো? কী করবো, জ্যেঠি তো নেই, মা’র শরীর খারাপ অনেকদিন, অামি না সামলালে কে সামলাবে? এসি বাসের কথা উঠতেই জ্যেঠু খিঁচিয়ে ওঠে, টাকা কে দেবে শুনি? কুড়ি টাকা ভাড়া, তোর বাবা রোজগার করবে? জ্যেঠুটা কি বাজে, নিজের ভাইয়ের প্রতি…

বাবা বাস চাপা পরে মারা যায়। সে অনেক বছর হয়ে গেল, অামি তখন ক্লাস টু-তে পড়ি। বাবা ডেয়ারডেভিল ছিলো, লাফিয়ে চলন্ত বাসট্রামের ফুটবোর্ডে চেপে ঝুলতে ঝুলতে যেত। মা’র সঙ্গে খুব কম বয়সে লাভ ম্যারেজ হয়েছিল। জ্যেঠু বাবার থেকে বেশ বড়, সামহোয়াট কনজার্ভেটিভ (এটা বাংলা অাসছে না, সরি মামিম…নো, সরি ডায়েরি)। একমাত্র ভাই লাভ ম্যারেজ করলো, তার পরে মেয়ে জন্মালো — মেনে নিতে পারেননি। জ্যেঠু ভীষণ সেকেলে; কনজার্ভেটিভ অার সেকেলে। মিডিয়েভাল…মধ্যযুগে পড়ে অাছেন। বাবা লাফিয়েই একদিন ফুটবোর্ডে উঠতে গিছলো, ভীড়টা একটু বেশি ছিল, পা পিছলে যায়। ছোটবেলা থেকে বাসের পিছনের চাকা অমার বেশি ভাল লাগে। কি সুন্দর দুটো চাকা, কেমন ভিতরে বসানো, খোপের মধ্যে। ইচ্ছে করতো গিয়ে লুকিয়ে বসি, পদা লুকোচুরিতে খুঁজেই পাবে না। বাবার মাথাটা থেঁৎলে যাওয়ার পর বাসের পিছনের চাকা অার অামার ভাল লাগতো না। ভয় পেতো। বাসে অামি সবসময় সামনের দরজা দিয়েই উঠি।

জ্যেঠুই খবর পেয়ে হাসপাতালে গিছলো। পরে অামাকে অার পদাকে নিয়ে গিছলো, বাবার থ্যাঁৎলানো মাথা দেখিয়ে বলেছিল, দেখ, সমুর মতো ডানপিটে হলে এই পরিণাম হয়। বাবার নাম ছিল সমর, সমর হালদার।

ফোনটার অালোটা জ্বলে উঠলো। মাইক্রোম্যাক্স, মামীমাই দিযেছে গত জন্মদিনে। বললো, অাজকালকার ইয়াং জেনারেশন, অার একটা স্মার্টফোন রাখবে না হয় নাকি? মামীমার দারুণ পার্সোনালিটি, তার সামনে জ্যেঠুর চলে না। মামীমা দারুণ ফোটোগ্রাফার, ন্যাশনাল জিওগ্রাফিকে ছবি বেরিয়েছে বহু। একটা ব্লগও লেখে, প্রাইমলেন্স অ্যাট ওয়ার্ডপ্রেস। মামীমা বলে, বাঙালীর মেয়ে, বাংলাটা ভাল জানলি না, কী দুঃখের। মামীমা ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক ফোটোগ্রাফার হলেও খুব সুন্দর বাংলায় ব্লগ লেখে। কিন্তু রাঁধতে একদম পারে না, গ্যাসের গন্ধে নাকি বমি পায়। অামি কখনো কখনো মামীমার বাড়ি গিয়ে মামীমাকে রেঁধে খাওয়াই। অামার রান্নার হাত ভাল। মামীমা খুব খুশি হয়। মামীমা ইজ দ্য বেস্ট।

মিমি ম্যাঁও করছে। মাইক্রোম্যাক্সটা মিমির পছন্দ না। অাগে ছিল, খেলতো এটাকে নিয়ে। কাল থেকে খেলছে না। অ্যাপটা ডাউনলোড করার পরেই। টেবিলেই ছিল কাগজটা, ফার্স্ট পে…প্রথম পাতার কোণায় অ্যাডটা ছিল। একটা হলুদ রেক্ট্যাঙ্গেল (রেক্ট্যাঙ্গেলের বাংলা ভুলে গেছি), অার মাঝখানে একটা কিউ-অার কোড। স্ক্যান করতে বেশি সময় লাগলো না, অ্যাপটাও এসে গেল কুইকলি। কি সুন্দর হলুদ। অামার ফেভারিট কালার ছিল পিঙ্ক, কাল থেকে হলুদ। হলুদ ইজ দ্য বেস্ট।

মিমিকে দুধ দিয়ে একটু অাদর করে বেরোব। কলেজ যেতে হবে। সুদীপের সঙ্গে একবার দেখা করতেই হবে। ওকে বলতে হবে। প্রোপোজ করবো, নাকি শুধু বলবো? সুদীপ, অাই লাভ ইউ। অাই ওয়ান্ট ইউ টু বী মাই বয়ফ্রেন্ড। মিমি ম্যাঁও করলো। বেড়াল কি হাসে? জানি না।

ডায়েরিটা ব্যাগেই থাক। খুব স্যাড…দুঃখের, এক দিনই ইউজ হল। ব্যবহার। ব্যবহার হল। তাই এনাফ…যথেষ্ট। এত যে বাংলা জানি, বা মনে অাছে, সেটাই জানতাম না। জানতাম হয়তো, ভুলে গেছিলাম। থ্যাঙ্ক ইউ মামীমা। এবারটা অার সেই নলেজ, জ্ঞান ব্যবহার করা হয়ে উঠলো না। ঠিক হ্যায়, নেক্সট টাইম, ইফ দেয়ার ইজ অা নেক্সট টাইম। রিগ্রেটস? সুদীপ…? না, এরকম ভাববো না। মন শক্ত করো রিয়া। ঠিক পারবে। পিছনের চাকার ভয়ের চেয়েও ডীপ ভয় অাছে পৃথিবীতে। ভাববার সময় এটা নয়, ইট ইজ দ্য টাইম ফর অ্যাকশান। ভাবলেই মুশকিল। এলিয়ট বলেছিলেন,

“In a minute there is time

For decisions and revisions which a minute will reverse.”

বাবার কাছেই যাচ্ছি, এলিয়টের মিনিটের ভাবনায় পড়লে চলবে না। লাইব্রেরী ছেড়ে সোজা এইট-বী, এস-নাইনে উঠবো। নামবো ঠিক টেগোর পার্কের কাছটায়। সুদীপ ওখানেই থাকে। গুডবাই সুদীপ। তারপর অপেক্ষা। বাবার জন্য। মা, সরি। ক্ষমা করে দিও। বাবা…হলুদ ডাকছে অামায়। অামায় যেতে হবে যে।

“Let us go then, you and I…”

(চলবে)

_____________________

#হলুদসিরিজ -এর পঞ্চম কিস্তির দ্বিতীয়াংশ। বাকি দুটি অংশ ধারাবাহিকভাবে দুদিন অন্তর বেরোবে। বাকি চার কিস্তির লিঙ্ক নীচে দিলাম। পঞ্চম কিস্তি হলেও এটি কিন্তু হলুদ সাত-ই, কোন ভুল নেই।

হলুদ এক 

হলুদ দুই

হলুদ তিন

হলুদ পাঁচ

_____________________

সোমদেব ঘোষ, দুপুর তিনটে, চৌঠা মার্চ, ২০১৬ সাল, কলিকাতা শহর।

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s