“Demons run, when good people go to war.” — Steven Moffat
____________

লেখাটি ৩১ মার্চের। যখন লিখছিলাম, তখন গণেশ টকীজের কাছে উড়ালপুল ধ্বসে পড়ছে, অগুণতি মানুষের জীবন এক নিমেষে পালটে যাচ্ছে। লেখা শেষ করে শিডিউল করার পর দুঃসংবাদটি পাই। তারপর তিরিশ ঘন্টা কেটে গেছে, মানুষের প্রাণ নিয়ে ছিনিমিনি সার্কাস যা চলেছে তা দেখে মনে হচ্ছে, যদি সত্যি সত্যি গডউইন এ. দেবেশ্বর একটা ফ্লাড আনতে পারতেন, সব ধুয়েমুছে ক্যানভাস পরিষ্কার হয়ে প্রোগ্রাম রিস্টার্ট করা যেত, কত ভালই না হত, তাই না? কিন্তু এ যে বাস্তব; কলমের খোঁচায় তো আর একে পালটানো যায় না (যায় বোধহয়, মিডিয়া হাউসগুলো তো…)।

যা আছে, তাই নিয়েই চলতে হবে। চারিদিকে পাঁক বলে বালিতে মাথা গুঁজে থাকলে তো আর পাঁক “আচ্ছা আসছি দাদা” বলে বাক্স-প্যাঁটরা-হোল্ডল গুছিয়ে অগস্ত্যযাত্রায় যাবে না। কেউ যেন কোথায় বলেছিল, “দুষ্টু লোকেরা কখন মাথা তুলে দাঁড়ায়? যখন ভাল লোকেরা হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকে।”

“Evil triumphs when the good do nothing.”

একটু ভাবুন।
____________

নোয়ার নাও
____________
— {ঘসর ঘসর ঘসস্। ঘসর ঘসর ঘসস্।}
— {টক টক। নক নক।}
— {ঘসর ঘসর ঘসস্। ঘসর ঘসর ঘসস্।}
— নোয়া। বাড়ি অাছো নাকি নোয়া?
— {ঘসর ঘ্যাসসস্…}
— বলি ও নোয়া! কানের মাথা খেয়েছো নাকি? হাফ লাইফ গ্যারান্টি অাছে কানটার, অামি গ্যারান্টার। {ঘটাং ঘটাং।}
— অ্যাঁ কে কে? দরজায় কে? বলি ও গিন্নী, শুনছো, দরজায় কে এসেছে গো। ও গিন্নী। গিন্নীইই…অারে ধুর, নির্ঘাত পানে চুণ দিয়ে ঘুমিয়ে অাছে। দাঁড়ান দাঁড়ান, দরজা খুলি। ওফফ এই বুড়ো বয়সে অার কি পারি হুটোপাটি করতে? খিল শিকল ছিটকিনি হ্যাজবোল্ট…বাপরে, গিন্নী অ্যায়সা লাগিয়েছে না…{খশশ পটাং ঝনাৎ খট খটাং ঘটাং ঘটাং ক্যাঁয়্যাচ}
— কী ব্যাপার বলো তো হে, বাড়ি না দূর্গ? বলি কটা তালা লাগিয়েছো হে, দরজা খুলতে তিরিশ বছর লাগে?
— অাজ্ঞে ক্ষমা করবেন, বড় ভুতের উপদ্রব, ইলেকশান অাসছে কিনা, তাই একটু, মানে গিন্নী একটু সিকিওরিটি…
— থাক, বুঝেছি। ইলেকশান ভারী ডেঞ্জারাস জিনিস। কী যে ভুল করেছি সত্যি।
— ভুল করেছেন? কী ভুল করেছেন? অাপনি স্যার কি ইলেকশান কমিশন থেকে অাসছেন? অামি কিন্তু নেহাত মামুলি কাঠকারিগর, দিন অানি দিন খাই। ভুতের উপদ্রব…
— অাঃ, কে বলেছে অামি ইলেকশান কমিশন থেকে অাসছি। অামার নাম গডউইন এ. দেবেশ্বর। এই অামার কার্ড।
— অারে নমস্কার নমস্কার। অাসুন অাসুন অাস্তাজ্ঞে হোক বোস্তাজ্ঞে হোক।
— অামি এসেছি তোমার জন্য একটা বিশেষ কাজ নিয়ে, বুঝলে? হাতে বিশেষ সময় নেই।
— অাহা তাও তাও গরীবখানায় প্রথম এসেছেন, একটু বসুন জল-বাতাসা খান চা-লেড়ো দি…বলি ও গিন্নী, গিন্নীইইই…
— কী মুশকিল, অাবার চা-লেড়ো…দরকার নেই বাপু, দরকার নেই। তোমার তো নির্ঘাত ওই দামুর দোকানের চা অানবে। বড্ড বেশি কমলালেবুর এসেন্স দেয়, পোষায় না।
— তো হুজুর, বলেন, কী কাজে ছুটে এসেছেন অধমের দোরে।
— কাজটা বেশ কঠিন, বুঝলে নোয়া। অামি উড-অার্টিস্টস ডট কম, ঘুণ-দেখলেই-খুন ডট অর্গ, এমনকি অাইকিয়া-নিপাত-যাক ডট নেটেও খোঁজ নিয়েছি, ঠিক লোক পাইনি। শেষে টাইটানিক-রোজনামচা ফোরামে তোমার পোস্টটা পড়ে বুঝলাম, এ কাজের জন্য তুমিই যোগ্য ব্যক্তি।
— অাজ্ঞে বলে লজ্জা দেবেন না। টাইটানিক যদি এ শর্মা বানাতো, ইস্পেশাল কাঠ কেটে, তাহলে কোন অাইসবার্গের বাপের সাধ্যি ছিল ডোবায়?
— টেন্ডারটা পাওনি তো? হোয়াইট স্টারলাইন বেইমানি করেছিল?
— বেইমানি বলে বেইমানি? অামার কাজ কি অার যা-তা কাজ, বলুন? ইস্পেশাল কাঠ, ইস্পেশাল কাঠকারিগর। হ্যান্ডমেড, হান্ড্রেড থাউজ্যান্ড পার্সেন্ট গ্যারান্টী। তা বলে একটু খরচা পড়বে না? না, ত্যানাদের টাকা বাঁচাতে হবে।
— ডেঙ্কালা থেকে অানাও তো, কাঠ? গুরানবাবু ডেলিভারি দেন, অার মজখুড়ো হিসেব রাখেন, তাই তো?
— ওটি করবেন না হুজুর। বস যিনি, মানে যাঁকে বাইপাস করে এসব কাজ করতে হয়, শোনা যায় উনি নাকি অশরীরী, শুনতে পেলে কাটামুন্ডু এঁকে দেবেন, নিরমা ঘষলেও বেরোবে না।
— ওই কাঠের অারো সাপ্লাই লাগবে, বুঝলে?
— লাগবে বলছেন? ইস্পেশাল নৌকো বানাতে হবে নাকি?
— ইস্পেশাল বলে ইস্পেশাল, একেবারে অাল্টিমেট নৌকো। ক্যামেরনের ক্যামেরাও ধরতে পারবে না একে।
— একটু খোলসা করে বলুন দেখি কর্তা। হাটে হাঁড়িটা না ভাঙলে ঠিক…
— কিছুই নয়। তোমায় একটি বেশ বড় নৌকো বানাতে হবে। লম্বায় ৫০০ কিউবিট, দৈর্ঘ্যে ৪০ কিউবিট…
— ইয়ে, মানে, স্যার, কিউবিট ব্যাপারটা ঠিক কী যেন?
— কিউবিট? কিউবিট মানে…হুম, কিউবিট ব্যাপারটা ঠিক…জানতুম অাজ সকালেও, জলের ব্যবস্থা করতে গিয়ে গুলিয়ে গেল।
— জলের ব্যবস্থা?
— অার বলো না। সবকিছু তৈরী অামি করলাম, মাথার ঘাম পায়ে ফেলে, দিনরাত খেটেখুটে, সাত দিন লেগেছিল, জানো, সাঅাঅাত দিন। অার অামাকেই কিনা বুড়োক্রেসি দেখাচ্ছে?
— ছি ছি, এ ভারি অন্যায় কথা। কোন নরাধমের এরূপ সাহস?
— অারে পুবদিকের চার্জে অাছে বরুণ মালপানি। সে ব্যাটা বলে কিনা, ধর্মঘট চলছে পাম্পিং স্টেশনে, মেশিন বন্ধ। বেশ। গেলুম পশ্চিমে, তার চার্জে রয়েছে ডন পোশাই। সে ব্যাটা দেখি সর্ষের তেল দিয়ে ত্রিশূলটা পালিশ করছে।
— সর্ষের তেল দিয়ে?
— ওই হল, অলিভ অয়েল। যাহা বাহান্ন তাহাই তিপ্পান্ন।
— পোশাই ডন কী বললেন?
— ব্যাটা বলে কিনা, গ্লোবাল ওয়ার্মিং কমে গেছে, এক্সট্রা জলের সাপ্লাই নেই।
— কমে গেছে? কে বললে?
— অারে ওই অ্যামেরিকা তো এখন সবচেয়ে লাল দেশ। তো সেই দেশের লালমুখোরা, মানে যারা হাতির পিঠে চেপে…
— হাতির পিঠে চেপে? মার্কিন দেশে?
— অারে ওই যে, রিপাব্লিকানরা। হাতিই তো। সেই রিপাব্লিকানরা নাকি বলেছে গ্লোবাল ওয়ার্মিং মিথ্যা। সেটা কাগজেও বেরিয়েছে। ফক্স নিউজ নাকি ধুন্ধুমার প্রচার চালাচ্ছে।
— তাহলে তো কেস জন্ডিস বস।
— তা অার বলতে!
— অামি পাইপয়সার কাঠকারিগর, অামি কিবা জানি? গত রোববার পাড়ার দামুর দোকানে অাড্ডা বসেছিল, তাতে শুনলুম সেই ছোকরা নিতাই বলছে লালমুখোরা নাকি এভোলিউশনও নাকচ করে দিয়েছে।
— সে কি অার নতুন কথা? বলে কিনা, ইন্টালিজেন্ট ডিজাইন করেছেন গড! হ্যাঃ, অামার নাকি অত ক্ষ্যামতা। সাতদিনের চেষ্টায় কোনক্রমে ইনিশিয়াল কন্ডিশানটা বের করতে পেরেছিলুম, তাও কলেজ স্ট্রীটের কত দিস্তে কাগজ সুলেখার কত বোতল কালি খরচ করে তার ইয়ত্তা নেই।
— অাজ্ঞে হুজুর, মুখ্যসুখ্যু মানুষ, অতশত বুঝি না।
— কম্পিউটার জানো?
— অাজ্ঞে ওই ছোকরা নিতাইয়ের একটা অাছে বটে। ওপাড়ার ঘোসবাবুরও শুনেছি একখানা অাছে।
— সেই কম্পিউটারে প্রোগ্রা…মানে হিসেব হয়। অাঁক কষা যায়। সেই অাঁক কষেই তো এই সৃষ্টি…মানে, এই হিসেবটা চলছে।
— অাজ্ঞে অনেকদিন থেকেই চলছে কি?
— তা অার বলতে? গেল বিষ্যুদবার শুরু করেছিলাম। টাইম-অ্যাক্সিসটা একটু টেনে দিয়েছিলুম, বোরিং ব্যাপারগুলো যাতে শিগগিরি কেটে গিয়ে স্টেরেট ক্লাইম্যাক্সে এসে দাঁড়ায়…তা বলে এই? কী ভুলই না করেছি। নির্ঘাত ইনিশিয়াল কন্ডিশন ঘেঁটে ঘ।
— প্রভু বিচলিত হবেন না, পরের বার ঠিক লেগে যাবে।
— লেগে যাবে মানে, লাগাতে হবে, বুঝলে? লাগাতেই হবে। নয়তো গিন্নী কূপিত হবেন। “এইটুকু রান্না করতে এত ইয়ে…” গোছের কথা অাবার শুনতে হবে।
— তো জাহাঁপনা, এই অধম কী কাজে লাগতে পারে?
— ওই যে বললাম, নৌকো বানাও। বড় নৌকো, মানে যাকে বলে বেএএএশ বড়।
— টাইটানিক…
— লজ্জা পেয়ে যাবে, ইয়েস। তাতে সবাইকে গ্যারেজ করো।
— সবাইকে? ঠিক বুঝলুম না কর্তা।
— সবাইকে বলতে সব জন্তু-জানোয়ার-প্রাণী ইত্যাদি। সব্বাইকে। দুটি-দুটি করে।
— অাজ্ঞে বড্ড বড় হয়ে যাবে না নাওটা?
— সেই জন্যই তো তোমার কাছে অাসা। তুমি জিনিয়াস কারিগর, বানিয়ে ফেলো।
— কিন্তু খিদমতগার, প্ল্যানটা কী যদি বলেন।
— খুব সিম্পল। গোলমাল এভরিহোয়্যার, কিন্তু এস্পেশালি এই এরিয়াতে, এই শহরে। অামি গণনা করে বের করেছি, অঙ্কে কোন ভুল নেই। ইনিশিয়াল কন্ডিশনে কাঁচা হতে পারি, তা বলে ফিনানশিয়াল কন্ডিশনিং বুঝি না তা নয়। ফিনিশিয়াল কন্ডিশনও বানাতে অামি সিদ্ধহস্ত।
— ইয়ে, মানে, অাগে করেছেন নাকি?
— বহু প্র্যাকটিস অাছে, বুঝলে? এই শহরকে অাগে মুছে ফেলে নতুন করে সাজাতে হবে। প্রোগ্রামটা একটু দেখে করতে হবে, কোডিংটা সাবধানে, ডিবাগ ওল্ড মঙ্ক ছাড়াই। বাউন্ডারি কন্ডিশন অ্যাড হক হবে। হোক, অাপত্তি নেই। নীট অ্যান্ড ক্লীন করতেই হবে।
— কিন্তু এক্সেলেন্সি, নাও কেন?
— ধুতে হবে তো, তাই জল দরকার, বুঝলে? পোশাই ডন অার মালপানি তো না করলো, তাই অামাকেই সামলাতে হবে। গোটা দুই যমজ কালো বেড়াল…
— কালো বেড়াল? বলেন কি সর্বেসর্বা? অতি অলুক্ষুণে জিনিস।
— নাঃ, দুপিস কালো বেড়াল না হলে চলবে না। যমজ হওয়া চাই। দেজা ভূ না থাকলে কিছু জোর করে পাল্টানোর জো নেই। অ্যাড হক সাবরুটিন তো…
— কীভাবে পাল্টাবেন স্যার?
— সিম্পল। চল্লিশ দিন চল্লিশ রাত টানা বৃষ্টি চলবে কলকাতার বুকে। জল বেড়ে উঠবে। মানুষ-জীব-জন্তু-পাখি-সাপ-ব্যাঙ-কীট-পতঙ্গ-ঘাস-ফুল সব ধূলিসাৎ হয়ে যাবে।
— অার প্রলয়ের পরে।
— থাকবে তুমি, অার তোমার নাও। অার তাতে করে নতুন শুরুওয়াত। তাই বলছি নোয়া, বেশি দেরী করো না, হাত চালাও। সময় বেশি নেই।
— অাজ্ঞে কবে করবেন যদি বলেন…
— বেশি দেরী করবো না, বুঝলে? এপ্রিল মাস অাসছে, লোকে এখানে “দি মক্রেসি” নামে এক খেলা খেলতে লেগে যাবেন, ভুতের উপদ্রবও বেড়ে চলবে। তার অাগেই ক্লিয়ার করে দিতে চাই। ইন ফ্যাক্ট, অাজই বেস্ট দিন। তারিখটাও ভাল, বেশ অস্পিশাস, হাইলি অানসাস্পিশাস।
— অাজই? বলেন কি কর্তা? অামার তো অাগে নিতাইয়ের পিঁড়িটা সাপ্লাই দিতে হবে। কত সুন্দর পিঁড়ি, চারটে চাকা, ভুলো দ্য ডগ চালাবে…তিনটে চাকা বসে গেছে, শেষেরটা…
— সময় নেই, নোয়া, সময় নেই। অামি সিক অ্যান্ড টায়ার্ড, স্বাদ তিতকুটে হয়ে গেছে। অাজই করবো, রাত ন’টা থেকে। তুমি হাত চালাও। জিনিয়াস লোক, ঠিক পেরে যাবে। মনে রাখবে, চল্লিশ দিন চল্লিশ রাত থাকবে নৌকোর ভিতর, তার পর বেরিয়ে অাসবে, জল নেমে যাবে…
— হুজুর, অতদিন লাগবে না। পাম্পিঙের যা অবস্থা, তিনদিনেই ধুয়ে যাবে। অত জল খরচা করে লাভ কী?
— বলছো?
— অালবাত জাহাঁপনা।
— বেশ। সেই কথাই রইলো। অামি চললুম, অনেক কাজ সামলাতে হবে। তুমি লেগে পড়ো কাজে। অাজ রাত ন’টা। মনে থাকে যেন।
— অাজ্ঞে হুজুর, চিন্তা করবেন না। নিশ্চিন্তে থাকুন। সাবধানে যাবেন। নারদ নারদ।

____________
বিল কসবির একটি কমেডি স্কেচ দেখে এই লেখার অনুপ্রেরণা পাওয়া।

____________

সোঘো, দুপুর দুটো, ৩১ মার্চ, ২০১৬ সাল, কলিকাতা শহর।

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s