—  একটা নয়, দুটো নয়, একেবারে তিন-তিনটে!
—  তিন-তিনটে?
—  তিন-তিনটে।
—  মানে চারটে কোনোমতেই নয়?
—  শোন মেয়ের কতা। দিলুম তিনটে, অার এ নাকি চাইছে অারো? পোষাচ্ছে না বুঝি?
—  অাহা তিনটেই যদি হল তাহলে চারটে হতে দোষ কোথায়? পাঁচটা হতেই বা অাটকাচ্ছে কে?
—  উফফ, তোকে নিয়ে অার পারি নে। যা, তোকে অার শুনতে হবে নে, লস্যি খাচ্ছিলি চুকচুক করে লস্যিই খেয়ে বসে থাক।
—  অাহা রাগছো কেন? লস্যি তো নয়, ঘোল খাচ্ছিলুম।
—  ঘোল? অ। অামি ভাবলুম লস্যি। এই গরমে ঘোল-লস্যি খাওয়া ভাল।
—  অাঃ, দিদি, তিন-তিনটে কী বলবে তো।
—  অাগে ঘোলের ভাগ দে।
—  কি মুশকিল। পিকুদি তোমার জন্যও করেছে, ফ্রীজে রাখা অাছে, নিয়ে নাও না। অামারটা নিয়ে অাবার টানাটানি কেন?
—  কি যেন সবেধন নীলমণি অাগলে বসে অাছেন কন্যাপ্রবর, তেতেপুড়ে দিদিটা এসেছে, এক চুমুক ঘোল দিতেও অনীহা।
—  কালোডাক কালোডাক, সেরেফ কালোডাক। নেও, তোমার ঘোল নেও। অামি যাই ফ্রীজের ঠান্ডা ঘোলটা বের করি…
—  অ্যাই, খপরদার, হমারা ঘোলকো হাত লগায়া অগর।
—  এই, দেখছো তো, দেখছো তো, হিপোক্রেসি হিপোক্রেসি, জলজ্যান্ত ঘোলসর্বস্ব হিপোক্রেসি। একটু অাগে কী বলছিলে শুনি?
—  যা যা, বেশি বিরক্ত করিস নে, ঘোলটা খেতে দে। {চুক চুক} একী, ঘোল কোথায়, এ তো লস্যি।
—  ইম্পসিবেল। ঘোল। পিকুদি করে রেখে গেছে ফ্রীজে।
—  এটা যদি লস্যি না হয়ে ঘোল হয় তাহলে অামি কান কেটে কুকুরের পায়ে দেবো। ফ্রীজ খোল, অভি, ইসী ওয়াক্ত।
—  খুল যা সিম সিম / ফ্রীজ দিখা দ্রিদিম দ্রিদিম।
—  দ্রিদিম দ্রিদিম? ইয়ার্কী পেয়েছিস? বসে থেকে থেকে ভুড়ি বাগাচ্ছিস, যা উঠে গিয়ে খোল।
—  অামি ভুড়ি বাগাচ্ছি? অামি ডেলি নিজে দুঘন্টা সাঁতার কাটি, দুঘন্টা সাঁতার শেখাই। অামার মতো ফিট টোন্ড বডি ভূভারতে কটা অাছে? তোমার ওই কাজল লাগবে অামার ফিগারের কাছে?
—  এই, কাজলকে নিয়ে টানাটানি না। কাজল ইজ অাউট অফ বাউন্ডস।
—  ব্রেন্ডাকে ফোন লাগাই?
—  এবার কে কালোডাক করছে শুনি? দিদিকে এভাবে প্যাঁচে ফেলা, অ্যাঁ?
—  সারাদিন নিজেই তো বসে থাকো, ল্যাপটপে টপাটপ টাইপ করো, এক্সারসাইজটা কখন করো শুনি? ভুড়ি তো তুমি বাগাচ্ছো। এবার ব্রেন্ডা এলে স্ট্যামিনায় কুলোতে পারবে?
—  এলে না, অামিই যাবো।
—  অ্যাঁ, কবে?
—  এই গরম অার সহ্য হচ্ছে না। ব্রেন্ডার সঙ্গে কথা হয়েছে। ভিজিটে যাবো, ও কল-লেটার ড্রাফট করছে। মে-মাসের মাঝামাঝি…
—  ভিসা পাবে?
—  অামার তো ছ-মাসের এন্ট্রি ভিসা অাছে। জানুয়ারিতে গেলুম না?
—  মা-কে বলেছো?
—  রেওয়াজ সেরে নিক, বলে দেবো।
—  অার অামাকে? অামাকে বুঝি ড্রেসডেনে গিয়ে জানাতে?
—  না, তোকে ড্রেসডেন থেকে ফিরে এসে জানাতুম।
—  ওয়ায়ায়ায়াহ, দিদি অামায় ভালবাসে নায়ায়ায়ায়া…
—  হ্যাঁ, অারো ডাক ছেড়ে কাঁদো, মা-র রেওয়াজ গড়বড় হলে…
—  …য়ায়ায়া…অাঁক!
—  হ্যাঁ, মেয়ের সুমতি হয়েছে। নাও, এবার চুপটি করে বসে থাকো। এই নাও গাপুচি, এই নাও অাইসক্রীম…
—  এটা অাইসক্রীম?
—  প্রিটেন্ড ইট ইজ। এবারে গুড গার্লের মতো বসে শোনো।
—  লস্যিটা…
—  সে রহস্য পরে উদঘাটন হবে। অাগে ব্রেন্ডা। অাজ স্কাইপে কথা হল। বেশ ইন্টারেস্টিং একটা প্রবলেম পেয়েছে, একসঙ্গে কাজ করতে চায়। তাই ভিজিট।
—  হুঁ। বুয়েচি।
—  কী বুঝলি শুনি?
—  অার বলতে হবে নে। যাও, ঘুরে এসো। কাজটা একটু-অাধটু হলেও করো ব্রেন্ডার সঙ্গে সর্বক্ষণ…অাউ অাউ, এই বালিশ নিয়ে পিটুনি নট অ্যালা…অাউ অাউ…
—  হয়েছে শিক্ষা?
—  বিলকুল। অাউউউউউ…
—  থাক, অার মোগলির ছোটভাইয়ের মতো অাউউ করতে হবে না।
—  লেগেচে যে।
—  অাহা মরণ, গুজফেদারের নরম তুলতুলে বালিশে ম্যাডাম মাথা দিয়ে রাত্রিযাপন করেন, তাতে নাকি অাবার লেগেছে? সাততোষকের অাড়ালে মটরশুঁটির ঘায়ে মূর্ছা যাওয়া রাজকন্যে যেন।
—  মূর্ছা যায়নি, রাতে ঘুমোতে পারে নি।
—  ওই হলো। এই যে শরীরচর্চা চলে, দিনে চার ঘন্টা সুইমিং ফিগার-টিগার, ওয়াশবোর্ড অ্যাবস, অার বালিশের ঘা খেলেই কুমীরের কান্না? তার চেয়ে কাজলই ভাল। দুচারটে মার্ডার-টার্ডার তো অ্যাট লীস্ট করতে পারে।
—  এই রে, না না, গুপ্ত নয় প্লীজ যা বলবে করবো…
—  গুড অাইডিয়া। খাওয়া-দাওয়া করে চালাবো। ডিভিডিটা যে কোথায় রাখলুম…
—  হারিয়ে গেছে!
—  হারিয়ে গেছে? গুপ্তের ডিভিডি?
—  বেমালুম। হদিস নেই। দশ প্লাস এক মুল্কের পুলিশও খুঁজে পাবে না। ভ্যানিশ!
—  তাই বুঝি? তো, পুলিন্দার বোস, এটা কী?
—  ওটা? ওটা, মানে, ইয়ে…
—  হারিয়েই গেছে বটে। ঠিক জানতুম, ভুল কভারে রাখা হয়েছে।
—  হ্যাঁ হ্যাঁ, অ্যাক্সিডেন্ট। মানে যাকে বলে ভুল করে রাখা হয়েছে।
—  অ্যাক্সিডেন্ট? অামার তো এসব ভুল হয় না।
—  হবে না কেন? গতবার যখন দেখলে তুমিই তো রাখলে কভারে। নির্ঘাত ভুলে…
—  উঁহু, নো স্যার। হামি রাখা নেহি। হামিকো বিলকুল ইয়াদ হ্যায়। রাখা তুম হ্যায়। ভুল কভারে। অাউর ইয়ে এক্সিডেন্ট নেহী হ্যায়, ডেলিবারেট সাবোতাজ হ্যায়, গভীর ষড়যন্ত্র হ্যায়, গুপ্তবিরোধী গুপ্তদলের কারসাজি হ্যায়। অাউর উস দলকা প্রেসিডেন্ট হ্যায় মিস পুলিপিঠে। ইস জুর্ম কি সজা জানতে হো?
—  অাই পোটেস্ট। অাই ইনোসেন্ট দুগ্ধপোষ্য ছাগশিশু ইয়োর মিলর্ড। অাই নো নো হাউ উল্টাফাই ফ্রাই ফিশ।
—  ইস জুর্ম কি সজা হ্যায়…বোতলবন্দী!
—  নহীইইইইই…
—  চুন চুন কে পছতাওগে বখতাওর, চুন চুন কে পছতাওগে।
—  …ইইইইই…
—  অ্যাই, অাস্তে, মা শুনতে পাবে।
—  …ইইই…ইঁক!
—  দে, বোতলটা দে, গলা শুকিয়ে গেল।
—  বলছি, ওপেনিং স্টেটমেন্টটা এবার খোলসা করে বললে হয় না? যেভাবে অালেকজান্ডারের মতো দিগ্বিজয়বেগে ঢুকলে ঘরে…
—  ওপেনিং স্টেটমে…ওঃহো, সে তো ভারি ইয়ে খবর।
—  তিন-তিনটে কী একটা নিয়ে লাফাতে লাফাতে এলে।
—  বলছি। তার অাগে এটা বল, সৌরজগতে প্রাণ অাছে?
—  থাকবে না কেন। এই তো অামি তুমি মা গাপুচি…
—  গাপুচি?
—  অালবাৎ! ক্যালভিনের যেমন হবস, অামার তেমন গাপুচি।
—  হুম, বুয়েছি। ঠিক হ্যায়, এবার বল, পৃথিবী ছাড়া অার কোথাও প্রাণ অাছে?
—  কুইজ নিচ্ছো? কুইজের বয়স পেরিয়ে এসেছি।
—  থাক, অার বয়স নিয়ে বকবক করতে হবে না। নাক টিপলে এখনও দুধ বেরোয়, ইনি বয়স দেখাচ্ছেন। ঝটপট উত্তর দে, সৌরজগতে…
—  না নেই, পৃথিবী ছাড়া অার কোথাও নেই। মানে, সন্ধান পাওয়া যায় নি বলাই ভাল।
—  গুড। ফেল করতে করতে লাস্ট মোমেন্ট রিকভার করেছিস। সন্ধান পাওয়া যায় নি, থাকতে পারে, কিসুই বলা যায় না। মঙ্গলগ্রহে কিছু এমন চিহ্ন পাওয়া গেছে যাতে মনে হয় এখনও সেখানে জল থাকতে পারে। অার জল থাকা মানে…?
—  মানে প্রাণও থাকতে পারে।
—  রাইট! প্রাণ থাকার প্রাইমারি নেসেসারি কন্ডিশান হল গিয়ে জল থাকা। লিকুইড ওয়াটার, তরল অবস্থায়।
—  মঙ্গলগ্রহে তরল জল পেলে?
—  অামি পেতে যাবো কেন, অামার খেয়ে-দেয়ে কাজ নেই? যারা পেয়েছে–মানে, ইন্ডিরেক্টলি হয়তো পেয়ে থাকবে–তারাও শিওর নয়। অার মঙ্গলের যা অবস্থা, মাটির উপর জল লিকুইড থাকা চাপ।
—  কেন?
—  প্রেশার কম। কম প্রেশারে কী হয়?
—  লোকে মাথা ঘুরে অজ্ঞান হয়ে পড়ে যায়।
—  মাথা ঘুরে…ব্লাড প্রেশারের কথা বলেছি অামি?
—  বলো নি…? না না, বলো নিই তো। একেবারেই নয়। কোলবালিশ দিব্যি।
—  অবশ্য ভুল করেও যে খুব একটা ভুল বলেছিস তা নয়। অ্যাটমস্ফিয়ারিক প্রেশার কম হলে মাথা ঘুরে লোকে পড়ে যেতেই পারে, অক্সিজেনের অভাবে। কিন্তু দ্যাট ইজ নট দ্য পয়েন্ট। প্রেশারকুকারে কী হয়?
—  ভাত সেদ্ধ হয়।
—  ভেজিটেরিয়ান হয়ে তোর বারোটা বেজে গেছে। শতকরা নিরানব্বুই লোক বলবে মাংস, মডার্ন ওয়েল-টু-ডু কলকেত্তাই বাঙালি হলে তো কথাই নেই, অার ইনি কিনা ভ্যাদভ্যাদে ভাত নিয়ে বসে অাছেন।
—  যাদের সাঁতার শেখাই বা সন্ধ্যাবেলা পড়াই তাদের তো অার দিন-দিন মাংস রান্না হয় না, ভাতটাই বরাদ্দ। তাই বলছিলুম অার কি।
—  তাদের প্রেশারকুকারও থাকে না। দিদির সঙ্গে চালাকি, সেন্টু করে অফ-টপিক যাওয়ার চেষ্টা?
—  প্রেশারকুকার অাছে তো। গত মাসেই ভ্যানে করে এলো দেখলাম।
—  ভ্যানে করে প্রেশারকুকার এলো?
—  ভাবলাম কোন রাজনৈতিক ব্যাপারস্যাপার, ভোটের জন্য দিচ্ছে। ওমা, দেখি কে পাঠিয়েছে কেউ জানে না, গোটা চল্লিশ ব্র্যান্ড নিউ প্রেশারকুকারে এখন মনা-কাকলি-উজ্জ্বলা-জোরিনা-করুণাদের বাড়িতে যাবতীয় রান্না হচ্ছে।
—  অার এটা কে দিয়েছে কেউ জানে না?
—  একেবারে কেউ জানে না বললে একটু ভুল হবে। অামার একটা থিওরি অাছে।
—  অাঃ, কতবার বলেছি থিওরি কথাটাকে ওরকম অশ্রদ্ধা করবি না। থিওরির একটা বিশেষ মানে অাছে…
—  অাচ্ছা বাবা অাচ্ছা, ভুল হয়ে গেছে থুড়ি। হাইপথিসিস। হয়েছে? অামার একটা হাইপথিসিস অাছে।
—  বেটার। বলে যাও।
—  যেদিন এলো কুকারগুলি, সেদিন সকালবেলা তুমি চানে গিছলে। অন্য বাথরুমে মা, অামি এদিকে সাঁতার কেটে এসে ঘর জলে-জলময় করছি, অার বকা খাবার জন্য রেডি হচ্ছি…
—  কতবার বলেছি, একটা পাপোষের উপর দাঁড়াবি, তাহলে ঘরে জল থইথই করবে না অন্তত। পাপোষ শুকোতে দিলে শুকিয়ে যাবে, মা যদি স্লিপ করে?
—  উফফ, মুছে নিয়েছিলাম রে বাবা। অামি অত কেয়ারলেস নাকি?
—  রেটোরিকাল প্রশ্ন অাশা করি।
—  রেটোরিকাল তো নয়, একেবারে সত্যজিতটোরিকাল। যাই হোক, তোমার ফোন বেজে উঠলো, অচেনা নম্বর। ব্লকড নয়, ব্রেন্ডাও নয়, তানিয়াও নয়, তাই তুললাম।
—  যাক বাবা, ব্লকড যে তুলিসনি…
—  হ্যাঁ, তুললাম অার তিনদিন বাদে অামি গায়েব। মিস্টিরিয়াস ডিসাপিয়ারেন্স অফ মেধাবী প্রেসিডেন্সি হিস্টরি স্টুডেন্ট, ল এনফোর্সমেন্ট ব্যাফেল্ড।
—  হা হা হা, ব্যাফেল্ডই বটে। শেখরের একটা টীশার্ট ছিল, ইনস্টিতে। তান্ত্রার টীশার্ট, ডেলি পরে অাসতো।
—  কাচাকুচি করতো না?
—  কি জানি? ওই পরেই স্নান সারতো বোধহয়। শেখর তো, সবকিছুই সম্ভব। টীশার্টে লেখা থাকতো, “ইফ ইউ কান্ট ড্যাজল দেম উইথ ব্রিলিয়ান্স…”
—  “…ব্যাফেল দেম উইথ বুলশিট!” হি হি হি, সাংঘাতিক মনে অাছে। যতবার শুনি হেসে খুন হই। শেখরদা কোথায় এখন?
—  শেখরদা? সে…অাছে, বহাল তবিয়তেই অাছে। স্টেট্সএ অাছে, ইউটার সল্ট লেক সিটিতে অাছে। ইউনিভার্সিটি অফ ইউটাতে, অার্টিফিশিয়াল হার্ট রিসার্চ সেন্টারে। হার্ট কাজ না করলে এখনকার রিসার্চ অনুযায়ী মানুষ তিন মিনিট উনষাট সেকেন্ডের বেশি বাঁচে না, ও সেটাকে চার মিনিট করার চেষ্টা করছে।
—  হার্ট ছাড়া লোকে অতক্ষণ বাঁচে? অামি তো জানতুম মস্তিষ্কে রক্ত চলাচল বন্ধ হয়ে গেলে প্রায় তৎক্ষনাৎ মৃত্যু।
—  হয় হয়, zaনতি পারো না? অন সেকেন্ড থট, জানতে হবে না, না জানাই মঙ্গল।
—  কেন গো, তোমরা কি কোন মিলিটারি অ্যাপ্লিকেশান চালাচ্ছো, সুপার-সোলজার তৈরি করবে? ক্যাপ্টেন অামেরিকার মতো?
—  অাঃ মোলো যা, এ কোত্থেকে ক্যাপ্টেন অামেরিকা নিয়ে এলো। কাজে লাগবে মহাকাশে, অার ইনি কমিক্স নিয়ে…অাচ্ছা, অফ অল পীপল, তুই অাবার কবে থেকে এইসব ছাইপাঁশ নিয়ে পড়লি রে?
—  অামি খামোখা কেন পড়তে যাবো। রঞ্জনা বলছিল কাল, কি সিভিল ওয়ার সিনেমা অাসছে নাকি এই শুক্কুরবার, পুলুদার সঙ্গে যাবে।
—  পার্শে কেমন অাছে রে? ওরা সব ভাল?
—  বিলকুল বিলকুল, ওরা বেমিসাল অাছে। তোমার কথা জিজ্ঞেস করছিল, অামি বললুম রিসার্চ ভালই চলছে। খুশি হয়ে গেল।
—  গুড গুড।
—  তো যাই হোক, সেই ফোন তুললাম, অপর দিক থেকে জানতে চাইলো, ডেলিভারি অাজ–মানে সেদিন–নেবে কিনা। মানে তুমি নেবে কিনা। চানে অাছো কল ব্যাক করবে বলে অামি রেখে দিলুম ফোনটা…
—  অার অামাকে বলিসও নি ফোন এসেছিল বলে।
—  অারে ফোনটা নামিয়ে রাখতেই দুধ এলো যে। ছুটে গিয়ে নিতে গিয়ে পা পিছলিয়ে পড়ছিলুম প্রায়।
—  দেখেছো কান্ড। নির্ঘাত ওই পড়ে থাকা জলে। উফফ, তোকে নিয়ে পারি না। কতবার বলেছি…
—  পাপোষ, ইয়েস। সেদিন থেকেই শিক্ষা হয়েছে। যাই হোক, দুধ নিয়ে রান্নাঘরে রেখে সমস্ত জল মুছেটুছে…
—  এভিডেন্স ক্লীয়ার করে বল, প্রমাণ লোপাট।
—  …মুছেটুছে ফোনের কথা ভুলেই গিছলাম। থুড়ি।
—  থাক, অার থুড়িগিরি করতে হবে নে। ওরা অামাকে পরে ফোন করেছিল।
—  প্রেস্টিজ থেকে তো? এত বড় অর্ডার, অার ফোন করবে না?
—  হুম। কখন বুঝলি শুনি।
—  ওই কুকারগুলো অাসার পরেই। দুইয়ে দুইয়ে চার করতে অার কত দিমাগ লাগে বলো।
—  কাজ দিচ্ছে ওগুলো?
—  কেয়াবাৎকেয়াবাৎ কাম দিচ্ছে। সুমিতামাসি তো অাজও সকালে তাদের অাননোন বেনেফ্যাক্টরের প্রতি অাশির্বাদ দিলো।
—  অ্যাদ্দিন বলিস নি যে বড়।
—  বলে কী হতো শুনি? তুমি কি যেতে ওখানে? যেতে পারতে?
—  হুম। যাগ্গে। কী নিয়ে যেন কথা হচ্ছিল?
—  কী নিয়ে? এই তো, প্রেশারকুকার।
—  না না, এটা তো সাইডভাবে এসে পড়লো…ইয়েস, প্রেশার। প্রেশারকুকার কী কাজে লাগে?
—  বললাম তো, ভাত সেদ্ধ করতে।
—  ওকে। কিন্তু কেন। প্রেশারকুকার না থাকলে কী এমন পৃথিবী উল্টে যেত?
—  ওই তো, কী যেন ছিল? প্রেশার বাড়লে জল বয়েল হতে বেশি সময় নেয়।
—  ওয়েল, বেশি টেম্পারেচারে বয়েল করে। যার জন্য পাহাড়ি এলাকায় দেখবি প্রেশারকুকার না থাকলে রান্না করাই মুশকিল। জল হয়তো অাশি ডিগ্রীতেই দিব্যি বাষ্প হয়ে উড়ে গেল, অার ভাত হয়তো সেদ্ধই হল না।
—  বুঝেছি। কিন্তু এর সঙ্গে মঙ্গলগ্রহের মাটিতে জল তরল থাকার কী সম্পর্ক…?
—  বুঝতে পারছিস না? ভাব ভাব, ভাবা প্র্যাক্টিস কর।
—  ওঃ। সমঝা।
—  সির মে ঘুঁসা?
—  ঘুঁসা। মঙ্গলগ্রহে মাটিতে বায়ুচাপ অনেক কম, তাই জল অনেক কম তাপমাত্রাতেই বাষ্প হয়ে যায়।
—  বয়েলিং পয়েন্ট অনেক কম । কম টেম্পারেচরে কিন্তু একই গল্প। প্রেশার যত কমবে, জল বরফও হবে ততই তাড়াতাড়ি।
—  উল্টোটাই হওয়ার কথা না? প্রেশার কমলে যদি সহজে বাষ্প হয়, তাহলে বরফ তো অত সহজে হবে না, শূন্যের চেয়েও কম তাপমাত্রায় হওয়া উচিত। মানে কোনকিছু জমে গেলে তো তার অায়তন হ্রাস পায়। তাই বায়ুচাপ কম থাকলে তো জমে যাওয়া মুশকিল হওয়া উচিত।
—  হুম, লাজিক তেরা ঠিক হি হ্যায়, বাট এটা জল হ্যায় মিস পুলিপিঠে। ওয়ান অফ দি মোস্ট মিস্টিরিয়াস থিংস ইন দ্য ইউনিভার্স। জল হচ্ছে সুপারহিরো এলিমেন্ট…
—  এলিমেন্ট? অামি জানতুম কম্পাউন্ড। দুভাগ হাইড্রোজেন…
—  হ্যাঁ হ্যাঁ ওই হলো, এলিমেন্ট অামি ঠিক রাসায়নিক অর্থে বলি নি। জল একটু অালাদা, বুঝলি। অন্যদের মতো নিয়ম মেনে চলে না। যেকোন লিকুইড বস্তু ফ্রীজ করলে এক্সপ্যান্ড করে…
—  বিস্তৃত হয়? অামি জানতুম সঙ্কুচিত হয়?
—  অ্যাঁ? অামি কী বললাম?
—  তুমি বললে তরল জমলে অায়তনে বাড়ে।
—  এহেহেহে, মিসটেক মিসটেক। এপালাজিস। বাড়ে না, কমে। কন্ট্র্যাক্ট করে।
—  তাই ভাবি। পদার্থবিদ্যা রসায়নে চিরকালই গাড্ডু পেতুম, কিন্তু এটা মনে অাছে।
—  জল কিন্তু অালাদা। জল জমলেও বাড়ে, অাবার বাষ্প হলেও বাড়ে।
—  ও হ্যাঁ হ্যাঁ, তাই তো। পড়েছিলুম বটে এককালে।
—  তাই মঙ্গলগ্রহে মাটির উপর জল বেরোলেই সেটা হয় বাষ্প হবে, নয়তো জমে যাবে। মানে তার সম্ভাবনা প্রবল।
—  হুম, অার তাই প্রাণ খুঁজে পাওয়া খুব সহজ নয়।
—  রাইট। প্রাণের জন্য প্রয়োজন তরল জল, লিকুইড ওয়াটার।
—  অার তাই সৌরজগতে প্রাণের দেখে পাওয়া অত সহজ নয়, তাই তো?
—  ওয়েল, ইউরোপাতে পেলেও পাওয়া যেতে পারে।
—  ইউরোপা?
—  জুপিটারের স্যাটেলাইট। চারটে গ্যালিলিয়ানের মধ্যে অন্যতম।
—  জুপিটারে প্রাণ! বলো কি?
—  অারে জুপিটারে নয় রে বোকা, জুপিটারের স্যাটেলাইটে। কিং অফ প্ল্যানেটস, জুপিটার। রোমান দেবরাজ জুপিটার, যার গ্রীক নাম জিউস, তাঁর নামে নাম। তাঁর অনেক সাঙ্গপাঙ্গ, স্যাটেলাইট প্রচুর। বড়সড় ষোলটা, অার সব মিলিয়ে প্রায় সাতষট্টিটা।
—  বলো কি!
—  রাজা তো, কায়দাকানুনই অালাদা। এদের মধ্যে চারটে অন্যদের তুলনায় অায়তনে অনেক বড়। গ্যানিমিড, ক্যালিস্টো, ইও, অার ইউরোপা। গ্যালিলিও গ্যালিলি নিজের হাতে টেলিস্কোপ বানিয়ে…অাচ্ছা, এটা বল তো, টেলিস্কোপ প্রধানত যে দু-প্রকারের হয়, কী কী?
—  দাঁড়াও দাঁড়াও, এইটে তুমি বলেছিলে, অনেক অাগে। কী যেন ছিল, লেন্সটার কায়দাকানুন…
—  ইশশ, ইতিহাসফাঁস পড়েটড়ে মেয়ে বেসিক সায়েন্স ভুলভুলাইয়া করে ফেলেছে রে।
—  একটায় অায়না থাকে, নিউটন ব্যবহার করতেন। ঠিক?
—  নিউটনের অাবিষ্কার ওরে পাঁঠা। তখন তো অার অ্যামজন-ফ্লিপকার্ট ছিল না, অ্যাপ ঘোরালি টুপুস করে মাল বাড়ি পৌঁছে গেল। খেটেখুটে বানাতে হতো, মগজাস্ত্র খাটিয়ে।
—  এই শোন না, মগজাস্ত্রের কথায় মনে পড়লো, এই শনিবার কলেজে নাটক হবে। পাঞ্চ মনতাজ, সত্যজিতের ছোটগল্প নাটকে রূপান্তরিত করে।
—  কীরকম শুনি।
—  রতনবাবু ও সেই লোকটি, অনাথবাবুর ভয়, ফ্রিৎস, অার খগম। পরপর, সীমলেসলি।
—  ওয়াহ গুরু, একেবারে টপ চারটি নিয়েছো।
—  চারটে? পাঁচটা তো হবার কথা…ওঃ হো, পটলবাবু ফিল্মস্টার।
—  কখন হবে কোথায় হবে ইমিডিয়েট বল।
—  ডিরোজিও, অবশ্যই। বিকেল চারটে থেকে শুরু হবে।
—  প্রিয়তোষকে বলেছিস?
—  ওমা, বলবো না? প্রিয়তোষদা মনোতোষদা শ্যামলীদি সকলেই নিমন্ত্রিত।
—  সকলেই নিমন্ত্রিত?
—  সকলেই নিমন্ত্রিত।
—  তো এইসব নেমন্তন্ন কখন করলে শুনি?
—  কেন? গত পরশু থেকেই তো…এই রে চাচারে বাঁচারে…
—  অার নিজের…{ধুপ}…দিদিকে…{ধাপ}…সবার শেষে…{ধাঁই}…বলা, তাই না?
—  অাউউ, মরে গেলুম রেএএএ…
—  থাম, ভারি তো গুজফেদারের বালিশ দিয়ে…
—  এক্স-বালিশ।
—  ফরমার বালিশও বলা চলে।
—   বালিশটা ভেবেছিলুম এক মাস টিকবে অন্তত।
—  সঅঅঅব তোর দোষ।
—  মা দেখলে পিটিয়ে পোস্তচচ্চড়ি বানাবে।
—  সে অামি কি জানি। ইউ অার রেস্পন্সিবল।
—  অামার কি দোষ। গত দুদিন তোমার টিকির দেখা দেখতে পেয়েছি? রাত একটায় বাড়ি ঢুকে ভোর পাঁচটায় বেরিয়ে গিয়ে…
—  অামার টিকি নেই।
—  থাকলে মানাতো ভাল। পুরনো দিনের টোলের মাষ্টার, খেপে খেপে ছাত্রদের বেত পেটে করা।
—  তোকে বেতপেটাই করা উচিত। ফোনে জানাতে কী হয়েছিল?
—  ব্যস্ত অাছো, তাই অার করিনি।
—  ব্যস্ত অাছি বুঝলি কীকরে? বলেছি না, যতই ব্যস্ত থাকি, ফোন করতে হলে ঠিক করবি?
—  দিদি, যতই যা বলো, তোমাকে অামি চিনি। এমনি ব্যস্ত থাকা অার স্পেশ্যাল ব্যস্ত থাকার মধ্যে তফাতটুকু বুঝি। অাজ হঠাৎ এসে ব্রেন্ডার কাছে যাওয়ার প্ল্যানিং, সৌরজগতের বাইরে তিনটে গ্রহ অাবিষ্কারের কথা…এগুলো মানে হয় প্রবলেম কিছুটা হলেও সল্ভড, কিম্বা ব্যাপার অারো ঘুলিয়ে উঠেছে, অাজকের পরে অাবার বেশ কয়েকদিন তোমার নন-এগজিস্টেন্ট টিকির দেখা পাওয়া যাবে না।
—  হুম।
—  কী হুম?
—  হুমম। তুই খুব ডেঞ্জারাস লোক।
—  খামোখা অামি অাবার ডেঞ্জারাস হতে যাবো কেন?
—  ভিতরে ভিতরে কী ভাবছি বা কীরকম মুডে রিয়েলি অাছি বুঝতে পারে দুনিয়াতে–অন্তত এ দুনিয়াতে–মাত্র দুজন লোক।
—  অামি তাদের মধ্যে অন্যতম?
—  তুই সেকেন্ড বেস্ট।
—  সেকি, অন্যজন কে? মা? না ব্রেন্ডা?
—  এদের মধ্যে কেউই না। পারে অামার বস।
—  ও বাবা, সেই রহস্যময় বস। কী নাম গো তোমার বসের?
—  সে সব অলুক্ষুণে কথা, বলতে নেই। ছোড়ো ও বাতেঁ। এবার বল, অামি যে তিনটে গ্রহের কথা বলতে এসেছি, তুই জানলি কীকরে?
—  কাগজ অামিও পড়ি, দিদি। কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স কিছুটা হলেও জানি। প্রাণ পাওয়া গেছে কি?
—  অারে না না, অাবিষ্কারই হয়েছে স্রেফ। তবে কিনা, ঠান্ডা তারা তো, তাই খুব বেশি ব্রাইট নয়, চোখ–বা, রাদার, টেলিস্কোপ ঝলসে যায় না। তাই গ্রহ তিনটেয় অ্যাটমস্ফিয়ার অাছে কিনা সেটা বের করা সম্ভব হলেও হতে পারে।
—  বাঃ, এতো গুড নিউজ। কিন্তু ঠান্ডা তারা বলতে কী বোঝায়?
—  ও, এগুলো অাল্ট্রাকুল স্টার। অামাদের সূর্য যেমন হলদেটে রঙের, এদের অাবার রঙ লালচে হয়। এরা এনার্জিও কম দেয়। তাই এই গ্রহগুলি তারাটির খুব কাছে থাকা সত্ত্বেও পৃথিবী থেকে খুব অালাদা নয়। কি জানি, চল্লিশ লাইটইয়ার দূরেই হয়তো দ্বিতীয় প্রাণের খোঁজ পাওয়া যাবে।
—  দ্বিতীয় প্রাণ?
—  অাহা, পৃথিবী প্রথম না?
—  তাও বটে তাও বটে। তুরু তুরু বেরি তুরু।
—  রেওয়াজ থেমে গেছে মনে হচ্ছে।
—  গেছে বৈকি। তুমুল খিদে পাচ্ছে। দিদি, লেট অাস দ্য গো।
—  লেট অাস গো দেন, ইউ অ্যান্ড অাই।
—  অারিব্বাস, এলিয়ট। এত তু, দিদি?
—  বললাম না, নট টু অান্ডারএস্টিমেট দিদি। চলো হে পুলিপিঠে, খাওন-দাওন করা যাক।
___________________________________

সোঘো, দুপুর সাড়ে দেড়টা, পাঁচই মে, ২০১৬ সাল, কলিকাতা শহর।

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s