অ্যালার্মটা বাজলো ঠিক ন’টায়।

পুরনো অ্যালার্ম, এককালে তিরিশ টাকায় কেনা। ঝনঝন করে ছ্যাকরা গাড়ির মতো বাজে। বিছানার পাশের ছোট কাঠের রংচটা টুলটার উপর থাকে, পাশে জলের গেলাস। অ্যালার্ম থামাতে গিয়ে বহুবার জলের গেলাস উল্টেছে, অ্যালার্ম বাবাজি মাটিতে ধূলুন্ঠিত হয়েছেন। নীচটার প্লাস্টিকের কিছু অংশ উড়ে গেছে, বেসটা তাই নড়বড় করে, বাজলে তাই বাবাজি একটু একটু করে ভরতনাট্যম করতে করতে টুলের সাইডের দিকে যাওয়ার চেষ্টা করেন।

যাক না। পড়লে আপনা থেকেই থেমে যাবে। এই কথা ভেবে আধঘুমন্ত আধজাগন্ত গোপার দিল তিড়িংবিড়িং করে উঠলো।

যাবে কি যদিও? কিছুই বলা যায় না। যা ডেঞ্জারাস চিজ, সবই পারে।

চান্স নিয়ে লাভ নাই। একটা চোখ খুলে তাক করে হাতটা সপাটে মারলো। অ্যালার্ম একবার কেঁউ করেই চুপ।

গুড। এবার আরেকটু ঘুমোনো যাবে। যদি গরমঘামপ্যাচপ্যাচেবাবাজীবন সেটা অ্যালাউ করেন।

গরম? ঘাম? প্যাচপ্যাচে?

গোপা ধড়মড়িয়ে উঠলো। বরং বলা ভালো গোপার চোখদেড়টি ধড়মড়িয়ে উঠলো। ধর ধড়মড় করার মতো জাগন্তস্টেজ এখনো আসেনি।

অ্যালার্মটা ভালো করে দেখলো গোপা। কোন ভুল নেই, ন’টাই বাজে। হাত দিয়ে বাকি অর্ধেক চোখটি খুলে ফুল পাওয়ারে দেওয়ালে ঝুলে থাকা এককালে শাদা ডায়াল এখন হলদে ঘোষপুরনো অজন্তা ঘড়িটার দিকে দৃষ্টি ফেরালো। নাঃ, নো মিসটেক। সকাল ইজ দ্য ন’টাই। মানে সূর্য মধ্যগগন আর দিগন্তের বাইসেকশানে। মানে এই মমধ্যমেমাসে বাই কন্সট্রাকশন গরম, ঘাম আর প্যাচপ্যাচেনি থাকার কথা।

কিন্তু নেই!

আলোটাও কেমন জানি বেশি। কর্কশ নয়, মৃদুমন্দ।

ও, বুয়েচি, দক্ষিণের বারান্দার দরজা খোলা, দরজার পাশের জানলাটাও হাট করে খোলা। তাই এত আলো। কিন্তু চোখ ধাঁধিয়ে দিচ্ছে না কেন? গা জ্বালিয়ে দিচ্ছেই বা না কেন?

চোখদুটি পাশের জানলা গলে বাইরে পালালো। এটা পশ্চিমের জানলা। বাইরে একটা শাদা বাড়ি, দোতলা। একটা সোনালি বাড়ি, দোতলা। আর একটা আকাশনীল আকাশ। তলাহীন।

আকাশটা পুরো নীল নয়। নীলের উপর কোথাও শাদার ছোপ, কোথাও ছাইয়ের। তা সত্ত্বেও নীলটা যেন আজ বেশি নীল, বেশি আকাশি, বেশি তাজা।

বাতাসটাও তেমনই যেন তাজা। ক্লেদ স্বেদ মেদের ভার যেন কম আজ। যেন বেষ্টনি ভেঙে হারেরেরে করে ছুটে চলেছে। তার ছোঁয়ায় প্রাণ, তাজা নতুন জান।

আহা কী আনন্দ।

কিন্তু না। রাতে বৃষ্টি, বাদলা হাওয়া, গরম হাওয়া…শুধু এইজন্যই কি গোপার মনটা এরম সুখের আড়মোড়া ভাঙছে? দিলটা তিড়িংবিড়িং থামিয়ে ধীরগতির মোহময় ওয়াল্টজ শুরু করেছে? উঁহুঃ, শুধু তাই নয়। কর্ণযুগল এবার ফীল্ডে নামুক। কিছু একটা ভেসে আসছে পাগল হাওয়ায় ভর করে। শব্দটার ওঠানামা আছে, বাড়াকমা আছে, তাল আছে, সুর আছে, জান আছে।

ঢাকের আওয়াজ!

কোথায় যেন ঢাক বাজছে। একটা না, দুটো না, তিনটেও না। অনেক অনেক ঢাক। পুজোয় যেমন বাজে। দুগগাপুজোয়।

দুর্গাপূজা।

ছোটবেলায় ঢাকের আওয়াজ শুনলে প্রাণটা ছটফটিয়ে উঠতো। প্যান্ডেল হবে প্রতিমা আসবে ডাকের সাজে সাজানো হবে। খেলাধুলো সন্ধিপুজো ধুনুচিনাচ পাতপেড়ে খাওয়া ক্যাপপিস্তল ফাটানো বিসর্জনে আসছেবছরআবারহবে হেঁকে গলাচেড়া। একাদশীতে গানবাজনাআবৃত্তিনাটক…

একা একা কোনকিছুই হয় না। হতে পারে না। ছোটবেলার স্মৃতি এখনো উজ্জ্বল কেন? সবাই মিলেমিশে করতো বলেই। সবাই সবাইকে ভালবাসতো। খেয়াল রাখতো। এখনো কি রাখে না?

রাখতে চায়, আমিই দিতে দি না। দূরে তো আমিই সরিয়ে দিয়েছি। নিজের চারদিকে পাঁচিল তুলে পরিখা কেটে দূর্গ তুলে একলা থাকো রে নীতি তো আমিই নিয়েছি। নিজের কাছে এসব কবুল করতে বাধ্য হল গোপা।

কিন্তু এখন?

ঢাকের আওয়াজটা মিলিয়ে যাওয়ার আগে পাঁচিলে ধাক্কা মারলো। দেখলো, পাঁচিলটা আর নেই। পরিখাটা পরীক্ষা করলো। দেখলো, জল আর নেই, মাটি ভরেছে তাতে, সবুজ ঘাস দেখা দিচ্ছে। দূর্গটি?

গোপার মুখে হাসি ফুটলো। মেকি হাসি নয়, মুখোশ হাসি নয়, ভিতরের শূন্যতা ঢাকবার হাসি নয়। তারারা যে চিহ্ন রেখে গেছে তা কি ভোলবার?

গোপা আড়মোড়া ভেঙে উঠলো। অনেক, অনেক বছর বাদে এবারের পুজোটা আনন্দে কাটবে। আহা কি আনন্দ…

দূর্গটা যে আর নেই ভাই, দূর্গটা যে আর নেই…
_______________________________

সোঘো, সকাল দশটা, বাইরে ফুরফুরে হাওয়া, চোদ্দই মে, ২০১৬ সাল, টালিগঞ্জ শহরাংশ।

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s