—  আমি বড্ড একলা, জানেন?
—  তাই?
—  কেউ আমার সঙ্গে কথাই বলতে চায় না।
—  চায় না?
—  আমায় দেখলেই সবাই মুখ ফিরিয়ে নেয়।
—  নেয়?
—  কখনো কখনো গালাগালও করে।
—  তাই?
—  এক বুড়ো তো আমায় পাগলও বলেছে।
—  বলেছে?
—  হয়তো তার জন্য আমিই দায়ী।
—  বলছেন?
—  দোষ হয়তো আমারই।
—  কীকরে বুঝলেন আপনারই দোষ?
—  আমি মাঝেমধ্যেই একটু অ্যাগ্রেসিভ হয়ে উঠি।
—  কীরকম?
—  রেগে যাই হঠাৎ হঠাৎ।
—  তাই?
—  ধরুন সেদিন রেলস্টেশনে। শিয়ালদায়।
—  ট্রেনের বাংলা লৌহশকট।
—  একটা লোক।
—  কীরকম লোক?
—  গরীব লোক, জমাদার গোছের।
—  গরীব হওয়া খুব খারাপ।
—  নাম পঞ্চদেব। বিহারবাসি।
—  বিহারে নালন্দা আছে।
—  ডাকনাম খোট্টা।
—  সবার উপরে মানুষ সত্য…
—  অনেক কষ্টে এদিকওদিক ছড়িয়ে থাকা খালি জলের বোতল, চিপ্সের প্যাকেট, কোল্ডড্রিঙ্কের বোতল, বসার জন্য পাতা খবরের কাগজ তুলে এনে জড়ো করেছে।
—  বেশি কোল্ডড্রিঙ্ক খাওয়া স্বাস্থ্যের পক্ষে হানিকারক।
—  বলা নেই কওয়া নেই, আমি হঠাৎ রেগে গিয়ে সেই সব জঞ্জাল এক ধাক্কায় ছড়িয়ে দিলাম।
—  তাই?
—  বা ধরুন, পাড়ার রভিন্দ্রন। কেরালাবাসী। ডাকনাম মাল্লু। টাক পড়ে গেছে।
—  হায়দ্যেয়ানাথ ইন্দ্রলুপ্তলুপ্ত ক্রীম। দুহপ্তায় দুপোঁচ চুল গ্যা…ওয়ার‍্যান্টি, নয়তো টাকা ফেরত।
—  গত শনিবার পরচুলা মাথায় বাস ধরতে যাচ্ছে।
—  টার্মস অ্যান্ড কন্ডিশান্স অ্যাপ্লাই।
—  আমি সেই পরচুলা টেনে খুলে দিলুম।
—  টোনাল্ড ড্রাম্প টোনাল্ড ড্রাম্প টোনাল্ড ড্রাম্প…
—  বা ধরুন দীঘার সৈকতে।
—  এনএইচ ১১৬বি দিয়ে গেলে দীঘা ১৮৫ কিলোমিটার…
—  বাচ্ছারা খেলছে, বালির দুর্গ বানাচ্ছে।
— … গাড়ি করে গেলে এখনকার ট্র‍্যাফিকে ৪ ঘন্টা ১ মিনিট।
—  আমি রেগেমেগে গিয়ে মারলুম এক লাথি।
—  লাথিকে ক্যারাটেতে বলে কিক। সলমানেও।
—  সেই দুর্গ ভ্যানিশ।
—  মন্দার বোস।
—  বেচারিদের মা’রা এদিকে তাদের মাথা থেকে বালি বের করতে কাহিল।
—  বালি গরম করে কাচ…কাঁচ…কাচ…কাঁচ…কাচ হয়।
—  বা ধরুন গতমাসে প্রবল বৃষ্টি।
—  মাকুওয়েদার বলছে কলকাতায় আজ বৃষ্টি হবে আর হনোলুলুতে লবডঙ্কা।
—  স্মরণজিত কৌর। প্রৌঢ়া। ডাকনাম পাঁইয়া। আর্থ্রাইটিসে ভোগেন। ছাতা মাথায় অতি কষ্টে বাজারে চলেছেন। হাজবেন্ড গুরবক্স সিং, দুটো হার্ট অ্যাটাকের পর আর ট্যাক্সি চালাতে পারেন না। ডাকনাম বাঁধাকপি।
—  ফুলকপি পার পীস চল্লিশ টাকা চলছে বাজারে।
—  আমি পিছন থেকে চুপিচুপি গিয়ে ছাতাটাকে এক মোক্ষম টানে উলটে দিলুম।
—  কলকাতার মেট্রোয় এবছর দুশো চুরানব্বইখানা ছাতা হারিয়েছে।
—  এটা কি রাগ? নাকি দস্যিপনা? আমি তো বাচ্ছা নই। নাকি বাচ্ছাই?
—  দুধ না খেলে, হবে না ভাল ছেলে।
—  এতকিছু করলাম, কেউ কিন্তু আমায় কিচ্ছু বলে নি। কোনওদিনও না।
—  তাই?
—  হ্যাঁ, গালাগাল করে বটে। তবে মুখের উপর কখনোই নয়।
—  লেয়ার অ্যান্ড ফাভলি মাখলে মুখ হবে ফ্রেশ অ্যান্ড ব্রাইট, ধরুণ বাওয়ানের মতো।
—  সবাই যেন দেখেও দেখে না আমায়।
—  হ্যারি পটারের ইনভিজিবিলিটি ক্লোক তিনটি ডেথলি হ্যালোর একটি।
—  মনে বড় কষ্ট ছিল, জানেন। মনে হত, এত পোটেনশিয়াল আছে আমার মধ্যে, কেউ আমাকে বুঝলো না?
—  পোটেনশিয়াল এনার্জি প্লাস কাইনেটিক এনার্জি হল টোটাল এনার্জি।
—  ভরসা করে কেউ যদি একটা চাকরি দিতো, কাজে লাগাতো, একটা সুযোগ…
—  খোক্কস ডট কমে ডিস্কাউন্টেড সাইন-ইন চলছে।
—  সেদিন একটা পার্কে ঘোরাফেরা করছিলাম।
—  পার্ক স্ট্রীটের নাম পালটে হয়েছে মাদার টেরিজা সরণী।
—  একজন খুব মন দিয়ে খবরের কাগজ পড়ছিলেন।
—  মেট্রো স্টেশনটাও চ্যারিটিতে চলে।
—  কোন কারণ নেই, আমি তাঁর কাগজ নিয়ে টানাটানি শুরু করলাম।
—  নিউজপ্রিন্ট অত্যন্ত ক্ষতিকারক জিনিস।
—  তিনি দেখলাম বিরক্ত হলেন না।
—  পেটে গেলে ডাক্তার দেখানো উচিত।
—  অন্যদের মতো উপেক্ষা বা অগ্রাহ্যও করলেন না।
—  ভীষণ বিষাক্ত।
—  পাশে বসতে বললেন।
—  মাধ্যমিকের পাশের হার বাড়ছে।
—  আমার সঙ্গে অনেক কথা বললেন। আমি কী করি, কেন করি, সব শুনলেন।
—  কী এবং কি-য়ের মধ্যে ফারাক আছে।
—  আমার দুঃখটা বুঝলেন।
—  তুমি কি খাবে? অর্থাৎ তুমি খাওয়াদাওয়া করতে ইচ্ছুক কিনা জিজ্ঞেস করা হচ্ছে।
—  বললেন, আমি নাকি অন্যের কাজে লাগতে পারি।
—  তুমি কী খাবে? অর্থাৎ তোমার কোন মেনু পছন্দ জিজ্ঞেস করা হচ্ছে।
—  বললেন, আমার রাগ হওয়া, লোককে অকারণে বিরক্ত করা, এ নাকি হয়েই থাকে। এগুলো নেগেটিভ ব্যাপার, এসব নিয়ে ভেবে লাভ নেই। বরঞ্চ পজিটিভ নিয়ে ভাবা উচিত।
—  ইলেকট্রনের নেগেটিভ চার্জ আর প্রোটনের পজিটিভ চার্জ একে অপরকে ঠিকঠাক ব্যালেন্স করে।
—  ওনার কার্ড দিলেন। বললেন, আমায় নাকি আর একা থাকতে হবে না। মানুষের কাজে লাগতে পারলে লোকে আমার প্রশংসা করবে।
—  যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে…
—  আমার এখন অফিস হয়েছে, জানেন। ইয়া বড়। ইয়া উঁচু। কি সুন্দর ধবধবে শাদা। যেন পক্ষীরাজ ঘোড়া।
—  ডেড্যালাস ছিলেন ইক্যারাসের বাবা।
—  তিনটে ব্লেড। ঝাঁ চকচকে। ওতে আমি একরত্তি ধুলো পড়তে দি না, পড়লেই উড়িয়ে নিয়ে যাই।
—  প্রমিথিয়ুস স্বর্গ থেকে আগুন চুরি করে এনেছিলেন।
—  বড় ভালো লাগছে, মানুষের কাজে আসতে পেরে। রেগে গেলেও আর ঝামেলা নেই, তাতে ল্যাম্পপোস্টের আলোটা একটু বেশি জোরে জ্বলছে, রহমত সারাদিন ট্র‍্যাফিক লাইটে ধূপ বেচে রাত্তিরে খাতাপেন্সিল নিয়ে বসছে তার তলায়। ডাকনাম মোল্লা। কখনো স্যাল্লা বঙ্গালি।
—  আপনার আর কোন প্রশ্ন আছে, বা-বাবু?
—  আছে। আপনার সঙ্গে কথা বলে খুব ভাল লাগলো। কিন্তু আপনার পরিচয়টা ঠিক…
—  আমি বিড়ি। ইউফোনে আমার বাস। আমার মা, নাম এলাইজা, আমাকে ত্যাজ্যপ্রোগ্রাম করেছেন। আলাপ হয়ে ভালো লাগলো।
_____________________________

কাল একটি দুর্দান্ত ভিডিও দেখে এই লেখার ইচ্ছে আসে। দুঃখের বিষয় লেখাটি পড়ে ভিডিওটি দেখলে শেষের চমকটি মাঠে মারা যাবে, কিন্তু কী আর করা যাবে। লিঙ্কটা এইখানে

অ্যানেময় হল গ্রীক পুরাণে হাওয়ার দেবতা। বোরিয়াস হলেন উত্তুরে হাওয়া, জেফাইরাস পশ্চিমের, ইউরাস পূর্বের, আর নোটোস দক্ষিণের।
_____________________________

সোঘো, রাত পৌনে এগারোটা বাজতে এক ঘন্টা বাকি, ঝড় আসবো আসবো করেও ফেল মারছে, বা-বাবুকে কম্পলেন করতে হবে, ১৪ মে, ২০১৬ সাল, প্রিন্সেপ ঘাটের শহর।

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s