—  অাপনার নাম?
—  রাজা। রাজা গান্ধী।
—  সেদিন জুগার্ডেনে কেন গিছলেন?
—  বন্ধ হয়ে যাবে বলে। শেষ জুগার্ডেন। শেষবারের মতো একবার দেখবো।
—  অাগে গেছেন?
—  একবার মাত্র। ছোটবেলায়। মা-র সঙ্গে।
—  মাত্র একবার?
—  মা জুগার্ডেনের ইতিহাস শুনিয়েছিল। সে শুনে অার যেতে ইচ্ছে করেনি।
—  বিপ্লবের ইতিহাস?
—  বর্বরতার ইতিহাস। পাশবিক বর্বরতা। এই শান্তিপূর্ণ পৃথিবীতেও…ছিছি। ভেবেও ক্ষণে ক্ষণে শিউরে উঠি।
—  জুগার্ডেনে কী হল বলুন।
—  সারাদিন সব এগজিবিট দেখলাম। খুব দুঃখ হল, এভাবে নির্বোধ জীবগুলিকে অাটক রাখা।
—  অার তো হবে না। গতকাল থেকেই সব বন্ধ হয়ে গেছে।
—  সেটা ভেবেই ভাল লাগছিল। সারাদিন ঘুরে শেষে এনক্লোজারটায় এলাম।
—  ইয়েস। এনক্লোজারে। কী হল বলুন সেখানে।
—  তারের বেড়া, নীচে খোলা মাঠ, কিছু গাছপালা, মাঝখান দিয়ে কুলকুল শব্দে একটা নদী বয়ে যাচ্ছে।
—  এনক্লোজারটার বর্ণনা অামরা জানি রাজাবাবু…
—  রাজাবাবু নয় প্লীজ। রাজা গান্ধী। অামি পুরো নামটাই ব্যবহার করি।
—  অাচ্ছে বেশ। নোট করলাম। ঘটনাটা কী ঘটলো?
—  সেই বের দেওয়া এলাকায় অনেকগুলো নির্বোধ জীব ঘুরে বেড়াচ্ছিল। একজন বাদে।
—  হুম। সেই একজনই ইন্টারেস্টিং।
—  দেখে তো অার ওদের বয়স বোঝা যায় না…
—  সতেরো।
—  ও। তো তাকে কেন জানি অালাদা মনে হল।
—  কৌতুহলটা একটু বেশি।
—  হ্যাঁ। চাউনি দেখে মনে হল বুদ্ধির ছাপ অাছে।
—  তা বটে।
—  তো সেই নির্বোধটা…
—  হাড়াম্বে।
—  অ্যাঁ?
—  ওর নাম হাড়াম্বে।
—  নামও অাছে?
—  থাকবে না কেন? অাপনার অামার নাম থাকতে পারলে ওদের পারবে না?
—  না মানে বিপ্লবের পরে…
—  ঘটনায় ফিরুন রাজা গান্ধী। কী হল তারপর?
—  ভীড় বেশ বেশি ছিল। সকলেই শেষবারের মতো দেখতে এসেছিল বোধহয়।
—  কনফার্মড। এটা অনেকেই বলেছে।
—  অনেকেই নদীর উপরে ব্রীজটার উপর ঝুঁকে পড়ে দেখছিল। বোধ করি হাড়াম্বেকেই দেখছিল।
—  কী করছিল সে তখন?
—  নদীর পাড়ে বসে দুটো পাথর নিয়ে ঠোকাঠুকি করছিল। কেন কে জানে।
—  তারপর?
—  কেউ বোধহয় একটু বেশিই ঝুঁকে পড়েছিল। কোলে বাচ্ছা ছিল, স্লিপ করে সোজা নীচের নদীতে।
—  অাপনার নিজের চোখে দেখা?
—  না না, পরে শুনেছি। অামি তো হাড়াম্বেকেই দেখছিলাম। কী সাংঘাতিক ব্যাপার বলুন তো। ডাঙায় পড়লে তাও বেঁচে যেতো, জলে পড়লে তো…কে অার জল ডিঙোবে বলুন?
—  অার হাড়াম্বে?
—  সেও বাচ্ছাটির পড়ে যাওয়া দেখেছিল। এক মিনিট দেরী না করে তাকে জলে ঝাঁপ দিতে দেখলুম।
—  “এক মিনিট দেরী না করে…”। হুম। অর্থাৎ নিজের সুরক্ষার তোয়াক্কা না করে?
—  একদম। দেখি নিমেষের মধ্যে সাঁতরে পৌঁছে গেছে মাঝনদীতে। পুঁচকে শরীর হলে কী হবে, জলে যেন মাছ। বাচ্ছাটিকে পাকড়ে ডাঙায় নিয়ে ফেলতে বেশি সময় লাগলো না।
—  ফেলে কী করলো?
—  তারপর তার বুক চিপে জল বের করলো এই হাড়াম্বে।
—  মানে বাচ্ছাটির প্রাণ বাঁচালো।
—  একদম।
—  অার তারপর?
—  তারপরটাই দুঃখের।
—  খুলে বলুন।
—  বাচ্ছা নাগরিক বোধহয় হাড়াম্বে কোনদিনও দেখেনি।
—  কাছ থেকে নিশ্চই দেখেনি।
—  কৌতুহলই কাল হল বেচারার।
—  কী করেছিল সে?
—  বাচ্ছাটিকে টিপেটুপে দেখার চেষ্টা করছিল বোধহয়। ঝুঁকে পড়েছিল তো ওর উপর, তাই দেখা যাচ্ছিল না। এদিকে ব্রীজের উপর নাগরিকরা চিৎকার-চেঁচামেচি শুরু করে দিয়েছে। জুগার্ডেনের গার্ডও এসে গেছে। সঙ্গে লোডেড বন্দুক।
—  লোডেড বুঝলেন কী করে?
—  বুঝিনি। ভেবেছিলাম ঘুমপাড়ানি গুলি অাছে। এত লোকের এসে পড়াতে অার গোলমালে হাড়াম্বে ভড়কে গিয়ে দাঁতমুখ খিঁচোতেই পরপর দশটা বন্দুক গর্জে উঠলো।
—  হাড়াম্বেকে লক্ষ্য করে?
—  বার দুয়েক শরীরটা কেঁপে কেঁপে উঠলো। তারপর সব শেষ। জুগার্ডেনের গার্ডরা বাচ্ছাটিকে নিয়ে চলে এলো, মা-র কোলে সে ফিরে গেল। বছর দেড়েক বয়স, কীই বা বুঝলো, কী হযে গেলো তাকে নিয়ে?
—  অার অাপনি? অাপনি এসব দেখে কী করলেন?
—  কী অার করবো? শান্তিপূর্ণ পৃথিবী যে সবার জন্য নয়, সেটা বুঝলাম।
—  কিন্তু এটার কি প্রয়োজন ছিল না রাজা গান্ধী? হাড়াম্বে যদি বাচ্ছাটার ক্ষতি করতো?
—  প্রাণে বাঁচিয়ে ক্ষতি করবে? অার ঘুমপাড়ানি গুলিও তো চালানো যেত।
—  অত ফাস্ট অ্যাক্টিং ট্র্যাঙ্ক ছিল না ওদের। জুগার্ডেন বন্ধ হয়ে যাবে, সব স্টক সরিয়ে ফেলা হয়েছিল।
—  এ তো নেগলিজেন্স।
—  বাচ্ছাটি তো প্রাণে বাঁচলো।
—  বাঁচলো। কিন্তু তার রক্ষাকর্তা তো বাঁচলো না।
—  অাপনার কী মনে হয়? এটা নেগলিজেন্স?
—  তা অামি কি জানি বলুন। অামি ছাপোষা নাগরিক। শুধু…
—  শুধু?
—  মনে হল, এটা যদি বিপ্লবের অাগে হতো? মানে ধরুন হাড়াম্বে যদি অামি হতাম বা অাপনি, অার ওই নির্বোধগুলি যদি খাঁচার এপারে থাকতো, বন্দুক হাতে? কী হতো তাহলে?
—  যা এবার হয়েছে তাই হতো রাজা গান্ধী। শাসকের মনস্তত্ত্ব পাল্টায় না, জানেন না?
—  তাই এনক্লোজার থেকে বেরোবার সময় সাইনবোর্ডটা দেখে কেমন একটা অজানা ভয়ে শিউরে উঠলাম।
—  সাইনবোর্ড?
—  ওই যাতে লেখা থাকে না, বৈজ্ঞানিক নাম। মানে যে জীব খাঁচায় বা এনক্লোজারে থাকে তার…
—  শিউরে উঠলেন কেন? গোরিলা গোরিলা লেখা নেই বলে?
—  ঠিকই বলেছেন। দুবার পড়ে নিজেকে অাশ্বস্ত করলাম। হোমো স্যাপিয়েন্স। নট গোরিলা গোরিলা। হোমো স্যাপিয়েন্স।
___________

সোঘো, দুপুর সাড়ে বারোটা, ৫ জুন, ২০১৬ সাল, তিলোত্তমা।

Advertisements

4 thoughts on “হাড়াম্বে

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s