বিজ্ঞাপনটা শনিবারের কাগজে বেরিয়েছে। মাত্র দুটি লাইন। চারটে মাত্র শব্দ তাতে।

ফ্ল্যাশ ফোটোপোর্ট্রেট। অবিকল জীবন্ত।

তলায় একটি পোস্ট বক্স নম্বর। দিলুম পাঁচ লাইন লিখে। ডাকটিকিট বাড়ন্ত, তাই পাঁচুকে কুড়ি পয়সা দিলুম। তিনটে টিকিট, পাঁচ পয়সা করে, অার বাকি পাঁচে পাঁচু প্যাঁচার পাঁচন কিনবে।

উত্তর অাসতে বেশি দেরী হল না। হাল্কা নীল ইনল্যান্ড লেটার, মুক্তোর মত হাতের লেখা, ব্লু-ব্ল্যাক কালি, নিবটা খানিক ভোঁতা।

নমস্কার।

অাপনার চিঠি পেলুম। অাগামী বাইশে অাগস্ট সিটিং দিতে কি অাপনি প্রস্তুত?

অাবার সেই দু’লাইন। নীচে নামধাম অাছে বটে, কিন্তু সেটা এ দলিলে না দিলেও চলবে।

ভদ্রলোক উপস্থিত হলেন ঠিক দিনে ঠিক সময়ে। টেলিগ্রামটা যে পাঁচুই পাঠিয়েছিলো অার প্যাঁচার যে পাঁচনলাভও হয়েছিল একথা বলাই বাহুল্য।

“স্টেশন থেকে অাসতে কোন অসুবিধে হয়নি তো?”

সৌজন্যবোধ।

“না না, একটা রিকশা নিয়ে নিলুম। রিকশাওয়ালা বেশ রসিক লোক। বলে কিনা সিপাই বিদ্রোহ দেখেছে।”

“কে, অালি?” হোহো করে হেসে নিলাম একচোট। “অারে ও ওসব বলেই থাকে। সকাল থেকেই চড়ে থাকে ব্যাটার।”

“অাপনার চা-টা বেশ কিন্তু,” পেয়ালা থেকে এক চুমুক চেখে বললেন ভদ্রলোক।

“অার্ল-গ্রে,” মুখে এক ছিলিম প্রশান্তি অার সেরখানেক গর্ব মিশিয়ে বললাম, “সোজা লন্ডন থেকে ইম্পোর্টেড। একেবারে ফ্রেশ।”

“অার্ল গ্রে?” ভদ্রলোক অবাক। “গোল্ডেন টিপস্ কী?”

“হ্যাঁ,” অাগের মিক্শচারে এক পোঁচ উৎকন্ঠা মিশিয়ে বললাম, “অাপনি তো বেশ খবর-টবর রাখেন দেখছি।”

“হ্যাঁ, অামার এক পরিচিত গোল্ডেন টিপসের জোনাল ম্যানেজার,” পেয়ালাটা নামিয়ে বললেন ভদ্রলোক। “অাপনার সিটিঙের পর ওনার সিটিং অাছে, বিকেলবেলা।”

চা নিয়ে বড়াই করাটা অামার মজ্জাগত। চা অার টুপি। মানে হ্যাট। বাওলার ফেডোরা বোটার টপহ্যাট ইত্যাদি অনেক প্রকারে উচ্চমানের হ্যাটের মালিক অামি। তবে কি, কিছুই বলা যায়না, এঁর অন্য কোন বুজুম ফ্রেন্ড যদি ব্রস অ্যান্ড ক্ল্যাকওয়েলের জেনারেল ম্যানেজার হন। ভদ্রলোক তো, তাই চেপে ধরলেন না। কী বেইজ্জতই না হত।

“চলুন, অাপনার সিটিং এবার শুরু করুন,” বিব্রতভাব ঢাকতে কলকাতা থেকে অামদানী করা প্রায়-ঠান্ডা-হয়ে-যাওয়া অার্ল গ্রেতে শেষ চুমুকটা দিয়ে বললাম।

“বাড়িটা দোতলা, তাই তো?”

“দোতলাই বলতে পারেন। উপরে অারেকটা তলা অাছে বটে, তবে সেটা শুধু ঠাকুরঘর অার ছাত, বাদুড়ের বাস।”

“তাহলে চলুন, সেই তেতলার ছাতেই যাওয়া যাক।”

ছাতে রোজ বিকেলে অাসি। পায়চারি করি। একটা অারামকেদারা রাখা রয়েছে, তাতে অাধশোয়া হয়ে অার্ল গ্রের সদ্ব্যবহার করতে করতে জেম্স হ্যাডলি চেজ পড়ি। অালো কমে গেলে নীচে নেমে যাই। এরকম সকাল সকাল ছাতে অাসা অনেকদিন বাদে।

“তার মানে অাপনি ঠিক এই সময়ে ছাতে এসে বসতে অনভ্যস্ত?” ব্যাগ থেকে ট্রাইপড বের করতে করতে জিজ্ঞেস করলেন ভদ্রলোক।

“হ্যাঁ, অনেকদিন বাদে এলুম। বেশ লাগছে।”

“বেশ, ওটাতে বসুন একটু, সিটিং দিতে বেশি সময় লাগার কথা নয়।”

“অাপনি কিন্তু দুপুরে খেয়ে যাবেন,” অারামকেদারার দিকে হাঁটা লাগিয়ে বললুম।

“অারে না না, বিকেলে সিটিং, লেট হওয়া যাবে না, তাহলে বড় মুশকিল। ক্ষমা করবেন।”

প্রতিবাদ করতে যাবো, এমন সময় দেখি, অারামকেদারাটায় একটা মসৃণ ধুলো পরত পড়েছে। ডাস্টারটা অাবার ঝুলছে অারামকেদারার হাতলে। “পাঁচু, এই পাঁচু,” হাঁক দিলুম। পাঁচুটা বিশ্বস্ত, কর্মঠ, শুধু গ্রেম্যাটারে একটু রেশন পড়েছে।

“কতবার বলেছি তোকে, ধুলোমাখা ডাস্টার অামার ধারেকাছে রাখবি না,” ধমক দিতে বাধ্য হলুম।

“কিছু মনে করবেন না,” ক্যামেরার বাক্সের ঢাকনা খুলতে খুলতে বললেন ভদ্রলোক, “অাপনার কি হাঁপের ব্যামো অাছে?”

“ধুলো নাকে ঢুকলেই লাগলে সোজা উমাপ্রসাদ ডাক্তার,” ব্যাজার মুখে বললাম, “সেই ছোটবেলা থেকেই। অার এই গর্দভ পাঁচুটা ঠিক এই ধুলোমাখা…”

নাকে রুমাল চাপা দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে রামবকুনিটাও বনবাসে গেল। মস্ত বড় একখানা ঝাড়ন দিয়েছেন শ্রীপাঁচুশ্বর। ধুলোয় সব ধুলোময়। এদিকে ক্যামেরা তৈরি। ক্যামেরা নিয়ে অামার জ্ঞান সামান্যই, যদিও কৌতুহল যথেষ্ট।

“এটা কি কোডাক?”

ভদ্রলোক হেসে ফেললেন।

“না, এটা পেন্ট্যাক্স। এই দেখুন, খাপে লেখা অাছে। ইংরেজ কম্পানি। ডিপেন্ডেবল। অাচ্ছা, অাপনি এবার একটু বসুন তো, লাইটটা মেপে নি।”

পাঁচুর ঝাড়নদারী শেষ। অারেক রাউন্ড চায়ের নিঃশব্দ অর্ডার পেয়ে সে ছুটেছে নীচে। রুমাল ফেরত গেছে পকেটে। ধুতি সামলে রুপোর হাতলওয়ালা লাঠিটা অারামকেদারার শেগুনকাঠের হাতলে এলিয়ে রেখে সবুজ লেদারে নিজেকে এলিয়ে দিলুম।

“অাঃ।”

ভদ্রলোক অামার দিকে তাকিয়ে স্মিত হাসলেন। সাবজেক্ট রিল্যাক্সড থাকলে সিটিংয়ে সুবিধে। হাতে দেশলাই বাক্সের মতো ছোট একটা যন্ত্র নিয়ে চারিদিকে ঘুরিয়ে কীসব মাপলেন। বুঝলাম এটাই লাইটমীটার। মাপা হয়ে গেলে তিনি ট্রাইপডে ফেরত গিয়ে লেন্সের ঢাকনা খুলে ভিউফাইন্ডারে চোখ দিলেন। ভুরু কুঁচকে গেল। পছন্দ হল না বোধহয়। ট্রাইপডটার হাইট একটু কমালেন। ক্যামেরাটা খানিক এদিক-ওদিক ঘোরালেন। হাতের চেটো দিয়ে চোখ অাড়াল করে অাকাশের দিকে তাকালেন। তারপর লাইটমীটার দিয়ে অারেকবার কীসব মাপলেন। অাবার ক্যামেরার কাছে ফেরত গেলেন। কীসব খুটখাট করলেন। তারপর ব্যাগ থেকে ফিল্ম বের করে ক্যামেরার পিছনের ঢাকনা খুলে ভরে দিলেন। ঢাকনাটা খট শব্দে বন্ধ হল। অাবার ভিউফাইন্ডারে চোখ লাগালেন। ডানহাত দিয়ে বুড়ো-অাঙুল তুলে অল-ওকে বোঝালেন। তারপর শাটারে অাঙুলের অালতো চাপ দিলেন।

পাঁচু দ্বিতীয় রাউন্ড চা নিয়ে উপস্থিত হয়ে দেখলো ভদ্রলোক প্রাণপণে বাবুর বুকে মালিশ করছে। দামী টীসেট, সবুজ চায়না, বাবুর এক মাসতুতো দাদা লন্ডান না কোত্থেকে এনেছিল। সে তো ছাতের মাটিতে ছড়িয়ে ছত্রাখান। পাঁচুকে দেখতে পেয়েই ভদ্রলোক “ডাক্তার ডাকো, এক্ষুণি, ওই উমাপ্রসাদ ডাক্তারকে, তোমার বাবুর হার্ট অ্যাটাক হয়েছে, জলদি!” বলে তাকে উল্টো দিকে ফেরত পাঠালেন। ডাক্তার এলেন, ডেথ সার্টিফিকেটে লিখলেন ডেথ ডিউ টু সাডেন মায়োকার্ডিয়াল ইনফার্কশন। ভদ্রলোক পাঁচুকে সান্ত্বনা দিয়ে অার ডাক্তারবাবুর কাছে দুঃখপ্রকাশ করে ট্রাইপড ক্যামেরা গোছাতে শুরু করলেন।

“অাপনি কি এক্ষুণি কলকাতা ফেরত যাবেন?” স্টেথো ব্যাগে ভরতে ভরতে উমাপ্রসাদ ডাক্তার জানতে চাইলেন।

“যেতেই হবে, অারেকটা সিটিং অাছে অাজই বিকেলে,” নিরুপায় স্বরে বললেন ভদ্রলোক।
“খুবই স্ট্রেঞ্জ কেস,” ধবধবে শাদা রুমালে কালো মোটা ফ্রেমের চশমা মুছতে মুছতে বললেন উমাপ্রসাদ ডাক্তার। “অ্যাস্থমা ছিল বটে, কিন্তু তা বাদ দিলে যথেষ্ট সুস্থ স্বাস্থ্যবান লোক। রোজ সকালে মাঠে পাঁচ রাউন্ড দেন। হেলদি ফেলো। এনার হঠাৎ হার্ট অ্যাটাক…”

“জীবন-মৃত্যু কে কবে কোথা থেকে অাসে কে বা জানে,” ট্রাইপডটা ফোল্ড করে ব্যাগে পুরে বললেন ভদ্রলোক। “কখনও হঠাতে অাসে, অাবার হয়তো কখনো মৃত্যু নিতে অাসে।”

“মৃত্যু নিতে অাসে বলতে?” ভুরু কুঁচকে জিজ্ঞেস করলেন উমাপ্রসাদ ডাক্তার।

ফিল্মটা স্পুল করে খট শব্দে ক্যামেরার পিছনের অংশ খুলে ফেলে ভর্তি রোলটা বের করে ব্যাগে রেখে ভদ্রলোক বললেন, “পশ্চিমদেশে একটা ধারণা চালু অাছে, জানেন তো? ডেথ নাকি একজন কালো জোব্বা পরা বিশালদেহি কঙ্কালসার পুরুষ, হাতে তার লাঙল। মৃত্যুকাল উপস্থিত হলে তার দেখা পাওয়া যায়।”

“যত্তসব গাঁজাখুরি কথা।”

“হ্যাঁ, অাপনি ডাক্তার, বিজ্ঞান অাপনার কাছে ঐশ্বরিক। অাপনি তো গাঁজাখুরি বলবেনই। কিন্তু কিছুক্ষণের জন্য যদি বিশ্বাসও করে নেন যে এইসব গাঁজাখুরি সম্ভব, তাহলেও ভাবুন, কাজটা কত দুষ্কর। পৃথিবীর জনসংখ্যা দিন-দিন বেড়েই চলেছে, ফ্লেমিং-মশায়ের দৌলতে এ শতকে তো অারো বাড়ছে, এর পর অারো বাড়বে। দিন-দিন কত লোক মারা যাচ্ছেন বলুন তো। এবার ডেথ বা শমন যদি সত্যিই কেউ থাকে, তার পক্ষে তো সবদিক সামলানো অসম্ভব।”

“তাতে অার প্রবলেম কী?” পাইপে তামাক টিপতে টিপতে বললেন উমাপ্রসাদ ডাক্তার। “এই বঙ্গের ভার তো নাকি যমরাজের উপর, কাজ ভাগ-বাঁটোয়ারা করে নিলেই হয়।”

“অাপনার পাইপে তামাক টেপা দেখেই বলতে পারি, কি ভয়ানক অবিশ্বাস অাপনার। ভাগ-বাঁটোয়ারা করলেও কুলোতে পারবে না, বুঝলেন?”

দেশলাই জ্বালিয়ে তামাকে অাগুন দিয়ে বার-দুয়েক ফুঁ দিলেন উমাপ্রসাদ ডাক্তার। “অাপনার কাছে তো এর সলিউশন অাছে মনে হচ্ছে। সেটা কী শুনি।”

“পিক-অ্যান্ড-চুজ,” হেসে বললেন ভদ্রলোক। “বেটার যদি সে নিজেই অাপনাকে ডাকে। তাতে কাজ অারও সহজ হয়।”

ধোঁয়ার গোটা পাঁচেক রিং তেতলার ছাতের হাওয়ায় মিলিয়ে গেল।

“তো, ডাকলে অাসেন নাকি, ডেথ? হাতে লাঙল নিয়ে? অাত্মাটা কোথায় পুরে নিয়ে যান, জোব্বার হাতায়? জাদুকরদের মতো ট্রিক স্লিভে?”

ক্যামেরার রোলটা বারদুয়েক ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে দেখে ব্যাগে ঢুকিয়ে সশব্দে চেন টেনে ব্যাগটা কাঁধে নিলেন ভদ্রলোক। হেসে বিদায় নিলেন। বিকেলে অারেকটা সিটিং অাছে যে।
___________________

#সোঘো, রাত সাড়ে দশটা, ২২ আগস্ট, ২০১৬ সাল, তিলোত্তমা।

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s