— কী হল? এত ফুর্তি কীসের?
— চ’, সিনেমা দেখে আসি।
— সিনেমা দেখবি?
— হ্যাঁ গো। ভাল সিনেমা এসেছে হলে।
— সিনেমাটা কী আগে বলবি তো।
— উঁহু, ওটা সার্প্রাইজ।
— কী জ্বালা। জুলপি-কার নয় তো? তাহলে টেনে তোর জুলপিই উপড়ে ফেলবো।
— আমার জুলপি নেই-এই-নেই-এই-নেই-এই…
— চুল তো আছে…
— এই এই এই, ছাড়ো ছাড়ো ওরেবাবা মরে গেলুম মায়ায়ায়া…
— এই, আস্তে, মা রেওয়াজ করছে। নো ডিস্টার্ব।
— তাহলে চুল ছাড়ো।
— ছাড়বো। তার আগে বল কী সিনেমা।
— জুলফিকর নয়, জুলফিকর নয়, চুলের দিব্যি।
— হুম, গুড। ঠিক আছে, চল, সিনেমা দেখাই তোকে আজ।
— দেখাবে? দিদিইইইইই…
— আচ্ছা ছাড় ছাড়…
— ইউ আর দি বেস্ট দিদি।
— হুঁ। জানি। বাট, দেয়ার ইজ আ বাট।
— এই রে, কী গো?
— আমি অনেকদিন হলে যাইনি।
— তা আর বলতে।
— সুতরাং, প্রশ্ন হল, সিনেমা চলার আগে কি হলে জনগণমন বাজে?
— সেরেছে। তা তো শুনিনি।
— কেননা অন্যান্য শহরে বাজে।
— এটা শুনেছি বটে। অন্য শহরে চালায় বটে, কিন্তু কলকাতায় বোধহয় না।
— জাতীয় সঙ্গীত বাজালে উঠে দাঁড়াস?
— অবশ্যই।
— সবসময়ে?
— মানে সম্ভব হলে নিশ্চয়ই।
— আর সম্ভব না হলে?
— তখন আর কী করা যাবে। কিন্তু সম্ভব হবে নাই বা কেন?
— ধর, তুই একটা ঘড়ি সারাই করছিস। পুরনো দম দেওয়া ঘড়ি, খুব সূক্ষ্ম যন্ত্রপাতি, তুই চোখে ম্যাগ্নিফাইং গ্লাস এঁটে খুব মন দিয়ে গীয়ার স্প্রিং ইত্যাদি নাড়াচাড়া করছিস। হাতে সোন্না, ফরসেপ, একটু এদিক থেকে ওদিক হলেই গেল, ঘড়িটার লিটারেলি বারোটা বাজবে।
— না এরকম সিচুয়েশান হলে…
— বা ধর, তুই ফাইটার পাইলট…
— দিদি সত্যি? কতদিন আমার প্লেন চালানোর শখ।
— উফফ, প্লেন পরে চালাবি, কথাটা শোন। তুই ফাইটার পাইলট, ককপিটে বসে, এমন সময়ে রেডিওতে জনগণমন বাজলো, উঠে দাঁড়াতে পারবি?
— তা কী করে পারবো? মাথায় ককপিটের কাঁচ লাগবে তো। উঠেই দাঁড়াতে পারবো না।
— বা ধর আমি, তুই আর মা আজ সিনেমায় গেলাম, আর হঠাৎ সিনেমা শুরু হওয়ার আগে ন্যাশেনাল অ্যান্থেম বাজালো, আমি আর তুই দাঁড়িয়ে পড়লাম।
— কিন্তু মা তো…
— মা দাঁড়াতে পারবে না।
— কিন্তু সেটা তো…মানে এটা তো আন্ডারস্টুড। যারা হুইলচেয়ারে আটক তাঁরা…
— কি কম পেট্রিয়টিক? দেশকে কি তারা কম ভালবাসে? মা’র অ্যাক্সিডেন্টটা না হলে…
— দিদি!
— সরি। সরি রে।
— কথাটা তুমি একদম ঠিক বলেছো। জাতীয় সঙ্গীত বাজলে আমরা উঠে দাঁড়াই কারণ এইভাবে আমরা আমাদের দেশের প্রতি শ্রদ্ধা জানাই। কিন্তু না উঠে দাঁড়ানো মানে এই নয় যে শ্রদ্ধা কম। হয়তো কোন কারণে সে দাঁড়াচ্ছে না। হয়তো সে নিরুপায়।
— ঠিক যেমন গোয়ার সলিল চতুর্বেদী।
— সলিল চতুর্বেদী?
— বাবা ভারতীয় বায়ুসেনাতে ছিলেন। সলিল নিজে অস্ট্রেলিয়ান ওপেনে হুইলচেয়ার টেনিসে ভারতের প্রতিনিধিত্ব করেছেন।
— উনি কি কোন দুর্ঘটনায় পা-দুটি হারিয়েছেন?
— না, উনি কোনভাবে মেরুদন্ডে চোট পেয়েছিলেন। স্পাইনাল ইঞ্জুরি। তাই হুইলচেয়ার। দিনকয়েক আগে সিনেমা দেখতে পানাজির একটা মাল্টিপ্লেক্সে গিছলেন। সিনেমা চালু হয়নি তখনো, জাতীয় সঙ্গীত বাজছে, সলিল হুইলচেয়ারে বসে আছেন। সলিলের পিছনে এক দম্পতি জনগণমন গাইছেন। এমন সময় হঠাৎ সলিল জোর আঘাত পেলেন। ঘুরে দেখলেন, পুরুষটি তাঁকে মেরেছে, হয়তো আবার মারতে উদ্যত। আর মহিলা চ্যাঁচাচ্ছেন, বসে কেন, উঠে দাঁড়া।
— কী বলছো গো।
— অ্যান্থেম শেষে সলিল ঘুরে তাদের বলেন, আপনারা শান্ত হোন। আমি কেন উঠে দাঁড়াচ্ছি না আপনারা বুঝবেন না।
— তাতে থামলো?
— তারপরেও খানিকক্ষণ চোটপাট করে তারা বুঝতে পারে, সলিল হুইলচেয়ারে আটক। চাইলেও উঠে দাঁড়ানো তাঁর পক্ষে সম্ভব নয়।
— তখন? ক্ষমা চায়?
— আর ক্ষমা! চোঁ-চাঁ পালায়, যদি পুলিশ কেস হয়ে যায়। সলিল পুলিশে নালিশ করলেই তো হয়ে গেল।
— রণে ভঙ্গ দিয়ে পালালো? বলিহারি সাহস! এরাই ন্যাশেনালিস্ট? সীমান্তে সৈন্যদের নিয়ে নাচানাচি করে, নিজেরা একবার সিয়াচেনে গিয়ে দাঁড়াক তো। হিসি বরফ হয়ে যাবে।
— বাড়িতে এ ভাষা নয় পুলি। ইউ আর বেটার দ্যান দ্যাট। আর মা শুনতে পেলে…
— কিন্তু তা বলে এরকম গা-জোয়ারি? কী ভেবেছেটা কী, অ্যাঁ? দেশটাকে কিনে রেখেছে? দেশকে ভালবাসা কি তাদের পেটেন্টেড মাল? হাফপ্যান্টের তলায় চাড…
— পুলি!
— বুঝতেই তো পারছো, কী বলতে চাইছি।
— দেশকে ভালবাসা মানে যে কী জিনিস, সেটা যদি এদের কাছ থেকেই শিখতে হত, তাহলে বিদেশে গিয়ে থাকাই শ্রেয়। আমি পৃথিবী ঘুরেছি, কিন্তু দেশ সবার আগে। কিন্তু তা বলে সেনশিওর কেন? যে লোকের বাবা সেই একই সৈন্যদলের সারাজীবনের সদস্য, যে নিজে দেশের পতাকা হাতে বিদেশে গেছে, যে অত্যন্ত কঠিন পরিস্থিতির মুখে পড়েও দিনদিন স্ট্রাগল চালিয়ে যাচ্ছে, তাকেই যদি এরকম অবস্থার সন্মুখীন হতে হয়, তাহলে বৃথাই দেশপ্রেম। সব ঝুটা হ্যায়, সব ঝুটা হ্যায়, সব ঝুটা হ্যায়…
— দিদি।
— হুঁ?
— ও দিদি।
— কী? বল।
— চলো আমরা বাড়িতেই সিনেমা দেখি। আমি ডিভিডি আনছি, তুমি প্লেয়ারটা রেডি করো, আমরা তিনজনে মিলে দেখবো।
— তাই ভাল রে। মাও দেখতে পাবে। কোন সিনেমা দেখবি?
— হীরক রাজার দেশে দেখবো গো। কতদিন চরণদাসের গানটা শুনিনি…

(দুজনে) কতই রঙ্গ দেখি দুনিয়ায়, ও ভাই রে…


#সোঘো, রাত বারোটা বারো, বিশে অক্টোবর, ২০১৬ সাল, তিলোত্তমা।

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s