অাড্ডা
___________________

দাদা ছোটবেলায় খুব দুরন্ত ছিল। দুষ্টুমি তো করে বেড়াতোই, বোনেদের চুল ধরে টানা, গাঁট্টা মারা, এইসব লেগেই থাকতো। ইস্কুল থেকে ফিরে হাতমুখপা ধুয়ে মা’র তৈরি খাবার খেয়ে খেলতে যেত, ফিরে এসে পড়তে বসতো। বোনেরাও পড়তে বসতো। খানিক বাদেই ঝগড়া শুরু হতো, অার বোনেরা কাঁদতে কাঁদতে এসে মা’র কাছে নালিশ করতো। মা বললেন, দাঁড়া, পেন্তুর বন্দোবস্ত করছি।

বাবা কোর্ট থেকে ফিরে হাতমুখপা ধুয়ে একটু কিছু মুখে দিয়ে যেতেন বড়জ্যাঠামশাই অার ছোটজ্যাঠামশাইদের বাড়িতে। অাড্ডা দিতে। বাবার অাপন দাদা নন এরা, মামাতো দাদা। কালাচাঁদ চাটুজ্জ্যের ছেলে এরা। দুজনেই উকিল। কালাচাঁদ চাটুজ্জ্যেও নামকরা উকিল ছিলেন, মুনসেফ কোর্টে বসতেন। রোজ সন্ধ্যেবেলা এই তিন ভাইয়ের অাড্ডা না হলে এদের রাতে ঘুম হতো না।

একদিন বাবার অাসতে একটু দেরী হয়েছে। এসে তাড়াতাড়ি মুখ ধুয়ে খেতে বসেছেন, তাড়াহুড়ো করে কোনরকমে নাকেমুখে গুঁজে উঠে বেরোবেন। এদিকে মা খাবার বেড়ে দিতে দিতে ফিসফিসিয়ে বাবাকে বলে দিয়েছেন পেন্তুর কান্ডকারখানা। বাবা তো রেগে কাঁই, এক্ষুণি পেন্তুর পিঠে ছাতার বাঁট ভাঙবেন। মা বাবাকে শান্ত করে বললেন, পেন্তুকে অাড্ডায় নিয়ে গেলেই তো হয়। ঝামেলা মিটে গেলো। বাবাও বুঝলেন, বেশ সহজ সমাধান। ছাতাটাও বেঁচে যাবে।

দাদার তো ভীষণ মজা। বাবার হাত ধরে যাবে জ্যাঠামশাইদের বাড়ি। রিকশা তখনও ডায়মন্ড হারবারে অাসে নি, হেঁটে যাওয়া ছাড়া গতি নেই। দুজনে মিলে হাঁটা দিতেন। যেতে যেতে বাবা দাদাকে জিজ্ঞেস করতেন, ইংরিজিতে its অার it’s এর মধ্যে কী তফাত। দাদা বলতো, প্রথমটা হলে তার কিছু একটা অাছে। যেমন, Its home, ওটার বাড়ি। অার দ্বিতীয়টা শর্ট ফর্ম। It’s home, অর্থাৎ It is home, ওটা বাড়ি এসেছে। বাবা খুব খুশি হয়ে দাদার পিঠ চাপড়ে দিতেন।

খানিক বাদে দুজনেই জ্যাঠামশাইদের বাড়ি পৌঁছতেন। জ্যাঠারা তো দাদাকে দেখে মহা খুশি। বড় জ্যাঠামশাই বলতেন, এসো হে সুশীল, অামার এই ক্রসওয়ার্ডে এই শব্দটা অাটকে গেছে, দেখি তো বলতে পারো কি না। ছোট জ্যাঠামশাই দাদাকে অঙ্ক জিজ্ঞেস করতেন, বল দেখি সুশীল, একটা ত্রিভুজ অাছে। তার তিন কোণায় তিনটে পিঁপড়ে বসে। ধরো ত্রিভুজটার উত্তর দিকে একটা কোণ, অার পুব-পশ্চিম বরাবর তার বেসটা। উত্তরের পিঁপড়েটা তাকিয়ে অাছে পশ্চিমের দিকে, পশ্চিম পুবের দিকে, অার পুব উত্তরের দিকে। এবার তারা তিনজনেই চলতে শুরু করলো এমনভাবে যাতে যে যার দিকে তাকিয়ে অাছে তার দিকেই সোজা চলতে শুরু করলো। এবার বলো পিঁপড়ে তিনটে কোথায় গিয়ে মিলবে, অার কতক্ষণে। এই নিয়ে খুব জোর অালোচনা লেগে যেত। এদিকে জেঠিরাও দাদাকে পেয়ে মহাখুশি। ছোট জ্যাঠাইমা তো মুহূর্তের মধ্যে বারকোশে করে গরম গরম গোটা কুড়ি লুচি এনে ফেলবে। অার বড় জ্যাঠাইমা কাঁসার প্লেটভর্তি করে নন্দলালের মিষ্টি এনে দাদার নাকের সামনে ধরবে, হাতে কাঁসার জলের গেলাস। যতক্ষণ না প্লেট শেষ হচ্ছে নড়বে না।

দাদা অনেক পরে এই গল্প অামায় করেছিল। অামার নিজে মনে নেই, দাদার স্পষ্ট মনে অাছে। বাবার হাত ধরে জ্যাঠামশাইদের বাড়ি যাওয়া, পেট ভরে খাওয়া-দাওয়া, জমজমাট অাড্ডা খেলা অানন্দ। সন্ধ্যেগুলো যে কোথা থেকে কেটে যেত টেরই পাওয়া যেতো না। কিন্তু এইসব করে পড়াশুনোটা চুলোয় যেত।

দাদা ম্যাট্রিকে দারুণ রেজাল্ট করেছিল। অঙ্কে নিরানব্বুই পেয়েছিল। বিএ-তে ইংলিশে গোল্ড মেডেল পেয়েছিল।

দাদা এইসব গল্প করেছিল বিছানায় শুয়ে শুয়ে। ক্যানসার তখন লাস্ট স্টেজে।
___________________

[মিস মার্পেল অাগাথা ক্রিস্টির এক অবিস্মরণীয় সৃষ্টি। গল্পকার হিসাবে ক্রিস্টির বিশ্বখ্যাত। পঁচাত্তরটি ভাষায় তাঁর লেখা অনূদিত হয়েছে। পোয়ারো বা মার্পেল পড়েনি এমন লোক, অন্তত বাংলায়, পাওয়া ভার। কিন্তু অনেকেই জানেন না যে এই বঙ্গেই এক জলজ্যান্ত মিস মার্পেল অাছেন। দক্ষিণ চব্বিশ পরগণার ডায়মন্ড হারবার মহকুমায় তাঁর জন্ম। সেই জায়গায় উনি জীবনের পঁয়ষট্টি বছর কাটিয়েছেন। বহু অভিজ্ঞতায় ভরা জীবন, তার বেশিরভাগই ঘরোয়া। এই ছোট ছোট ঘটনা উনি নিজের ভাষায় যখন বলেন তখন মনে হয় চোখের সামনে রূপোলি পর্দা টেনে দিয়েছে কেউ, অার তাতে সিনেমার রীলের মতো ভেসে উঠছে এক ভুলে যাওয়া দিনের দিনলিপি। ডিটেকটিভ নন, কিন্তু পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা তুখোর, অার স্মৃতিশক্তি প্রখর। ওনার মুখে বলা কিছু ঘটনাকে সাজিয়ে ঘটিবাটীর পাঠকের কাছে পেশ করার দায়িত্ব অামি পেয়েছি ওনার বোনপোর কাছ থেকে। কতটা সফল হবো সেটা পাঠক ঠিক করবেন।]
___________________

#সোঘো, রাত দুটো ছত্রিশ, ২৪ অক্টোবর, ২০১৬ সাল, তিলোত্তমা।

#ঘটিবাটী

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s