মিষ্টির মিস্ট্রি
___________________

বাবার তখন কলকাতায় চাকরি। ডায়মন্ড হারবারে বদলি হয়ে অাসার অাগের ঘটনা। কালিঘাটে বাড়ি। সতুরা যেখানে থাকে, তার থেকে খুব বেশি দূরে না।

কালিঘাটে এই বাড়ির উল্টোদিকে, মানে রাস্তার ওপাশে, একটা মিষ্টির দোকান ছিল। কালিপদবাবুর দোকান। ধার্মিক লোক ছিলেন কালিবাবু। নিয়ম করে রোজ মন্দির যেতেন। কালিঘাটের কালিবাবুর কালিভক্তি অপার, একথা পাড়ায়-বেপাড়ায় প্রচুর শোনা যেত। লোক ভাল ছিলেন, কিন্তু ব্যবসার বুদ্ধিও ছিল, দোকানও ভালই চলতো। এই কালিবাবুর দোকান থেকেই বাবা মিষ্টি কিনতেন।

মিষ্টি খেতে বাবা যা ভালবাসতেন না, কী বলবো। গরম গরম ঘিয়ে ভাজা লুচির সঙ্গে ছানার জিলিপি না হলে ওনার চলতো না। বাড়িতে মা করতো বটে। ভীষণ ভাল লুচি বানাতে পারতো মা। তাতে ঘিয়ের স্বাদ পুরো থাকতো কিন্তু হাত ঠেকালে চ্যাপচ্যাপ করতো না। অাজকালকার ভেজাল মাল তো অার নয়। তখনকার জিনিসের কোয়ালিটিই অালাদা ছিল। কিন্তু রোজ রোজ তো অার লুচি হবে না, তাই বাবা যেতেন কালিবাবুর কাছে। কালি বলে ডাকতেন বাবা। গিয়ে দোকানের বেঞ্চিতে বসে গরম লুচি অার ছানার জিলিপি খেয়েদেয়ে জলটল খেয়েটেয়ে কালিবাবুর সঙ্গে কিছুক্ষণ দেশেরদশের অালোচনা-গল্পগুজব সেরে ফিরে অাসতেন। হাতে মেয়েদের জন্য–অার দাদার জন্যও–ঠিক মিষ্টির প্যাকেট থাকতো। মেয়েগুলোকে বড়ই ভালবাসতেন বাবা।

রোজকার মত একদিন বাবা গেছেন দোকানে মিষ্টি কিনতে। কালিবাবু ছিলেন না, বোধহয় মন্দিরেই গিছলেন। এক নতুন কর্মচারী ছিল, ছোকরা ছেলে। বাবা মিষ্টি নিয়ে দাম চুকিয়ে বেরিয়ে অাসবেন, হঠাৎ সে বলে, ব্যানার্জিবাবুর কিন্তু অারো টাকা বাকি অাছে। বাবা তো অবাক, বাকিতে তো উনি কখনো মিষ্টি কেনেন না। কীকরে হয়? নিশ্চয়ই কোন অন্য ব্যানার্জিবাবুর সঙ্গে ছেলেটা গুলিয়ে ফেলছে। নতুন তো। ছেলেটাও মানতে নারাজ। না, অাপনিই ব্যানার্জিবাবু, রাস্তার ওপারে থাকেন। এই দেখুন, খাতায় পষ্ট লেখা অাছে। বাবা দেখেন, তাই তো, এম ব্যানার্জির নামে প্রচুর টাকা বাকি। কী ব্যাপার?

রহস্য তুঙ্গে, এমন সময় কালিবাবু মা-কালির নাম জপতে জপতে দোকানে ঢুকলেন। বাবাকে দেখেই বললেন, কী, ব্যানার্জিবাবু, খবর ঠিকঠাক? বাবা তো সব খুলে বললেন। শুনেটুনে কালিবাবু খাতা না দেখেই বলেন, হ্যাঁ তো, অাপনার নামেই অাছে। বাবা তো হতবাক, সে কীকরে হয়। উনি তো সবসময় হিসাব চুকিয়েই যান।

এইসব চলছে, এমন সময় দেখা গেল, দোকানের সামনের কাঁচের কাউন্টারের ওপর দিয়ে একটা ছোট্ট হাত বেরিয়ে এসেছে, অার কচি গলায় কে বলছে, মিহিদানা দাও না গো কালিকাকু। গলাটা কেমন চেনা চেনা না? বাবা দোকানের ভিতরে ছিলেন, বাইরে থেকে দেখা যাচ্ছিল না তাঁকে, একটা থাম অাড়াল করছিল। বেরিয়ে এসে দেখেন, তাঁর মেজ মেয়ে দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে।

সব পরিষ্কার হলো। মেজদি রোজ কালিবাবুর দোকান থেকে এত এত মিষ্টি কিনে খেতো। টাকা তো ছিল না সঙ্গে, অত্তটুকু ছোট মেয়ে, টাকা থাকবে কীকরে। তাই বাবার নামে লিখিয়ে অাসতো। এতদিনে কত সের মিহিদানা-সীতাভোগ যে তার পেটে গেছে তার ইয়ত্তা নেই।

সব শুনেটুনে বাবা এতটাই হাঁ হয়ে গিছলেন যে মেয়েকে শাসন করার কথাও মনে ছিল না তাঁর। উল্টে সেদিন স্পেশ্যাল মিহিদানার ভাগ পেয়েছিল সক্কলে।

___________________
[মিস মার্পেল অাগাথা ক্রিস্টির এক অবিস্মরণীয় সৃষ্টি। গল্পকার হিসাবে ক্রিস্টির বিশ্বখ্যাত। পঁচাত্তরটি ভাষায় তাঁর লেখা অনূদিত হয়েছে। পোয়ারো বা মার্পেল পড়েনি এমন লোক, অন্তত বাংলায়, পাওয়া ভার। কিন্তু অনেকেই জানেন না যে এই বঙ্গেই এক জলজ্যান্ত মিস মার্পেল অাছেন। দক্ষিণ চব্বিশ পরগণার ডায়মন্ড হারবার মহকুমায় তাঁর জন্ম। সেই জায়গায় উনি জীবনের পঁয়ষট্টি বছর কাটিয়েছেন। বহু অভিজ্ঞতায় ভরা জীবন, তার বেশিরভাগই ঘরোয়া। এই ছোট ছোট ঘটনা উনি নিজের ভাষায় যখন বলেন তখন মনে হয় চোখের সামনে রূপোলি পর্দা টেনে দিয়েছে কেউ, অার তাতে সিনেমার রীলের মতো ভেসে উঠছে এক ভুলে যাওয়া দিনের দিনলিপি। ডিটেকটিভ নন, কিন্তু পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা তুখোর, অার স্মৃতিশক্তি প্রখর। ওনার মুখে বলা কিছু ঘটনাকে সাজিয়ে ঘটিবাটীর পাঠকের কাছে পেশ করার দায়িত্ব অামি পেয়েছি ওনার বোনপোর কাছ থেকে। কতটা সফল হবো সেটা পাঠক ঠিক করবেন।]

___________________

#সোঘো, দুপুর চারসোবিস, ২৪ অক্টোবর, ২০১৬ সাল, তিলোত্তমা।

#ঘটিবাটী

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s