ভূতচতুর্দশী
___________________

অাজ ভূতচতুর্দশী।

ডায়মন্ড হারবারে কালিপুজো প্রচুর হতো। প্রায় প্রত্যেক মাসেই একটা না একটা কালিপুজো লেগেই থাকতো। সবচেয়ে ঘটা করে পালন হতো অবিশ্যি কার্তিক অমাবস্যার কালিপুজো।

কালিপুজোর অাগের দিনটাও কিন্তু পালন করতাম অামরা। দিনটাকে ভূতচতুর্দশী বলা হতো। কেন জানি না। ছোটবেলায় শুনেছি দেবী চামুন্ডা নাকি চোদ্দ সাঙ্গপাঙ্গ নিয়ে দেশগ্রামনদীনালায় ঘুরে বেড়াতেন। কাঁচাখেকো অপদেবতা সবকটা, ভূত-পেত্নি-ডাইনি-শাঁকচুন্নি—কী নেই তাদের মধ্যে।

সেজদি, মেজদি, ন’দি, অামি প্রত্যকে মিলে ঘরের চারদিকে চোদ্দপ্রদীপ দিতাম। মাটির তৈরী তেলের প্রদীপ। তাতে সলতে পাকিয়ে লাগাতো অান্না। যখন একটু বড় হয়েছিল। তার অাগে ভার ছিল অামার উপর। সবচেয়ে ছোটদের উপরেই এই দায়িত্ব পড়তো।

মা এদিকে চোদ্দশাগ রাঁধবে। তার জন্য শাগ চাই। থাল্কুনশাগ অার হিংচেশাগ অামাদের পুকুরেই পাওয়া যেত। পুকুরের উত্তরপারে, নারকেল গাছের তলায় থাল্কুনশাগ হতো। গোলগোল, কিড়কিড়ি কিড়কিড়ি চারপাশটা। অামি তুলে অানতুম, তারপর বেটে দাদাকে খাওয়ানো হত। অামরাও খেতুম।

হিংচেশাগ হতো পুকুরের পুবদিকটা। রোজ ভোরবেলা ওই কেটকিবনের দিক থেকে মানুষ এসে একেবারে বোঝা বোঝা কেটে নিয়ে বস্তায় পুরে স্টেশন থেকে ট্রেন ধরে সোজা কলকাতা। সেখান থেকে বাজার। বাজারে বিক্রী প্রচুর হতো। হাজার হোক, একেবারে সদ্য তোলা তো। অার পুকুরের মাটিও খুব ভাল ছিল। সে শাগের স্বাদই অালাদা ছিল।

অামাদের জন্য? সে কোন ব্যাপারই না। ঝুড়ি-ঝুড়ি রোজ হত, যা কেটে নিয়ে যেতো তার ডবল ফলে যেতো দিন শেষ হতে না হতে। ওদের কিছু বলতাম কিনা? যারা কেটে নিয়ে যেতো? কী অার বলবো? গরীব মানুষ, শাগ বেচে যা একটু পয়সা পায়। থাক।

সকাল থেকেই অামাদের বোনেদের কাজ হতো পুকুরপার, কাচারীর পুকুর, মাঠ, কেটকিবন এইসব জায়গায় ছড়িয়ে গিয়ে শাগ যোগাড় করা। মা রান্না করবে। অামি খুব ভাল শাগ চিনতুম। দিদিরাও খুব ভাল চিনতো, কিন্তু অামার মতো নয়। লাউশাগ, কুমড়োশাগ, হিংচেশাগ, থাল্কুনশাগ, মেটেশাগ, ছাঁচিশাগ, লালনটে, শাদানটে, চাঁপানটে, ধনেশাগ, মৌরিশাগ, উচ্ছেশাগ, অালুশাগ, কলমীশাগ, কচুশাগ, মুলোশাগ অার অমৃতমানের পাতা। কটা হল? এর মধ্যে থেকেই চোদ্দ শাগ রান্না হতো। মা করতো। মা’র রান্নার হাত…অত ভাল রান্নার হাত অামরা বোনেরা কেউ পাইনি। হয়তো দুএক ছটাক কেউ কেউ পেয়েছে। তার বেশি নয়।

অান্না হয়তো পেতো হাতটা। সলতে পাকাতে খুব ভালই পারতো। রান্নাতেও যখন মা’কে দিদিদের সাহায্য করতো তখন বোঝা যেত, হাতে যাদু অাছে। র যাদু। তাকে ঘষামাজা করতে পারলে জুয়েল হতো।

যাগ্গে। যা অার হবার নয় তা নিয়ে ভেবে লাভ নেই।

___________________

[মিস মার্পেল অাগাথা ক্রিস্টির এক অবিস্মরণীয় সৃষ্টি। গল্পকার হিসাবে ক্রিস্টির বিশ্বখ্যাত। পঁচাত্তরটি ভাষায় তাঁর লেখা অনূদিত হয়েছে। পোয়ারো বা মার্পেল পড়েনি এমন লোক, অন্তত বাংলায়, পাওয়া ভার। কিন্তু অনেকেই জানেন না যে এই বঙ্গেই এক জলজ্যান্ত মিস মার্পেল অাছেন। দক্ষিণ চব্বিশ পরগণার ডায়মন্ড হারবার মহকুমায় তাঁর জন্ম। সেই জায়গায় উনি জীবনের পঁয়ষট্টি বছর কাটিয়েছেন। বহু অভিজ্ঞতায় ভরা জীবন, তার বেশিরভাগই ঘরোয়া। এই ছোট ছোট ঘটনা উনি নিজের ভাষায় যখন বলেন তখন মনে হয় চোখের সামনে রূপোলি পর্দা টেনে দিয়েছে কেউ, অার তাতে সিনেমার রীলের মতো ভেসে উঠছে এক ভুলে যাওয়া দিনের দিনলিপি। ডিটেকটিভ নন, কিন্তু পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা তুখোর, অার স্মৃতিশক্তি প্রখর। ওনার মুখে বলা কিছু ঘটনাকে সাজিয়ে ঘটিবাটীর পাঠকের কাছে পেশ করার দায়িত্ব অামি পেয়েছি ওনার বোনপোর কাছ থেকে। কতটা সফল হবো সেটা পাঠক ঠিক করবেন।]
___________________

#সোঘো, দুপুর একটা পঁচিশ, ২৮ অক্টোবর, ২০১৬ সাল, তিলোত্তমা।

#ঘটিবাটী

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s