নাউ অার লাউ
___________________

নাউ বলে মা’র একটা বেড়ালবাচ্ছা ছিল। ভালমন্দ খেয়ে বড় হচ্ছিল। কী স্বাস্থ্য! অার কী গায়ের রঙ! অার খাবারের ব্যাপারেও খুঁতখুঁতামি ছিল। খইমুড়িচিঁড়ে তো একেবারেই খাবে না। মা’র খুব প্রিয় ছিল। ইঁদুর মারতে বললেই নাউবাবাজির গায়ে জ্বর অার ল্যাজে পেটকামড়ানি শুরু হয়ে যেতো।

সেজদির তখন বিয়ে হয়ে গেছে। জ্যাঁয়ুর সঙ্গে অাগ্রায় থাকে। মাঝে মাঝে ডায়মন্ড হারবারে অাসে। এমনই এক কালিপুজোয় এসেছে। ওখানে তো দিওয়ালি, জ্যাঁয়ু ছুটি পেয়েছে।

সেজদি এলেই তো হাতমুখপাধুয়ে সোজা রান্নাঘরে। মা থাকলে মা’র সঙ্গে বকবক, অার নয়তো অামায় ডেকে গপ্পোসপ্পো। রান্নায় সেজদির হাত সোনা। মা’র মতন না হলেও।

এরকম একদিন সেজদি গিয়ে রান্নাঘরের উত্তরদিকের জানলার সামনে দাঁড়িয়ে অাছে। কী ভাবছে ওই জানে। হঠাৎ দেখে, জানলার বাইরে সেপটিক ট্যাঙ্কের ওপারে একটা ছোট্ট লাউচারা।

লাউ! অার যায় কোথায়। অামায় ডেকে অান্নাকে ডেকে সেজদি চললো লাউচারা দেখতে। বেশ পুরুষ্টু চারা। খুপড়ি নিয়ে অাসা হয়েছিল, লাউচারাকে মাটিশেকড়সুদ্ধু তুলে নিয়ে এসে সোজা উঠোনের কোনায় মাটিতে পুঁতে ফেলা হল। সেপটিক ট্যাঙ্কের ওধারে কারুর জমি নয়। তাই নিতে বাধাও নেই।

সেজদি বললো, কঞ্চি অাছে? বাঁশের গায়ে থাকে না, কঞ্চি? সেই। ভাঁড়ার ঘরে সবসময় মজুত থাকতো। নিয়ে এলুম। সেজদি বললো, কঞ্চি লাগিয়ে দে, বেয়ে বেয়ে উঠুক। দিলুম লাগিয়ে। দিদি কয়েকদিন বাদে অাগ্রা ফিরে গেল। লাউগাছও বড় হতে লাগলো।

বাপরে, তার কী বাড়-বাড়ন্ত। সেই কঞ্চি বেয়ে লতলতিয়ে উঠে উঠোনের মাচাটার উপর দিয়ে পাঁচিলের মাথা বেয়ে একেবারে গিয়ে পৌঁছল বাথরুমের উপরে সিমেন্টের চাতালটায়। সেখানে তাকে অার পায় কে? হুড়মুড় করে বাড়তে বাড়তে লাউ হতে লাগলো।

লাউ হবি তো হ, এদিকে ইঁদুরের অত্যাচারও বেড়েছে। তারা কোন খোঁদল থেকে যে কখন বেরিয়ে লাউ খেয়ে দাঁত বসিয়ে পালাতো তার ইয়ত্তা নেই। কী করা যায়? নাউকে দিয়ে লাভ নেই। সে বসে বসে লেজ থেকে মাছি তাড়াচ্ছে। মানে তাড়ানোর চেষ্টা করছে। লেজটাকে যে দোলানো যায়, এবং তাতে যে মাছিরাও উড়ে যায়, সে মাথাটা তার বারাসাতে সীতাভোগ খেতে গেছে।

মনে মনে ঠিক করলাম, এর একটা বিহিত দরকার। একদিন বিকেলে বাজার চলে গেলুম, সোজা মনোদার দোকানে। মনোদাকে ব্যাপারটা খুলে বললুম। মনোদা মন দিয়ে শুনলো। তারপর বললো, কতবড় লাউ। অামি বললুম, অ্যাত্তবড়। মনোদা বললো, ঠিক অাছে, এই নে জাঁতিকল, ধর ইঁদুরটাকে। টাকা? টাকা নিয়ে চিন্তা করিস না। লাউয়ের খেয়াল রাখাটাও অামার ধার্মিক কর্তব্যের মধ্যে পড়ছে। বলছি কি, মাসিমা সেই লাউচিংড়িটা ঠিক কবে…?

জাঁতিকলটাকে তো চাতালের উপর নামিয়ে বসাতে হবে। তখন কম বয়স, জোয়ান, এসবের তোয়াক্কা করি নাকি? পানু দাঁড়ালো উপরে, পিছনের ছাতের কার্নিশ ধরে। জাঁতিকলটা ঠিক সময়ে নামিয়ে দেবে। অামি কার্নিশ বেয়ে নেমে পড়লাম চাতালে। তখন এত এখনকার মতন পিচের চট ছিল না। খালি সিমেন্ট। তার উপর লাউবন। তারই মাঝখানে জাঁতিকলটাকে সেট করে দিলাম। ন্যাকরার মধ্যে মুড়ি বেঁধে জাঁতিকলটা মাঝখানে রেখে দিলাম। সেই মুড়ির লোভে ইঁদুর এসে খেতে গেলেই খট্টাং। ইঁদুরবাবাজী ফাঁদে ধরা পড়বেন।

এসব করেটরে অামি তো অাবার কার্নিশ বেয়ে ছাতে উঠে এসেছি। অামি গেছি রান্নাঘরে, পানু গেছে দোতলায় পড়তে। এমন সময় শব্দ শুনি, কট্টাস! কী ব্যাপার কী ব্যাপার? এই ভরদুপুরে ইঁদুর এসেছিল খেতে? ভারি বোকা ইঁদুর তো।

কিন্তু সঙ্গে অাঁউঅাঁউ অাঁউঅাঁউ কান্না কেন? এ গলা তো অামাদের চেনা। অামি বলি, কীরে! লাফিয়ে উঠলাম। দুদ্দাড় শব্দে উপরে উঠে গেলুম। দেখি পানু পিছনের ছাতের খিলটা খুলছে। শব্দটা ও-ও পেয়েছে। অামি এক ছুট্টে দরজায় পৌঁছে গেলুম। ততক্ষণে পানুও দরজাটা একটানে হাট করে খুলে ফেলে ছাতে বেরিয়ে গেছে, অামি ঠিক ওর পিছন পিছন। কার্নিশ অবধি গিয়ে দেখি সে কার্নিশ টপকাতে যাচ্ছে। অামি এক বকুনি দিয়ে ওকে থামালাম। বাচ্ছা মেয়ে, পড়াশুনো ছাড়া কিছু বোঝে না, ডানপিটেমো করতে গিয়ে হাত ভাঙলে মা অামাকে বকবে দাদা পেটাবে।

কার্নিশে পৌঁছে একলাফে ভল্ট খেয়ে ছাতালে গিয়ে পড়লাম। একেবারে এক হাঁটু গেড়ে উবু হয়ে এক হাতের উপর ভর দিয়ে অন্য হাতটা অাকাশের দিকে…তোরা যাকে পোজ বলিস।*

চাতালে নেমে দেখি, জাঁতিকলে হাত অাটকে বসে অাছে সে। সে মানে কে? কে অাবার? মিস নাউ! জাঁতিকলের মধ্যে ন্যাকড়ায় বেঁধে মুড়ি রাখছি যখন, সে সঙ্গে ছিল। ব্যাপারস্যাপার দেখে রেখেছিল, সুযোগ বুঝে মুড়ির থলির দিকে হাত বাড়িয়েছে। অার পায় কে? কটাস!

জাঁতিকলটাকে খুলে ওর হাত ছাড়িয়ে হাতটাকে ম্যাসাজ করে দিলুম। সেও খানিকক্ষণ অ্যাঁওঅ্যাঁও করে নালিশ জানালো। অামি বললুম, সেকিরে, তুই মুড়ির দিকে নোলা বাড়াবি তা অামরা কীকরে জানবো? দেখি, অ্যাঁওঅ্যাঁওটা কেমন ধীমে হয়ে গেল, অার কেমনজানি কুঁইকুঁই গোছের শোনাতে লাগলো। মালিশটালিশ শেষ করে নামিয়ে দিলুম মহারানীকে। সেও হাতটা চাটতে চাটতে চলে গেল। অামরাও অার জাঁতিকল বসানোর সাহস পেলুম না।

খানিক বাদে দেখি, সেই যে মুড়িটা ছিল, সেটার সঙ্গে একপিস সদ্যভাজা মাছ মেখে মা খেতে দিয়েছে, অার নাউবাবাজি বেশ তারিয়ে তারিয়ে খাচ্ছেন।

*সোঘোর নোট : এটাকে থ্রী-পয়েন্ট ল্যান্ডিং করে সুপারহিরো স্টান্স নেওয়া বলে।

___________________

[মিস মার্পেল অাগাথা ক্রিস্টির এক অবিস্মরণীয় সৃষ্টি। গল্পকার হিসাবে ক্রিস্টির বিশ্বখ্যাত। পঁচাত্তরটি ভাষায় তাঁর লেখা অনূদিত হয়েছে। পোয়ারো বা মার্পেল পড়েনি এমন লোক, অন্তত বাংলায়, পাওয়া ভার। কিন্তু অনেকেই জানেন না যে এই বঙ্গেই এক জলজ্যান্ত মিস মার্পেল অাছেন। দক্ষিণ চব্বিশ পরগণার ডায়মন্ড হারবার মহকুমায় তাঁর জন্ম। সেই জায়গায় উনি জীবনের পঁয়ষট্টি বছর কাটিয়েছেন। বহু অভিজ্ঞতায় ভরা জীবন, তার বেশিরভাগই ঘরোয়া। এই ছোট ছোট ঘটনা উনি নিজের ভাষায় যখন বলেন তখন মনে হয় চোখের সামনে রূপোলি পর্দা টেনে দিয়েছে কেউ, অার তাতে সিনেমার রীলের মতো ভেসে উঠছে এক ভুলে যাওয়া দিনের দিনলিপি। ডিটেকটিভ নন, কিন্তু পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা তুখোর, অার স্মৃতিশক্তি প্রখর। ওনার মুখে বলা কিছু ঘটনাকে সাজিয়ে ঘটিবাটীর পাঠকের কাছে পেশ করার দায়িত্ব অামি পেয়েছি ওনার বোনপোর কাছ থেকে। কতটা সফল হবো সেটা পাঠক ঠিক করবেন।]
___________________

#সোঘো, দুপুর দুটোবেয়াল্লিশ, ২৮ অক্টোবর, ২০১৬ সাল, তিলোত্তমা।

#ঘটিবাটী

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s