মঞ্জিতার বাবা
___________________

শিবালয়টা প্রতাপবাবুর বানানো।

প্রতাপবাবু, প্রতাপবাবুর ভাই পাদুসবাবু, বউ, ছেলে প্রত্যেকে খুব শিবভক্ত ছিলেন। । প্রতাপবাবু ডায়মন্ড হারবার কোর্টে উকিল ছিলেন। দুঁদে উকিল। প্রচুর টাকার মালিক। যেমন টাকা কামিয়েছেন বিলিয়েছেনও তেমন। হাত খুলে। শিবরাত্রির রাতে প্রতাপবাবু অার পাদুসবাবু পঞ্চাশটা শাড়ি বিলোতেন। বাবার সঙ্গে প্রতাপবাবু বিশেষ অালাপ সখ্যতা ছিল। সোনা তাই ফি বছর মা’র কাছে এসে কাকুতি করতো, ও ছোম্মা, বড়বাবুকে বলো না গো, একটা শাড়ি…

প্রতাপবাবু তিন ছেলে। থান্ডুদা সবার বড়, তারপর ঝন্টুদা, তারপর রন্টুদা। প্রথমজন বড় জজ হয়েছিল, মেজ অার ছোট ভাই তাদের বাবার মতোই বড় উকিল। প্রচুর পসার। প্রতাপবাবুর স্ত্রীর চোখে মোটা কালো ফ্রেমের চশমা, প্রখর বুদ্ধিমতী, ডিগ্নিফায়েড চেহারা। ডায়মন্ড হারবারে সবাই এদের চিনতো।

শিবালয়তে রোজ সকাল থেকে পুজো হতো। প্রচুর লোক অাসতো, পুরুত পুজো করতো, ভোগ দিতো। রাত ন’টা বেজে গেলে অার বাইরের লোককে ঢুকতে দেওয়া হতো না। দেখা যেত প্রতাপবাবু, প্রতাপবাবু ভাই স্ত্রী ছেলেরাবউরা মিলে শিবালয়তে ঢুকছে পুজো দিতে।

থান্ডুদার বউ পাগল ছিল। নিজের মনে একজায়গায় বসে থেকে খালি দুলতো, কী যেন বলতো নিজের মনে মনে, খিলখিল করে হাসতো। ডাক্তার দেখানো হয়েছিল, কোন ফল হয়নি। থান্ডুদা স্ত্রীকে চিরকাল সেবা করে গেছে। দ্বিতীয় বিয়ের কথা মুখেও কোনদিন অানেনি।

রন্টুদার বিয়ের সময়ে একটা ঘটনা ঘটেছিল। মেয়ে দেখার সময় তিন ভাই, প্রতাপবাবু, প্রতাপবাবু স্ত্রী সকলেই গিছলেন। মেয়ে পছন্দ হয়েছে; গুণবতী, শিক্ষিত, ব্যবহারে সুন্দর। কথাবার্তা শেষ, বিযের দিনক্ষণ ঠিকঠাক করে বরপক্ষ উঠে চলে গেল। এদিকে কনেপক্ষ পড়লো ফাঁপরে। একটা জরুরি কথা তো সারা হল না।

বিয়ের পিঁড়িতে রন্টুদা বসেছে। কনেকেও পানপাতায় মুখ ঢেকে পাশে বসানো হয়েছে। এমন সময় মেয়ের বাবা প্রতাপবাবুকে বললেন, ইয়ে, মানে, ফলতায় একফালি জমি ছিল। সেটা বেচে কিছু টাকা হাতে এসেছে। অার ওর মায়ের কিছু গয়না। প্রতাপবাবু ঠান্ডা গলায় জিজ্ঞেস করলেন, কীসের জন্য, বিয়ের পণ? অাপনি অামায় ডাউরি দিচ্ছেন? মেয়ের বাবা কাঁচুমাচু, বললেন, এর বেশি ক্ষমতা অামার নেই। প্রতাপবাবু একবার ছেলের দিকে, তারপর হবু ছেলের বউয়ের দিকে একবার চেয়ে বললেন, বেয়াইমশাই, অামি ছেলের বিয়ে দিচ্ছি, বাজারে বেচচি না। ও উকিল, নিজের যা অায় অাছে, তা দিয়ে বউমাকে চিরকাল খাইয়ে-পরিয়ে রেখে মাথার উপর ছাতের বন্দোবস্ত করতে যে পারবে, সে সম্বন্ধে অামার বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই। অাপনি দয়া করে এই কথা অার তুলবেন না।

বলাই বাহুল্য, বিয়েটা খুব অানন্দ করেই হল। রন্টুদার বিয়ে হয় পঁয়তাল্লিশ সালে। মানে ইংরিজি অাটতিরিশ সালে। তার মানে অাজ থেকে প্রায় অাটাত্তর বছর অাগে এই ঘটনা ঘটেছিল।

প্রতাপবাবু তিন ছেলে। এক মেয়েও ছিল। নাম ছিল মঞ্জিতা। প্রতাপবাবু মেয়েকে সবচেয়ে বেশি ভালবাসতে। মেয়েটি যেমন স্বভাবে সুন্দর তেমন বুদ্ধিতে প্রখর। বাবা-মায়ের দুজনের দিকটাই পেয়েছিল। বারো বছর বয়সে সাপের কামড়ে মারা যায়। তখনকার দিনে তো এত সাপের বিষের ওষুধ বেরোয়নি। প্রতাপবাবু পাগলের মতো হয়ে যান। কিছুকাল পরে উদ্বাস্তু মুসলমানরা ডায়মন্ড হারবারে এলে তিনি তাদের থাকার ব্যবস্থা করে দেন। একটা পুরো পাড়া গজিয়ে ওঠে ওনার দেওয়া জমিবাড়ি ঘরদোর থেকে। তার নাম হয় মঞ্জিতার পাড়া। প্রতাপবাবুদের ডায়মন্ড হারবারের কারুরই তেমন অাজকাল অার মনে নেই। কিন্তু মঞ্জিতার নাম কেউ কখনো ভুলবে না।
___________________

[মিস মার্পেল অাগাথা ক্রিস্টির এক অবিস্মরণীয় সৃষ্টি। গল্পকার হিসাবে ক্রিস্টি বিশ্বখ্যাত। পঁচাত্তরটি ভাষায় তাঁর লেখা অনুদিত হয়েছে। পোয়ারো বা মার্পেল পড়েনি এমন লোক, অন্তত বাংলায়, পাওয়া ভার। কিন্তু অনেকেই জানেন না যে এই বঙ্গেই এক জলজ্যান্ত মিস মার্পেল অাছেন। দক্ষিণ চব্বিশ পরগণার ডায়মন্ড হারবার মহকুমায় তাঁর জন্ম। সেই জায়গাতেই উনি জীবনের পঁয়ষট্টি বছর কাটিয়েছেন। বহু অভিজ্ঞতায় ভরা জীবন, তার বেশিরভাগই ঘরোয়া। এই ছোট ছোট ঘটনা উনি নিজের ভাষায় যখন বলেন তখন মনে হয় চোখের সামনে রূপোলি পর্দা টেনে দিয়েছে কেউ, অার তাতে সিনেমার রীলের মতো ভেসে উঠছে এক ভুলে যাওয়া দিনের দিনলিপি। ডিটেকটিভ নন, কিন্তু পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা তুখোর, অার স্মৃতিশক্তি প্রখর। ওনার মুখে বলা কিছু ঘটনাকে সাজিয়ে ঘটিবাটীর পাঠকের কাছে পেশ করার দায়িত্ব অামি পেয়েছি ওনার বোনপোর কাছ থেকে। কতটা সফল হবো সেটা পাঠক ঠিক করবেন।]
___________________

#সোঘো, বিকেল চারসোবিস, ২৯ অক্টোবর, ২০১৬ সাল, তিলোত্তমা।

#ঘটিবাটী

Advertisements

2 thoughts on “মিস মার্পেলের মেমোয়ার : সাত

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s