অাসামী
___________________

মেজদির পাশের বাড়ির গৌরী অামার বিয়ের সম্বন্ধ এনেছিল।

ছেলেটার মা নেই বাবা নেই। এক দিদি। দিদির বাড়িতেই থাকে। লাইফ ইন্শোরেন্সে চাকরী করে। ভাল চাকরী। খুব লম্বা নয়। অামাদের ভাড়াটে ছিল গৌর। ওই টাইপটা।

মেয়ে দেখতে এসেছে দিদি-ভাই মিলে। মা অাছে সেখানে, মেজদিও অাছে, গৌরীও অাছে, কলকাতা থেকে দুজনে ট্রেনে করে অালাদা চলে এসেছে। কথাবার্তা হচ্ছে। ছেলের দিদি মা’র সঙ্গে রান্না নিয়ে দারুণ অাড্ডা মারছেন। মেজদি ছেলেকে জিজ্ঞেস করলো, বাবা, তুমি কিছু খাবে না? কী খেতে ভালবাসো? সে উত্তর দেওয়ার অাগেই তার দিদি বলে উঠলো, ও খুব লুচি খেতে ভালবাসে। মা’ও খুব খুশি। বললেন বাবু—মানে বাবা—খুব লুচি খেতে ভালবাসতেন। মেজদি অামার দিকে দেখিয়ে বললো, এর মতো লুচি করতে কেউ পারে না। এই রমু, যা তো, গরমগরম কয়েকটা লুচি করে অান তো।

লুচি করতে কি অার অামার সময় লাগে? চটপট একথালা লুচি বানিয়ে দিলুম। কুমড়োর ছেঁচকি অার অালুভাজা দিয়ে সেও দেখলাম তারিয়ে তারিয়ে খেলো। খেয়েটেয়ে অাঙুল চাটতে গিয়েও চাটলো না। তারপর লাজুকভাবে অামার দিকে সোজা তাকিয়ে বললো, অার দুটো লুচি হবে?

তিনদিন বাদে মেজদি টেলিগ্রাম করে জানালো, মেয়ে পছন্দ হয়েছে।

দাদার কাছে খবর গেল। দাদা রাজস্থান থেকে টাকা পাঠিয়ে দিল, তা দিয়ে মেজদি কলকাতা থেকে গলায় পরার সোনার চেন কিনলো, তা দিয়ে ছেলের অাশির্বাদ হয়ে গেল। দাদা রাজস্থান থেকে চলে এলো। সেজদির কাছেও চিঠি গেল। সেজদিও চলে এলো। বিয়ের দিনক্ষণ ঠিক করতে হবে তো। দাদা সোজা কলকাতায় মেজদির বাড়ি গেল। মেজদির বাড়ির পাশে গৌরীরা থাকে। দাদা ইচ্ছে, গৌরীকে সঙ্গে নিয়ে যাবে বরপক্ষের সঙ্গে দেখা করতে।

গৌরীদের বাড়িতে গেছে দাদা। গৌরীর মা দাদাকে যত্ন করে বসিয়েছে, জলমিষ্টি দিয়েছে। গৌরী কোথায়? গৌরী বাজার গেছে। এক্ষুণি অাসবে। দাদা অপেক্ষা করতে লাগলো।

খটখটে রোদ ছিল। হঠাৎ মেঘ করে এসে ঝমঝম বৃষ্টি। মুষলধারে। তার যেন শেষ নেই। গৌরীর দেখা নেই। গেল কোথায় মেয়েটা? গৌরীর মা খুব চিন্তিত হয়ে বললেন, বাবা, মেয়েটা কোথায় গেল একটু দেখো না। দাদা দরজার পাশে ঝোলানো ছাতাটা নিয়ে বেরোতে যাবে, হঠাৎ দরজার কড়া নাড়ার শব্দ। খিল খুলে দরজা খুলতে দেখে, গৌরী! বৃষ্টিতে ভিজে গোবর, মাথার চুল থেকে পায়ের নখ অবধি জল গড়াচ্ছে। দাদাকে দেখেই ভূত দেখার মতো চমকে উঠলো। সোজা দাদার পায়ে পড়লো।

দাদা তো হতবাক। কোনোক্রমে তাকে ধরে দাঁড় করাতে সে হাউহাউ করে কেঁদে পড়লো। সে কান্না অার থামে না। খালি বলে, দাদা অামায় ক্ষমা করো, বুঝতে পারি নি। জানতাম না গো। দাদা তাকে ধরাধরি করে গিয়ে ভেতরে বসালো। গৌরীর মা গামছা এনে তার মাথা মুছিয়ে দিলো। অনেকক্ষণ ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে তারপর দাদাকে সব খুলে বললো।

গৌরী বাজারেই গিছলো। সেখানে এক পুরনো বান্ধবীর সঙ্গে দেখা। গল্প করতে করতে কখন ঘড়ির কাঁটা দৌড়েছে কেউ বুঝতেই পারে নি। এমন সময় হুড়মুড় করে বৃষ্টি। দুজনে কোনক্রমে একটা দোকানের শেডের তলায় দাঁড়ালো। অাড্ডা অাবার শুরু হলো।

গৌরী বললো, জানিস তো শিপু, এরকমই বৃষ্টিতে কয়েকদিন অাগে ফেঁসে গিছলাম। কোথায়? ডায়মন্ড হারবারে যাচ্ছিলুম রে, রেল থেকে ইস্টিশনে নেমেচি, এমন সময় ওরে বাবা, চারদিক অন্ধকার করে নামলো, অামরা দুজনে তো দেখতে না দেখতে নেয়ে গেলুম, এরকমই একটা দোকানের চালার নীচে দাঁড়ালুম, কিস্যু লাভ হল না, ডায়মন্ডের বিষ্টি না। ডায়মন্ড গিছলি? হ্যাঁ তো, সম্বন্ধ দেখতে। কার সম্বন্ধ? ওই যে, অনিদির বোনের। অনিদি? অারে অামাদের পাশের বাড়ি থাকে রে, অামার সঙ্গে সেই তো গেল ডায়মন্ডে, বোন খুব ভাল রান্না করে, খুব মিষ্টি স্বভাব, বিয়ে পাকা হয়েছে। কার সঙ্গে বিয়ে, পাত্র কে? ওরে পাত্র বিকাশ রে, লাইফিনশোরেন্সে চাকরী করে। বিকাশ? মানে বিপাশাদির ছোটভাই বিকাশ? হ্যাঁ রে, তুই চিনিস? চিনবো না মানে, খুব চিনি, অনেকদিন ধরে চিনি, অামাদের বাড়ির পাশেই থাকতো তারা। তাহলে তো ভালই, ছেলে তো ভালই শুনেছি রে শিপু। ছেলে ভাল অবশ্যই, কিন্তু ছেলের তো বিয়ে হয়ে গেছে।

দাদার মাথায় অাকাশ ভেঙে পড়লো।

বিকাশের তখন অনেক কম বয়স। এক অাত্মীয়া অাসামের এক গ্রামে বিয়ে ঠিক করেছিল। মেয়ে নাকি খুব সুন্দর রান্না করে, লুচি ভাজতেও দারুণ পারে। সব কথাবার্তা পাকা, ট্রেনে করে বিকাশ বিপাশাদি সক্কলে মিলে অাসামে গিয়েছিল। বিয়ের পিঁড়িতে বসে মন্ত্রপড়া সম্প্রদান সব হয়েছিল। সাতপাক ঘোরার জন্য মেয়ে উঠে দাঁড়িয়ে হাঁটতে যাবে, সবাই দেখে, মেয়ে খোঁড়াচ্ছে। কী ব্যাপার? দেখা গেল, মেয়ে খোঁড়া। ছোটবেলায় এক সাহেবের গাড়ি তাকে ধাক্কা মেরে ফেলে দিয়ে পা পিষে দিয়ে চলে গিছলো।

এবার কী হবে? বিপাশাদির মাথায় হাত। বিকাশ দিদিকে চুপিচুপি বলে, ও দিদি এ মেয়ে কী বিয়ে করবো গো? সারাজীবন খোঁড়াকে ঘাড়ে করে নিয়ে বেড়াবো? না না অামি পারবো না। কিন্তু কী করবে? বিয়ে তো হয়ে গেছে। কী উপায়? উপায় বার করা হলো শেষমেশ। পরের দিন সকালে কনে ঘুম থেকে উঠে দেখে, বর নেই। বর নেই, বরযাত্রীও কেউ নেই। সকলে ভোরবেলার অন্ধকারে পালিয়ে এসেছে। তারপর অনেক বছর কেটে গেছে, খোঁজ নেই খবর নেই। বিপাশাদি ঠিক করলো, ভাইকে অাবার বিয়ে দিতে হবে।

থান্ডুদার ভাই ঝন্টুদা রন্টুদা দাদাকে খুব ভালবাসতো। দুজনেই দুঁদে উকিল। দাদা নিরুপায় হয়ে তাদের কাছে গেল। সমস্ত খুলে বললো। দুইভাইয়ের কপালে ভাঁজ পড়লো। বললো, সুশীল, বড় মুশকিলে পড়ে গেছো। এত কষ্ট করে সম্বন্ধ এসেছে, ভালঘরের ভাল ছেলে, তুমি বোনকে এই বিকাশের সঙ্গে নাহয় বিয়ে দিলে। কিন্তু বাইচান্স যদি অাসামের সেই মেয়েটি এখনো বেঁচে থাকে, তাহলে কিন্তু বোনের বিয়ে নালিফাই হয়ে যাবে। হিন্দু ম্যারেজ অ্যাক্ট তাই বলে। বহুবিবাহ বেঅাইনি শুধু নয়, অাইনত দন্ডনীয় অপরাধ। বিকাশও জেলে যেতে পারে। তোমার বোনের লাইফটা নষ্ট হয়ে যাবে। দাদা বললো, তাহলে উপায়? ঝন্টুদা রন্টুদা বললো, উপায় একটাই, সে মেয়ে বেঁচে অাছে কিনা জানতে হবে।

দাদা সোজা গেল বিপাশাদিদের বাড়ি। বিকাশকে ডেকে জিজ্ঞেস করলো, এই কথা কি সত্যি। বিকাশ স্বীকার করলো, হ্যাঁ, অামার এক বউ অাছে। সে বেঁচে অাছে কি মরে গেছে জানি না। দাদা বললো, শোন বিকাশ, তোমায় এটা জানতে হবে সে মেয়ে বেঁচে অাছে কিনা। একবার যখন মাথায় সিঁদুর দিয়ে বিয়ে করেছো, তুমি ওকে অস্বীকার করতে পারো না। বিকাশ যেতে রাজি হল।

অাসাম এখানে নাকি? এখন অাসাযাওয়া অনেক সহজ। তখন তিনদিন-তিনরাত ট্রেনে থেকে শেষমেশ সেই গ্রামে পৌঁছলো বিকাশ। গিয়ে খোঁজখবর নিয়ে সে বাড়িও পৌঁছলো। গিয়ে দেখে, খুঁড়িবেচারি বসে অাছে। পা খোঁড়া, কে বিয়ে করবে?

বিকাশ ফিরে এলো। দাদাকে সব ঘটনা জানালো। দাদা রন্টুদা ঝন্টুদার সঙ্গে অারেকবার কথা বলে শেষে মেজদিকে নিয়ে ছেলের বাড়ি পৌঁছলো। বিপাশাদি দাদাকে অনেক কাকুতিমিনতি করলো, কিন্তু দাদা বললো, অামি বিশ্বস্ত উকিলের সঙ্গে কথা বলেছি। অামার বোনটা ভেসে যাবে। অামায় ক্ষমা করবেন।

এবার?

বিপাশাদি কাঁদতে কাঁদতে একঘটি জল অার সোনার চেনটা ফেরত দিয়ে দিলো। অনেক দিন বাদে মেজদি খবর নিয়েছিল। বিকাশ নাকি অার বিয়ে করেনি। অাসামেও যায় নি।

অামার বিয়েটা এভাবেই ভেঙে গিছলো।
___________________

[মিস মার্পেল অাগাথা ক্রিস্টির এক অবিস্মরণীয় সৃষ্টি। গল্পকার হিসাবে ক্রিস্টির বিশ্বখ্যাত। পঁচাত্তরটি ভাষায় তাঁর লেখা অনূদিত হয়েছে। পোয়ারো বা মার্পেল পড়েনি এমন লোক, অন্তত বাংলায়, পাওয়া ভার। কিন্তু অনেকেই জানেন না যে এই বঙ্গেই এক জলজ্যান্ত মিস মার্পেল অাছেন। দক্ষিণ চব্বিশ পরগণার ডায়মন্ড হারবার মহকুমায় তাঁর জন্ম। সেই জায়গায় উনি জীবনের পঁয়ষট্টি বছর কাটিয়েছেন। বহু অভিজ্ঞতায় ভরা জীবন, তার বেশিরভাগই ঘরোয়া। এই ছোট ছোট ঘটনা উনি নিজের ভাষায় যখন বলেন তখন মনে হয় চোখের সামনে রূপোলি পর্দা টেনে দিয়েছে কেউ, অার তাতে সিনেমার রীলের মতো ভেসে উঠছে এক ভুলে যাওয়া দিনের দিনলিপি। ডিটেকটিভ নন, কিন্তু পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা তুখোর, অার স্মৃতিশক্তি প্রখর। ওনার মুখে বলা কিছু ঘটনাকে সাজিয়ে ঘটিবাটীর পাঠকের কাছে পেশ করার দায়িত্ব অামি পেয়েছি ওনার বোনপোর কাছ থেকে। কতটা সফল হবো সেটা পাঠক ঠিক করবেন।]
___________________

#সোঘো, রাত ন’টা সতেরো, ২৯ অক্টোবর, ২০১৬ সাল, তিলোত্তমা।

#ঘটিবাটী

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s