হম হোঙ্গে কামইয়াব
______________________________

— কীরে পুলি? কী ভাবছিস?
— রূপাদির কথা।
— রূপাদি? মানে বারাসাতের রূপাদি?
— হ্যাঁ গো।
— কেমন অাছে রূপাদি? শরীর কেমন?
— ওই যেরকম থাকে অার কী। প্রেশারটা তো অার কমছে না।
— কতবার বলেছি, একটু হাঁটাহাঁটি করো। কে কার কথা শোনে। খালি সারাদিন বাড়ির কাজ অার বসে বসে চিন্তা অ্যাংজাইটি।
— অার কীই বা করবে বলো। শ্বশুরবাড়ির ব্যাপারস্যাপার।
— অার এই বয়সে তুই শ্বশুরবাড়ি দেখাতে অাসিস না। নিজেই শাশুড়ি হয়ে গেল…
— শ্বশুরবাড়ি মানে তো স্বামীও ইন্ক্লুডেড, তাই নয় কী?
— কেন, নিরঞ্জনদা কী করেছে?
— কিছুই করেনি। কিন্তু কিছু একটা করতে পারে।
— ব্যাপারটা কী খুলে বলতো।
— রূপাদির নিজের কোন অায় নেই তো তুমি জানো।
— জানি। কতবার বলেছি…
— অাঃ, বলতে দাও না।
— হুম, বল।
— তাও সময়ে-অসময়ে কুড়িয়ে-কাঁচিয়ে কিছু টাকা জমিয়েছে।
— তাও ভাল। কত?
— পনেরো হাজার।
— মাত্র?
— কী বলছো গো? যার হাত দিয়ে কোন টাকার লেনদেনই হয় না, নিরুদাই সবকিছু দেখে, সেখানে পনেরো হাজার কম বুঝি?
— হুম। তা নয়। তো কী হয়েছে? সব বুঝি হাজার-পাঁচশো টাকার নোট?
— তেরোশো টাকা একশোর নোটে। সাতশো পঞ্চাশ দশ কুড়ির নোটে। বাকি তেরো হাজার…
— বুঝেছি। তা গিয়ে ব্যাঙ্কে জমা দিক।
— অ্যাকাউন্ট নেই।
— অ্যাকাউন্ট খুলে নিক। পাঁচ মিনিট সময় লাগবে তো।
— না গো, অনেক বেশি সময় লাগছে। সব জায়গায় অ্যাকাউন্ট খোলার মতো লোকও নেই। সবাই ক্যাশের বসে, সামাল দিতে পারছে না।
— রূপাদির ছেলে…কী যেন নাম…?
— সবু।
— সবু যাক না। মা’র নামে অ্যাকাউন্ট খুলবে। বা নিজের অ্যাকাউন্টে দিয়ে দিক। সবুর অ্যাকাউন্ট অাছে তো?
— সবুর অ্যাকাউন্ট থাকবে না কেন। চাকরী করে তো।
— তাহলে? প্রবলেম সল্ভড।
— না। সল্ভড নয়। সবু এখানে নেই। সবু জার্মানীতে।
— অ। তাহলে মেয়েকে দিক। সুমি?
— সুমির কলেজে ইন্টারনাল চলছে। গিয়ে লাইন দেওয়ার মতো সময় নেই।
— হুম। নিরঞ্জনদা?
— নিরুদা একবার যদি জানতে পারে টাকা অাছে অমনি বলবে অামায় টাকাটা দাও, অামি এটার ব্যবস্থা করছি। ব্যস, হয়ে গেল।
— ব্যস হয়ে গেল মানে কী? নিরঞ্জনদা খেয়ে ফেলবে টাকাটা? মদ-টদ-সিগ্রেট-ফিগ্রেট তো কিছু খায় না। জুয়া খেলে নাকি? রেস?
— ছিছি, না না, নিরুদা ওরকম নয়। বিজনেসে দেবে।
— তাতে প্রবলেম কী?
— নিরুদা অার বিজনেস! কী ফল হয় জানো না?
— কেন, কী ফল হয়?
— ফ্যামিলি নিয়ে তোমার এই নির্লিপ্ততা…
— কেন তুই খুব ভালো করে জানিস পুলি। সো ব্যাক অফ।
— হ্যাঁ গো দিদি, জানি। তবুও, পরিবার বলে কথা…
— কী ব্যাপার বল তো পুলি? তোর মতো ফায়ারব্র্যান্ড রেবেলের মুখে হঠাৎ এসব কেন?
— ভয় পেয়ে গেছি গো।
— ভয়? অামার বোনের ভয়? সেকি, জীবনে তো একথা শুনিনি।
— সকালে সাঁতার ক্লাস করাই জানো তো।
— অামি কেন, সবাই জানে। অ্যান্ড অাই অ্যাম ভেরি প্রাউড অফ ইউ। পাড়ার মেয়েগুলো…
— সেটা নিয়েই চিন্তা। জানোই তো এদের ঘরের কী অবস্থা।
— টিনের চালা? একটা স্টোভ? কলতলায় কমিউনাল বাথরুম?
— শুধু তাই নয়। কমলা দুবাড়ি কাজ করে, কমলার মা তিনবাড়ি। রেবার মা চারবাড়ি, রেবা একবাড়ি। মালতী অার মালতীর বোন বিপাশা অারো পাঁচবাড়ি…
— পয়েন্টে অায়।
— এরা সব মহিলা। এরাই সংসার চালায়। কমলার বাবা রিক্শা চালাতো, তাড়ি অার বাংলা খেয়ে খেয়ে অার পারে না। রেবার বাবা তো ট্রেনেই কাটা পড়লো। রেবার কাকাটা তো ওদের বাড়িটুকুও নিয়ে নিলো। মালতীর স্বামী বিপাশাকে নিয়ে কী করেছিল তা তো শুনেইছো। ছিল ইলেকট্রিশিয়ান, ভালই পেতো, গাঁজাটা ধরে মাথাটা গেল বিগড়ে।
— তুই বলছিস এদের কাছে যে জমা টাকা অাছে…
— প্রায় সব পাঁচশো হাজারের নোটে গো।
— রূপাদির অ্যাকাউন্ট খোলার সমস্যা তো বুঝলাম। রেবা, কমলা এদের কী প্রবলেম? এরা লাইনে দাঁড়াতে পারবে না? সময় তো প্রচুর হাতে।
— না গো, বুঝতে পারছো না, মুশকিল একই। কমলা বা কমলার মা ব্যাঙ্কে যেতে গেলেই লাল্টু ধরবে ওদের, পিটিয়ে বা যে করে হোক টাকা ওদের কাছ থেকে অাদায় করে গিয়ে গিলবে। রেবার কাকাটা ডেঞ্জারাস লোক। টাকা অাছে শুনতে পেলেই লাফিয়ে এসে পড়বে। অার বিশ্বনাথের মতো ক্যারেক্টারলেস লোক…কী যে করে বসবে। বিপাশাটা এখনো ছেলেমানুষ, ওকে দিয়ে যদি মালতীকে থ্রেট করে…
— কিন্তু পুলি, তুই তো অাছিস। তুই ওদের বলে দে, যা টাকা অাছে চুপিচুপি কোঁচড়ে গুঁজে এনে তোকে দিতে, তুই ব্যাঙ্কে ভরে দে। হয়ে গেলো।
— সবার টাকা? অামি ব্যাঙ্কে ভরে দেবো?
— কেন? কজন অাছে সবমিলিয়ে?
— সাতজন।
— তাদের সব মিলিয়ে কত টাকা জমা অাছে?
— সব মিলিয়ে ওই লাখ দুয়েক হবে।
— তাহলে? মুশকিল কোথায়? অাড়াই অবধি তো জমা করতেই পারবি।
— নিজের নামে করবো?
— তোকে অামি অ্যাকাউন্টটা খুলে দিয়েছি কেন তাহলে?
— কিন্তু…?
— ওরা তোকে বিশ্বাস করবে না? তোকে? এটা অামি বিশ্বাস করতে পারছি না।
— না, সেটা করবে। কিন্তু তাও, ওদের টাকা অামার নামে…
— শোন, এটা একটা সলিউশন। এটা গা-ঢাকা দেওয়া সলিউশন। কোনরকমে জোড়াতাপ্পি দিয়ে একটা পথ বের করা সলিউশন। টেম্পোরারি ব্যান্ডেড।
— তাহলে? পাকাপাকি স্থায়ী একটা সমাধান কী হতে পারে? ব্যাঙ্কে খাতা খোলা?
— ব্যাঙ্কে খাতা খোলা। ইয়েস! কেন বল দেখি।
— তাতে নিজেদের টাকার উপর নিজের দখল থাকবে অারো বেশি করে।
— কারেক্ট।
— তা কী থাকবে গো? লুকোনো টাকার কথা ফাঁস হলেই তো…
— হলেই তো কী? ব্যাঙ্কে যাবে। অ্যাকাউন্ট খুলবে। টাকা জমা দেবে। পাসবুক পাবে। তারপর কে কী করতে পারবে? সই লাগবে তো।
— সই যদি জোর করে করিয়ে নেয়?
— অারে অত সোজা নাকি? বললেই হল? তার চেয়ে দেখ না, ধর ৮ নভেম্বরের অাগে এইসব মহিলাদের লুকোনো টাকা যদি ফাঁস হয়ে যেত, তাহলে এই লম্পটগুলো তো সেটাকা অনেক সহজে হাতাতে পারতো, তাই না? তার চেয়ে এরা এখন মাথা তুলে বাঁচবে।
— বলছো? কিন্তু…
— কিন্তু কী? ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট খোলা নিয়ে চিন্তা করছিস? তোর দৌলতে ওদের অনেকেরই তো নিজস্ব অ্যাকাউন্ট অাছে।
— মাত্র তিনজনের।
— বাকি চারজনের খুলিয়ে দে। তুই গ্যারান্টর হ।
— এদের নিয়ে অামি চিন্তিত নই গো। চিন্তিত গ্রামেগঞ্জের মহিলাদের নিয়ে। তাদের তো অার অামি নেই।
— দিনতিনেক অাগে অামি উবের নিয়ে ফিরছিলাম।
— তুমি? উবের? অফিসের গাড়ির কী হল?
— প্রয়োজন ছিল। অফিসের গাড়িতে অাসলে এই জিনিসটা জানতে পারতাম না।
— কী জিনিস?
— ড্রাইভারের কাছে ফোন অাসে। বিহার থেকে। খাতা খোলা নিয়ে কথা। হয়ে যেতে অামি জিজ্ঞেস করি, কী হয়েছে? বলে, ফোন করেছিল শালার বউ। তার বাড়িতে অনেক টাকা জমা অাছে। শালা থাকে বোম্বে, কাজ করে। সে মাসদুয়েকের মধ্যে ছুটি পাবে না। এদিকে বিহারের অজ পাড়াগাঁয়ে বাড়ি। শ্বশুরবাড়ির কেউ জানে না মেয়েটি এত টাকা জমিয়ে রেখেছে। জানতে পারলে তুলকালাম কান্ড।
— স্বামী, মানে শালাটি জানে এটা?
— না। তাকে জানানোর সাহস পায়নি মেয়েটা। তাই এর কাছে ফোন। সাহায্য চাইতে।
— এ কী সাহায্য করবে। অাছে বসে কলকাতায়, বিহারের গ্রামে না গিয়ে…
— যাবে কীকরে? উবেরে তো ডেলি ডিউটি।
— দেখছো তো। এবার মেয়েটি কী করবে? এইজন্যই অামি ভয় পাচ্ছি…
— ওরে শোন অাগে, সলিউশন একটা বেরিয়ে এলো।
— এলো?
— এলো।
— কী?
— পড়শি অাছে। তাকে টাকাটা দিয়ে দেবে। তার অ্যাকাউন্ট অাছে। সে জমা করে দেবে। ঝামেলা মিটলে পরে টাকা তুলে ওকে দিয়ে দেবে।
— যদি না দেয়?
— ওরে, গ্রামের দিকে লোক এত হারামী হয় না, যতটা শহরে হয়। অার যে জমা দিচ্ছে সেও মহিলা। এই সময়ে মহিলারা মহিলাদের ব্যাকস্ট্যাব করবে না রে।
— না গো। এটা একটা কেস। এরকম সমাধান দেওয়ার মতো তো অার পুরুষ ড্রাইভার সব জায়গায় বসে নেই।
— সলিউশনটা ড্রাইভারটা দিয়েছে কে বললো?
— মানে?
— মেয়েটিই দিয়েছে। নন্দাইকে জানালো স্রেফ।
— ওগো দিদি শোনো গো। সবার তো অার ওরকম পড়শি থাকবে না। তারা জীবনে ব্যাঙ্কে যায়নি, ব্যাঙ্কে দেখেওনি পর্যন্ত। তারা কি তুমি ভাবছো গটগট করে গিয়ে খাতা খুলবে? ওইসব ব্যাপার দেখেই তো ওরা ভয়ে পালাবে। তারপর? সারাজীবনের জমানো পুঁজি হাওয়া।
— এইখানেরই তুই ভুল করছিস। না, হবে না। কেননা এরা একা নয় রে। এরা অনেক। একে অপরের ভরসায় এরা চলে। সারা ভারতবর্ষের পুকুরপারে কলতলায় গত ৮ই নভেম্বর থেকে কী কী কথা হচ্ছে তুই জানিস না? কীভাবে সবেধন নীলমণি জমানো টাকাটা বাঁচানো যায়। ওরে এরা মুখ্যু নয় রে, নয়তো সংসার চালাতে পারতো না। এরা জমায়েত হবে, এককাট্টা হবে, ইউনাইটেড হবে, হয়ে একটা উপায় বাৎলাবে। বাৎলিয়ে শুধু যে নিজেদের পুঁজিটুকুর ব্যবস্থা করবে তা নয়, এদের নিজেদের জীবন অারো ভাল হয়ে উঠবে। ওরে, হোয়্যার দেয়ার ইজ অা উইল, দেয়ার ইজ অা ওয়ে। ইউনাইটেড দে স্ট্যান্ড। হবে হবে, তুই দেখে নিস।
— অামার সন্দেহ অাছে গো। সন্দেহ নয়, ভয় অাছে। যদি না পারে…
— পারবে। অামার দৃঢ় বিশ্বাস পারবে। ওরে, তোর মতো মেয়ে যদি মেয়েদের উপর থেকে অাস্থা হারিয়ে ফেলিস তাহলে অার কী রইলো? তুই কি চাস না, এরা মাথা তুলে দাঁড়াক? চোরের মতো অন্ধকার কুঠুরিতে দিন না কাটিয়ে অালোতে এসে বুক চিতিয়ে বলুক, এই অামার শ্রমের ধন, কে কী বলবি বল। সততার একটা শক্তি অাছে রে, তার সামনে অার সব কিছু খড়কুটোর মতো কোথায় উড়ে যায় তার ঠিকানা পাওয়া যায় না। বিশ্বাস কর সেই শক্তিতে। বিশ্বাস কর অামাদের শক্তিতে। হম হোঙ্গে কামইয়াব! হম হোঙ্গে কামইয়াব!
— দিদি। গান না, প্লীজ। গান না। পারছি না। হেল্প…
— হম হোঙ্গে কামইয়ায়ায়ায়াব…
— মায়ায়া…দিদি অাবার গাইছেএএএ বাঁচাওওওওও…
— …এএএএক দিনননননননন…

______________________________

#সোঘো, দুপুর দেড়টা, ১৫ নভেম্বর, ২০১৬ সাল, তিলোত্তমা।

#ঘটিবাটী #দিদিপুলি

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s