— মা, ও মা।
— কীরে, কী হয়েছে?
— এই শাড়িটা কেমন হয়েছে মা?
— কাছে অায়, দেখি…
— অাজ রমাদির বিয়ে। তাই একটু সাজুগুজু করেছি।
— বেশ ভালই তো লাগছে। ফ্যাব্রিকটা বেশ হাই-কোয়ালিটি। কাজও তো মনে হচ্ছে ভালই। জামদানী?
— হ্যাঁ গো।
— রং?
— লাল রঙের।
— খুব সুন্দর তো। কবে কিনলি রে? অামাকে বলিসনি তো।
— অারে কিনি নি গো। তোমার কী মনে হয়, অামি এরকম জমকালো শাড়ি কিনবো?
— না কেনার কারণ কী, শুনি।
— অামি ওসব পরতে ভালবাসি না…
— সেটা তো এক্সকিউজ। নিজের পকেটমানি বাঁচিয়ে সুইমিং ক্লাসের জন্য জামাকাপড় কিনে না দিলে কি তোর কাছে ভাল শাড়ি কেনার টাকা থাকতো না?
— এসব কী বলছো মা?
— ঠিকই বলছি। অার ঠিক এইজন্যই অাই অ্যাম সো প্রাউড অফ মাই ডটার!
— অ্যাঁ?
— কী ভেবেছিলি? তোর মা হঠাৎ বাংলা সিরিয়ালের ভিলেন হয়ে গেছে?
— ইশশ। মায়ায়া…
— ওরে বাবা, ছাড় ছাড়, বুঝেছি। মেয়ে বড় হলেও সেই ছোটই অাছে।
— হিহি। তাহলে শাড়ি পসন্দ্?
— সে তো পসন্দ্। বাট হু?
— ও, এটা অামায় কেউ কিনে দেয়নি। বা অামিও কিনিনি।
— অ। বুঝেছি। দিদিরটা ঝপাস?
— দিদিরটা ঝপাস।
— বার্লিন থেকে ফিরে যদি দেখে তার পেয়ারের শাড়ি…
— দিদি? শাড়ি? ও শাড়ির কী বোঝে? জামদানী অার চান্দেরীতে তফাত করতে পারে সে? গঙ্গা-যমুনা বললে ও কখনো নদী ছাড়া কিছু ভাববে?
— হ্ম। তাও বটে।
— সে বুঝতেও পারবে না। পরেটরে কেচেকুচে শুকিয়েটুকিয়ে ইস্তিরিটিস্তিরি করে…
— ওফফ। বুঝেছিটুঝেছি। নে, এবার বেরোবি তো? বিয়েবাড়ি কোথায়?
— পাটুলিতে।
— কীভাবে যাবি?
— কেন, হেঁটে।
— হেঁটে?
— সাইকেলটা বুনুদার দোকানে সারাই করতে দিয়েছি।
— না, সে কথা বলছি না। বিয়েবাড়ি যাবি, সাজুগুজু করে, বাট হেঁটে? এতটা পথ?
— কেন? ততটাও নয়। অারামসে হয়ে যাবে।
— সেটা বলছি না। তুই যে ম্যারাথন হাঁটতে পারিস সেটা অামরা সবাই জানি। কিন্তু সেটা এরকম সাজগোজ করে কখনই নয়। ঘেমেনেয়ে একশা হবি তো, সমস্ত সাজগোজ জলাঞ্জলি।
— অারে না না। অামি কি অতই বোকা? তা করবো কেন? এটা তো তোমাকে বোঝানোর জন্য ট্রায়াল রান দিলুম। এবার শাড়িটা-ব্লাউজটা ছেড়ে ফেলে নিজের শাড়িব্লাউজ গায়ে চাপিয়ে এগুলো একটা ব্যাগে পুরবো, তারপর ব্যাগ পিঠে নিয়ে হাঁটা মারবো।
— বেশ। মারলি। তারপর? বিয়েবাড়ি পৌঁছে কি বাথরুম খুঁজবি চেঞ্জ করতে?
— অারে না না। পাটুলিতেই সুপুদি থাকে, তার বাড়ি যাবো। ওখানেই চেঞ্জ করবো।
— সুপু? মানে সুপ্রিয়া?
— সুপু মানে সুপ্রিয়া।
— তোর রমাদির বিয়ে যার সঙ্গে হচ্ছে, তার নাম কি উত্তম?
— উঁ? না অরুণ চট্টোপাধ্যায়।
— বাঃ বাঃ, বেশ বেশ।
— কেন বলো তো?
— কিছু না। রতো। অরুণ।
— অরুণ! অরুণ চট্টোপাধ্যায়?
— হেহে, না। অরুণ সান্যাল।
— যাঃ।
— হিহি।
— তোরা এটা নিয়ে রমাকে খেপাস না?
— রমাদি সুপুদিকে খেপাতে গিছলাম। বলার পর দুজনেই খানিকক্ষণ হাঁ করে তাকিয়ে রইলো, তারপর একে অপরের দিকে মুখ চাওয়া-চাওয়ি করলো।
— মানে কিছুই বুঝলো না, তাই তো?
— এক বিন্দু নয়।
— তুই কী বললি?
— বললাম, তুমলোগ দোস্ত পর ধব্বা হ্যায়, বঙ্গালি পর ধব্বা হ্যায়।
— বললি? এই ডায়ালগ?
— হুঁ। বলে গটমট বেরিয়ে এলুম।
— তারপর?
— তারপর অার কী? এত সরের মজাটা কেউই বুঝলো না। অাজকল কে বচ্চে টাইপের ব্যাপার।
— হুম। স্যাড। তো, হিন্দু মতে বিয়ে হচ্ছে না নাকি…?
— হিন্দু মতে। এক মাস অাগে অরুণদা অার রমাদি গিয়ে নোটিস দিয়ে এসেছে।
— এই রমারই না হিন্দু মতে বিয়ে না করার ইচ্ছে ছিল?
— অরুণদার, রমাদির নয়। রমাদি এ ব্যাপারে নিউট্রাল ছিল।
— তাহলে?
— অরুণদার পিসি, রমাদির ঠাকুমা।
— ব্যাপারটাকে হাইজ্যাক করেছে, তাই তো?
— দুজনেই প্রায় একই বয়সের, একই সময়ের লোক। চেনেজানাও যথেষ্ট। অরুণদা রমাদির ব্যাপারটা তো অনেকদিন ধরেই চলছিল। দুজনে মিলে গান্ধীগিরি করে বিয়েটাকে হাইজ্যাক করেছে।
— গান্ধীগিরি!
— কী কুক্ষণেই না ওই দুজনকে নিয়ে অামরা লগে রহো মুন্নাভাই দেখতে গিছলাম।
— হুম। হাঙ্গার স্ট্রাইক? সার্জিকালি এগজেকিউটেড?
— ওরে বাবা, একেবারে। রমাদি এমনিতেই নিউট্রাল ছিল, কান্ড দেখেটেখে বলেই দিলো, ঠিক অাছে, হিন্দু মতেই বিয়ে হবে।
— অরুণ জানতো ব্যাপারটা?
— একবিন্দু নয়। জেনে তো খেপচুরিয়াস।
— বাট ইট ওয়াজ টূ লেট?
— সাংঘাতিক ঝগড়া, অরুণদা অার রমাদি। শেষে রমাদি বলে বসলো, হিন্দু মতে বিয়ে না হলে সেও অনশনে বসবে।
— বাপরে।
— অরুণদা শেষে গিভ-ইন করতে বাধ্য হলো।
— রমা এত সহজে রাজি হয়ে গেল? অরুণের পছন্দ নয় জেনেও?
— রমাদির ব্যাপারটা একটু অদ্ভুত। ছোটবেলা থেকেই ঠাকুমার কাছে বেশিটা মানুষ। ঠাকুমাই তাকে সব শিখিয়েছে। বিয়ে জিনিসটা একটা পবিত্র জিনিস, শাস্ত্র মেনে করতে হয়, নাহলে সর্বনাশ হয়, এইসব।
— তা সত্ত্বেও সিভি ম্যারেজে রাজি হয়েছিল?
— তার কারণ সম্পূর্ণ অরুণদা। অরুণদার প্রভাবে এসে রমাদি ধীরে ধীরে ওই বৃত্ত থেকে বেরিয়ে অাসা শুরু করে। অামরা ভেবেছিলাম এতদিনে সম্পূর্ণ বেরিয়ে অাসতে পেরেছে। দেখা গেলো, ভুল ভেবেছিলাম।
— অার অরুণ? অরুণ কী ভাবছে এটা নিয়ে?
— অরুণদা নরম মনের মানুষ। অার একটু থিওরেটিকাল। রমাদিকে পাগলের মতো ভালবাসেও। এতদিনের প্রচেষ্টা ফেল মেরে গেলো দেখে ভীষণ ভেঙে পড়েছে বটে, কিন্তু মানিয়ে নেবে। মানিয়ে নিয়েছে। কী অার করবে, মানুষ নিয়মের দাস।
— তার মানে কম্প্রোমাইজ করেছে, তাই তো?
— হ্যাঁ। অাপস করতে বাধ্য হয়েছে বলতে পারো।
— তার মানে ওর কাছে রমার সঙ্গে জীবন কাটানো একটা অাইডিয়াল ধরে রাখার চেয়ে বেশি ইম্পর্ট্যান্ট?
— হুম। তাই দাঁড়াচ্ছে ব্যাপারটা।
— পুলি?
— মা?
— কখনো এরকম করবি না, কথা দে। নিজের জীবনে নেভার কম্প্রোমাইজ। নেভার।
— কথা তো অনেক অাগেই দিয়েছি মা। অাবার দিলাম।
— তোর দিদির কাছ থেকেও অারেকবার কথাটা নিতে হবে। ব্রেন্ডাকে ও যেন…
— করবে না মা। ব্রেন্ডার সঙ্গে দিদি কোন অাপস কখনই করবে না। ব্রেন্ডাও করবে না। ওরা জানে, কী কী বাধা ওদের সামনে অাছে। একদিন না একদিন ওরা সে বাধা কাটিয়ে উঠবেই, দেখো মা।
— অাশির্বাদ করি, তুই যেন এরম বাধার মুখে না পড়িস।
— না মা, বরঞ্চ এই অাশির্বাদ করো, এরম বাধার সামনে পড়লে অামিও যেন এগিয়ে যাওয়ার সাহস পাই, শক্তি পাই।
— অায়, মাথাটা কাছে অান। অামার ছোট্ট মেয়ে পুলি, কত্তবড় হয়ে গেছে। অাই অ্যাম প্রাউড অফ ইউ মাই ডটার।
— এবার অাসি মা?
— এসো। সাবধানে হেঁটো মিস বৈদ্য।
— রজার উইলকো ডক্টর বৈদ্য।


#সোঘো, দুপুর একটা ছেচল্লিশ, ১১ ডিসেম্বর, ২০১৬ সাল, তিলোত্তমা।

#পুলিওমা #পুলিসিরিজ #ঘটিবাটী #Ghotibaatea

#patriarchy #পিতৃতন্ত্র


ম্যালেরিয়ার মতো পিতৃতন্ত্রও (পিতৃরিয়াও বলা চলে) একধরনের রোগ। চেপে বসে থাকে, একজনকে ছাড়লে অারেকজনকে চেপে ধরে। অার এর বাহক যে শুধু পুরুষরা তা নয়। পিতৃতন্ত্র নিয়ে অারো লেখার ইচ্ছে রইলো।

— সোঘো

Advertisements

2 thoughts on “পুলিপিঠে ও মা : পিতৃরিয়া

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s