“ডাইসন গোলক কাকে বলে জানিস?”

তৃতীয় কাপ হরলিক্স চলছে। একটু ধীর গতিতেই বলা চলে। সাড়ে বারোটা বাজে, সকাল থেকে হিসেবমতো চার কাপ হওয়া উচিত ছিলো। নেলোদা বললো বাবু নাকি কীসব পড়াশুনো করছিল ভোর থেকে।

“তো বাবু অার কবে পড়াশুনো করেনি নেলোদা?” পুলুদার সটান বক্তব্য। প্রশ্ন, তবে রেটোরিকাল ঝনারের। “বলছি কি, একটা অমলেট পাওয়া যাবে? ডবল ডিম, নো পেয়াঁজ, ওনলি লঙ্কা? তুমি তো জানোই হে হে…”

বেশি এগোনোর অাগে পরিচয় করিয়ে দি। পুলুদা অামার জ্যাঠতুতো দাদা, ভাল নাম পলাশরঞ্জন মিত্র, নিবাস ২৬ নং বনমালী নস্কর লেন, পেশায় অমলেটবিশারদ, গোয়েন্দা কাহিনী লিখে পাড়াবিখ্যাত। অবিশ্যি গোয়েন্দা গল্প লিখতে একটু হলেও রিসার্চ লাগে, তাই যখনই পারে হত্যে দেয় বিধুজ্যাঠার বৈঠকখানায়। দুজনের দিব্যি ঘুঁটে-গোবরে লেগে যায়।

হরলিক্সের কাপে চুমুক দিতে দিতে ডাইসন গোলক প্রশ্নটি করলেন বিধুজ্যাঠা। পুরো নাম শ্রী বিধানচন্দ্র ভট্টাচার্য, সংক্ষেপে এবং সর্বজনগ্রাহ্যে বিধুজ্যাঠা। কারুর অাপন জ্যাঠা নয়, ইউনিভার্সাল পাশেরপাড়াতুতো জ্যাঠা, নেবারিংনেবারহুডজ্যাঠা। বিধুজ্যাঠার জেনারেল নলেজ কলেজবিখ্যাত। । ইদানীং ম্যাপ-ট্যাপ নিয়ে চর্চা করছেন। হরলিক্সভক্ত লোক, ডেলি সাত কাপ না হলে চলে না।

নেলোদা বিধুজ্যাঠার বিশ্বস্ত পাসেপার্টাউট। হরলিক্স অার অমলেট বানাতে ওস্তাদ। এককালে পাঞ্জার লড়াইতে চোস্ত ছিলেন, অার খেলতেন টুয়েন্টি নাইন। প্রথমটা বয়সের সঙ্গে সঙ্গে কমেছে, দ্বিতীয়টা বেড়েছে।

লাইনের শেষে অামি। লাস্ট, অনেক সময়ে লীস্টও, যদিও একে বিনয় ভাবা ভুল। তবে লিস্টলেস হতে কখনই শোনা যায় নি। নাম রঞ্জনা মিত্র। বাবার নাম নরেশরঞ্জন মিত্র, ঠাকুর্দার নাম উমেশরঞ্জন মিত্র, গ্রেটঠাকুর্দার নাম অবিনাশরঞ্জন মিত্র। ছেলে হবেই, এবং নাম তার হবে পরেশরঞ্জন মিত্র–বাবার এই স্ক্রিপ্ট রেডিই ছিল। শেষে ডেলিভারি রুমে ছেলের বদলে মেয়ে এসে পড়ায় একটু ফাঁপরে পড়েছিলেন, শেষে মা-ই পরেশ ছেঁটে রঞ্জনকে জেন্ডার চেঞ্জ করে সলিউশান বাতলে দেন। পুলুদার ওসব প্রবলেম নেই। অাদর করে–উইথ খান দুয়েক গাঁট্টা ফ্রী–ডাকে পার্শে। বিধুজ্যাঠা অাবার নাম ঠিক রাখতে পারেন না, তাই ওনার কাছে অামি ভেটকি-ত্যালাপিয়া-গুরজাউলি এটসেটেরা।

যাই হোক, পরিচয়ের পালা শেষ। দেখা যাক, হরলিক্স অার ডাইসনবাবু মিশে কী দাঁড়ায়।

“কীহে পুলু, জানো, ডাইসন স্ফীয়ার? নাম শুনেছো কখনও? শুধু অমলেট খেলে চলবে?” হরলিক্সে শেষ চুমুক দিয়ে বিধুজ্যাঠার বিশপাওয়ারের বোমা বিস্ফোরণ।

পুলুদা খুব মন দিয়ে অমলেটটা খাচ্ছিল। “খাচ্ছিল” বললে কম বলা হয়, ইনসাল্ট টু পুলুদার প্যাশন। “ভক্ষণ করছিল” বা “সেবা করছিল” বললে বোধহয় পিকচারটা অারেকটু ক্লীয়ার হয়। হঠাৎ বিধুজ্যাঠার গমগমে অাওয়াজ শুনে কেমন ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে বিষম খেতে খেতে বেঁচে গিয়ে কাঁচালঙ্কাচিবানোমুখ করে বলে উঠলো, “জানি তো। ওই তো, হেরেংবাটি না কী যেন, বাইসনরা ঘুরে বেড়ায়। ন্যাশানাল স্ফীয়ার।”

হয়ে গেল। লাগ লাগ লাগ নারদ নারদ। বিশ পাওয়ার এবার সত্তরে উঠবে। লগ স্কেল, সুতরাং…

“বাইসন বলেছি অামি? সেরেংগেটিকে হেরেংবাটি বলা? স্যাঙ্কচুয়ারিকে স্ফীয়ার?” বুককেসের কাঁচের পাল্লা, টেবিলে কাঁচের গ্লাস, সিলিংয়ে কাঁচের ছোট ঝাড়লন্ঠন সব সাইমালটেনিয়াসলি ঝনঝন করে উঠলো। বাইরে একটা কাক তিনটে চড়াই দুটো অারশোলা হার্টফেল করলো। বুঝলাম ডেসিবেলে শানাবে না, কিলোবেল লাগবে।

পুলুদার হার্টফেল হয়নি। চুলটা ব্যাকব্রাশ হয়ে গেল স্রেফ। সাউন্ডপাওয়ার টিনটিনেই পড়েছি, সেই যে ক্যালকুলাসকে যে গল্পে কিডন্যাপ করা হয়েছিল, বা সিনিয়োরা বিয়াঙ্কার কাস্তাফিয়োরের জুয়েল সং। পুলুদার কল্যাণে নিজচক্ষে দেখাও, মানে, স্বকর্ণে শ্রবণও হয়ে গেল।

“অবশ্য তোমার কাছ থেকে একস্পেক্ট করাটাও…এই শোলমাছ, অমলেট রাখো, বলো, ডাইসন গোলক কী।”

খকখক…জল…ভীষণবিষম…খক্কোরখক…

দুপদাপ শব্দ। নেলোদার অাবির্ভাব, জলের গ্লাসটা যেন পাশে ফ্লোট করতে করতে অাসছে। মাথায় চাঁটি, পিঠে চাঁটি। অাধগ্লাস জল। খক। ক্লীয়ার।

থুড়ি। পুলুদা বিষমটা অ্যাভয়েড করেছিল, অামি পারি নি। এক্সপেক্ট করা উচিত ছিল…যাকগে। হাফ অমলেট বাকি ছিল, দেখি পুলুদা ভীষণ মন দিয়ে ওটা শেষ করছে। হায় হায়, নেলোদা স্পেশ্যাল।

“সামলেছে, কাৎলা?” বিধুজ্যাঠা নিজের জায়গা ছেড়ে নড়েননি। কখনও মনে হয় উনি ব্রেন অার নেলোদা বডি।

সামলেছে বৈকি। চোখ-নাক মুছে–নেলোদার হেল্পফুল গামছা–বললুম, “ডাইসন স্ফীয়ার কথাটা শুনেছি। তারাদের চারদিকে কীসব তৈরী করে, ওই সোলার প্যানেল জাতীয়? অনেকটা এনার্জি লাগলে…সায়েন্স ফিকশনে পড়েছি।”

দেখলাম বিধুজ্যাঠার মুখ প্রসন্ন। “রাইট ইউ অার পার্শে”–খুশি হলে পার্শেই বলেন, হায়েস্ট প্রেজ অ্যান্ড অনার–“ডাইসন স্ফীয়ার বা গোলক কতকটা সেরকমই ব্যাপার বটে। অাজ সকালে স্লেটে একটা লেখা পড়ে একটু পড়াশুনো করছিলাম। ফ্রীম্যান ডাই…”

“শ্লেটে পড়ে মানে? অাপনি এখনও শ্লেট-পেন্সিল-চক ব্যবহার করেন নাকি?”

অতবড় বাজখাঁই বম্বব্লাস্টের পরেও পুলুদার শিক্ষা হয়নি।

“শ্লেট নয় পুলু, স্লেট। একটা ওয়েবসাইট। ব্লগ, ওপিনিয়ন পীস, খবর ইত্যাদি থাকে। পোর্টাল জাতীয়। স্লেট ডট কম। কোনদিন পারলে খুলে দেখো। মনের জানলার ছিটকিনির জংটা কিছুটা হলেও শিরীষ কাগজের ঘষা পাবে।”

বেঁচে গেল পুলুদা, স্রেফ বেঁচে গেল। অামাকে থ্যাঙ্কস দেওয়া উচিত ওর।

বিধুজ্যাঠা গায়ের চাদরটা একটু অ্যাডজাস্ট করে হুইলচেয়ারটা অারেকটু জানলার জানুযারির রোদের দিকে ঘুরিয়ে নিলেন।

“সেই স্লেটে ফিল প্লেট বলে একজন ব্লগ লেখেন। ব্লগের নাম ব্যাড অ্যাস্ট্রোনমি। নামে ব্যাড থাকলেও যা লেখেন ভদ্রলোক…ব্লগের কথাটা কিছু মাস হলো জানলাম, এক বন্ধু পাঠিয়েছিল লিঙ্কটা। পড়ে তো অামি মুগ্ধ। ফিল প্লেট নিজে অ্যাস্ট্রোনমার। বইও লিখেছেন। কঠিন বিষয় খুব সহজ করে বোঝাতে ওনার জুড়ি নেই। এই যে মাগুর, ব্লগটা পড়বি। পড়া ধরবো পরের বার।”

সুবোধ বালিকার মতো ঘাড় নাড়লুম। ফিল প্লেটের নাম শুনিনি, কিন্তু বিধুজ্যাঠা ইম্প্রেস্ড মানে…

“দিনতিনেক অাগে প্লেটমশাই–খাবার প্লেট নয় পুলু, পি-এল-এ-অাই-টি প্লেইট বলা চলে–একটা লেখা দিয়েছেন, একটা অদ্ভুত তারা নিয়ে। তারাটার বৈজ্ঞানিক নাম কে-অাই-সি ৮৪৬২৮৫২, কিন্তু সকলে তাকে ট্যাবি’জ স্টার বা ট্যাবির তারা বলেই ডাকে। কেন বলতে পারবে?”

“ট্যাবি নামক কেউ অাবিষ্কার করেছে তারাটাকে,” পুলুদার স্ট্রেট ড্রাইভ।

“ট্যাবি হল অাবিষ্কারকের প্রিয় টেডি বেয়ারের নাম,” অামার রিভার্স সুইপ।

হল না। ইয়র্কার দিয়েছেন বিধুজ্যাঠা। ক্লীন বোল্ড দুজনেই। নাক থেকে ঘোঁৎ অাওয়াজটা তারই সংকেত।

“তারাটার অাবিষ্কার খুব নতুন কিছু নয়। বহুকাল ধরেই মানুষ এর অস্তিত্ব জানে। সিগনাস নামক কনস্টালেশন বা নক্ষত্রমন্ডলে এর স্থান। লাইট ইয়ার কাকে বলে জানো?”

জানতুম, কিন্তু এটাও জানতুম যে এর উত্তরটা অন্তত পুলুদা জানে। স্টার ওয়ার্স দেখার ফল।

“এক বছরে অালো যতটা দুরত্ব অতিক্রম করে, তাকে লাইটইয়ার বা অালোকবর্ষ বলে।”

পুলুদার মুখ থেকে ঠিক উত্তর পেয়ে দেখলাম বিধুজ্যাঠা হ্যাপি। “বাঃ, বেশ বলেছো তো পুলু। তো এবার দেখি, পার্সেক কাকে বলে জানো?”

“সোয়া তিন লাইটইয়ার হলে এক পার্সেক।”

অারিব্বাস। পুলুদা এটাও জানে? সত্যি বলতে কি, এটা অামিও জানতুম না। এটাও কি স্টার ওয়ার্স দেখারই ফল? দেখলাম বিধুজ্যাঠাও এতটা অাশা করেন নি।

“নেলো। পুলুর জন্য অারেকটা ডবল ডিমের অমলেট। স্যামনের জন্যও, কারণ অামি জানি ও উত্তরদুটো জানে।”

অর্ধসত্য। বাট…অমলেট পাচ্ছি যখন। একটা ভারচুয়াল শ্রাগ দিলুম।

“তো পুলু, অামার একটু কৌতুহল হচ্ছে, এটা তুমি জানলে কীকরে? মানে লাইট ইয়ার নাহয় লোকে জানে, কিন্তু পার্সেক?”

পুলুদা দেখলাম নিপাট ভালোমানুষ সেজে বললো, “এই তো বিধুজ্যাঠা, এই সেদিন উইকিপিডায় পড়লুম যে। একটু অ্যাস্ট্রোনমি নিয়ে চর্চা করবো ভাবছি, বুঝলেন। গোয়েন্দা গল্পে যদি লেগে যায়…”

কি মিথ্যুক। এবার অামারো মনে পড়েছে। মিলেনিয়াম ফ্যালকন, কেসেল রান, বারো পার্সেক। ইশশ, কীরকম স্মুথলি বেরিয়ে গেলো।

“বাঃ বেশ বেশ, যত পড়াশুনো করবে, জ্ঞান অর্জন করবে, তত মনের প্রসার বাড়বে,” বিধুজ্যাঠা প্রসন্ন। “যা বলছিলাম, এই তারাটি পৃথিবী থেকে সাড়ে চারশো পার্সেক বা প্রায় দেড় হাজার অালোকবর্ষ দূরে। এফ-টাইপ তারা, তার মানে অালোর রঙ হলদেটে শাদা।”

“অামাদের সূর্য কোন টাইপ তাহলে?” পুলুদার সাহসের বেলুন ফুলেফেঁপে উঠেছে।

“সূর্য জি-টাইপ, অালোর রঙ হলুদ।”

“মানে দূর থেকে দেখলে হলদে লাগবে?”

“ঠিক হলদে লাগবে না, বরং হলদেটে শাদা লাগবে।”

“কিন্তু অাপনি যে বললেন…”

পুলুদার অবজেকশানকে মাঝপথে লুফে নিয়ে বিধুজ্যাঠা বলে চললেন, “জি-টাইপ হলদে মানে স্পেক্ট্রাল টাইপ হলদে। স্পেক্ট্রামে প্রধান হল হলদে। সূর্যের অালো কি হলদে লাগে, না শাদা লাগে?”

“শাদা লাগে,” পুলুদার অবিলম্ব উত্তর।

“একটু হলদেটে ভাব রয়েছে, টিউবলাইটের মত ঠিক নীল-শাদা নয়,” অামার একটু ভেবেচিন্তে পেশ।

বিধুজ্যাঠার মুখ অাবার প্রসন্ন, চাহনি অামার দিকে। প্রেস্টিজে অামার কান চুলকোতে লাগলো।

“রাইট, পার্শে। টিউবলাইট কিনতে গেলে দেখবে অাজকাল ওয়ার্ম ডেলাইট পাওয়া যায়। ট্যাম্পাটা ঝুড়ি ঝুড়ি কেনে, অার স্টাডিতে লাগায়। কতবার বলেছি, চোখ খারাপ হয়ে যাবে, কে কার কথা শোনে।”

ট্যাম্পা হল বিধুজ্যাঠার অাপন ভাইপো। ক্যামেরাবিশারদ, সাইকেলপাগল ভবঘুরে লোক। ইদানীং গ্যাংটকবাসি।

“যাই হোক, ট্যাবির তারা খালি চোখে দেখা যায় না, কেপলার নামক মহাকাশে যে টেলিস্কোপটি অাছে, সেটি দিয়ে এর অনেক স্টাডি হয়েছে। অবশ্য পৃথিবীর টেলিস্কোপ দিয়েও একে স্বচ্ছন্দে দেখা যায়।”

“কিন্তু তার সঙ্গে ডাইসন গোলকের সম্পর্ক কোথায়?” কুট করে ফুট কাটাটা পুলুদার চিরকালের অভ্যেস।

“অাসছি তাতে,” একটা অাঙুল তুলে পুলুদাকে থামিয়ে বিধুজ্যাঠার বলে চললেন, “তার অাগে ট্যাবির তারা নাম কেন সেটা জানা প্রয়োজন। ট্যাবি হচ্ছেন ট্যাবেথা বোয়াজিয়ান, ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের পোস্ট-ডক ফেলো। গত সেপ্টেম্বর মাসে “Where’s the Flux?” বলে একটা পেপার বেরিয়েছিলো অার্কাইভে…অার্কাইভ কী কেউ জানো?”

এইবারে অামার দুজনেই ঘাড় নাড়লুম। না, জানি না।

“ইংরিজি এ-অার-চি-এইচ-অাই-ভি-ই archive নয়, এ-অার-কাই-ভি-ই, arXiv। কাই বা X হল গ্রীক অক্ষর। বিজ্ঞানীরা গবেষণা করে তার ফল পেপার লিখে ছাপায় এটা জানো তো?”

এটা অামি জানতুম। হাত তুলে হ্যাঁ বললাম। পুলুদা চুপ। সাহসের থলি অাবার চুপসে গেছে।

“সে পেপার ছাপে কোথায়?”

“জার্নালে?” অান্দাজে মেরে দিলুম। নকুড়বাবুর গল্পে ‘কসমস’ নামক জার্নালের জন্য শঙ্কু লেখা লিখছিলেন। মিলেও গেল।

“হ্যাঁ। বেশিরভাগ বিষয়ের গবেষণাপত্র বা পেপার জার্নালেই বেরোয় বটে। কম্পিউটার সায়েন্স একটু অালাদা, ওদের পেপার কন্ফারেন্সে বেরোয়। সে যাকগে, তো এই যে জার্নালে বেরোয়, কে ছাপায়?”

এবার পুলুদাও হাত তুললো। “প্রকাশক। মানে সেই জার্নালের প্রকাশক।”

“হ্যাঁ, কিন্তু তারা জানবে কীকরে কোন পেপার ঠিক অার কোনটা ভুল? ধরো অঙ্কের পেপার ছাপবে, উপপাদ্যের প্রমাণটা–থিওরেমের প্রুফটা–যে ঠিক না ভুল, কে বিচার করবে?”

“প্রকাশক?”
“অন্য কোন গবেষক?”

দুজনেই একসঙ্গে উত্তর দিলুম। পুলুদা হাফ সেকেন্ড অাগে উত্তর দিয়েছে বলে ওরটা অাগে লিখলুম।

“ইলিশ কারেক্ট। গবেষণার সেই বৃত্তে, সেই ফীল্ডে এক্সপার্ট কাউকে দিয়ে রিভিউ করানো হয় অাগে পেপারটা। একে বলে পিয়ার রিভিউ। পাশ করলে তারপর ছাপা হয়। এক বা একাধিক রিভিউয়ার থাকতে পারে।”

বেশ। বুঝলাম। নোটেড।

“কিন্তু জার্নালে ছাপলে সাধারণ মানুষের পক্ষে তা পড়ে খুবই কঠিন, কেননা জার্নালগুলো দাম সাংঘাতিক। তাই তার বদলে অাছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ের অার্কাইভ।”

“কর্নেল? গোয়েন্দার নামে ইউনিভার্সিটি? মুস্তাফা সিরাজের নাম এতদূর পৌঁছে গেছে?”

ঘড়িতে ঢংঢং করে একটা বাজলো। এছাড়া টুঁ শব্দটি নেই। অামি স্পিকটি নট, নেলোদা উইন্ড, বিধুজ্যাঠার মুখ অাষাঢ়ে কালো মেঘ। পুলুদা খানিকক্ষণ অামাদের দুজনের মুখের দিকে তাকিয়ে বুঝলো, কেস গড়বড়। সারেন্ডার অ্যান্ড উইথড্র ফ্ল্যাগটা টুং-কিট শব্দে খাড়া হওয়া জানান দিল।

“এ কর্নেল অার্মি কর্নেল নয়,” বিধুজ্যাঠার গলা তিন স্কেল নামিয়ে অার ভল্যুম তেরো ডেসিবেল বাড়িয়ে বললেন। “যে যুদ্ধ করে সে সি-ও-এল-ও-এন-ই-এল (colonel), পড়লে মনে হবে কোলোনেল, উচ্চারণ কর্নেল কিংবা কার্নেল। বিশ্ববিদ্যালয়টি কর্নেল, সি-ও-অার-এন-ই-এল-এল (cornell), নিউ ইয়র্কের ইথাকায় অবস্থিত। ১৮৬৫ সালে এজরা কর্নেল ও অ্যান্ড্রু ডিকিনসন হোয়াইট এর প্রতিষ্ঠা করেন। এই…”

“নিউ ইয়র্কের ইথাকা মানে?” এবার প্রশ্ন করার পালা অামার, কেননা পুলুদা ভীষণভাবে রণে ভঙ্গ দিয়েছে। “নিউ ইয়র্ক একটা শহর না? ইথাকা কি পাড়া, কলেজ স্ট্রীট বা ভবানীপুর গোছের?”

“অন্য কেউ এই প্রশ্ন করলে বলতাম গুড কোয়েশ্চেন। নট ফর ইউ। ম্যাপ-ট্যাপ দেখা হয়, নাকি এতদিন ভূগোল নিয়ে যা বললাম সবই ভুলে গেছো হে কাৎলাদেবী? নিউ ইয়র্ক কি শুধুই একটি শহর?”

অামি স্রেফ মিইয়ে গেলুম। ইশশ, এই তো কিছুদিন অাগেই পড়লাম হিলারি ক্লিন্টন বার্নি স্যান্ডার্সকে হারিয়ে নিউ ইয়র্কের প্রাইমারিটা জিতলো। ছ্যা ছ্যা, ওটা যে পঞ্চাশটার মধ্যে একটা সেটা বেমালুম ভুলে গিছলুম। পুলুদা দেখলাম একটু নড়েচড়ে বসলো, বকা খাওয়া ডেলিগেট হয়ে যাওয়াতে এন্থু পেয়েছে মনে হল। বিধুজ্যাঠা ঘন্টি বাজিয়ে নেলোদাকে ডেকে হরলিক্সের চতুর্থ কাপটি চেয়ে নিলেন। নেলোদা দেখলুম রেডিই ছিল, ঘন্টি বাজতেই কাপ হাতে হাজির। হরলিক্সে চুমুক দিয়ে বিধুজ্যাঠার মেজাজ খুশ, অার অামিও হাঁপ ছেড়ে বাঁচলুম।

“ইথাকা নিউ ইয়র্ক রাজ্যের দক্ষিণ দিকের একটি শহর। কর্নেল ইউনিভার্সিটি ছাড়াও এখানে বৌদ্ধদের নামগেয়াল মনাস্টারি অবস্থিত। উত্তর অামেরিকায় দলাই লামার প্রধান অাবাস এখানেই।”

“দলাই লামা? তিনি অামেরিকাতেও থাকেন?” পুলুদা অার তর সইতে পারলো না।

“দলাই লামা সারা পৃথিবী ঘুরে বেড়ান, তাঁর শান্তির বাণী প্রচার করেন। যাই হোক, যা বলছিলাম। অার্কাইভ। কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ের অনলাইন গবেষণাপত্রের সংগ্রহশালা। ধরো তুমি গবেষক…”

বিধুজ্যাঠা কথাটা বলে ফেলে খানিকক্ষণ চুপ করে থাকলেন। পুলুদার পক্ষে গবেষণা কোনকালেও সম্ভব কিনা, তার সম্ভাব্য সম্ভাবনাই বোধহয় মনের মধ্যে ঝালিয়ে নিচ্ছিলেন। মুখ দেখে মনে হল না সম্ভাবনা উজ্জ্বল।

গলা খাঁকারি দিয়ে ট্র্যাক খানিক পাল্টে বিধুজ্যাঠা বলতে লাগলেন, “ধরো রাজীব বা সন্দীপ, এরা পেপার লিখে সেটা অার্কাইভে অাপলোড করলো। বাকিরা, মানে ধরো অামি, সেটা তখন বিনামূল্যে ডাউনলোড করে পড়ে নিতে পারলাম। রাজীব-সন্দীপের গবেষণা ছড়িয়ে পড়লো, তাদেরও লাভ, পাঠকেরও লাভ।”

এখানে বলে রাখা ভাল, রাজীব কুমার গোয়েল অার সন্দীপ সিং বিধুজ্যাঠার অতি পুরনো বন্ধু। দুজনেই গবেষক, পদার্থবিদ্যার প্রফেসর। সুযোগ পেলেই এদের সুখ্যাতি ভদ্রলোক করে থাকেন।

পুলুদা এদিকে দেখি প্রাণপণে অার্কাইভ ব্যাপারটা বোঝার চেষ্টা করছে। বলেই ফেললো, “মানে অাপনি বলছেন জার্নালে পেপার ছাপানো ওই দেশ পত্রিকায় লেখা ছাপানোর মতো, পড়তে হলে ম্যাগাজিনটা কিনতে হবে। অার অার্কাইভ অনেকটা ফেসবুকে কি ব্লগে পাবলিশ, ফ্রীতে পড়া যায়।” লেখক লোক, পুলুদার পক্ষে ওই লেখালেখির বৃত্ত থেকে বেরনো মুশকিল। বিধুজ্যাঠার দেখলাম উপমাটা মনে ধরলো।

“খানিকটা সেরকমই বটে। তবে কি, ফেসবুকে বা ব্লগে লেখা দিলে যদি কেউ সে লেখা নকল করে নিজের নামে চালিয়ে দেয়, তাহলে কিছু করার নেই। অার্কাইভে সেটা করা একটু মুশকিল। যাই হোক, ট্যাবির তারায় ফেরা যাক। কেপলার নামক যে মহাকাশে অবস্থিত টেলিস্কোপটার কথা বলছিলাম–হাবলের উত্তরসূরী বলতে পারো–তাকে তাক করা হয়েছিলো এই বিশেষ তারাটির দিকে। তা থেকে যে সব তথ্য পাওয়া গিয়েছিলো সেইসব বিশ্লেষণ করেছিলেন বহু শখের এবং পেশাদার জ্যোতির্বিদ। পেপারটির নাম অাগেই বলেছি, “Where’s the Flux?”। প্রায় তিরিশজন বিজ্ঞানীর নাম জড়িয়ে অাছে পেপারটির সঙ্গে, কিন্তু প্রথম নামটি ট্যাবিথা বোয়াজিয়ানের। তাই ওনার নামেই তারাটার নাম, Tabby’s star অথবা ট্যাবির তারা।”

এতটা বলে বিধুজ্যাঠা একটু দম নিতে থামলেন। হরলিক্স? না, অাবার শুরু করেছেন।

“তো ট্যাবির তারা নিয়ে ফিল প্লেটের এত মাথাব্যাথা কেন? এর কারণ বেশ অদ্ভুত। তোমরা কি জানো যে কিছু তারার ঔজ্জ্বল্য ওঠানামা করে? তাদেরকে ভেরিয়েবেল স্টার বলে?”

এটাও জানতুম না। তারার অাবার ঔজ্জ্বল্যের হেরফের ঘটবে কীকরে? মানে কতদিনে ঘটবে…”ওঠানামাটা কতদিনে করে? মানে দিনে মাসে বছরে নাকি শবছরে?”

“গুড কোশ্চেন ট্যাংরা। সেফাইড ভেরিয়েবেল বলে একধরনের তারা অাছে। এদের ঔজ্জ্বল্যের হেরফের এক-দুমাসের মধ্যেই ঘটে। চোখে টেলিস্কোপ লাগিয়ে বসে থাকলে মাস তিনেকের মধ্যে সুন্দর প্যাটার্ন পাওয়া যায়। সেফাইডদের ঔজ্জ্বল্য খুব নিয়ম করে বাড়ে-কমে, এবং ওদের দিয়ে দুরত্ব মাপা যায়।”

“দূরত্ব?”
“কীভাবে?”

অাবার অামাদের জয়েন্ট প্রশ্ন।

“সে বোঝাতে গেলে তো অারও সময় চাই। বোঝাবো, অারেকদিন। তার অাগে ট্যাবির তারার ব্যাপারটা বলে নি?”

এতে হ্যাঁ ছাড়া অার কিই বা বলা যায়।

“ট্যাবির তারার ঔজ্জ্বল্যে বা ব্রাইটনেসে প্রচুর হেরফের দেখা গিয়েছে। এতটাই যে, এটা নিয়ে বেশ হইচই পড়ে গেছে জ্যোতির্বিদদের মধ্যে। সেই হেরফের কেন বুঝতেই কেপলারকে ব্যবহার করে…অাচ্ছা, কেপলার কে ছিলেন?”

অামার হাত সটান উঠে গেল। পুলুদা চুপ।

“কেপলার, অর্থাৎ নিকোলাস কেপলার ষোড়শ শতাব্দীর অ্যাস্ট্রোনমা…জ্যোতির্বিদ। সূর্যের চারপাশে গ্রহগুলি যে বৃত্তাকারে না ঘুরে এলিপস…উপবৃত্ত অাকারে ঘুরছে, উনিই প্রথম বলেন।”

“নিকোলাস না, ইয়োহানেস। কোপারনিকাসের নাম ছিল নিকোলাস। বাকিটা ঠিকই বলেছো,” ভুরু নাচিয়ে বিধুজ্যাঠা বললেন, মুখে হালকা হাসি।

ছাতিটা ইঞ্চিতিনেক বেড়ে গেলো।

বিধুজ্যাঠা বলে চললেন, “ট্যাবিথা বোয়াজিয়ান এবং ওনার সহগবেষকরা কেপলার থেকে পাওয়া তথ্য বিশ্লেষণ করেন। তারাটির ঔজ্জ্বল্যের এত হেরফের কেন, এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার চেষ্টা তারা করেন।”

“উত্তর কিছু পাওয়া গেল?” পুলুদার প্রশ্ন।

“ধূমকেতু দেখেছো কখনো?” বিধুজ্যাঠার পাল্টা প্রশ্ন।

দুজনেই মাথা নাড়লাম। কলকাতার পলিউশনে অার ধূমকেতু!

“হেল-বপ তো তোমার জন্মের অাগে, তাই না ত্যালাপিয়া?”

দুঃখিতভাবে মাথা নাড়লাম, অাবার। পুলুদা বললো, “অামি খুব ছোট ছিলাম। বছর পাঁচেক বয়স তখন। দাদু দেখিয়েছিলেন ছাদে উঠে।”

বিধুজ্যাঠা বললেন, “হ্যাঁ, সাতানব্বই সালে এসেছিল হেল-বপ। অামেরিকার নিউ মেক্সিকো অার অ্যারিজোনার দুই শখের জ্যোতির্বিদ প্রায় একইসঙ্গে অালাদা অালাদা ভাবে অাবিষ্কার করেছিলেন। সাম্প্রতিককালের সবচেয়ে উজ্জ্বল ধূমকেতু। পরিচিতির দিক দিয়ে অবশ্য হ্যালির ধূমকেতু বেশি নাম করা। মার্ক টোয়েনের সঙ্গে হ্যালির ধূমকেতুর অদ্ভুত সম্পর্ক ছিল। কেউ বলতে পারবে, কী সেটা?”

উত্তরটা জানতুম। কিন্তু পুলুদাও দেখি হাত তুলেছে। মনে পড়লো, কি একটা গোয়েন্দা গল্প লিখতে গিয়ে এই নিয়ে একটু-অাধটু রিসার্চ করেছিল বটে। অবিশ্যি তার সোর্সও এই বিধুজ্যাঠাই ছিলেন।

“মার্ক টোয়েন জন্মান ১৮১০ সালে, তখন অাকাশে হ্যালির ধূমকেতু। মারা যান ছিয়াত্তর বছর বাদে, ১৮৮৬ সালে, তখন ধূমকেতু অাবার ফিরে এসেছে।”

“বাঃ পুলুরাম, একদম ঠিক বলেছো তো। ভেরি গুড ভেরি গুড, এরকম জেনারেল নলেজ থাকা খুব জরুরি,” বিধুজ্যাঠা মোস্ট ইম্প্রেস্ড। পুলুদার গোঁফ থাকলে সেটা নির্ঘাত তিরতির করে নড়তো।

“যাই হোক, ধূমকেতু। ট্যাবির তারার চারপাশে এককালে অনেক ধূমকেতু ছিল বলে বোয়াজিয়ান এট অল মনে করছেন। কিছুকাল অাগে হয়তো কাছ দিয়ে কোন তারা যাওয়ার ফলে সেই ধূমকেতু লেমিংদের মতো একজোট হয়ে তারার কাছে এসে পড়ে। ডিস্টার্বেন্স হলে যা হয় অার কি, গোলমার মারকাটারি ব্যাপার। এইসব ধূমকেতু হয়তো একে অপরের ঘাড়ের উপর পড়ে ধাক্কাধাক্কি করে ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেছে, এবং তারপর এলোপাথাড়ি ঘুরে বেড়াচ্ছে তারাটির চারিদিকে। এমনিতেই ধূমকেতুদের কক্ষপথ বেশ গোলমেলে হয়, বেপরোয়া ধাক্কাধাক্কির ফলে তা অারো কেওটিক হয়ে গেছে। এর ফলে তারার অনেকটা অালো ব্লক হয়ে যাচ্ছে সম্পূর্ণ উল্টোপাল্টাভাবে, অার তাই ঔজ্জ্বল্যে হেরফেরও ঘটছে সম্পূর্ণ এলোপাথাড়িভাবে। কী মনে হয়, এটা ভাল প্রস্তাব?”

পুলুদার দেখলাম গভীর ভাবনায় পড়ে গেছে। অামার তো বেশ ভালই লাগলো অাইডিয়াটা। মাথা নেড়ে সন্মতি জানালুম। বিধুজ্যাঠা হরলিক্স শেষ করে অামাদের দিকে তাকিয়ে গম্ভীরভাবে বললেন, “গ্রহণ কাকে বলে?”

গ্রহণ? মানে সূর্যচন্দ্রগ্রহণ? পুলুদাও জানে, তাই ওকেই বলতে দিতাম, কিন্তু দেখি সে চোখমুখ কুঁচকে কী না কী ভাবছে, তাই পুট করে বলে ফেললাম, “চাঁদ পৃথিবী অার সূর্যের মাঝামাঝি এসে গেলে, মানে এক লাইনে এসে গেলে সূর্যকে পুরোটা বা কিছুটা ঢেকে দেয়। একে বলে সূর্যগ্রহণ। অার অন্যদিকে পৃথিবী চাঁদসূর্যের মাঝখানে ভাগ বসালে চাঁদ অাবার সূর্যের অালো পায় না, তখন হয় চন্দ্রগ্রহণ।”

বিধুজ্যাঠার মুখ দেখে মনে হলো ঠিকই বলেছি। পুলুদা দেখলাম অামার দিকে অদ্ভুতভাবে তাকিয়ে অাছে।

“বেশ বেশ, চিংড়ি ঠিকই বলেছে। অাচ্ছা, পৃথিবী অার সূর্যের মধ্যে চাঁদ ছাড়া অার কী অাছে?”

এবারও দেখলাম পুলুদা চুপ। অগত্যা, “শুক্র গ্রহ অার বুধ গ্রহ। যদ্দূর জানি এদের কোন উপগ্রহ নেই।” অাছে কী?

“রাইট, এদের কোন উপগ্রহও নেই, তাই এরাই অাছে শুধু,” বিধুজ্যাঠা অামার কথা কনফার্ম করলেন। “এ ছাড়া ধূমকেতু ইত্যাদি অাসতে পারে বটে, কিন্তু এদেরকে এক্ষুণি ধর্তব্যের মধ্যে অানছি না। এবার ধরো, শুক্র বা বুধ যদি পৃথিবী অার সূর্যের মধ্যে এসে পড়ে…”

“অামি ঠিক এটাই এতক্ষণ ভাবছিলাম,” পুলুদার সাডেন বোমা। বেশ সাডেন, এবং বেশ বোমা। অাবিষ্কার করলাম অামি এর সাডেননেস এবং বোমেত্ত্বর ধাক্কায় কাউচে লাফিয়ে উঠে পড়েছি। বিধুজ্যাঠা দেখলাম লীস্ট বিব্রত। অ্যাট অল যে হয়েছেন সেটা তাঁর বাঁকা বাঁ ভুরু দেখে বোঝা যাচ্ছে।

“কী ভাবছিলে পুলু, বুঝিয়ে বলো,” ভুরু নাচিয়ে বিধুজ্যাঠার প্রশ্ন।

“ট্যাবির তারার কোন গ্রহ নেই?” পুলুদার পাল্টা প্রশ্ন।

“থাকতে পারে, জানা নেই…অন্তত অামার জানা নেই,” বিধুজ্যাঠার গম্ভীর উত্তর।

“যদি থাকতো,” পুলুদা এক্সাইটেডভাবে বলে যেতে লাগলো, “অার যদি যথেষ্ট বড় হতো, অার যদি পৃথিবীর অার ট্যাবির মাঝখানে এসে পড়তো…?”

“যদিগুলোর সংখ্যা একটু বেশি হয়ে যাচ্ছে না পুলু? এতগুলো যদি থাকলে সে হাইপথিসিস নিয়ে সন্দেহ জাগে। অকাম্স রেজারে অাটকে যায়।”

এবার অামার পালা। “অকাম্স রেজার কী?”

“একটা তত্ত্ব। কোন কঠিন সমস্যার একের অধিক সমাধান থাকলে বেশিরভাগ সময় যেটা সবচেয়ে সহজ সমাধান সেটাই ঠিক হয়,” বিধুজ্যাঠা বোঝালেন। “ধরো তুমি দেখছো দূরে একটা পোড়ো বাড়ি, তার জানালা অাপনা থেকে খুলছে অার বন্ধ হচ্ছে, খুলছে অার বন্ধ হচ্ছে। তুমি কী ভাববে, কেন হচ্ছে?”

“ভূত।” পুলুদা।
“হাওয়াবাতাস।” অামি।

“ভূত বলে কি সত্যিই কিছু অাছে?” বিধুজ্যাঠা পুলুদার দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করলেন। “প্রমাণ পেয়েছো কখনও?”

“হতেও তো পারে,” পুলুদা ডিফেন্ড করলো। “দেয়ার অার মোর থিংস ইন হেভেন অ্যান্ড অার্থ দ্যান অার ড্রেম্ট অফ ইন ইয়োর বায়োলজি।”

বিধুজ্যাঠা চুপ, ভুরুটা সেকেন্ড ব্র্যাকেট। অামি প্রায় হাততালি দিতে যাচ্ছিলাম, শেষ শব্দটি শুনে হাতদুটি ঠিক দুইঞ্চি দূরত্ত্বে অাটকে গেলো। পুলুদা শুনেছিলাম ইদানীং প্রিয়তোষদার নাটকের গ্রুপে জয়েন করার চেষ্টা করছিল, তাই সময় পেলেই পুলিদির কাছে তালিম নিচ্ছিল। তালিমটা যে ঠিক সম্পূর্ণ হয়নি, এটা পুলিদিকে জানাতে হবে, মেন্টাল নোট করে রাখলাম।

“ওটা ফিলোজফি হবে, বায়োলজি নয়,” কারেকশানটা নস্যির মতো ঝেড়ে ফেললেন বিধুজ্যাঠা। পুলুদা শেক্সপীয়ার অাওড়াতে পেরে খুব এক্সাইটেড হয়ে পড়েছিল, খানিক মিইয়ে গেলো।

“ভূত? হ্যাঁ, ভূত বলে কোন বস্তু যদি বাস্তবে থাকে তাহলে জানালা খোলা বন্ধ হওয়ার পিছনে সেটাও নিশ্চই একটা কারণ হতে পারে। কিন্তু ভেবে দেখো পুলু, তোমার উত্তরের বদলে কইমাছের জবাবটা অনেকটা বিশ্বাসযোগ্য নয় কী? ভূতকে জানালা খোলাবন্ধ করতে নিজের চোখে কজন লোক দেখেছে? কিন্তু হাওয়ার বেগে জানালা খোলাবন্ধ হয়, এ অভিজ্ঞতা নিশ্চই সকলেরই অাছে।”

পুলুদা মাথা নাড়লো। হ্যাঁ, অাছে বৈকি। নিদারুণভাবে অাছে। অামারও মনে পড়লো সে কাহিনী। সময় পেলে নিশ্চই শোনাবো একদিন।

“বাবু তো জানলা বন্ধ করতেই দেন না, খালি বলেন, দম অাঁটকে অাসছে দম অাঁটকে অাসছে। সেইদিন ঝড় হলো, কি ঝঞ্ঝাট, সারাবাড়িময় ধুলোবালিশুকনোপাতা। অার এদিকে যা বাতাসের বেগ, খড়খড়ি তো একেবারে পাগল হয়ে উঠেছে। অামি ভাবলুম ভেঙেই না যায়।”

নেলোদা এমনি অামাদের অালোচনায় খুব একটা মুখ খোলে না। অাজ হঠাৎ বলে ফেলে দেখি নিজেই কেমন লজ্জা পেয়ে গেলো।

“নেলোর অভিজ্ঞতা নিশ্চই তোমাদেরও হয়েছে,” নেলোদার দিকে চাউনাগ্নিবর্ষণ করে বললেন বিধুজ্যাঠা। “ভূতের অভিজ্ঞতা অাশা করি হয়নি। হয়ে থাকলে জানিও, ভৌতিক পেশেন্ট নিয়ে মেরথেডেসের অনেকদিনের ইচ্ছে গবেষণা করার, এয়ারমেলে পাঠিয়ে দেবো।”

ডক্টর মেরথেডেস রামোন সাইকায়াট্রিস্ট, বার্সেলোনায় বসবাস। অামি ডাকি মার্সেডিস মাসি বলে। খুব ভাল মুগডাল রান্না করতে পারেন।

“যাই হোক, অকাম্স রেজার। এখানে দুটো উত্তরই সম্ভব, কেননা ভূত যে অাছে সেটা প্রমাণ করা না গেলেও ভূত যে অাদপে নেই বা থাকতে পারে না কোনমতেই সেটাও ঠিক প্রমাণ হয়নি এখনও অবধি। কিন্তু হাওয়ার বেগে জানালা নড়েছে, এটা বিশ্বাস করা সহজ, উত্তরটার মধ্যে সিম্পলিসিটি অাছে, তাই অকাম্স রেজার অনুযায়ী এটাই সঠিক উত্তর হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল। সেরকমই, ট্যাবির তারার গ্রহ থাকতেই পারে, কিন্তু তাকে বেশ বড় হতে হবে, অার তাকে ঠিক ট্যাবির তারা অার পৃথিবীর মাধখানে থাকতে হবে। এতগুলো শর্ত পূরণ করা মুশকিল, যদিও অসম্ভব নয়। তার উপর ট্যাবির তারার ২২% অালো কমছে দেখে…”

নম্বরটা কেমন বেশি বেশি শোনালো। ২২% অালো কমছে, একটা তারার?

“হ্যাঁ, বাইশ শতাংশ একটু বেশিই বটে।”

ওমা, জোরে জোরে বলে ফেলেছি?

“বৃহষ্পতি চেষ্টাচরিত্র করেও এক শতাংশের বেশি অালো অাটকাতে পারবে না। এ ছাড়াও, বৃহষ্পতির চেয়ে খুব বড় গ্রহ অাদপে পাওয়া যায় না, তারা ব্রাউন ডোয়ার্ফ স্টার হয়ে যায়। তাই পুলুর অাইডিয়া বা হাইপথিসিস ভালো হলেও এক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়।”

“তাহলে সেই ধূমকেতুই?” পুলুদার গলা নিরাশ।

“তাহলে সেই ধূমকেতুই,” অাশার শেষ স্ফুলিঙ্গে একবালতি ঠান্ডাজল ঢেলে বিধুজ্যাঠার মন্তব্য।

দুপুরের গপ্পো শেষ ভেবে পেট কুঁইকুঁই করছিল, অমলেট-ফমলেট হজম, নেলোদার স্পেশ্যাল ধোকার ডালনার খোশবু অনেকক্ষণ থেকেই পাচ্ছি। প্লেট-টেবিলক্লথ-কাঁটা-চামচ-ছুরি ইত্যাদি লাগাতে যাবো বলে উঠি-উঠি করছি, পুলুদাও একটা বড়সড় হারিকেন অাকারের দীর্ঘশ্বাস ফেলতে যাচ্ছে, এমন সময় বিধুজ্যাঠার বিস্ফোরণ।

“তবে কি, অারেকটা সম্ভাবনা অাছে বটে।”

স্ফুলিঙ্গটা অাবার মাথাচাড়া দিচ্ছে নাকি?

“ওই দূরে একটা টাওয়ারে রোজ রাতে একটা লাল অালো জ্বলতো, রেগুলার। অাজকাল অার দেখতে পাই না। কেন? কী মনে হয়?”

ঠিক কথা। লাল অালোটা অামিও দেখেছি।

“অালোটা খারাপ হয়ে গেছে?” পুলুদার কিংস পন ওপেনিং।

“অালো দিব্যি অাছে। নেলোকে ছাতে পাঠিয়েছিলাম, সে রিপোর্ট দিয়েছে,” বিধুজ্যাঠার সিসিলিয়ান ডিফেন্স।

“কোন নতুন বাড়ি উঠছে?” অামার কুইন্স গ্যাম্বিট।

“একদম কারেক্ট ত্যালাপিয়া,” বিধুজ্যাঠার কুইন্স গ্যাম্বিট অ্যাকসেপ্টেড। “একটা নতুন হাইরাইজ উঠছে, তাই অালোটা অাটকে গেছে। তো পুলু, এর থেকে কী বুঝছো?”

“প্রোমোটারদের অাজকাল বড়ই রমরমা,” পুলুদার ম্যাটার-অফ-ফ্যাক্ট অফারিং।

“হুম, নো ডাউট। কিন্তু ট্যাবির তারার ক্ষেত্রে যদি এই একই লজিক লাগাও তাহলে কী দাঁড়ায়ে?”

এমনিতে রাশভারি গুরুগম্ভীর লোককে এরকম ঝিলিক-মারা চোখে মিটিমিটি তাকাতে এই প্রথম দেখলাম। যেন প্রশ্নটা করে কী একটা দারুণ মজা পেয়েছেন, উত্তরটাও ব্যাপক মজারু, পর্দা ফাঁস হবে পরের সীনেই, টানটান উত্তেজনা।

“সেটি,” বিধুজ্যাঠার মাইক্রোহিন্ট।

“কোনটি?” পুলুদা এদিক-ওদিক চাইছে। না বোঝাই স্বাভাবিক। মিশরের ফারাও প্রথম র‍্যামসেসের পরে সেটি ফারাও হন, কিন্তু এটা পুলুদার জানার কথা না। কার্ল সেগানের নামও শুনেছে বলে তো মনে হয় না।

অামার মুখের দিকে তাকিয়ে বিধুজ্যাঠা বোধ করি বুঝতে পারলেন, ঠিক রাস্তাতেই হাঁটছি। দেরাজ থেকে নস্যির ডিবেটা বের করে বাটিকপ্রিন্টের সিল্কের রুমালটা বাগিয়ে টুপ করে একটিপ নস্যি নিলেন। এর অর্থ, মুড ভাল। এতক্ষণ বাদে হার্ট অফ দি ম্যাটারে এসেছেন।

“পার্শে, ওয়েল ডান,” প্রথমেই ভোকাল পিঠচাপড়ানি। অামি গদগদ, পুলুদা হাঁ। হওয়ারই কথা, কোন কথা না বলেই “পার্শে” লেভেলে প্রোমোটেড হওয়া এই প্রথম।

“সেটি, অর্থাৎ সার্চ ফর একস্ট্রা টেরেস্ট্রিয়াল ইন্টালিজেন্স। এস-ই-টি-অাই, SETI। কার্ল সেগান এর প্রতিষ্ঠাতা। পৃথিবী ছাড়া অন্য কোন গ্রহে প্রাণ অাছে কি না তার খোঁজের জন্য এই সংস্থার উৎপত্তি।”

“ট্যাবির তারায় ইটি অাছে?” পুলুদা নড়েচড়ে বসেছে। এতক্ষণে ব্যাপারটা বুঝেছে বলে মনে হল।

“ইটিসেটি অার করতি হবি নি, খেবার ঠান্ডা হচ্ছি, খেবা এসো।”

নেলোদা উপর কখনো কখনো দিশি অ্যাক্সেন্টের ভূত ভর করে। পুলুদা বলে শক ভ্যালুর জন্য। অামার কাছে এটা হেডসারীয় ডাক, এর মানে নেলোদা সিরিয়াস, অার দেরি বরদাস্ত করবে না। বিধুজ্যাঠাও এই ডাককে অগ্রাহ্য করতে পারেন না।

“নেলো ঠিকই বলেছে, প্রায় অাড়াইটে বাজে, এত দেরি করে খেলে শরীর খারাপ করবে। যাও খেয়ে নাও, অামারও কিছু কাজ অাছে। পরের দিন ট্যাবির তারার বাকি কাহিনী অালোচনা হবে, কেমন?”

বিধুজ্যাঠাও নেলোদাকে সমর্থন করছেন দেখে বুঝলাম, বিধুজ্যাঠারই এখন কোন কাজ অাছে। নয়তো খাবার টেবিলেই বাকি কথা সারতে পারতেন। ট্যাবির তারার পরের অংশ পরের দিনই জুটবে, এই অাশায় সুড়সুড় করে নেলোদাকে ফলো করলাম। ঘর থেকে বেরোচ্ছি, এমন সময় বিধুজ্যাঠার ফোন বেজে উঠলো। মোবাইল ব্যবহার করেন না, বলেন ওতে নাকি কাজের ক্ষতি হয়। ঘরেই ল্যান্ডলাইন, স্পষ্ট শুনতে পেলুম ফোনটা তুলে বললেন, “হ্যালো, বিধুভট্ট স্পীকিং। কে, ডক্টর বৈদ্য? বলুন বলুন, এনি প্রবলেম?”

(বাকিটা পরের অংশে)


সোঘো, সোয়াপাঁচটা, সূর্য হলদেটে শাদা থেকে সোনালির দিকে যাচ্ছে, এগারোই মে, ২০১৬ সাল, সিটি অফ জয়।

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s