— হারাল্ড বোড কে ছিলেন জানো?

হয়েছেটা কী, গতকাল…না, গতপরশু, অর্থাৎ পয়লা তারিখ পুলুদা টিকিট কেটে অামাকে সিনেমা দেখাতে নিয়ে গিছলো। পুলুদা! টিকিট কেটে? মানে গাঁটের পয়সা খরচা করে টিকিট কেটে সিনেমা…!

বেসিকালি মা’র এইরকম একটা রিয়্যাকশন হয়েছিল।

“অসম্ভব!” মা ডিক্লেয়ার করেছিল, ক্যাপ্টেন যেভাবে ইনিংস ডিক্লেয়ার করে একদমই সেরকমভাবে নয়।

“সম্ভব,” হাই তুলতে তুলতে অামি বলেছিলুম, “কেসটা বুঝতে হবে। মানে নাটকের এভ্রি চরিত্রকে অাগে ছকতে হবে, নয়তো বুঝবে না।”

“কী অাবোলতাবোল বকছিস?” বিছানার চাদর ঝাড়তে ঝাড়তে মা বলেছিল। “ঘুম পেয়েছে তোর, বিছানা প্রায় রেডি, ঘুমিয়ে পড়।”

“অাহা,” হাত-পা নেড়ে অামি বলি, “অাগে শোনোই না। পুলুদার পুলিদির প্রতি মাইল্ড ব্যাথা অাছে।”

খ্যাংড়া ঝ্যাঁটা দিয়ে খাট ঝাড়ছিল মা। কথাটা শোনার সময় অান্দ্রে অাগাসিসুলভ একটা ব্যাকহ্যান্ড নিতে যাচ্ছিল, ফুল ব্যাপারটা মাথায় রেজিস্টার হতে হতে সুইংটা প্রায় শেষ হয়েছিল, কাইনেটিক এনার্জি ভর করে ট্যানজেনশিয়ালি ঝাঁটাটা সাঁই শব্দে গিয়ে মামার শখের ডোকরার ফুলদানিটাকে সোজা অ্যাম্বুলেন্সে পাঠাতে পাঠাতে একটুর জন্য মিস করলো।

যাই হোক, সে ড্রামার পুরো ডেস্কি না হয় অারেকদিন হবে। এখনকার মতো সামারিই যথেষ্ট। পুলুদা হ্যাজ মাইল্ড ব্যথা অন পুলিদি, পুলিদি হ্যাজ নো ব্যাকব্যথা, অন্তত গ্রেপভাইন ফীডব্যাক তাই বলছে। তা সত্ত্বেও পুলুদা হার মানে না। তাই পয়লা তারিখে দু’খান সিনেমার টিকিট কিনেছিলো। কেটে সোজা পুলিদির বাড়ি। পুলিদি বোধহয় বাড়ি ছিল না, পুলিদির দিদিও ছিল না, অার পুলিদির মা সম্ভবত রেওয়াজ করছিলেন।

পুলুদা এদিকে প্রাণপণে বেল বাজিয়ে চলেছে। শেষে কাকিমার রেওয়াজ থামিয়ে ধীরেধীরে এসে দরজা খুলেছিলেন।

সীনটা কল্পনা করো। দরজার সামনে শ্রীপুলু, দরজার ওদিকে কালোচশমা পরে ডঃ বৈদ্য। পুলুদার হাত হাফ এগোনো, টিকিটদুটো দেখাবে। কালোচশমার তাৎপর্য বুঝতে সময় লাগলো সেকেন্ডতিনেক। তাও বুঝলো ওনলি বিকজ পুলির কাছে অামার কাছে অন্তত বারোশোবার শুনেছে ডঃ বৈদ্যর অ্যাক্সিডেন্টের কথা। এরপর—

— ইয়ে, মানে, পুলি অাছে?
— না। তুমি?
— ইয়ে মানে…
— ভাই ইয়েমানে, পুলি বাড়ি নেই। নীলিও নেই। কোন বিশেষ দরকার ছিল কী?
— না মানে তেমন কিছু না মানে এই টিকি—
— এক মিনিট। তোমার নাম কি পলাশ?
— পলাশ? না না, অামি মানে…অামি পুলু।
— পুলু? শিওর? পলাশ নও?
— ও হ্যাঁ হ্যাঁ মানে অামার ভালো নাম পুলু ডাকনাম পলাশ।
— তাই?
— হ্যাঁ—না, মানে—
— ভিতরে এসো। এভাবে দরজায় দাঁড়িয়ে কথা হয় নাকি?
— না না মানে অাপনি অাবার কেন অামি পরে অাসবো কোনও অসুবিধে নেই—
— অসুবিধের কী অাছে? বাড়ি এসেছো ভিতরে এসো। পুলি একটু পরেই এসে পড়বে, সাঁতার ক্লাস নিতে গেছে।
— সাঁতার ক্লাস? এই শীতে?
— শীতেই তো সাঁতরে মজা, তাই না?
— হ্যাঁ হ্যাঁ সেই তো একদম।
— তো ভিতরে অাসা হোক পলাশবাবু।
— ইয়ে মানে ও পুকুরে অাছে তো? অামি নাহয় পুকুরেই গিয়ে…
— কথা বলে অাসবে?
— হ্যাঁ মানে তাহলে অার অাপনাকে মানে…
— কীভাবে যেতে হয় জানো?
— অ্যাঁ পুকুর হ্যাঁ হ্যাঁ এইতো ডানদিক দিয়ে—
— বাঁদিক দিয়ে।
— হ্যাঁ হ্যাঁ বাঁদিক দিয়ে গিয়ে তারপর ডাইনা ঘুরে—
— উঁহু। ফের বাঁয়া।
— …ফের বাঁয়া ঘুরে তারপর কিছুটা গেলেই পুকুরটা।
— মঞ্জুর ইস্তিরির গুমটির ঠিক পরেই।
— …ঠিক পরেই।
— গুড। তাহলে এগোও। অামি রেওয়াজে বসি ফের, কেমন?

অতএব পুলুদা গেলো পুলিদিকে খুঁজতে। যেখানে বাঁয়ে যাওয়ার সেখানে ডাইনা ঘুরে অ্যান্ড ভাইসি ভার্সা করে মিনিট দুয়েকের রাস্তা যেতে সময় নিলো মিনিট কুড়ি। শেষমেশ পুকুরটা পেলো, পুলিদিকেও পেলো। পুলিদি পুকুরপারে দাঁড়িয়ে ছাত্রীদের এক্সারসাইজ করাচ্ছে—নিজে শীতকালে সাঁতার কাটলেও ছাত্রীদের অতটা ইম্যুনিটি অাছে কিনা সেটা পরখ করতে হয়তো চায় না। পুলুদা গুটিগুটিপায়ে এগোল। পুলিদির পিঠ পুলুদার দিকে, ছাত্রীদের ফুল ভিউতে পুলুদা। ছাত্রীরা খিকখিকহিহি জুড়ে দিলো। পুলিদির অ্যাটেনশনে এলো ব্যাপারটা। এরপর—

— কে?
— ইয়ে মানে অামি—
— কে অাপনি?
— অামি মানে অামি—
— কী চাই?
— না মানে অামি—
— দেখুন মশাই। এটা সাঁতারের ক্লাস, পাড়ার মেয়েরা সাঁতার শেখে। একটু তো প্রাইভেসি লাগবেই, তাই না? বুঝতেই পারছেন, ইয়াং মেয়ে সব, গা ঘামাচ্ছে, এখন যদি অাপনার মতো লোকেরা এসে অডিয়েন্ড হয়ে যায় তাহলে তো…
— না না মানে অামি পুলুশ।
— পুলুশ? অাপনি পুলিশ? পুলিশ কেন? কী হয়েছে? মা’র ঠিক অাছে তো?
— অারে না না পুলিশ নয় পুলুশ—দুচ্ছাই পলাশ মানে অামি পুলু।
— পুলু? পুলু…ওও, অাপনি রঞ্জুর দাদা?
— ঠিক ধরেছেন।
— তাই বলুন। চিনতেই পারিনি অাপনাকে।
— পারেননি?
— না।
— ও।
— সরি। অামার কি অাপনা…এক মিনিট। এই কুন্তলা, কিছুক্ষণের জন্য তুই ডিরেক্ট কর তো। অামি এনার সঙ্গে কথাটা সেরে নি।
— অামি পুলু।
— হ্যাঁ হ্যাঁ, সেটা বুঝেছি। অামি অাপনাকে সত্যিই চিনতে পারিনি। সন্ধ্যেবেলা, শীতকাল, ঝপ করে অন্ধকার, অাপনিও হঠাত উদয় হলেন, বুঝতেই পারছেন…
— হ্যাঁ হ্যাঁ না না ঠিক অাছে মানে মালপোয়া…

পুলুদা অতি ফ্লাস্টার্ড হয়ে গেলে মাঝেমাঝে সাড়েচুয়াত্তরের ডায়ালগ দিয়ে ফিল-ইন-দ্য-ব্ল্যাঙ্কস করে।

— মালপোয়া? মানে?
— না মানে টিকিট।
— টিকিট? টিকিট কেটে মালপোয়া খেতে হবে?
— না না মানে সিনেমা।
— দেখুন মশা—
— পুলু।
— দেখুন পুলুবাবু, অাপনি ঠিক কী বলতে চাইছেন অামি বুঝছি না। এদিকে দেরী হয়ে যাচ্ছে, শীতকাল, এদের ক্লাসটা—
— ডবল ফেলুদা!
— মানে?
— সিনেমা।
— হ্যাঁ, ডবল ফেলুদা সিনেমাই বটে। নিঃসন্দেহে।
— টিকিট। সিনেমার।
— অ্যাকচুয়ালি, সিনেমা কিনা কিছু সন্দেহ অাছে। টেলিফিল্মও হতে পারে।
— টেলিফিল্ম?
— বা টিভির সিরিয়ালের এপিসোড। দু’পিস।
— সিরিয়াল?
— বা ইউটিউব শর্টফিল্ম। অবিশ্যি ইউটিউব শর্টফিল্ম অনেক বেটার হয়।
— শর্টফিল্ম?
— যাই হোক, কী অার করা যাবে? হ্যাঁ, ডবল ফেলুদা নিয়ে কী একটা বলছিলেন যেন?
— না মানে এই যে…

সেফ খেললো পুলুদা। মুখে ঠিক শানাচ্ছিল না, তাই সিনেমার কায়দায় শো-ডোন্ট-টেল পথই বেছে নিলো।

টিকিটদুটো পুলিদি হাতে নিয়ে খানিক উল্টেপাল্টে দেখলো। এরপর—

— ডবল ফেলুদার দুটো টিকিট। কাল। বিকেল পাঁচটা পাঁচে শো। অাপনি যাচ্ছেন নাকি দেখতে?
— হ্যাঁ মানে—
— বাঃ। ভেরিগুড। কেমন লাগলো জানাবেন। বা নাও জানাতে পারেন। ঈদার ওয়ে, বাবু উইল বি বাবু। হ্যাঁ, মেয়েরা, পরের সেটটা। কুন্তলা, লাইন জয়েন কর।

অতএব অামি বলির পাঁঠা। থুড়ি, পাঁঠি।

অার হারাল্ড বোড? সে কথাও নাহয় অারেকদিন? বিধুজ্যাঠার জিকেতে অবান্তর কথা না ঢোকানই ভাল, তাই নয় কী?


#সোঘো, বিকেল পাঁচটা বাহান্ন, তিনমগ কফি শেষ, একমগ চা শেষ, দ্বিতীয় মগ চলছে, শেষ করার ডেডলাইন অার অাটমিনিট বাদে, নইলে রাতের ঘুম রানাঘাট, ৩ জানুয়ারী, ২০১৬…থুড়ি, ২০১৭ সাল, অাল্ফাহিলিক্স, তিলোত্তমা।


#ঘটিবাটী #ghotibaatea
#পুলিসিরিজ #বিধুজিকে

Advertisements

2 thoughts on “পুলিদি, পুলুদা, ও সিনেমার টিকিট

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s