— জয় মা! জয় মা! জয় মা! জয় মা!

চমকে উঠলাম। ঘুমটাও ভেঙে গেল।

অালোটা লাল হবো হবো করছে। রয়েছে হ—

সিগনালটা পেরিয়ে এলুম।

— দেখলেন তো। আরেকটু হলে লালে ফাঁসতুম আর কী। দেরী হতে দেবো না। জয় মা!

— না, না, ঠিক অাছে, অত দেরীও হয় নি। অাপনি বুঝেসুঝে চালান।

রিয়ারভ্যু মিরারে ড্রাইভারের চশমা। ঘোলাটে। গোঁফ। হাসি। সোজা তাকিয়ে অাছে অামার দিকে। অায়নার সামনে ঝুলছে তিনটে লেবু। লঙ্কা নেই। লেবু তিনটে দুদিকে দুটো চোখ।

চশমাটা ঘোলাটে। তাও মনে হল যেন সোজা চোখে চোখ রেখে কথা বলছে।

— না স্যার, দেরী অার হতে দেবো না। একবার ভুল করেছি বলে কি অার বার বার করবো?

— ঠিক অাছে। ভুল অার কোথায়? অামারই—

— না স্যার, ভুল রাস্তায় অাসছি অামার বোঝা উচিত ছিল। ফ্লাইওভারটাই তো ভাল রাস্তা। দেখছেন তো কত দেরী হয়ে যাচ্ছে অাপনার।

— বললাম তো, ভুলটা অাপনার নয়—

— অাসলে ন্যাভিগেশনটা রাস্তাটা দেখালো তো, তাই অার…। অামি অাপনার পাড়ারই ছেলে, এখন অবিশ্যি লোকই বলতে পারেন হেঁহেঁ…

কী করে যে বোঝাই।

— রেডিওটা চালিয়ে দেবো স্যার?

— চালান।

— রেডিও উনোতে দি স্যার? অারজে তন্ময় অাছে। রেট্রো গান চালায় স্যার।

— দিন।

— ব্রেকে ধাঁধাও খেলায় স্যার। মজার মজার পাজল। ফোনে বলতে পারলে বাধাই দেয়।

— তাই?

— অামি উত্তর দি স্যার। রেগুলার। নাম বললে চিনতেও পারবে স্যার।

— বাঃ।

খানিকক্ষণ চুপচাপ। চারুমার্কেটে জ্যামে অাটকে অাছি।

— অাপনি কি স্যার নাটকের লোক?

— কীকরে বুঝলেন?

— অাপনার ডেস্টিনেশান দেখাচ্ছে অহীন্দ্র মঞ্চ, তাই গেস–ইয়ে, মানে, অনুমান করলাম স্যার।

— অনুমান করলেন?

— ইংরিজি শব্দ বলা কমিয়ে দিয়েছি স্যার। ওই অারজে তন্ময়ের ইনস্পিরেশনেই—

— অনুপ্রেরণায়।

— অনুপ্রেরণায়–থ্যাঙ্ক ইউ স্যার–অামি যত পারি বাংলা বলার চেষ্টা করি অাজকাল।

— কেন অাপনি বাঙালি নন?

— অাহা তা হবো না কেন? খাঁটি বাঙালি।

— তাহলে?

— না মানে মুম্বই ছিলাম বহু বছর, ওখানে ভটচায মশাইয়ের গাড়ি চালাতাম।

— ওখানেই কি বাংলাটা…?

— ভুলি নি স্যার। ভুলতে কি পারি? প্রাণের ভাষা।

— হিন্দীটাই বেশি চলতো?

— ভটচায মশাই ইংরিজি বলতেন স্যার। গাড়িতে বসে অামাকে ইংরিজিতেই ডিরেকশান দিতেন।

— সেই থেকেই…?

— বাঙালির ছেলে হয়ে সবসময় ইংরিজি কপচানো কি কাজের কথা হল স্যার, অাপনিই বলুন।

— অারজে তন্ময় বুঝি বাংলা ভাষার হয়ে কাজ করে?

— মোটিভে–প্রেরণা দেয় স্যার।

— বাঃ।

— তো স্যার, অাপনি নাটকের লোক?

— অামি নাটক লিখি।

— লেখেন? অথার? অারিব্বাস।

— নাট্যকার। ছোটমাপের।

— অামি স্যার কবি নাট্যকার লেখক সব্বাইকে তুমুল শ্রদ্ধা করি স্যার। গ্রেট লোক অাপনারা।

— কেন, অামরা মহান কেন?

— গ্রে–মহান নন? অাপনারা তো প্রাণ দেন মশাই।

— অামরা…প্রাণ দি? মানে?

— ক্যারেক্টার স্যার। চরিত্রগুলো। তাদের অাপনার প্রাণ দেন না?

— হুম…

— অাপনারা না থাকলে ওই মানুষগুলোর কথা কি ভেবে দেখতো? ভাবুন তো।

— না কিন্তু চরিত্র তো কাল্প—

— ওদেরও তো একটা প্রাণ অাছে, তাই না? একটা জীবন অাছে।

— কল্পনায় অাছে নিশ্চ—

— অাপনারা তাদের মুক্তি না দিলে তারা কখনো বন্দীদশা থেকে মুক্তি পেতো স্যার?

— শুনুন—

— চিরকাল অাটকে থাকতো স্যার। চিরকাল স্যার। বন্দী থাকতো। ভাবতে পারছেন? ফর ইটার্নিটি।

— ওরকমভাবে—

— এ তো মার্ডার স্যার। পিওর অ্যান্ড সিম্পেল। সোজাসুজি মার্ডার। তাজা প্রাণগুলো বাঁচতে না দেওয়া। খুন!

— কিন্তু—

— এর শাস্তি হওয়া উচিত স্যার। প্রচন্ড শাস্তি হওয়া উচিত স্যার। সখ্ত সে সখ্ত সজা!

— অাপনি শান্ত হো—

— এর শাস্তি একটাই হতে পারে স্যার। কোল্ড ব্লাডেড মার্ডার স্যার। ঠান্ডা মাথায় খুন। এর শাস্তি একটাই—

— সামনে বাস—

— মৃত্যু!

ঘ্যাসস্স্স্!

এবিএস ব্রেক। অ্যান্টি লক। ভাগ্যিস নতুন গাড়ি।

— সরি স্যার। সো সরি। ক্ষমা করবেন স্যার।

— অাপনার মাথা খারাপ নাকি? এরকম কথা বলতে বলতে কেউ চালায়? অারেকটু হলে কী হত?

— ক্ষমা করবেন স্যার। কথা বলতে বলতে প্যাশা—

— বুঝতে পারছি, অাপনি সাহিত্য নিয়ে অত্যন্ত উৎসাহী। খুবই ভাল। কিন্তু দাদা, গাড়ি চালানোর সময়ে না করলেই কি নয়?

— অামার ভুল হয়ে গেছে স্যার। ক্ষমা করবেন স্যার।

— ইট্স ওকে। ঠিক অাছে। এটা নিয়ে অার ভাববেন না। এবার দয়া করে চলুন, ভীষণ দেরী হয়ে গেছে।

গাড়ি থেমেছিল রাসবিহারী মোড়ে। সিগনাল সবুজ হতে বাঁদিকে ঘুরলো। বাঁ হাতে ঘড়ি দেখলাম। রিহার্সাল সাতটায় শুরু হবে, এখন সাতটা সাত। কী গেরো।

— অাপনি রেগে অাছেন স্যার।

— না না অামি রেগে নেই। অাপনি প্লীজ গাড়িটা সাবধানে চালান।

— না স্যার অাপনার ভুরু কুঁচকে অাছে অাপনি রেগে অাছেন স্যার।

— অাঃ, অামি মোটেও রেগে নেই। অাপনি দয়া করে—

— অাপনি অামায় উবেরে রিপোর্ট করবেন স্যার। অামি জানি, অাপনি রিপোর্ট করবেন।

— অামি ওসব করিনা। অাপনি—

— করলে অামায় অার গাড়ি চালাতে দেবে না স্যার। উবের লাইসেন্স কেড়ে নেবে স্যার। না খেতে পেয়ে মারা যাবো স্যার।

— অামি কিছু করবো না, অাপনি দয়া করে—

— না, অামি জানি অাপনি করবেন। অাপনার মুখ তাই বলছে। অাপনার ভুরু তাই বলছে। অাপনার…অাপনি অামার সর্বনাশ করবেন।

— কী? অামি—?

— নির্ঘাত চান। নয়তো অাপনি এভাবে অামার ট্যাক্সিতে উঠবেনই বা কেন? অামায় দিয়ে ফ্লাইওভার মিস করাবেন কেন—?

— অামি? অামি অাপনার ফ্লাইওভার মিস করিয়ে—?

— অাবার কে? তারপর তাড়া করিয়েছেন। কালো বেড়াল রাস্তা কেটেছে, তা সত্ত্বে অামি চালিয়ে দিয়েছি। অাপনি দায়ী।

— অাপনি বদ্ধ উন্মাদ—

— অামি? অামি উন্মাদ? অার অাপনি? অাপনি খুনি। অাপনি মার্ডারার। অাপনি চরিত্রদের জীবন শেষ করেন, অামারও করতে চান। অাপনি…অাপনি…অাপনাকে অামি—

হলুদ! ছিল সবুজ। সিগনাল। দেশের খাবারের সিগনাল।

উবেরটার গতি হঠাৎ অনেকটা বেড়ে গেল।

সামনের রাস্তাটা অাশ্চর্যরকমের ফাঁকা।

নিমেষের মধ্যে অহীন্দ্র মঞ্চের কাছে পৌঁছে গেলাম।

উল্টো দিক থেকে ফোক্সউয়াগন বীটলটা অাসছে। গন্তব্য একই। নাটকের ডিরেক্টর, ঋজু সরকার। এই অঞ্চলে হলুদ রঙের বীটল একজনেরই অাছে।

যাক। ডিরেক্টরই লেট। অামি তাহলে অতটাও লেট—

উবেরটার গতি হঠাৎ উধাও হয়ে গেল।

বীটলটারও।

— ক্ষমা…করবেন…স্যা—


#সোঘো, ০৭/০১/১৭, ১৪৪০, ২২.৫১°উ, ৮৮.৩৪°পু

(#ffff00)

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s