ফস করে লাইটারটা জ্বলে উঠল।

জ্বলে উঠল। কেউ জ্বালাল যে তা নয়। নিজে থেকেও যে জ্বলে উঠবে, তার ক্ষমতাও নেই। স্রেফ জ্বলে উঠল। যেন জ্বলে ওঠার জন্যই তার জন্ম হয়েছে, যেন এটাই তার জীবনের একমাত্র পরিণতি। একমাত্র মিশন। ফস করে জ্বলে ওঠা।

অাচ্ছা, লাইটার জ্বালান হয় না ধরান হয়? লম্ফ ধরান হয়, বাল্ব জ্বালান হয়। কিন্তু বাল্বে তো অাগুন নেই। তাহলে? লাইটার খচ খচ না করেই বুঝি ধরান/জ্বালান যায়? অামি জানি না। অামি তো চুরুট খাই না। চুরুট খাওয়া অামার মানা নয়।

অালো জিনিসটা অদ্ভুত। অালো না থাকলে অামরা বলি অন্ধকার অাছে। অন্ধকার মানে কী? অন্ধকার মানে তো অালোর না থাকা, তাই না? অন্ধকারের নিজের কি কোন অস্তিত্ব অাছে? অালো ছাড়া কি অন্ধকার হয়? অালো না থাকলে অন্ধকার হয়, কিন্ত অালো না থাকলে অন্ধকার থাকে না, তাই না?

ফস করে লাইটারটা জ্বলে উঠল, উঠে জ্বলেই রইল।

টেবিলটা কাঠের। বার্নিশ করা। ব্রাউন রঙের। গাঢ় ব্রাউন। ধূসর। লাইটারের অালো শুষে নিয়ে লাইটারের অন্ধকারের সঙ্গে মিটিমিটি হেসে ফিসফিস কথা বলতে পারে, এমন ব্রাউন।

— একটা জীবন মানে কী? জীবনের মানে কী? ব্রেন? ব্রেন মানেই জীবন? হার্ট রক্ত পাম্প করে। কেন? যাতে ব্রেন বাঁচে। ব্রেনই হচ্ছে অাসল। ব্রেনই ইঞ্জিন। ব্রেনে কিছু না হলে কিছু হবেই না।

ছুরিটা ভোতা। ছোট ছুরিটা নয়, সেটা ধারাল। খাপের মধ্যে থেকে বেরোলে লাইটারের অালোটার একটু কিডন্যাপ করে ঝিলিক মারতে সে বেশ ভালই পারে। বড়টাও না। এক কোপে পাঁচ ফুট সাড়ে তেরো ইঞ্চি লম্বা ব্রাউন শার্ট হলুদ প্যান্ট পরা অদেশি লোকের বাঁ হাতের দ্বিতীয় কড়ে অাঙুলটাকে কেটে ফেলতে পারে।

কুকুর চেঁচাচ্ছে। একটা নয়। দুটো নয়। তিনটেও নয়। জোরে চেঁচাচ্ছে। খুব জোরে। চেঁচাতে চেঁচাতে দূরে সরে যাচ্ছে, কাছে চলে অাসছে, অাওয়াজ একই থাকছে, কমছেও না, বাড়ছেও না।

— সেইজন্যই থট। থটই হল সবার গোড়ার কথা। বিগ ব্যাং অার বড় ব্যাঙের মধ্যে পার্থক্য অাছে কি নেই সে প্রশ্ন করাটাও যেমন থট, তেমনই পার্থক্য সত্যিই থাকতে চায় কিনা সেটাও থটের কারবার। থট না থাকলে যুধিষ্ঠির-ধর্মের প্রশ্নোত্তর পর্বটাও ঝলসানো বকমাংসে পরিণত হত।

বাটারফ্লাই। ছুরিটার নাম বাটারফ্লাই। অাশ্চর্য ছুরি। খাপের মধ্যে থেকে বেরিয়ে এদিক থেকে ওদিক, ওদিক থেকে এদিক লাফিয়ে-বাঁচিয়ে-নেচে-কুঁদে কী না কী করে। করে, কেননা করতেই হয়। সেটাই যে তার পরিণতি। লাইটারের যেমন জ্বলা। বাটারফ্লাইটা ধারাল।

বেহালাটার তারগুলো তিরতির করে কাঁপছে। বেহালায় ক’টা তার থাকে? পাঁচটা? সাতটা? চারটে? এটায় ক’টা অাছে তার চেয়ে বড় কথা, তারগুলো কি কিছু বলার চেষ্টা করছে? তারগুলো কি দুঃখে কাঁপছে, নাকি ভয়ে কাঁদছে? হয়ত দুটোই।

অন্ধকারটা লাইটারের সঙ্গে সামনাসামনি পেরে উঠছে না। লাইটারটা, লাইটারটার অাগুনটা, অাগুনটার অালোটার গায়ে যে বড্ড জোর। অন্ধকারের গায়ে অত জোর নেই। অাছে ভিতরে। অন্দরে। ধৈর্য অাছে। অালোর নেই। অালো চায় সপাটে জিততে। জিতেই যেতে। যেন অালেকজান্ডার। যেন ব্লিৎসক্রেগ। অন্ধকার জানে, জয় করাটাই সব নয়। অন্ধকার তাই অপেক্ষা করে। জানে, শেষমেশ অপেক্ষাই পড়ে থাকবে, চিতার অাগুন নিভে যাওয়ার পরে প্রাণটা যেমন পড়ে থাকে।

— অার চয়েস। চয়েস ছাড়া পৃথিবী অর্থহীন। কোয়ান্টামে প্রতিমুহূর্তে চয়েস হচ্ছে। ফোটনকণা ফোটনকণা, এই স্লিট দিয়ে যাবে না ওই স্লিট দিয়ে? এদিক দিয়ে গেলে হেভেন, অার ওদিক থেকে গেলে ফিরদৌস। তফাৎ শুধু গোলাপের স্বাদে। চয়েস সবচেয়ে এফেক্টিভ কখন? যখন যে চয়েস করছে সে জানে না সে চয়েস করছে। যখন সে জানে না কী কী চয়েস অাছে। যখন সে জানে না তার হাতে চয়েস বলে একটা জিনিস অাছে অ্যাট অল। অস্ত্র যদি অস্ত্র বলে বোঝাই না যায়, তবেই তার অাসল অস্ত্রত্ব প্রকাশ পায়।

কাঁচিটা ধাতুর। বেশ লম্বা, বেশ ভারী কাঁচি। ধাতুটা লোহা হতে পারে, অাবার নাও হতে পারে। বেহালার তারগুলো তো তা জানে না। চয়েস। তারগুলো বেঁচে থাকার চয়েস অাছে। তাকে এটাই চয়েস করতে হবে যে সে কাটা পড়বে না। চয়েস করে নিলেই কেল্লা ফতে। কাঁচিটা লোহার না হলেই কেল্লা ফতে। ভারী না হলেই কেল্লা ফতে। অার যদি হয়? হলে তারগুলো কাটা পড়বে, বেহালাটাও অার কোনওদিন ভিভালডিকে স্বপ্নে দেখবে না।

অন্ধকারের কি প্রাণ অাছে? অালোর কি মৃত্যু অাছে? শুরুর কি শেষ অাছে? এসব প্রশ্ন ভিত্তিহীন। এসবের ভিত্তি প্রশ্নাতীত।

— বেহালাটার সত্যিই কি চয়েস ছিল? হয়ত। এই বাঁশিটার অাছে? এটা অাড়বাঁশি। কোন উস্তাদের বাড়ির কাঠের কাবার্ডে সাতাশ বছর অতি যত্নে ছিল। অাজ অার সেই কাবার্ড নেই, উস্তাদও নেই, সাতাশটা বছরও নেই। অাছে শুধু এই হাতুড়িটা। চয়েস।

করাতটা ছোট। কিন্তু ভারী। লোহারই হবে। জং ধরেছে। ধার কমেছে। কিন্তু অাড়বাঁশিটার যে ধার নেই একেবারে। রেকর্ডারটা অস্ফুট একটা অার্তনাদ করলেও অাঁড়বাশিটা চুপই রইল। উস্তাদের চোখের কোলটা কি কোন কালে ভিজে উঠেছিল?

অন্ধকারটা কমছে যেন, তাই না? কাঁপছে, শুঁকছে, ঝুঁকছে, হঠাৎ হঠাৎ পালানর চেষ্টা করছে। হেরে যাচ্ছে।

— চয়েস সবের থাকে। সবার থাকে। তিনরকমের জিনিস থাকে এই বিশ্বে। চয়েস দিয়ে চেনা যায় এদের। এক, যারা জানে চয়েস অাছে, এবং তারা সেই চয়েসের একটা নিয়ে নিজেদের রাস্তা নিজেরাই বানিয়ে নেয়। এদের ইতিহাস কাঁচের বাক্সে পুরে রাখে, অালো এদেরকে অাগলে রাখে। দুই, যারা জানে না চয়েস অাছে, তাও তারা কিছু না কিছু করে, না জেনেই চয়েস করে, কোনও না কোনও একটা পথে পা রাখে। না জানার না বোঝার অানন্দ এদের কাছেই মাথার উপর ছাত খুঁজে পায়। ইতিহাস এদের চারপাশে মাটির দেওয়ার গড়ে দেয়, অালো এদেরকে নিয়ে খেলা করে। অার অাছে তিন নম্বর। এরা জানে চয়েস অাছে, এরা জানে চয়েস করা যায়, চয়েস করা উচিত, চয়েস করাই নিয়ম, চয়েস করাই ধর্ম। তাই এরা চয়েস করে না। এরা অাউটসাইডার। অালো এদেরকে হলুদচোখে ভয় পায়। ইতিহাস এদের ছোঁয়ার সাহস পায় না, তাই অন্ধকারের ছাতা এরাই বয়। ছাতার তলাতেই এরা থাকে।

জাঁতিটা পিতলের। হারমোনিয়ামটা নয়। প্রতিটা চাবির মাথায় জাঁতির দাঁতদুটো কষে পাকড়ে হেইঁয়ো। তারপর লাইটারের অাগুনে প্লাস্টিকের চাবিগুলো থেকে একটা নাম-না-জানা ছাইরঙা ধোঁয়া বেরিয়ে অালো-অাঁধারির মধ্যে গেটক্র্যাশ করে ঢুকে পড়ছে। শাদা চাবি কালো হয়ে যাচ্ছে, কালো চাবি শাদা ছাইতে পরিণত হচ্ছে। অাল্টিমেটলি সবই গ্রে।

— চয়েসটা লাইটারটার। অাপনারও। তোমার বলি? দূরত্ব কমে। এক-একটা প্রাণ, বুঝলে? এই যে বেহালাটা, হারমোনিয়ামটা, করতালটা, বাঁশিটা — এদের কি প্রাণ অাছে? তোমার চয়েস কী বলে? থাকতে কি পারে? অন্তত এই বাস্তবে? জন্ম থেকে কী শিখে এসেছ? ক্রেস্কোগ্রাফ, ছোলার গাছ, মাটিতে জল দেওয়া, অার বিড়ালের কেরামতি? সঙ্গীতের প্রাণ থাকে, অাছে, কারণ সেটা সঙ্গীতের চয়েস। বাঁশিদের প্রাণ নেই। কারণ বাঁশিরা মাটির দেওয়ালে মাথা গোঁজে।

মাউথ অর্গানটা চেনা। খুব চেনা। সস্তা, বহু পুরনো। মফস্বলের বাজারে কেনা। বয়স হয়ে গেলেও কাঠের কাবার্ডে নয়, ব্যাগের জিপপকেটে থাকত। ঝোলা ব্যাগে। ব্যাগটা সবসময় মাউথ অর্গানের মানুষটার সঙ্গে সঙ্গে থাকত। খানিক অাগে অবধিও ছিল। লাইটারটা ফস করে জ্বলে ওঠার ঠিক অাগে অবধি।

— দাঁতগুলো দেখছ? জেম্স বন্ডের জ’স বলে একজন ভিলেন ছিল। তার এর’ম দাঁত ছিল। এই দাঁত দিয়ে কড়মড়িয়ে কত সোল যে চিবিয়ে খেয়েছি ইয়ত্তা নেই। লোহার দাঁত। জ’জ সিনেমার হাঙরটার মতো। সব জিনিসের সোল থাকে না। জুতোর থাকে, কিন্তু সেটা পান। ইঁদুরের থাকে না, বিড়ালের থাকে, কাফকার থাকে না, হারুকির থাকে, জনির থাকে না, ওয়াকারের থাকে। কার সোল থাকবে, কার থাকবে না, সেটা জানাটাও একটা চয়েস। অামি এখনও ছাতা বয়েই চলেছি। বেরোতে যে চেষ্টা যে করিনি তা নয়। কাঁচের ঘরটায় কে না যেতে চায় বল? কিন্তু চেষ্টা করলেই যে ফল মেলে সেটা অাঙুরশেয়ালকে বোঝাও গিয়ে। বেহালাটার সোল ছিল, বাঁশিটার অারও সোল ছিল, হারমোনিয়ামটার ছিল না। কী করব? চেখে তো দেখতেই হবে। অাসলে সোল থাকলেই যে কেল্লা ফতে তাও নয়। সোল মানেই অালো, জানো তো? স্বর্গ থেকে নির্ভুল স্পটলাইট পড়বে, অার সোলটা হিলিয়ামের মত ভাসতে ভাসতে উড়ে যাবে। সে সোল চিবিয়ে অানন্দ নেই। লাইটারটা যেমন। দেখছ না, অালো দিচ্ছে, অন্ধকার নয়। এর মধ্যে অালোর সোল অাছে। অামি চাইছি অন্ধকারের সোল। অামি জানি সেটা তোমার মধ্যে অাছে। তাই লাইটারের অালোটা তোমার দিকে যেতে ভয় পাচ্ছে। অন্ধকার তোমার চারপাশে পাক খেয়ে খেয়ে বেড়াচ্ছে। অামি তোমার সোল চাই। তুমি যে তোমার সোল সহজে দেবে না, সেটা অামি খুব ভাল করেই জানি। এটাও জানি, তুমি রূপকথার প্রেমিক, প্রাণপাখি তো অার তোমার মধ্যে নেই, রয়েছে এই মাউথ অর্গানটায়। তাহলে কড়মড়িয়ে এটাই চিবিয়ে—

অন্ধকারটা কখন থেকে যে দানা বাঁধছিল অামি নিজেই জানি না। হয়ত এটাও চয়েস, এই না জানাটা। বা জেনেও না জানানটা। লাইটারটা এক ধাক্কায় উড়ে গেল, অাগুনটা ছিটকে কোথায় যেন পড়ল, অন্ধকারের চাবুকটা গিয়ে সজোরে দাঁতগুলোয় পড়ল, লোহার দাঁতগুলো টুকরো টুকরো হয়ে হাওয়ায় ছড়িয়ে পড়ল। একটা হা-হা অট্টহাসি শুরু হতে হতেই থেমে গেল—

মাউথ অর্গানটা কতদিন বাজাইনি।


#সোঘো, ১৯:০৯, ২ ফেব্রুয়ারী, ২০১৭, তিলোত্তমা।

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s