রোদটা অাজ বড়ই বেড়েছে।

নতুন কথা কিছু নয়। রোদ রোজই বাড়ে। বাড়তেই থাকে। কবে রোদ বাড়েনি বাপু?

কিন্তু অাজ মনে হচ্ছে রোদটা একটু বেশিই বেড়েছে।

খুব সাবধানে তাঁবুর বাইরে কড়ে অাঙুলের নখটা বের করলাম। হাতের শিরার দশটা দপদপের মধ্যেই কালো হয়ে ধোঁয়া উঠতে অারম্ভ করল। তাড়াতাড়ি হাতটা ভিতরে টেনে অানলাম।

অাউচ!

জিভ দিয়ে অাঙুলটা ভাল করে চেটে দিলাম। থুতুটা লাগতেই মেরামত শুরু হল। কালো ধোঁয়াটা অাসব-না অাসব-না ফিরে-অাসব-না করতে করতে ঠিকই ফিরে এসে কড়েটার মধ্যে সেঁধিয়ে গেল। রক্তটা ফিরে এল, মাংসটাও এল, বেলুনের মত ফুলেফেঁপে উঠল, কালো চলে গিয়ে লাল ফিরে এল।

ঝলসানো রুটি উল্টো করে সেঁকা হলে যা হয় অার কি।

ব্যথাটা রইল। কী অার করা যাবে। গোটা অাড়াইশ দপদপ লাগবে কমতে।

এত করে এটা বুঝলাম যে রোদটা অাজ বড়ই বেড়েছে।

বলিহারি বুদ্ধি, তাঁবুর ওপার থেকে ৎ বলে উঠল।

— জানতেই তো রোদ বেড়েছে। অাবার পুড়িয়ে-ঝলসিয়ে অাগডুম-বাগডুম খেলার কী দরকার ছিল শুনি।

ৎ ওরকমই। বৈজ্ঞানিক বুদ্ধি বিন্দুমাত্র নেই। ৎ-কে পাত্তা না দেওয়াই মঙ্গল।

— তো বেরোবে না কি অারো হাজার দপদপ ধরে ৎ-য়ের বৈজ্ঞানিক বুদ্ধির বৈজ্ঞানিক বিবরণী দিয়ে যাবে?

অসহ্য!

মাথায় গামছাটা ভাল করে জড়িয়ে নিলাম। থুতু অাছে যথেষ্ট, তাও কিছু বলা যায় না, ফুরিয়ে গেলে এক নিমেষে ৎ হয়ে যাব। এক ফুৎকারেও হতে পারি। জয় মা ভাতমাছেরঝোল!

— ওহে, যাওয়ার অাগে গামছাটায় থুতু লাগিয়ে নাও।

হুম। ৎ-টা ৎ হলেও, মনে ৎ নেই। থুতুটা লাগালে সত্যিই কাজ হবে।

বাপরে! রোদ বেড়েছে ভেবেছিলাম, কিন্তু এটা কী? এ তো শান্তপাহাড়ির দেশের ছাগল! মোটরবাইকে যীশুখ্রীস্ট!

— নীল হয়ে গেছে বলছ?

ৎ যে তাঁবু ছেড়েও বেরিয়ে অাসতে পারে এতদিন জানতাম না। সত্য সেলুকাস, কত কিছুই যে না জানি।

ৎ-কে কিছু জিজ্ঞেস করতে অামার চুলকুনি হয়। কারণটা অার কিছুই নয়। ৎ-টা খালি প্রমাণ করার চেষ্টা করে অামি পাপ্পু, কিসুই বুঝি না। কিন্তু বাইরে যা দেখছি, ব্যপার গুরুতর। অবস্থা সঙ্গীন। জীবন রঙ্গীন। এসব ক্ষেত্রে ছেঁড়া পাঞ্জাবীর অাস্ত পকেটের ভিতরে সযত্নে লুকোনো এর-মানে-কী-ৎ বোতামটা না টিপলেই নয়।

— এর মানে অার কিছুই নয়, একটা খিচুড়িডিম্ভাজা ব্যাপার ঘটেছে।

গম্ভীর মুখে ৎ বলল বটে, কিন্তু মুখের কোণে একটা হাল্কা হাসির হাল্কা অাভা হাল্কাভাবে হল্কে হল্কে উঠল। তার মানে ৎ মজা পেয়েছে।

তার মানে কিছু একটা ঘটবে। বা ঘটেছে।

— অাঃ মোলো যা, তাই তো বললুম দু’দপ অাগে। কানে মরচে পড়েছে না কী?

দেখছ তো? বকছে। ৎ ভারী বাজে।

— দাঁড়াও দাঁড়াও, বুঝেছি, তোমার গামছাটা লীক করছে—না, লীক নয়, থুতুটা শুকিয়ে গেছে। স্থির হয়ে দাঁ—এই, নড়বে না, নট-নড়ন-নট-চড়ন, থুতুটা লাগাও। হ্যাঁ, নাও, নিয়ে লাগাও।

উফফ। বাপরে। মাথাটা ঝলসে যাচ্ছিল বোধহয়।

— কালো ধোঁয়া অবধি অাসে নি। অাসলে মোরগ হালিম হয়ে যেত। ওহে, দেখে, তুমি হালিম হয়ে গেলে অামি ৎ হয়ে যাব।

ৎ কীকরে ৎ হবে তা অার জিজ্ঞেস করলাম না। ব্যাজার মুখে গামছায় থুতু ঘষতে ঘষতে রঙধনুটা বের করে তাক করে ছুঁড়লাম। সাতদপ বাদে তীরটা ফিরে এসে অামার চেয়েও দু’পোঁচ বেশি ব্যাজার মুখে জানাল যে ৎ ঠিকই বলেছে। রোদটা কাল অবধি কমলা ছিল, অাজ রীতিমত নীল।

— তার মানে রোদটা বেড়েছে।

হ্যাঁ, অার অামিই শুধু সাফ কথা সাফ সাফ বললে পাপ? সম্বরণ সম্বর সপ পেয়েছে বুঝি!

ৎ দেখলাম অামায় সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করে শিউরে উঠল।

এইরে। ৎ শিউরে ওঠা মানে ঘোরতর রামেশ্বরম।

— ওটা কী?

ওটা? ওটা মানে? কোনটা?

— ওইদিকে। পাহাড়টার তলায়।

ম্যাপটা খুলে দাঁড়ালাম। ম্যাপটাও পকেটেই ছিল, টেনে বের করলে ঝলসে যেতে পারে, তাই মুড়ে রেখেই খুললাম। পাহাড়? হুম, পাহাড় একটা অাছে বটে। দুটোও থাকতে পারে। দুটোই অাছে। মাঝখানে একটা নীচু জায়গা। তাতে জুরা বসে থাকে না। কোনওদিনও থাকেওনি। থাকবেও না।

— জুরা-ফুরা বাদ দাও। নীচু জায়গাটায় কী থাকে?

কী থাকে? কী বা থাকবে? কোটর একটা। একটা উল্টোনো বাটির মত, ঝোলে ভরা নয়, থাকলেও উল্টোনো বলে ঝোলটা অ্যাদ্দিনে পড়েই যেত। গিয়ে ঝোলসে যেত। হ্যাঃ হ্যাঃ। ঝোল ঝোলসে যেত।

— থুতু। জলদি।

এরকম চললে তো মুশকিল ৎ। থুতু অার কতটাই বা অাছে।

— যতটাই থাক, ওই বাটি অবধি যেতেই হবে। না হলে নীলরোদের রহস্য মেফিস্টোফিলিসই হয়ে থাকবে।

রহস্য কোনভাবেই মেফিস্টোফিলিস করে রাখা চলে না। তাহলে দপদপ কূপিত হন।

বাকি থুতুটা গামছায় লাগিয়ে নিলাম। তাঁবুয়ে ফিরলে অারও তৈরী হত, কিন্তু ৎ যা বলছে তা যদি ঠিক হয়, অত দপদপ অামাদের হাতে নেই।

পা বাড়ালাম।

পাহাড়টা কাছে চলে এল।

পাশেই অন্য পাহাড়টা। মাঝখানে বাটিটা।

চারদিকটা হঠাৎ যেন শিউরে উঠল, লালকমলা খেলে গেলে অাকাশবাতাসের রন্ধ্রে-রন্ধ্রে। ৎ শুঁকলাম তিরতির করে কাঁপছে।

বাটিটা উল্টোনো। বাটির চারদিকে নীলরোদ।

বাতাসে কী একটা ঝলসানোর গন্ধ না? অামার? না, ৎ তাহলে বলত। উল্টোদিকে কালো ধোঁয়া উড়ছে। কী ব্যাপার—?

— পাহাড়টা ঝলসে ধোঁয়া হচ্ছে। রোদটা বেড়েছে।

ঠিক। রঙধনুটা তুলে ছুঁড়তে গিয়ে দেখলাম, সেটার থেকেও কালো ধোঁয়া বেরোচ্ছে। দু’দপও কাটল না, তীরটাও কালো ধোঁয়া হয়ে ঝলসে গেল।

রোদটা বেড়েছে, সন্দেহ নেই।

থুতুও অার নেই।

বাটিটা?

অাছে। বাটির মধ্যেও কী যেন একটা উঁকি মারছে।

পা বাড়ালাম।

বাটিটার কাছে চলে এল।

দুটো পাহাড়ই এতক্ষণে ঝলসে-টলসে অাকাশে কালো ধোঁয়া লেপে দিয়েছে। অাশেপাশের পাথর-বরকন্দাজেরও একই অবস্থা।

— কিন্তু লক্ষ্য কর, বাটিটার চারপাশে কিন্তু নয়।

ঠিক। একদম ঠিক। বাটিটার চারপাশে রোদ বাড়েনি। নীলটাও কেমন হলদেটে। হল্কাটা কেমন যেন অাভা। ৎ নড়েচড়ে উঠল।

— খুব বেঁচে গেলে।

বেঁচে গেলাম? কেন?

— থুতু শুকিয়ে গেছে, খেয়াল করেছ?

নাঃ। করেও লাভ নেই। তাঁবুর দিকে পা বাড়ালেও তাঁবু অার কাছে চলে অাসবে না। অত কই মাছের ঝোল মজুত নেই যে।

— ঝলসাচ্ছ কিন্তু না।

তাও তো বটে। গামছাটা তো কালো ধোঁয়াকে ডেকে ডেকে তা-না-বা-না করছে না। গামছাটা খুলে ফেলে বাঁ গোড়ালিতে জড়িয়ে নিলাম।

— ঠিকঠাক সময়ে হয়েছে তাহলে ব্যাপারটা, অ্যাঁ?

ঠিকঠাক সময়ে? কী হয়েছে?

— বাটিটা। নীলরোদ অার নীল নেই।

তাও ঠিক। রঙধনুটা থাকলে অারও ঠিকভাবে বলতে পারত। কড়ে অাঙুলটা বের করে চুষে অালোয় মেলে ধরতে গিয়েও ধরলাম না। অভ্যাস।

— ওটা করার প্রয়োজন নেই। ৎ হওয়া তোমার অার হল না। এটা কী জানো?

এটা বলতে বাটির মধ্যেকার বস্তুটা। কেমন কাঁচের মত দেখতে।

কাঁচ নাকি?

— ছুঁয়ে দেখ।

ছুঁলে ৎ হয়ে যাব?

— হলে তিরিবিক্কান্তরিকা হবে। ছুঁয়ে দেখ, শিগগিরি।

তাড়া কীসের কে জানে। বাটিটায় কাঁচ ভর্তি। তাতে পাহাড়দুটোর প্রতিবিম্ব নীল হয়ে অাছে। ঝকঝকে-তকতকে। যেন—

— অত মেটাফরফর করো না। দপদপ কি অার পাহাড়ে ফলে। ছুঁয়ে দেখ।

কড়ে অাঙুলটাই এগিয়ে দিলাম। জিভে অার একবারের মত থুতু অাছে—

ইয়াউল্লাহাল্লুমাস্টিপেলাস!!!

— অার যাই কর, হাতুড়ি দিয়ে পিটিও না।

অারে দূর ছাই হাতুড়ি। ঝলসে লাটসাহেব হেস্টিংস হয়ে গেছে কড়েটা। তাড়াতাড়ি জিভে দিতে যাচ্ছি, শুঁকি ৎ প্রবলভাবে বারণ করছে। তাঁবুর বাইরে ৎ-য়ের কথা মানাই ভাল। নইলে ৎ হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা প্রবল।

— কীরকম লাগছে?

উষ্টুবিষ্টু লাগছে। ঝলসে যাচ্ছে। মনে হচ্ছে, ব্যথা বলে কোন জিনিস কোন দপেই ছিল না।

— কালো ধোঁয়া বেরোচ্ছে?

ধোঁয়া বেরোচ্ছে।

— রঙ?

কালো নয়।

— তাহলে?

কালো নয়। কালো না থাকলে যা থাকতে হয়।

— শাদা?

কড়ে অাঙুলটা অাকাশে তুলে ধরলাম। কালো ধোঁয়াটা যেন ভয় পেয়ে পালিয়ে গেল। নীলরোদটা লেপের তলায় লেজ ঢুকিয়ে কেঁউকেঁউ করে হলদের কাছে ক্ষমা চেয়ে গিয়ে তেতলার চিলেকোঠায় উঠে কাঁপতে কাঁপতে দস্তয়েভস্কি নিয়ে বসল। হলুদ রোদটা বাটিটার চারপাশ থেকে এক লাফে অামার কড়ে অাঙুলের উপর চড়ে বসে জনি ওয়াইসমুলারের মত চিৎকার দিয়ে ফুৎকারে ফুৎ হয়ে গেল। পাশ ফিরে দেখি, ৎ-টাও ফুৎ হয়ে গেছে।

— এই তো, সবকিছু কেমন পটলকুমার হয়ে গেছে। গামছার দিব্যি, ভয় পেয়ে গিছলাম।

এই যে ৎ, তুমি ফুৎ হওনি?

— ৎ কি অত সহজে ফুৎ হতে পারে? হলে ৎ খণ্ড-ত হয়ে যাবে যে।

তাই তো হয়েছ। তুমি তো অার ৎ নেই, খণ্ড-ত হয়ে গেছ।

— তাই বুঝি? তা বেশ তা বেশ। তো এবার কী? কই মাছের ঝোল দিয়ে দইভাত, নাকি এডগার অ্যালেন পো?

বাটিরহস্যটা প্রকাশ করবে না?

— করে লাভটা কী হবে শুনি?

না মানে ক্লোজার ক্যাথারসিস পেটিএম ইত্যাদি।

— গামছাটা গোড়ালি থেকে খুলে গেছে, থুতু ছিটিও না। ক্লোজার দিয়ে লাভটা কী? এটা কি কল্পবিজ্ঞান নাকি? তুমি তো অার বহু ভবিষ্যতের পৃথিবীতে ছিলে না। সেখানে কি মানুষের বোকারাম গড়গড়ি এক্সপেরিমেন্টের ফলে অাইনস্টাইন-রোজেন ব্রীজের মাধ্যমে সূর্য অন্য ব্রহ্মাণ্ডের কাজিন সূর্যের কাছ থেকে ম্যাটার চুরি করে ইয়েলো ডোয়ার্ফ থেকে ব্লু জায়েন্টের দিকে যাচ্ছিল না। তাপমাত্রা এতটাই কিলিমাঞ্জারো লেভেলে উঠে গিছল যে পাহাড় সোজা সাব্লিমেট করে বাষ্পও হয়ে যাচ্ছিল না। তাহলে? মাকন্দটা কোথায়?

না কিন্তু ওই বাটিটাতে—

— কী ছিল? তা ভেবে কোন লাভ অাছে? এখন তো অার সেটা নেই, তাই না? বরফ থাকলে এখন অার নেই। অার বরফ থাকলেও তাতে কী? কীসের বরফ? জলের? হ্যাঃ হ্যাঃ। নীলসূর্য ভার্সাস জলের বরফ।

মিথেনের। বা হিলিয়ামের।

— উঁহু। ওসব তেজপাতার ঝোল দিয়ে কইমাছের শিং খাওয়ার ফল। বরফ যদি থাকবেই তাহলে তো দপদপই থাকতে পারত। দপদপ থাকলে বাকিরা বাক্স-প্যাঁটরা-টিনেরট্রাঙ্ক-হোল্ডল-গাড়ু-হাগজ নিয়ে রাণাঘাট এক্সপ্রেসে অানরিজার্ভড কামরা বুক করত।

দপদপ থাকত? মানে? একটু সময় নিয়ে বোঝাও না ভাই খণ্ড-ত।

— দপদপ। সময়। সময় ঘন হয়ে বাটিটাতে বরফ হয়ে ছিল। ওইজন্যেই বললুম, জিভ না দিতে। থুতু অক্সিহাইড্রক্সি হয়ে যেত।

তাহলে যা ঘটল, ঘটেছিল?

— কিছুই ঘটেনি হে। দপদপবরফটা ফেটে চৌচির হয়ে গেলে কি অার অার কিছুর হওয়ার জো অাছে? এটা তো অার কল্পবিজ্ঞান নয়।

তাহলে? কী করব এখন?

— কী অার করবে? মাছের ঝোল দিয়ে ভাল করে তেঁতুলজলমাখা ভাত মেখে পান্তা ভেবে মেরে দাও। বেশ একটা ৎ ব্যাপার হবে।

সন্দেহ নেই।


#সোঘো, ১৯:১৯, ৭ ফেব্রুয়ারী, ২০১৭, তিলোত্তমা।

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s