ইদানীং ওয়েস্টওয়ার্ল্ড বলে একটা টিভি সিরিজ দেখছি। মূল লেখাটা মাইকেল ক্রাইটনের*, সত্তরের দশকে এটা সম্ভবত একটা সিনেমাও হয়েছিল। কিছু বছর অাগে জনাথন নোলান, যিনি দাদা ক্রিস্টোফার নোলানের ব্যাটম্যান ট্রিলজি লিখে খ্যাত, অার তাঁর স্ত্রী লিসা জয় এই ওয়েস্টওয়ার্ল্ডকে টিভিতে অানার প্ল্যান করেন। দশটা এপিসোড, এইচবিওতে, খানিকটা গেম অফ থ্রোন্সের মত অ্যাম্বিশাস। দুর্ধর্ষ গল্প, পার্ফেক্ট অ্যাক্টিং (অ্যান্টনি হপকিন্স মুখ্য ভূমিকায়), দারুণ নির্দেশনা অার টপক্লাস ম্যুজিক (রামিন জাওয়াদি, যিনি গেম অফ থ্রোন্স অার অায়রন ম্যান ১ সিনেমাতেও ম্যুজিক দিয়েছেন)।

সিরিজটা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা, অামার ভাষায়, নকলচেতনা নিয়ে। কিছু অ্যান্ড্রয়েড বা নকলমানব** অাছে, তারা জানে না তারা নকলমানব। এমনই একজন নমার (নকলমানবের) সঙ্গে এইসব নমাদের স্রষ্টা রবার্ট ফোর্ডের (অ্যান্টনি হপকিন্স) কথা হচ্ছে। ফোর্ডের কাছে নমাটির একটাই প্রশ্ন : (ফোর্ডের গল্প বা ন্যারেটিভ অনুযায়ী) নমাটির খুব কাছের একজন মারা গেছে অনেকদিন অাগে। এতে স্বভাবতই নমাটির খুব কষ্ট হচ্ছে। যখন সে জানত না সে নমা তখন যতটা কষ্ট হত, জানতে পারার পরেও সে কষ্ট বিন্দুমাত্র কমেনি। তাই ফোর্ডের কাছে নমাটির প্রশ্ন, এই যে কষ্ট সে পাচ্ছে, সেটার সঙ্গে কোন মানুষের কষ্টর কি কোন তফাত অাছে? হ্যাঁ, নমাটির কাছের মানুষটি হয়ত সত্যি সত্যি মারা যায়নি, সেটা সম্পূর্ণ ফোর্ডের কল্পনা, এবং এই ঘটনা নমাটির স্মৃতি হিসাবে রয়ে গেছে। কিন্তু সে দিক থেকে দেখতে গেলে, কোন অাসলমানবও যদি একইরকম কষ্টের মধ্য দিয়ে যায়, যথেষ্ট সময় পেরিয়ে গেলে সেটাও কি শুধু স্মৃতিই হয়ে থাকে না? তাহলে নমাটির স্মৃতি, একটা কাল্পনিক ঘটনার প্রতি তার কষ্ট অার একটা অাসল মানুষের অাসল কষ্টের মধ্যে কী তফাত?

উত্তরে ফোর্ড বললেন — বিন্দুমাত্র পার্থক্য নেই।

ফোর্ডের উত্তরটা শুনে অামার চিন্তার একটা নতুন দিক খুলে গেল। সত্যিই তো, ব্যথা কষ্ট হাসি মজা এসব সবই তো স্মৃতি হয়ে অামাদের মনে গিয়ে জড়ো হয়। যথেষ্ট সময় কেটে গেলে এই এককালের তথাকথিত সত্যি ঘটনা অার কোন কাল্পনিক স্বপ্নালু “স্মৃতির” মধ্যে কী তফাত?

তারপর ভেবে দেখলাম, একটা তফাত অাছে। জীবনের যেকোন খারাপ ঘটনাতেই, যেকোন ব্যথা বেদনা কষ্ট উপশমের জন্য ঠিকঠাক ওষুধ পড়াটা খুব জরুরি। ফোর্ডের নমাটির ক্ষেত্রে ঘটনাটি কাল্পনিক, তাই ঘটনাটি ঘটার পর তার জন্য যে মানসিক ওষুধ পড়েছে সেটাও কাল্পনিক। কিন্তু সত্যিকারের বাস্তব জীবনে কোন ঘটনাতে ওষুধ পড়লে সেই উপশমটা কাল্পনিক না হলে তার একটা জোরালো হীলিং এফেক্ট থাকে। কাটা ঘা, ভাঙা হাত বা টুটে যাওয়া মন, জোড়া তখনই ভালভাবে লাগবে যখন তাতে ঠিকঠাক মলম লাগানো হবে। এবং এই মলমের গুণ চিরকাল থাকবে। এখানেই কল্পনার জগতের সঙ্গে বাস্তব জগতের তফাত। এখানেই নকলমানবদের সঙ্গে অামাদের তফাত।
{এটা একটু বিরতি হল। পরের কিস্তি থেকে ফের ঘটনার ঘনঘটায় ঝাঁপিয়ে পড়া যাবে নাহয়।}

(চলবে)
* হ্যাঁ, কেউ কেউ ক্রিখটনও বলে থাকেন। অামি ক্রাইটন বলি।

** কেউ কেউ অাবার এদের যন্ত্রমানব বলেন। যন্ত্রমানব মানে রোবট, অ্যান্ড্রয়েড নয়। অারেকটা নাম অাছে, অামার পছন্দ, যন্ত্রানব, যদিও নকলমানব বেটার।

(#চামলমও_টুথপেস্ট)


#সোঘো, ১৯:০৯, ২১ ফেব্রুয়ারী, ২০১৭, তিলোত্তমা।

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s