রিক্যাপ।

গরম চায়ের চামচায় হাত পুড়ে গেছে। হাতে টুথপেস্ট লাগিয়ে ট্যাক্সিতে উঠে ফোনে এসোএস ছেড়েছি। জবাবেও এসোএস পেয়েছি। দুটো পার্লেজির প্যাকেটে তিনটে ভিখারী বাচ্চার ব্রেকফাস্ট হবে। একটাই অাক্ষেপ, অারো যদি প্যাকেট থাকত।

এন্ড রিক্যাপ।

ট্যাক্সিটা সাদার্ণ অ্যাভেন্যু দিয়ে চলছে। সাদার্ণ অ্যাভেন্যুর দুটো অংশ অাছে, অন্তত অামার ফ্রেম অফ রেফারেন্সে অাছে। একটা অংশ লম্বা, রবীন্দ্র সরোবর স্টেডিয়াম থেকে, মানে ল্যান্সডাউনের* মোড়** থেকে সোওওওজা লেক কালিবাড়ি লুকনো বইয়ের দোকান বিড়লা অ্যাকাডেমি অফ অার্ট অ্যান্ড কালচার সুলভ শৌচালয় রামকৃষ্ণমিশন লাইব্রেরী পেরিয়ে ঝপ করে গোলপার্কে এসে শেষ হয়। অন্য অংশটা পেট্রলপাম্প থেকে উল্টোদিকে, অর্থাৎ পশ্চিম দিকে একটু বেঁকেচুরে কালিধন সুইমিংপুল ইত্যাদি পেরিয়ে ত্যারছাভাবে মুদিয়ালির অাশেপাশে গিয়ে ঠেকে। অামি রোজ এই রাস্তা ধরে রাসবিহারী মোড়ে গিয়ে উপস্থিত হই।

কালিধন পেরিয়ে ফুটপাথে একটা অাড্ডাখানা অাছে। রোজ সকালে পোলো টীশার্ট ট্র্যাকপ্যান্ট বা শর্টস পরা জনৈক পঁয়ত্রিশ থেকে পঁয়ষট্টির অাপিসের বাবুরা কাগজের গেলাশে চা ভরে গাছের ছায়ায় লালরঙা নীলকমল চেয়ার বা টুলে বসে কথার তুফান তোলেন। রোজ দেখি অার ভাবি, এই অাড্ডার জন্যই তো কলকাতা ক্যলকত্তা না হয়ে তিলোত্তমা হয়েছে।

ট্যাক্সিটা সাদার্ণ অ্যাভেন্যুয়ের বেড়া ডিঙিয়ে এবার রসা রোডে পড়েছে। রাস্তাটার নিশ্চয় একটা অাধুনিক নামও অাছে, অামি রসা রোড বলেই ডাকি। নেহাত লোকে বুঝতে না পারলে মেট্রোর রাস্তা বলি। কম্প্রোমাইজ তো একটু করতেই হয়।

গন্তব্য চেতলা, তাই উচিত রাসবিহারী মোড় থেকে বাঁদিক নেওয়া। এদিকে মোড়ে সিগন্যালের অাটকাবার সমূহ সম্ভাবনা, তাই পেট্রলপাম্পের বাঁপাশ দিয়ে টুক করে প্রতাপাদিত্যের শর্টকাটটা নিয়ে সুট করে চেতলাব্রীজের দিকে যাওয়াটা বাঁয়ে হাতের খেল। ড্রাইভারের, অামার নয়। লাইসেন্স অাছে, কিন্তু গাড়ি চালাতে বললে অামি সোজা সোফার তলায় লুকোব। ড্রাইভারটা ভাল, কিন্তু কেমন নতুন লাগল। বা হয়ত দক্ষিণের রাস্তার সঙ্গে ঠিক পরিচিত নয়***।

যাই হোক, রেডিওতে দিব্যি রফি চলছে, সামনে রাস্তাও ফাঁকা, অামিও যাকে বলে একটু রিল্যাক্স করার দিকে মন দিলাম। প্রি-স্মার্টফোন যুগে এর মানে হত পাতি জানলার বাইরে সিনারি দেখা। মডার্ন যুগে এর মানে হল পাতি ফেসবুক খুলে ক’টা লাইক কমেন্ট পেলাম ঘটিবাটীর ক’টা লাইক বাড়ল বা কমলো তার চুলচেড়া বিশ্লেষণ করা।

ড্রাইভ করার সময় মোবাইলে কথা বলতে নেই — জনঅরণ্যের অর্বাচীন প্রবাদ। ওলাউবেরে উঠলে ড্রাইভ না করলেও যে মোবাইলে বৈদ্যুতিন বাক্যালাপ করতে নেই, সেটা কোত্থেকে জানব?

দিব্যি একটা রসাল পোস্ট পেয়েছি। এবাংলায় বহিরাগতের অনুপ্রবেশ নিয়ে লেখক সুচিন্তিত একটা পোস্ট দিয়েছেন। পড়ছি, অার যুবক লেখকের উইট দেখে নিজের মনেই হাসছি, এমন সময় কেমন একটা মেট্রিক্স-ব্ল্যাকক্যাট ব্যাপার ঠেকল।

না, দেজা ভূ নয়, স্রেফ যাকে বলে অজানা এলাকায় হঠাৎ করে না জেনেশুনে এসে পড়লে যে অনুভূতি হয়, ঠিক সেরকম।

চমকে চুয়াল্লিশ! সটান ধড়ফড় করে উঠে বসলাম। এ কোথায় এসেছি? এ রাস্তা তো চেনা নয়। প্রতাপাদিত্য থেকে তো কুট করে বাঁদিকে ফের রাসবিহারী অ্যাভেন্যুতে পড়ে চেতলা ব্রীজের দিকে যাওয়ার কথা। তার বদলে এখন কোন রাস্তায় যাচ্ছি? বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের কোন অজানা কোণে ধেয়ে চলেছে অামাদের ওলা? কোথায় গিয়ে শেষ হবে এ অশেষ যাত্রা? অামাদের হিরো(রা) কি কোনওদিনও নিজস্থানে ফিরে অাস—

ও। সদানন্দ রোড। পাশে একটা বাড়ির দরজাতেই লেখা ছিল। রহস্যটা কেমন যেন সেই হেতমগড়ের লোকটার (যে ভূত নয়, নামটা ভুলে গেছি) সাহসের বেলুনটার মতো ফুঁসে গেল। তুবড়েও যেতে পারে। কিছুই অসম্ভব নয়।

কিন্তু এরকম গন্ডগোল হল কীকরে? ডেস্টিনেশন তো দেওয়াই—

ও। ওলা। ডেস্টিনেশন দেওয়া কম্পালসারি নয়।

কিন্তু তাও, চেতলা কে না চেনে? ফুচকা কে না ভালবাসে? বৃষ্টি কে না চায়? বই কে না পড়ে?

দেখা যাচ্ছে, অামার এক্সপেক্টেশনে কিছু ফান্ডামেন্টাল গলদ অাছে।

কিন্তু এবার উপায়? সময় নেই, সুজুকি স্যুইফ্ট ডিজায়ার সাঁইসাঁই বেগে সদানন্দ রোড দিয়ে ধেয়ে চলেছে কোন অজানা গন্তব্যের দিকে, এ হেন ক্রাইসিসের মুহূর্তে এমন কি কেউ নেই যে পথ বাৎলে দেবে, এমন কোন ওবি-ওয়ান, কোন গ্যান্ডাল্ফ, মর্ফিয়ুস বা ডাম্বলডোর, কোনও—

{— ওহে বুদ্ধিমান, গুগল ম্যাপটা খোল।}

বলাই বাহুল্য, {…} অর্থাৎ অামার কল্পনায় শোনা কথা। অাসল লোক হলেও একই কথা বলতো। চমকপ্রদ লাগল। সামহাউ সে অামার সোর্সকোডে নিজের একটা অংশ সাবরুটিন হিসাবে অ্যাড-অন করে রেখেছে, বাবা লোকনাথের মত জলে-বনে-জঙ্গলে-কলকাতাররাস্তায় ঠিক অ্যাক্টিভেট হয়ে গিয়ে রক্ষা করবে।

জয় মা পারোশ্বরী!

(চলবে)

(#চামলমও_টুথপেস্ট)


#সোঘো, ১১:২২, ২৪ ফেব্রুয়ারী, ২০১৭, তিলোত্তমা।
* অাজকাল লোকে ল্যান্সডাউনকে শরৎ বোস রোড বলে।

**ল্যান্সডাউনের মোড় বলতে যে অন্য কিছু বোঝায় সেটা অামি দেড় বছর অাগে অবধি জানতুম না। অামি ওই পেট্রলপাম্পের মোড়টাকেও ল্যান্সডাউনের মোড় বলি। ফ্রী স্পীচ হ্যানত্যান।

*** পরে জেনেছিলাম এটাই ঠিক। লোকটা লাইফলঙ দমদমে কাটিয়েছে, সাউথ ক্যালকাটা অার সাউথ সুদান তার কাছে এক ব্যাপার।

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s