রিক্যাপ!

গরম চায়ের চামচায় হাত পুড়ে গেছে। হাতে টুথপেস্ট লাগিয়ে ট্যাক্সিতে উঠেছি, গন্তব্য চেতলা। ট্যাক্সিওয়ালা রাস্তা চেনে না, রাস্তা হারিয়ে ঘুরছি, এমন সময় পারোশ্বরীর ফোন!

এন্ড রিক্যাপ!

হুম, রিক্যাপটা না দিলেও চলত। লেখক ঠিক এইমুহূর্তে অ্যাকশনের মুডে নেই, নস্টালজিয়া মুডে অাছে। ওটা পরের কিস্তিতে অাসবে।

ট্যুইনিং কোম্পানী লন্ডনের খাস সাহেবী গোলাপীমুখো* বিলিতি কোম্পানী, এতই পুরনো অার অভিজাত যে ক্যম্পনী*** বলতে নেই, বলতে হয় কোম্পানী। মানে যেভাবে বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে কলকাতার এডুকেটেড বাবুরা বলতেন অার কি।

তো এই ট্যুইনিং কোম্পানীর নাম অামি সম্ভবত জানতে পারি ক্রিকেটমাঠে বিজ্ঞাপন থেকে। ওই যে, ইংল্যান্ডের প্লেয়ারদের জামায়, বা লর্ডস, ট্রেন্টব্রিজ, ওভাল ইত্যাদি মাঠের বাউন্ডারিবেড়ায় লেখা থাকত। থাকত, তাই তো?

ইয়ে, না, মানে, অামায় এক্ষুণি মেমরি ডিপার্টমেন্ট জানাচ্ছে যে ওটা ট্যুইনিং নয়, টেটলি বিটার ছিল। অার সম্ভবত, এ ব্যাপারে অামি সম্পূর্ণ নিশ্চিত নই এবং নেট পাচ্ছি না বলে চেক করতে পারছি না, টেটলি কোম্পানীর নাম কেটলির সঙ্গে মিল খেলেও অাদপে ওটা বীয়ার বা এলের কোম্পানী। মানে যাকে বলে চায়ের উল্টো এফেক্ট।

নাকি একই?

গভীর প্রশ্ন। বেশি ভাবলে ডীপথেরিয়া হবে।

তার চেয়ে চা খাওয়া ভাল।

হাতের কাছে তো অার হুটহাট টেটলি বিটার পাচ্ছি না।

এনিওয়ে, যাই হোক, যাহাই হউক, যো ভি হো, ট্যুইনিঙের চায়ের তুলনা হয় না। দামেরও তুলনা হয় না, অার অামার পকেটেরও তুলনা হয় না—

ভুল বললাম। থুড়ি। মিস্টেক হয়ে গেছে। অার হবে না। এই জিভ কাটলাম।

পকেটের তুলনা অাছে।

মহাকাশ। অর্থাৎ অাউটার স্পেস। টোটাল ভ্যাক্যুম। মানে কিস্যু নেই সেখানে। অালো নেই বাতাস নেই অাপেল নেই ফুচকা নেই মায় ধুলোটাও নেই।

এঃ। ফের মিস্টেক। জিভটা মেজে অাসি।

ধুলো অাছে। স্পেস ডাস্ট। কস্মিক ডাস্ট। মহাজাগতীয় ধুলো। ধুলো থাকতেই হবে। দুনিয়ায়, এবং দুনিয়ার ফাদারদুনিয়া-ইন-লতেও, ধুলো জিনিসটা না থেকে উপায় নেই। ধুলো এই সৃষ্টির অদ্ভুত এক রহস্য। বাড়িতে যে ধুলো হয় তার অনেকটাই মানুষের শুকিয়ে যাওয়া চামড়া। তাই সাবধান করে দিচ্ছি, ধুলো খাবেন না, ক্যালিবান**** হয়ে যাবে। এই ধুলোয় পোকামাকড় বাস করে, মাইট (mite) থাকে, তা নাকেমুখেগলায়ফুসফুসে গেলে হাঁচু হয়, কাশু হয়, অ্যালার্জি হয়।

ধুলো খুব খারাপ জিনিস।

মহাকাশে প্রতি বর্গমিটারে ধুলোর ডেন্সিটি ঠিক কতটা তা বলতে পারছি না, নেট নেই। কিন্তু এটুকু বলতে পারি, সংখ্যাটা যাকে বলে একটু কমের দিকেই। অামার পকেটের ভ্যাক্যুমের কাছে শিশু যদিও।

এই ট্যুইনিং বিভিন্ন রঙবেরঙের প্যাকেটে টীব্যাগ বিক্রী করে। সবচেয়ে প্রাণকাড়া অবশ্যই — অন্তত অামার পক্ষে — হলুদটা। অার্লগ্রে। লেডিগ্রে অাসে নীলরঙের প্যাকেটে। এত সুন্দর নীল যে চোখ জুড়িয়ে যায়। দার্জিলিং অাসে বেগুনি প্যাকেটে, অার ইংলিশ ব্রেকফাস্ট লালরঙের প্যাকেটে।

সুপারমার্কেটের শেল্ফে থাকেথাকে সাজানো রঙচঙে প্যাকেটগুলো মুক্তি চাইছিল। দিলাম মুক্তি।

অামার ওয়ালেটের খাপে থাকেথাকে সাজানো নোটগুলোয় মুক্তি চাইছিল। দিলাম মুক্তি।

এখন একটা স্ট্যাক তৈরি হয়েছে। সবার নীচে দার্জিলিং, কেননা সেটা সবার কম খাব। তার ওপরে লাল ইংলিশ ব্রেকফাস্ট, তার ওপরে নীল লেডিগ্রে, সবার ওপরে হলুদ অার্লগ্রে।

দেখতে বেশ যাকে বলে নাইস। ছোটবেলা থেকেই রঙের প্রতি অাসক্তি। এই বড় হয়েও সেটা যায়নি। এর মানে দুটো। হয় অামার মধ্যে ম্যাচিওরিটি অাসেনি, নয় এখনও ছোটই রয়ে গেছি।

কাল সুপারমার্কেটের চায়ের শেল্ফের সামনে অনেকক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে ছিলাম। রঙ দেখতে অামার ভীষণ ভাল লাগে, বিভিন্ন কোম্পানীর বিভিন্ন রঙের রঙীন বাহাদুরীখেলা দেখতে বেশ লাগছিল। বেশ একটা রেভেরির মধ্যে চলে গিছলাম। হঠাৎ—

— কী চাইছেন স্যার?

সিনেমায় — অাজকাল টিভিসিরিয়ালে — স্লোমোশানে হাত থেকে চায়ের কাপ পড়ে যেতে দেখায়। মৌতাতটাও সেভাবেই ভাঙল। স্লোমোশানে নয় যদিও।

অ্যানালজিটা শাণাচ্ছে না। ওকে, রিট্রাই।

অাশির দশকের শেষের দিক বা নব্বুইয়ের প্রথমদিকে ক্রিকেটম্যাচ দেখানর সময় স্লোমোশান যেভাবে করত, খানিক সেভাবে। ধরা যাক, ইমরান খান মনোজ প্রভাকরকে বল করতে অাসছে*****। ইমরানের ছুটে অাসার প্রথম অংশটা স্পীডে হবে, তাতে ইমরান খরগোশের মত গুড়গুড় করে ধেয়ে যাবে। বোলিং ক্রীজের কাছাকাছি পৌঁছতেই স্পীড কমানো হবে, ইমরান ক্যাঙারুর মত চাঁদের মাটিতে লাফ মারবে, বলটাও গুলতির মত সাঁই করে বেরিয়ে মনোজ প্রভাকরের অ্যাব্ডোমিন গার্ডের দিকে ধেয়ে যাবে। টার্গেট একেবারে লক করে। লেজার গাইডেড বলব্রেকার বল। প্রভাকর ক্রীজে একটু নাচবে, একবার ভাববে পালাব কিনা, তারপর মাইন্ড চেঞ্জ করে সর্দিবসা গলায় সারে-জহাঁ-সে-অচ্ছা গাইতে গাইতে চোখ কুঁচকে কুঁচকি বাঁচিয়ে ব্যাটটা অফস্টাম্পের এক ইঞ্চি বাইরে মেলে দেবে, যেন রোদ্দুর ডিডিজাঙ্গিয়া শুকোতে দিয়েছে। ইমরানের বলটা মাঝপথে ভেক্টর পাল্টে অাউটস্যুইঙের মাস্টারক্লাস দেখিয়ে ব্যাটের কোনাটাকে অালতো করে চুমু খেয়ে পেছনে মোইন খানের হাতে গিয়ে টুপুস করে মাকালফলের মত জমা পড়বে। ইমরান ক্যাঙারুর ঠাকুর্দার মত একটা জাম্প দিয়ে হাওয়াতে ট্যুইস্ট মেরে অাম্পায়ারের দিকে ভিট্রুভিয়ান ম্যান সেজে দাঁড়িয়ে পড়বে, প্রভাকরও অাম্পায়ারের দিকে কাতর অাকুতির সঙ্গে তাকাবে — এবার মোরে যেতে দে, নচেত মরে যাব। অাম্পায়ারও সবদিন বিচারবিবেচনা করে ভুরুটুর কুঁচকে মুখ ভেংচে ডানহাতের অাঙুলটা অাকাশের দিকে পয়েন্ট করবে—

— স্যার? অাপনি কোন ব্র্যান্ডের চা চাইছেন?

ধুসসস। প্রাইভেসি দেশ থেকে উঠে গেছে নাকি? উফফ। কী একটা লা-কেলাশ সীন কিরিয়েট করেছি—

— স্যার! শ্যার! অাপ ঠিক তো হো না?

যাব্বাবা, হিন্দী বলে কেন?

— না না, হম ঠিক অাছি। মানে, অামি ঠিক হ্যাঁয়। মানে—

রোয়েট। সিস্টেম এরর। ফাস্ট রিবুট।

— স্যার কিছু স্পেসিফিক ব্র্যান্ড চাইছেন?

একটা মেয়ে। সুপারমার্কেটের কর্মচারী। দরকারের সময় এদের টিকির দেখা পাওয়া না। টিকি না থাকলে — সেটার চান্সই বেশি — অারও মুশকিল। পারফ্যুমের অাইলে এদের সবচেয়ে বেশি দেখা যায়, উল্টোপাল্টা বিকট গন্ধওয়ালা পারফ্যুম নাকের সামনে ধরিয়ে দেওয়াই এদের কাজ। ভাই, ওখানে গিয়ে কোন ফ্যাশ্যনেবল সোশাইলাইট নাক-উঁচু মহিলাকে জ্বালা না, অামায় কেন? দিব্যি মৌতাতটা—

— স্যার—
— অামি ঠিক অাছি, থ্যাঙ্ক্যু। চায়ের সম্ভার দেখছি, অামার—
— সম্ভার?
— হ্যাঁ। সম্ভার। কালেকশ্যন। অাপনাদের এখানকার কালেকশ্যন ভাল।
— ওঃ, কালেকশ্যন। হ্যাঁ হ্যাঁ দেখুন…

যাক বাবা, ছেড়েছে।

— অামাদের একটা অফার অাছে স্যার, তিনটে সুপারমার্কেট ছাপ মারা চায়ের প্যাকেট কিনলে দুটো ফ্রী।

উফফফ।

— লাগবে না, ধন্যবাদ।
— ভালো অফার স্যার, নিয়ে দেখুন।
— অফার নিঃসন্দেহে ভাল, চায়ের কোয়ালিটি—
— টপ কোয়ালিটি স্যার। গ্যারান্টি।
— তাই? দার্জিলিং?
— হ্যাঁ স্যার।
— ফার্স্ট ফ্লাশ?
— স্যার?
— না, বলছি, ফার্স্ট ফ্লাশ না সেকেন্ড?
— ইয়ে, মানে…

বোঝ।

খানিক বাদে অামায় দোকান থেকে বেরোতে দেখা গেল। সুপারম্যান থাকলে ব্যাগের মধ্যে এক্সরে করে দেখত পাঁচটা প্যাকেট — একটা লাল, একটা হলুদ, একটা বেগুনি অার দুটো নীল। একটা নীল অামার জন্য, অার একটা—

ফোন।

— হ্যালুউউউ।
— কী করছ?
— লিখছি।
— বাঃ। অামি খাচ্ছি।
— রুটি?
— অার ডাল।
— ডাল? সেকি?
— সত্যি তাই।
— অামি একটু চা খাই।
— থাক। এখন লাঞ্চ কর। চা পরে খাবে।
— সকালে থেকে ওনলি ওয়ান কাপ। হ্যাভ মার্সি, মঁশেরি।
— অামারও সকাল থেকে এক কাপই।
— মোটরবাইকে যীশুখৃষ্ট******! কেন?
— কাজের চাপ। সকালে ঘুম থেকে জাস্ট এক কাপ খেয়েছি। লেডিগ্রে।
— অার? ভাল লেগেছে?
— রোজ সকালে একটা মাথাধরা থাকে। অাজ নেই।

বলাই বাহুল্য, অাই দ্য যাকে বলে অ্যাম ভেরি হ্যাপি।

রঙবেরঙের চায়ের সম্ভার দেখতে দেখতে সেই ছোটবেলাকার কাঠের বাক্সে চায়ের কথা মনে পড়ে যাচ্ছিল। অার মনে হচ্ছিল, কৈ, এই রঙীন চায়ে তো সেই নস্টালজিয়াটা নেই, সেই এসেন্সটা নেই, সেই ছবিবিশ্বাসমার্কা ওমটা নেই।

মডার্ন জিনিস মানেই খারাপ, অার পুরনো মানেই ভাল, তাই তো? নতুন বইয়ের গন্ধ ভাল, নাকি পুরনো বইয়ের সুবাস?

নট অলওয়েজ। ভালখারাপ মাপেন স্বয়ং স্মৃতি। ভাল হলে ভাল, ভাল না হলে ভেলায়। ভুলনের ভেলায়।

লেডিগ্রে খেয়ে পারোশ্বরীর মাথাধরা ছেড়েছে। নাহোক লেডিগ্রে কাঠের রং না হয়ে নীলই হল, তাতে কী? কারুর উপকারে তো এসেছে। কারুর ভাল তো করেছে।

একেই বলে ক্যাথার্সিস।

(চলবে)

(#চামলমও_টুথপেস্ট)


#সোঘো, ১৪:১১, ১ মার্চ, ২০১৭, তিলোত্তমা।

 

  • বেশি রেশিস্ট শোনাচ্ছে? পলিটিকালি ইন্কারেক্ট? ইনসেন্সিটিভ? হমারা কোই কসুর নাহি। স্টার ট্রেকে ইউনাইটেড ফেডারেশন অফ প্ল্যানেট্সের ফাউন্ডিং মেম্বার অ্যান্ডোরানরাই তো শাদাচামড়াদের** এভাবে ডাকত।

** এঃ, না, সত্যিই, মানে, সেন্সরবোর্ড, কাঁচি, লিপস্টিক বুরখা ইত্যাদি।

*** ক্যম্পনী মার্কিন ব্যাপারস্যাপার।

**** ক্যানিবালও হতে পারেন, অাশ্চর্য নয়।

***** ছবিটা মনে করলেও হাসি পাচ্ছে।

****** এইজন্যেই বলি, বাংলা অনুবাদে দম থাকে না। জীসাস ক্রাইস্ট অন অা মোটরবাইকটা কেমন পটলের লাবড়া হয়ে গেল।

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s