চেন্নাইতে অামি বহু বছর কাটিয়েছি। প্রচন্ড গরম জায়গা, সারাবছর একইরকম গরম থাকে, এপ্রিম-মে মাসটা একেবারে নরক। জুন মাসে অাবার কখনও কখনও বৃষ্টি পড়ে রাতের তাপমাত্রা দুম করে নেমে যায়। সারাবছর প্যাচপ্যাচে গরম বলে চা বা কফির দরকারটা কম পড়বে বলেই মনে হতে পারে। সেরকম মনে হলে ভুল ভাবা হবে।

অনেক ছোটবেলায় বাবা একবার পার্লামেন্টে নিয়ে গিছল। এটা পার্লামেন্ট হামলার অনেক অাগেকার ঘটনা, কড়াকড়ি থাকলেও অত হয়ত ছিল না। পার্লামেন্ট বিল্ডিঙের ঘোরানো থামওলা বারান্দা দিয়ে হাঁটছি, মে মাস, দিল্লীতে তুমুল (শুকনো) গরম। দুপর একটা নাগাদ হবে, সকালে বেরিয়ে দু’একটা জায়গা ঘুরেটুরে শেষে পার্লামেন্টে গেছি, বেশ তেষ্টা পেয়ে গেছে। বললাম বাবাকে, কোল্ডড্রিঙ্ক খাব। ততদিনে মনমোহন সিং-য়ের দৌলতে* কোকাকোলা ভারতের বাজারে ফিরে এসেছে, সেই কোকই চেয়ে বসলাম। বাবা মুচকি হেসে মাথা নাড়ল। হ্যাঁ, কোল্ডড্রিঙ্ক নিশ্চয় হবে। খুশিতে ডগমগ হয়ে বাবাকে জিজ্ঞেস করলাম — তুমি কোল্ডড্রিঙ্ক খাবে? বাবার চিরকালের হাঁপানির অসুখ ছিল, ঠান্ডা জিনিস তাই এড়িয়ে চলত। সেটা অামি জানতাম না যদিও। সেটা বয়সের খামতি হতে পারে, বা নিস্পৃহতাও হতে পারে। অাশা করি প্রথমটাই। কোল্ডড্রিঙ্ক খাবে কিনা শুনে বাবা অারেকবার মুচকি হেসে বলল — চা খাব।

অামি তো স্পুটনিক থেকে পড়লাম। চা! এই গরমে!! মাথা খারাপ নাকি?

মুচকি হাসিটা স্মিত হয়ে বলল — চায়েতেই অারাম।

অামার হাঁ করা মুখটা ততক্ষণে হীরকরাজারদেশের যক্ষকে পাল্লা দিতে পারে। বলে কী লোকটা — অাই মীন, বাপটা? শুধোলাম — কিন্তু এই গরমে অারও গরম খাবে? তার চেয়ে ঠান্ডা কিছু খেলে বেটার হত না?

স্মিত হাসিটা চৈতন্য লেভেলে চলে গেল। বলল — গ্রীষ্ম হোক কি শীত, শরীর ক্লান্ত অবস্থায় চায়ে প্রথম চুমুকটা দিলেই মনে হবে, অাঃ, হাতে যেন স্বর্গ পেলাম**। একটা হেভেনলি ব্যাপার।

পুরো কনসেপশন্টাই তখন অামার মাথার চার হাত ওপর দিয়ে এক পাল মিসাইলের মত সাঁইসাঁই করে বেরিয়ে যাচ্ছে। শুধোলাম — কিন্তু কোল্ডড্রিঙ্ক খেলে তো চাঙ্গা লাগে, শরীরও ঠান্ডা হয়। এখন চা খেলে হেদিয়ে পড়বে না?

স্মিত হাসিটা চৈতন্য থেকে অাপগ্রেডেড হয়ে বুদ্ধদেবে গিয়ে ঠেকল। বলল — এখন বুঝবে না। বড় হও, চায়ের মাহাত্ম্যটা টের পাবে।

সেদিন শেষমেশ কোল্ডড্রিঙ্ক খাওয়া হয়নি। স্ট্রবেরী মিল্কশেক দেখে বায়না করেছিলুম, স্মিত হাসি মুচকি হেসে সে বায়না মিটিয়েছিল। কোকাকোলার চেয়ে অনেক ভাল লেগেছিল। অারও ভাল লেগেছিল*** বাবার চা খাওয়া দেখে। সারাটা সকালে এখান থেকে ওখান বেশ কয়েকটা জায়গায় গেছে, বয়সও হয়েছে, চায়ে প্রথম চুমুকটা দিতেই ক্লান্ত শুকনো মুখটায় একটা শান্ত ঔজ্জ্বল্য এল। মুখ থেকে একটা অারামের “অাঃ” বেরিয়ে এল। বয়সটা যেন দশ বছর কমে গেল ভদ্রলোকের। অনেক পরে মনে হয়েছিল, চায়ের সত্যি এত মাহাত্ম্য?

এখন অামারও বয়স হয়েছে। খুব না হলেও, কিছুটা তো হয়েছে। অন্তত শারীরিক দিক থেকে তো বটেই। এখন গ্রীষ্ম হোক কি শীত, বর্ষা হোক কি বসন্ত, ক্লান্ত শরীরী গরম গরম চায়ের কাপে প্রথম চুমুকটা দিয়ে মুখ থেকে অটোমেটিক “অাঃ”-টা বেরোনর সঙ্গে সঙ্গে মনটাও সেই কবেকার কয়েকটা কথায় ফিরে ফিরে যায়।

চায়ের মাহাত্ম্য অামি এতদিনে টের পেয়েছি বাবা।

(চলবে)

(#চা-মলম-ও-টুথপেস্ট)


#সোঘো, ১৩:০৯, ২ মার্চ, ২০১৭, তিলোত্তমা।

  • কল্যাণে অার বললাম না। অাদপে কল্যাণ কিনা তাই জানি না। বহু বছর কোল্ডড্রিঙ্ক ছেড়ে দিয়েছি, কচিৎ-কদাচিৎ খুব ঝাল কিছু খেলে সঙ্গে খেতে ইচ্ছে করে।

** বাবা ঠিক এভাবে বলেনি বটে। অ্যানালজিগুলো অামার, মানে এই এখনকার অামার। বাবা খুব শান্তভাবে হার্ট-অফ-দ্য-ম্যাটারে গিয়ে সুন্দর ছোটছোট দু’তিনটে বাক্যে কাজ সারত। যেখানে এক প্যারাগ্রাফে কাজ হয়, সেখানে একটা পুরো প্রবন্ধ লিখতে তাকে কখনও দেখিনি। হয়ত সারাজীবন সাংবাদিকতার ফল।

*** তখন হয়ত বুঝিনি, স্মৃতিটুকু রয়ে গেছে। পরে ওয়ার্ড্সওয়ার্থের স্টাইলে রিকালেক্ট করেছি।

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s