হেমেনরায়ের লেখার অামি এককালে সাংঘাতিক ভক্ত ছিলাম। এতটাই ছিলাম যে ভদ্রলোকের নাম এগজ্যাক্টলি হেমেনরায় কিনা সেটাও সম্পূর্ণ নিশ্চিত নই। তাও, টিভিতে যখের ধন (নাকি অাবার যখের ধন) সিরিয়াল দেখে বেশ রোমাঞ্চিতই হতাম, অাফ্রিকার গহীন ঘন জঙ্গল অার ডায়মন্ডহারবারের কেটকিবনের কোন তফাত না পেয়ে অারও শিহরিত হতাম।

হেমেনরায়ের বই অামি ঠিক কোত্থেকে জোগাড় করি মনে নেই। নতুন বই ছিল না এব্যাপারে নিশ্চিত। ডাহাতে একটা ছোট লাইব্রেরী ছিল বটে, গ্রীষ্মের ছুটিতে ডাহা ফিরে দু’য়েকবার যে যাইনি তা নয়, একবার একটা অলৌকিক গপ্পের বই এনেছিলুম সেটাও মনে অাছে, কিন্তু হেমেনরায়ের স্টেডি সাপ্লাই কোত্থেকে অাসত স্মৃতি থেকে সম্পূর্ণ উবে গেছে। এর মানে নির্ঘাত মা, হয় পড়িয়ে-টড়িয়ে কলেজস্ট্রীট থেকে অানত, নয় কলেজের লাইব্রেরী থেকে।

অাজ সকালে অাবিষ্কার করলাম ট্যাঁক খালি। সেটা অাশ্চর্যের কিছু না। কিন্তু টাকা তো লাগবেই। তাই পেটে দানাপানি না ফেলেই বেরিয়ে পড়লাম। দানাপানি ফেলে বেরলেও চলত, কিন্তু অামি হচ্ছি অামি, সবচেয়ে ইউজলেস নীডলেস জায়গায় হিরোগিরি দেখান চাই।

রোদ্দুরে রাস্তা, গাড়িঘোড়া নেই যদিও, হাঁটতে মন্দ নয়। মার্চ মাস এসে গেছে, গরমটাও অাস্তে অাস্তে জানান দিচ্ছে, তাই ছায়া খুঁজে খুঁজে হাঁটাটাই ভাল। যাই হোক, রাস্তা পেরিয়েটেরিয়ে শেষমেশ এটিএমে পৌঁছলাম। মাসের শুরু সত্ত্বেও লাইনফাইন নেই। হ্যাপি হয়ে তড়াক করে লাফিয়ে দরজা ঠেলে ঢুকে পড়লাম।

সামনে দেখি দু’খানা মেশিন। একটা নতুন দেখতে, পালিশটালিশ অাছে, অন্যটার স্ক্রীনটা কেমন হলদেটে হয়ে গেছে, যেন বহুদিন বিড়ি খেয়ে খেয়ে দাঁতে তামাকের চিরছাপ পড়ে গেছে। ন্যাচেরালি পুরনোটাতেই গেলাম। অান্ডারডগদের প্রতি অামার স্বাভাবিক একটা ইয়ে অাছে। এটা সেই ছোটবেলার মোহনবাগান-ইষ্টবেঙ্গল ম্যাচ দেখার সময় থেকেই। ছোট দুর্বল অপোনেন্টের প্রতি সবসময় অামার সিমপ্যাথি যায়। অবিশ্যি উল্টোদিকে পেয়ারের দল খেললে অন্য কথা। তাও, কখনও-সখনও যে লালহলুদের প্রতি একটা অনুকম্পাজাত দুঃখ হত না তা নয়।

ট্যাঁক থেকে কার্ডটা বের করে ঠিক দিকটা বাছাই করে বারতিনেকের চেষ্টায় স্লটের ঢুকিয়ে স্লুট করে স্টাইলিশলি টেনে বের করলাম। স্ক্রীনটা খেঁকিয়ে উঠল — ভালভাবে কার্ডটা ঢোকান না মশাই। এত বড় হয়ে গেছেন, কার্ড ঠিক করে ঢোকাতে শেখেননি। যত্তসব অকর্মার ঢেঁকি।

ভাই। অামি লাইফে প্রচুর বকুনি গালাগালি চড়চাপট খেয়েছি। কিন্তু একটা এটিএম এভাবে প্রেস্টিজটা—

পোকার ফেস। পোকার ফেস।

কার্ডটায় বারদুয়েক ফুঁ দিয়ে অারেকবার ঢুকিয়ে এবার কচ্ছপের গতিতে টেনে বের করলাম। জয় বাবা এটিএমনা—

— ভালভাবে কার্ডটা ঢোকান না মশাই। এত বড় হয়ে গেছেন, কার্ড ঠিক করে ঢোকাতে শেখেননি। যত্তসব অকর্মার ঢেঁকি।

তাও ভাল, এটিএমটা কন্সিস্ট্যান্ট।

অান্ডারডগদের প্রতি অামি স্নেহশীল। খ্যাঁকাড়ে অান্ডারডগদের প্রতি নই।

বাঁদিকে দু’ফুট সরে এসে অান্ডারএটিএমটাকে ভেংচি কেটে কার্ডটা পালিশটালিশ করা মেশিনটাতে ঢুকিয়ে অালতো করে স্লাইড করে বের করে অাঙুলদুটো ক্রস করতে যাব এমনসময়ে—

— পিনটা দেবেন দাদা। অার দেওয়া হয়ে গেলে ওই ডানদিকের বোতামটা টুক করে চেপে দেবেন।

অাহা। এই তো, গুড মেশিন, নাইস মেশিন। অাহ্লাদে অাপ্লুত হয়ে মাথায় হাত বুলিয়ে দিলাম। লেজটা মনে হল বারদুয়েক নাড়ল।

সময় নেই। পেট খিদেতে জ্বলছে। টপাটপ দরকারি তথ্য মেশিনে পুরে ফেললাম, টাকার অঙ্কটা অাসতে চার শূন্য শূন্য শূন্য বসিয়ে দিলাম, দিয়ে কার্ডটা তড়িঘড়ি যথাস্থানে পাচার করে টাকার স্লটের নীচে হাত পেতে দাঁড়ালাম। যেন জাগো মোহন পেয়ারেতে নার্গিসের জলভরা কলসের সামনে দাঁড়িয়ে নাচান নাশেভ ঘেমো রাজকপূর।

ঘট-ঘট।

ঘটাং-ঘট।

ঘেঁটো-ঘট-ঘট-ঘটাং-ঘেঁটো-ঘটাং-ঘট-ঘট।

ঘ্যাঁও-ঘ্যাঁও-ঘটাস-ঘং।

দু’হাজার ষোল সাল। নভেম্বর মাস। তারিখ অাট। ভারতবর্ষের ইতিহাসে এক অভাবনীয় দিন। নাড়ুদা দামুরূপে টেলিভিঝ্যন রেডিও ইন্টারনেট ইত্যাদিতে ইন্দ্রের ন্যায় অাবির্ভূত* হয়ে পাঁচশহাজারের কেস গেলাশ করে ছেড়ে দিলেন। তারপর সে এক লুহুস্থুল ব্যাপার। এক হইহই কান্ড। এক রইরই ব্যাপার। এক হর্সের এক ব্যাকে এক গোবিন্দলাল কেস।

ইতিহাস সবাই জানে। বিশেষ করে যখন সে ইতিহাসে ফ্রেশ ন্যুজপ্রিন্টের গন্ধ এখনও লেগে অাছে। পাব্লিকের মেমরী, বুঝলেন দাদা, হাতির অপোজিট।

যাই হোক, পয়েন্টটা হল, এটিএমে অাজকাল একশটাকার নোট পাওয়া অার জোজোর পকেটে চাঁদের পাথড় পাওয়ার চান্স একই। বিশেষ করে দু’হাজারের মাল্টিপেলে টাকা চাইলে তো বটেই। হাতে চাঁদ পেয়েছি হাতে চাঁদ পেয়েছি বলে চেঁচামেচি করে মেশিনমশাই লাফাতে লাফাতে গোলাপি গোলাপি সরু সরু প্যাতপ্যাতে নোট হাতে ধরিয়ে দেবে। ঠিক যেন লঙ্গরখানায় ঝলসানো রুটি বিলোচ্ছে।

দু’হাজার টাকার নোটের একটা সুবিধা অাছে। মেশিন থেকে বেরোতে বেশি সময় নেয় না**। চেয়েছি তো মাত্র চার হাজার, অাসবে তো ওই দু’টি নোট, তা বলে এত তেরেকেটে-মেরেকেটে ধা-নি-সা-পা করার কী দরকার তো বুঝলুম না। ইদিকে মেশিনমশাই নিজের মনে ঘট-ঘট-ঘটাং-ঘট করেই চলেছেন। বিগড়োল নাকি? গার্ডভায়াকে বলব বলব করছি, এমন সময় ঘটাং-ঘটাং বন্ধ হল। তার বদলে চ্যাঁ-চোঁ-সুঁই-সাঁই শুরু হল।

বহুত দুর্ধর্ষ এটিএম।

ছিল।

মানে পাস্ট টেন্স।

নির্ঘাত। প্রেজেন্ট থাকলে, মানে কেজো থাকলে এত হ্যাজাত না।

ট্যাঁকটা ট্যাঁকে পুরে কেটে পড়ব কিনা ভাবছি, এমন সময় চালাকবাকে টিং। কী ব্যাপার? না, ছোর্তা*** এয়েছে। টাকা কেটেছে। অ্যাকাউন্ট থেকে চারটি হাজার টাকা চিরকালের জন্য ভস্মীভূত হয়ে গেছে।

হায় হায়, এ কী হল? এ কী ক্যালামিটি? অামার কী হবে গোওওওওও…

গোঁওওও-ঘ্যাঁসসসস-ফসসসস-ফ্যাঁশ-ফসসস।

প্লীজ কালেক্ট ইয়োর কারেন্সি।

টাকার স্লটটা সরু হয়। রোগাও বলা যায়। যেন পঁচিশ দিন না খেয়ে অাছে। তার থেকে দু’টো পাতলাপাতলা গোলাপি নোট বেরলে যে দৃশ্যটা চোখের সামনে সাঁতরে ওঠে, তার ঠিক উল্টো দৃশ্য পনের ফুট উঁচু থেকে ডাইভ মেরে জলে ঝাঁপ দিয়ে চারদিক ভিজিয়ে দিল।

অামিও অাঁতকে উঠলাম। মানে উঠতেই হল।

স্লটের গহ্বর থেকে দু’টো নয়, একবান্ডিল নোট বেরিয়ে এসেছে। অার নোটের রঙ বাবলগামের গোলাপি নয়, দেয়ালে লাগা অতি পুরাতন শ্যাওলার মেটেসবুজ।

কাঁপাকাঁপা হাতে বান্ডিলটা টেনে বের করলাম। কাঁপাকাঁপা হাতে গুনলাম। কাঁপাকাঁপা হাতে গুনতিতে ভুল করলাম। কাঁপাকাঁপা হাতে ফের গুনলাম। কাঁপাকাঁপা চোখে স্পষ্ট দেখলাম, অালিবাবা ও চল্লিশ নোট।

কাট্!

থুড়ি। ভুল অ্যানালজি।

কিন্তু এ কী লা-কেলাস ব্যাপার! দু’হাজারের মাল্টিপ্যলে টাকা চেয়েছি, অার পোস্ট-৮নভেম্বর ভারতবর্ষের এটিএম মেশিনমশাই নাকি একশ টাকার নোটে দিয়েছেন! একটা নয়, দুটো নয়, মায় তিনটেও নয়, একেবারে চল-চল্লিশটা!!!

কাঁপাকাঁপা হাত থেকে নোটের থোকাটা পড়েই যাচ্ছিল প্রায়।

দুপুরবেলা ব্যাঙ্কে গিছলাম। সেখানে গিয়ে ঘটনাটা বলতে কাউন্টারের লোকজন একসাথে সিঙ্ক্রোনাইজড স্যুইমারের মত চেয়ার পেছনে ঠেলে চোখ ঠিকরে বের করে সেখানেই গোঁগোঁ করে পতন এবং সরাসরি মূর্ছা। শেষে স্মেলিং সল্ট — থুড়ি, সিঙ্গল মল্ট শুঁকিয়ে তাদের জ্ঞান ফেরাতে হয়েছিল।

গার্ডভায়া সত্যিই ছিল একজন। সে এসব কান্ডকারখানা হাঁ করে দেখছিল। অতগুলো একশটাকার নোট দেখে তারও গুড়ুম অাক্কেল হয়ে গেছে।

— চার হাজার?

কাঁপাকাঁপা গলায় জবাব দিলাম।

— হ্যাঁ, মানে গুনতে হবে।

লোকটা হেসে ফেলল।

— না না, বলছি, চার হাজার দিয়েছিলেন?

ইরিব্বাসকেল্লা! লোকটা জানল কীকরে? প্যাথিটেলি জানে নাকি?

— হ্যাঁ কিন্তু কীকরে…

ফেলুদার ক্লায়েন্টদের মত করে লাস্ট ডায়ালগটা পড়তে হবে।

— কিছুই না। মনে হল। অাপনার অাগেও একজন এরকম চারহাজার দিয়ে এতগুলো একশ টাকার নোট পেয়েছিলেন।

মনের অানন্দটা কেমন ফুটোওয়ালা টায়ারের মত চুপসে গেল।

— অাগেও? মানে অামি প্রথম নই?

লোকটা অারেকবার হেসে উঠে দাঁড়াল। অন্ধকারে বসেছিল, ঠিক ঠাওর করতে পারিনি। এখন দেখলাম কেমন সিড়িঙ্গেমার্কা চেহারা, যেন অনেকদিন ফেলে রাখা কিসমিসের মত শুকিয়ে অামসি মেরে গেছে। গায়ের রঙ ফর্সা — ফর্সা না বলে শাদা বলাই ভাল। অনেকটা বিশ বছর অাগে হোয়াইটওয়াশ করা দেয়ালের মত। গলাটাও কেমন ফ্যাঁসফ্যাঁসে। পরনে গার্ডের পোষাক।

— অাপনার অাগেও অারেকজন এসেছিলেন। অাপনার মতই তিনিও চান না করে দাড়ি না কামিয়ে তিনদিনের বাসি ঘেমো জামা পরে গন্ধ ছাড়তে ছাড়তে এসেছিলেন। অাপনারই মত তাঁরও ল্যাক্টোজেন খাওয়া চেহারা। অাপনারই মত তিনিও ফুচকা খেতে খুব ভালবাসেন। অাপনারই মত তিনিও গল্পকথায় বিশ্বাসী।

গল্পকথা? ফুচকা? গন্ধ? বগলটা একবার শুঁকে নিলাম। কই, তেমন তো কিছু নয়, জাস্ট স্ট্যান্ডার্ড—

— গল্পকথা? মানে?

কাঁপা কাঁপা গলায় প্রশ্নটা ছুঁড়ে দেবার চেষ্টা করলাম, ঠিকঠাক জুত করতে না পেরে ভির্মি খেয়ে সে তিনবাউন্সে অফস্টাম্পের তিনহাত দূরে গিয়ে পড়ল।

— মানে অাপনিও এককালে ডায়মন্ডের সেই লাইব্রেরী থেকে পোকায় কাটা হেমেনরায় রচনাবলী নিয়ে পড়ে যারপরনাই হ্যালু হয়েছিলেন, এবং তারপর পাক্কা তিনমাস বিভিন্ন অলৌকিক গল্পে, ধ্যানে, ধারণায় বিশ্বাসও রেখেছিলেন। ঠিক কিনা?

বাধ্য ছেলের মত তিনবার মাথা নাড়ালাম। শকের চোটে ঘাড়ের হাড় জ্যাম হয়ে গিছল, ছাড়াতে “ঠিক ঠিক ঠিক” শব্দ হল।

— তাহলে অার বাধা কোথায়? বিশ্বাসের পুরষ্কার হয়, সেটাও নিশ্চয় বিশ্বাস করেন। নিন, নিয়ে যান।

গার্ড তার ডান হাতটা তুলল। তর্জনীটা সোজাসুজি একশর নোটের বান্ডিলটার দিকে তাক করল। হাতটা রোগা, এত রোগা হাত অামি কখনও দেখিনি। কোন জীবন্ত মানুষের—

ট্রিং ট্রিং ট্রিং!

ফোন!

পারোশ্বরী!

কিন্তু—

দেখি, এটিএমের বাইরে একটা কালো মার্বেলের চাতালের ওপর বসে অাছি। ট্যাঁকে ট্যাঁকটা অাছে বেশ টের পাচ্ছি। ট্যাঁকটার পেটটা যে বেশ মোটা হয়েছে সেটাও হাড়েহাড়ে টের পাচ্ছি।

পকেট থেকে ফোনটা বের করতে করতে ভাবলাম, গার্ডই বটে। অাল্টিমেট গার্ড।


#সোঘো, ১৯:৩৬, ৩ মার্চ, ২০১৭, তিলোত্তমা।


  • প্রথম অা-টা টেনে, বীরেনভদ্র স্টাইলে।

** সুবিধে অারেকটা অাছে। ট্যাঁকে বেশি জায়গা নেয় না।

*** ছোট বার্তা। অর্থাৎ এসেমেস। চালাকবাক মানে যে স্মার্টফোন সেটা নিশ্চয় বলে দিতে হবে না।

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s