ভারোত্তলন ছোটবেলায় টিভিতে দেখতাম। ব্ল্যাকশাদা টিভি, মাঝেমধ্যেই কাজ করত*, দূরদর্শনে ওলিম্পিক স্পোর্ট্স ইত্যাদি রিপিট টেলিকাস্ট দিত। লোকজন হাতে পাউডার ঘাড়ে বজরংবলী মেখে একটা অত্যন্ত হাল্কা দেখতে রডমার্কা জিনিসকে অত্যন্ত নাটকীয়ভাবে হেঁইয়ো-টেঁইয়ো বলে তোলার চেষ্টা করত। দু’টাইপ ছিল — একটা স্ন্যাচ, সেখানে হাল্কা দেখতে রডমার্কা জিনিসটাকে একচান্সে মাথার ওপর তুলে ফেলতে হবে। অার অন্যটা ক্লীন অ্যান্ড জার্ক, সেখানে দেখতে রডমার্কা জিনিসটাকে প্রথমে ঘাড়ে বেতালকা মাফিক রেখে তারপর মুখচোখ ভেঙচে ব্রুসলী-মোনিকাশেলেস স্টাইলে চেল্লাচেল্লি করে লাফিয়ে-ঝাঁপিয়ে মাথার ওপর তুলে তারপর অারও জোরেমাফিক মাটিতে ধমাস করে ফেলতে হত।

বেশ একটা স্ট্রগোন্যামর্ফিকেটাস থ্রীলিং ব্যাপার। গায়ের রোম ইতালী হয়ে যেত।

অাজ সকালে হাওড়া ইস্টিশনে গেছি। মাসতুতো ভাইঝির বিয়ে—থুড়ি, বিয়েবার্ষিকী, মানে ওই স্ট্রেট ভরসাপূর্তি উৎসব। দাদা-বৌদি-মাসি দিল্লী থেকে রাজধানী চেপে অাসবেন। কোন এক সামন্তজানা কারণে ট্রেন লেট। মানে যে সে লেট নয়, একেবারে পাক্কা দু’ঘন্টা লেট।

এদিকে অামার ফিলসফি হচ্ছে, ট্রেন অাসার পনের মিনিট অাগেও যদি ট্রেন স্টেশ্যনে পৌঁছলে চলে, তাহলে অবশ্যই ঝাড়া দু’ঘন্টা অাগে পৌঁছতে হবে। নয়ত অামার বিম্বিসার হয়।

এদিকে রোদ চড়েছে বেদম। দিনকয়েক ভাল ঘুম হয় নি, সকালে পেটে কফি পড়ে নি। মাথাটা ধরব-ধরব করছে, এমন সময় এক পশ্চিমা** হাজবেন্ড-ওয়াইফ ফেমিলি প্ল্যাটফর্মের থামবেঞ্চিতে বসে কলা সেবন করছেন। তা ভাল, কলা-ফলা খাওয়া ভাল। হেল্থ ইম্প্রুভ হয়, মোশ্যন লুজ থাকলে শক্ত হয়, শক্ত থাকলে লুজ হয়, অার পরে হাগজ না থাকলে খোসাটা তো অাছেই।

ইদিকে অামি অাবার সকালে স্রেফ ম্যাগি খেয়ে বেরিয়েছি। তাও মাত্তর এক প্যাকেট। ভাবেন তো, এই ল্যাক্টোজেন খাওয়া শরীরে মাত্তর একপ্যাকেট ম্যাগি? অতএব জুলজুল করে তাকিয়ে যতটা পারি নজর দিচ্ছি।

এই নজর দেওয়া কেসটা অামার ফ্যাসি লাগে। জুলজুল করে কারুর দিকে তাকিয়ে থাক, গ্যরান্টি গাড়ু নয় হাজগের ডিমান্ড বেড়ে যাবে। মানে যাকে বলে ম্যাজিক। সুপারপাওয়ার। সবার নাকি থাকে। তাক করে মারতে পারলেই কেল্লাফতে, ফ্রেন্ডফোফিলোজফার সবাই অক্টারলোনির মাথায় গিয়ে চড়ে বসবে।

হাজবেন্ডটা কলা খাওয়া শেষ করল। উফ কি ফাস্টই না খায়। কলা খাচ্ছে না টেনিস খেলছে বোঝা যাচ্ছে না***। ওয়াইফ অনেক ধীরে ধীরে সত্যজিতের মামার মত চিবিয়ে চিবিয়ে কলা খাচ্ছে। হাজবেন্ডটা কলাটা শেষ করে কলার খোসাটা না পাকিয়েই চূড়ান্ত অবজ্ঞার সাথে দূর করে লাইনে ফেলে দিল।

হুজুর ধর্মাবতার, ট্রেনলাইনে অাবর্জনা ফেলবে না তো কি দশপা দূরে বসানো “ইউজ মী” লেখা ডাস্টবিনে ফেলবে? অাফটার অল, ইয়োর অনার, ইয়ে ইন্ডিয়া হ্যায়। অামিও খোসার দিকে নজর না দিয়ে—

নাঃ, নজর না দিয়ে থাকা যায়? নজরে ম্যাজিকবল থাকে, চোখ অটোমেটিকালি চলে যায়।

এক্সপেক্টেশ্যন : খোসাটা বেশ অ্যাট হোম ফীল করবে। লাইনটা তো এমনিতেই ফেলো জঞ্জালে ভর্ত—

রিয়্যালিটি : খোসাটা অামি-বাড়ি-যাব সুরে সুর জুড়ে দিল।

রীজন : পুরো লাইনে, মানে গোটা লাইনটায়, মানে কলকাতার হাওড়া স্টেশ্যনে…থুড়ি, হাওড়ার হাওড়া স্টেশ্যনের পুরনো ব্লকের অাট নম্বর প্ল্যাটফর্মের সামনের গোটা লাইনটা, ইন ইটস এন্টায়ারিটি, পরিষ্কার। মানে যাকে বলে কুটোটি নেই। একেবারে পিনড্রপ ক্লীন।

কলার সদ্যজাত খোসাটা ছাড়া।

দেখেই গায়ের মধ্যবয়সী রক্ত সাড়ে সাঁইত্রিশ ডিগ্রী শেলশিয়াসে উষ্ণতায় কেঁপে উঠল। সিভিক সেন্স রাস্তায় তাসাপার্টি নিয়ে ক্যানেস্তারা পেটাতে পেটাতে শিঙাড়া-জিলিপি খেয়ে একভাঁড় রোডসাইড চা চাইল। নাগরিকদায়িত্ত্ব হন্তদন্ত করে হম্বিতম্বি করে হইহই-চইচই বাঁধিয়ে দিল। শার্টের অাস্তিনটা নিজে থেকেই ইঞ্চিদুয়েক গুটিয়ে গেল। ঠ্যাংদু’খান অফ ইট্স ওন ভলিশ্যন লোকটার দিয়ে এগিয়ে—

অ্যান্যালিসিস : হাজবেন্ড ছ’ফুট দুই, মিনিমাম। ছাতি পঞ্চান্ন ইঞ্চি, মিনিমাম। বাইসেপ দেখলে মনোহর অাইচ মনের দুঃখে প্যারামাউন্টের শরবৎ খেতে বসে যাবে।

টর্চ নিলাম। নিয়ে স্মৃতিটাকে হাতড়ালাম। না, উইল করা নেই। অামি মরলে অামার সমস্ত স্থাবর-অস্থাবর-নিস্থাবর সম্পত্তি লম্বকর্ণের পেটে যাবে।

কে একটা অানেডুকেটেড লোক নাকি বলে গেছে, কাওয়ার্ডস ডাই মেনি ডেথস। কই, দিব্যি তো দেখলুম বেঁচেবর্তে অাছি। নিঃশ্বাস নিচ্ছি, হিসু-হিসু পাচ্ছে, মাথা ধরাটাও বাড়ছে। সেল্ফ-এস্টিমও সিলিংপাখায় দিব্যি ঝুলে রয়েছে।

ছোটবেলায় পোয়েটিক জাস্টিস বলে একটা কথা শুনেছিলুম। লাইফে বিশ্বাস করিনি বস, মাইরী বলছি। অাজ করলুম।

কলার খোসাটা দিব্যি পোজটোজ দিয়ে লাইনের ধারে পড়ে অাছে। এদিকে ওয়াইফও নিজের কলাটা শেষ করে খোসাটাকে পাকাচ্ছে। পাকানো কলা লাইনের কলার দিকে অাড়চোখে চেয়ে ঝাড়ি মারছে, লাইনের কলাও শাহরুখের মত হাতদু’খান ভিট্রুভিয়ান করে বলছে, অায়, কাছে অায়।

ঠিক এই সময়ে একটা ক্যালরব্যালর।

কী ব্যাপার?

না, ওয়াইফ হাজবেন্ডকে বকাবকি করছে।

কী নিয়ে?

না, কলার খোসা কেন লাইনে ফেললে, পাশেই তো ডাস্টবিন ছিল।

চড়কগাছ বস্তুটি ঠিক কী অামার না সত্যি কোন ধারণা নেই। কোনওদিন ছিলও না, কোনওদিন হবে বলেও মনে হয় না। কিন্তু চোখদু’পিস যে তখন চড়কগাছের ঠাকুর্দার পিসেমশাইয়ের জ্যাঠাশ্বশুরের ধুতির গিঁটের চেয়েও ঘেঁটে ছিল, সে নিয়ে ক্যালিবগার্নিস গ্রহের অগুনতি জনগণে অন্তত কোন সন্দেহ নেই।

পরের সীন। শটও বলা যায়।

ওয়াইফ পাকানো খোসাটাকে হাতে করে উঠে দাঁড়িয়ে গটমট করে ডাস্টবিনটার কাছে গিয়ে কলার খোসাটা ফেলে ফের গটমট করে হেঁটে ফিরে এসে বসেই পাঁচঢোঁক জল খেলেন।

কলার পর জল? হরি হরি। পেটে কলাগাছ হবে তো! ছ্যাঃ, এটুকু জানে না? হাউ নির্বোধ।

দেখলাম মাথাধরাটা ছেড়ে গেছে।


#সোঘো, ১৯:২৮, ১০ মার্চ, ২০১৭, তিলোত্তমা।

  • বাকি সময়টা বিগড়ে পড়ে থাকত, দীপক নামে ঘেমো মেকানিক এসে সারাই করত।

** মানে মাড়োয়ারী। কীভাবে জানলাম কৃপয়া মত পুছিয়ে, সির্ফ গোটাপঞ্চাশেক একটাকর্পূরমার্কা সিরিয়াল দেখিয়ে।

*** টেনিস খেলার সময় বরিস বেকার একটা কলাকে তিনঘন্টা ধরে এককামড় এককামড় করে খেত, খেয়ে খোসামুড়ি দিয়ে রেকে দিত। দেখে অামারও কলা খেতে ইচ্ছে করত। তারপর বাজার থেকে সত্যি সত্যি কলা এলে অামিও বেকার স্টাইলে কলায় কামড় দিয়ে রেখে দিতাম, অার বেদম বকা খেতাম।

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s