“জেরিম্যান্ডারিং কাকে বলে জানো?”

অালাপ করিয়ে দি। বক্তা শ্রী বিধানচন্দ্র ভট্টাচার্য, অামাদের স্বনামধন্য পাশেরপাড়াতুতো বিধুজ্যাঠা। সত্যজিতবাবুর সিধুজ্যাঠার মতই বিভিন্ন বিষয়ে এনার জ্ঞান অগাধ। সেই জ্ঞানের ফোঁটাকয়েক পেতে অার বিধুজ্যাঠার বিশ্বস্ত ম্যান ফ্রাইডে নেলোদার বিখ্যাত ডবলডিমের মামলেট খেতে অামরা দু’জনে রেগুলার হত্যে দি। অামরা বলতে অামি অার পুলুদা। পুলুদা অর্থাৎ পলাশচন্দ্র মিত্র, সংক্ষেপে পুলুদা। অার অামি রঞ্জনা মিত্র, সংক্ষেপে পার্শে।

বলাই বাহুল্য, জেরিম্যান্ডারিং কাকে বলে অামরা কেউই জানি না। মাথা নেড়ে নিঃশব্দে মামলেট চিবোতে চিবোতে শাদা ফ্ল্যাগ উড়িয়ে দিলাম।

বিধুজ্যাঠা দিনে সাত কাপ হরলিক্স খান। এখন তিন নম্বর চলছে। কাপটা পাশের টীটেবিলে রেখে কোল থেকে খবরের কাগজটা ভাঁজ করে টেবিলে রেখে নাক থেকে ডাম্বেলডোরমার্কা চশমাটা খুলে বললেন, “ভোট দিয়েছ কখনও?”

পুলুদার হাত সাঁই করে উঠে গেল। অামি মুখ গোঁজ করে বসে রইলুম। এখনও দু’বছরের লম্বা ওয়েট, তারপর ভোট দিতে পারব। কী জ্বালা। ভোটের বয়সটা পনের করে দিলে কী মজাই না হত।

“ভারতবর্ষ গণতন্ত্র, তাই ভোট দিয়ে সরকার এবং সাংসদ বিধায়কদের বাছা হয়। লোকসভা বিধানসভা ভোট সাধারণত পাঁচ বছরে এক-একবার হয়। লোকসভায় পাঁ…এই, লোকসভায় ক’খানা অাসন?”

এটা অামি জানি। তিন বছর অাগে লোকসভা ভোটের সময় ইস্কুলে এই নিয়ে একটা ক্যুইজ হয়েছিল। তখন এই উত্তরটা পারিনি। তারপর থেকে অার ভুলিনি।

“পাঁচশো তেতাল্লিশ।”

বিধুজ্যাঠা একবার অামার দিকে তাকালেন। ভুরুটা কুঁচকোন নয়, তার মানে ভুল বলিনি।

“রাইট। এই সাড়ে পাঁচশোর মত অাসনে সাংসদ নির্বাচন কীভাবে হয় জানো?”

পুলুদার হাত সাঁই করে সীলিঙের দিকে উঠে গেল। নেহাত শোল্ডার জয়েন্টটা ছিল, নইলে ছিটকে ফ্যানে লেগে একটা কেলেঙ্কারী হত।

“বোতাম টিপে। মানে ওই ভোটবাক্সে। অামিই তো গতবছর ভোটে—”

বিধুজ্যাঠা চোখের দিকে তাকিয়ে পুলুদা ফাটা সাবানের বুদ্বুদের মত চুপ মেরে গেল। কে কাকে ভোট দিয়েছে এ নিয়ে অালোচনা বিধুজ্যাঠা একেবারে প্রশ্রয় দেন না।

“হুঁ। ভোটবাক্সে বোতাম টিপে তুমি নাহয় প্রার্থী নম্বর তিন-কে ভোট দিলে। কিন্তু মাঠে অারও তিনজন প্রার্থী অাছে। ধরো তাদের নাম রাম শ্যাম যদু অার মধু। কে জিতবে? কীভাবে জিতবে?”

এবার অামি হাত তুললাম। বললাম, “যে সবচেয়ে বেশি ভোট পায়, সে।”

“ঠিক। ব্যাপারটা একটা রেসের মত। চারজন দৌড়চ্ছে, যে প্রথম ফিনিশ লাইনে পৌঁছতে পারবে, সে জিতবে। তার অার রানার অাপের মধ্যে দু’ মিলিসেকেন্ডের তফাত থাকলেও সে জিতবে। ভোটেও একই রকম। পুলুর পছন্দের ৩ নং প্রার্থী, অর্থাৎ যদু যদি পঁচিশটা ভোট পায়, রাম যদি কুড়িটা পায়, শ্যাম যদি পনেরটা পায়, অার মধু যদি বাকি চল্লিশটা পায়, তাহলে এই একশ ভোটারের অাসনে এই মধু নিঃসন্দেহে জিতবে, তাই তো?”

অামি চুপ। এটায় উত্তর দেওয়ার প্রয়োজন নেই। পুলুদা দেখলাম মাথাটাথা চুলকে খানিকক্ষণ ভেবেটেবে মাথা নাড়ল। ওপর-নীচ, মানে হ্যাঁ, তাই হবে বৈকি।

“লক্ষ্য কর, মধু কিন্তু মেজরিটি পায়নি। মেজরিটি পেতে গেলে কম সে কম ৫০% ভোট পেতে হয়। অামরা যদি বাকি তিনজন প্রার্থীর ভোট যোগ করি তাহলে ৬০% পাব। তাই তো?”

পুলুদা ফের মাথা চুলকোতে শুরু করেছে দেখে অামিই ঘাড় নেড়ে হ্যাঁ জানিয়ে দিলুম।

“এখানে যদু রানার অাপ। সে যদি বাকি দু’জনের ভোট পেয়ে যেত তাহলে সেই জিতত, তাই নয় কি?”

পুলুদার প্রসেসর হ্যাং করে গেছে। অামি ফের ঘাড় নেড়ে ফ্লো-টা বজায় রাখলুম।

“এমন কোন উদাহরণ দিতে পারো, যেখানে এরকম হয়?”

উদাহরণে দিতে অামি চ্যাম্পিয়ন। দিতেও, বুঝতেও। এইজন্যই পুলিদির সঙ্গে অামার কেমিস্ট্রিটা এত ভাল। পুলিদি উদাহরণ না দিয়ে পড়াতেই পারে না।

“সরকার ফর্ম করার সময়,” অামি বললুম, “সিঙ্গল লার্জেস্ট পার্টি হয়েও হয়ত দ্বিতীয় পার্টি বাকিদের সাপোর্ট নিয়ে সরকার বানিয়ে ফেলল। এই তো, ক’দিন অাগে গোয়াতে যা হল।”

বিধুজ্যাঠা দেখলাম দারুণ ইম্প্রেস্ড। চশমাটা নাকে এঁটে অামার দিকে একটা ওয়েল-ডান-মার্কা লুক দিয়ে বললেন, “পার্শে ইজ অ্যাবসোল্যুটলি কারেক্ট। সরকার গঠনের সময় এরকম হয় বৈকি। যদিও অালাদা অালাদা অাসন নির্বাচনের সময় ওই ফার্স্ট-পাস্ট-দ্য-পোস্ট নিয়মই মানা হয়।”

“পাস্ট-ফাস্ট-দ্য কী?” পুলুদা কমপ্লীট ভ্যাবাচ্যাকা।

“First-past-the-post,” পুলুদার দিকে অনুকম্পাভরা দৃষ্টি দিয়ে বিধুজ্যাঠা বললেন, “অর্থাৎ যে সবচেয়ে বেশি ভোট পাবে, সেই জিতবে। মাঠে যতজন প্রার্থীই থাকুক না কেন, জিতবে একজনই, অার একবার মাত্র ভোট হবে। এর অারেকটা নাম উইনার-টেকস-অল, winner-takes-all।”

“খেলাতে তো এরকম হয় না,” পুলুদা নিজের কমফর্ট জোনে টেনে অানার চেষ্টা করল।

“স্পোর্টস টুর্নামেন্টে সাধারণত হয় না,” বিধুজ্যাঠা বললেন, “অন্তত প্রাইজমানির দিক থেকে তো নয়ই। সরকার গঠনে এটা করা ছাড়া উপায় নেই, কেননা প্রত্যেক অাসন থেকে একজনের বেশি সাংসদ বা বিধায়ক নির্বাচিত হলে পুরো ব্যাপারটা প্রচন্ড জটিল হয়ে যাবে।”

একটা ব্যাপার মনে খচখচ করছিল। এর অাগে কখনও এটা নিয়ে ভাবিনি। প্রশ্নটা করেই ফেললাম।

“কিন্তু বিধুজ্যাঠা,” অামি বললাম, “৪ নং, মানে মধু যদিও সবার চেয়ে বেশি ভোট পেয়েছে, ৪০% লোক ভোট দিয়েছে, কিন্তু তার মানে তো এও ঠিক যে ৬০% মধুর এগেন্স্টে ভোট দিয়েছে, তাই না? মানে তারা চায় না মধু ইলেক্টেড হোক, তাই না?”

“নেলো!” বিধুজ্যাঠার হঠাৎ হাঁকে অামাদের পিলে চমকে উঠল। “এই পার্শের জন্য অারেকটা অমলেট করে অানত।”

অাঃ। সুরুৎ। পুলুদার মুখ চূণ।

“ভেরি গুড পার্শে। ইয়েস, মেজরিটি চায় না মধু তাদের প্রতিনিধি হোক। তা সত্ত্বেও FPTPর নিয়ম অনুযায়ী মধুই জিতবে। দুনিয়ার বেশিরভাগ দেশেই এই নিয়ম।”

“অন্য নিয়ম হয় না?” পুলুদা ওপেনিং পেয়েছে, ছাড়বে কেন।

“কেন হবে না?” বিধুজ্যাঠা বললেন, “রান-অফ সিস্টেম রয়েছে, প্রোপোর্শ্যনাল সিস্টেম রয়েছে। রান-অফেও অাবার টপ-টু সিস্টেম রয়েছে, অাবার এলিমিনেশ্যন সিস্টেমও রয়েছে।”

এতকিছু শুনে পুলুদার প্রসেসর হ্যাং করে গেছে। অামারও অবস্থা তথৈবচ। একটা এগজাম্পেল—

“একটা উদাহরণ দি। ধর টপ-টু রান-অফ। অাগেরবারের মত সেই চারজন প্রার্থী নাও। রাম পেল ২০%, শ্যাম ১৫%, যদু ২৫%, অার মধু ৪০%। সবাই ভোট দিয়েছে। কেউ মেজরিটি, অর্থাৎ ৫০%, পেল না। এবার তাহলে যারা প্রথম অার দ্বিতীয় হয়েছে, তাদের নাও। যদু অার মধু। বাকিদের বাদ দাও। মাঠ খালি, এবার হেড-টু-হেড হবে। ফের ভোট হবে—”

“অাবার ভোট?” এবার অামি অবাক।

“হ্যাঁ,” বিধুজ্যাঠা বললেন, “এই সিস্টেমে দু’বার ভোট হয়। এবারের ভোটে দেখা গেল মধু ফের সেই ৪০%ই পেয়েছে, কিন্তু যদু পেয়েছে ৪৫%। ১৫% লোক ভোট দেয়নি। তাহলে প্রথম রাউন্ডে দ্বিতীয় হওয়া সত্ত্বেও শেষমেশ যদুই জিতল। কেন বলতে পারবে?”

“রাম অার শ্যামের ভোটগুলো যদু পেয়েছে।”

অামি হাঁ। পুলুদার প্রসেসর কাজ করছে। ভাবা যায়? বিধুজ্যাঠাও ইম্প্রেস্ড।

“হ্যাঁ। প্রথম রাউন্ডে যে ৬০% লোক মধুর বিরুদ্ধে ভোট দিয়েছিল, তাদের মধ্যে ২০% লোক যদুর দিকে চলে গেছে। যদুর নিজের ২৫% এমনিতেই ছিল। এখানে অবশ্য অামি এটা অনুমান করে নিচ্ছি যে প্রথম রাউন্ডে যারা মধু বা যদুর পক্ষে ছিল তারা তাদের ভোট পাল্টায়নি।”

“তাও তো ১৫% লোক কারুর দিকেই যায়নি,” পুলুদার ব্যাটে ফর্ম এসেছে দেখছি।

“না, যায়নি। হয়ত তারা প্রথম রাউন্ডে শ্যামকে ভোট দিয়েছিল, শ্যাম হেরে যাওয়াতে এবার তারা হয়ত উৎসাহ হারিয়ে ফেলেছে।”

“অার রামের ওই ২০% সবাই যদুর হয়ে ভোট দিয়েছে?”

“হতে পারে,” বিধুজ্যাঠা বললেন, “হয়ত শ্যামের রাজনৈতিক ধ্যানধারণার সঙ্গে বাকি কারুর বিন্দুমাত্র মিল নেই, তাই তারা ভোট দেয়নি। হয়ত রামের সাপোর্টাররা মনে করেছে মধুর চেয়ে যদুই তাদের হয়ে বেশি কাজ করবে। তাই সবাই যদুকেই ভোট দিয়েছে।”

“অন্যটাও তো হতে পারে। মানে, যদি মিলেমিশে যায়? রামের কিছু ভোটার যদুকে দিয়েছে, শ্যামের কিছু ভোটার যদুকে দিয়েছে…”

বিধুজ্যাঠা হাত তুলে পুলুদাকে থামালেন। “নিশ্চয় হতে পারে। বাস্তবে এমনটাই হয়। অামি স্রেফ সহজ করে উদাহরণ দেওয়ার জন্য বললাম।”

কিছুক্ষণ থেকেই একটা প্রশ্ন পেয়েছিল, হাত তুলতে যাব দেখি নেলোদা দু’টো ডবলডিমের মামলেট অার চার নম্বর হরলিক্সের কাপটা নিয়ে ঢুকছে। নেক্সট পাঁচ মিনিট প্লেট কাঁটা ইত্যাদির অাওয়াজ এল। খাওয়াদাওয়া শেষে বিধুজ্যাঠা অামার দিকে ভুরু তুলে তাকালেন। বুঝলাম, অামার প্রশ্নটা শুনতে চাইছেন।

“অাচ্ছা, দু’বার ভোট করলে লোকের মাইন্ড চেঞ্জ হতে পারে না? ভোট দেওয়ার অাগে তো ট্রেন্ডগুলো অত ভাল করে জানা যায় না। এমনও তো হতে পারে প্রথম রাউন্ডে মধুকে জিততে দেখে ওই ২০% মধ্যে সকলে যদুর দিকে না গিয়ে ৫%-এর মত মধুর দিকে গেল। তাহলে মধু ৪৫%, অার যদু ৩৫% হয়ে মধুই জিতল?”

“রাইট, তা হতেই পারে,” হরলিক্সের কাপে চুমুক দিয়ে বিধুজ্যাঠা বললেন। “এটা রুখতে অাছে IRVর মত এলিমিনেশ্যন সিস্টেম। অস্ট্রেলিয়ার নির্বাচনে বা ভারতবর্ষের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে এই সিস্টেম ব্যবহার হয়। এখানে ভোট একবারই হয়। তফাতটা হল, একজনকে ভোট না দিয়ে সবাইকে পছন্দ অনুযায়ী সাজাতে হয়। অর্থাৎ ranking করতে হয়। একই উদাহরণ নেওয়া যাক। প্রার্থী চারজন, রাম শ্যাম যদু মধু। প্রত্যেক ভোটার তাদের পছন্দমত প্রার্থীকে ক্রমানুসারে সাজাবে। সবার ভোট হয়ে গেলে তারপর গোনা হবে। ধর, ভোটার সংখ্যা একশ। চল্লিশজন সেই মধুকে প্রথম স্থানে রাখল, কুড়িজন রামকে, পনেরজন শ্যামকে, অার পঁচিশজন যদুকে। কেউই মেজরিটি পেল না। সবচেয়ে কমবার প্রথম স্থানে অাছে শ্যাম, তাই সে এলিমিনেট হয়ে গেল। এবার—”

“কিন্তু তাহলে তো সেই মধুই জিতবে,” পুলুদা লাফিয়ে উঠল। হায়রে। ধৈর্য জিনিসটা পুলুদার একেবারেই নেই।

বিধুজ্যাঠা হরলিক্সে চুমুক দিতে গিয়েও থেমে গেলেন। পুলুদার হয়ে গেল। গন কেস। শ্রাদ্ধ হাসপাতাল মর্গ অাইসিউ…

“না, জিতবে না,” ঠান্ডা গলায় চুমুকটা দিয়ে বিধুজ্যাঠা বললেন। এই ঠান্ডা গলাটা অারও সাংঘাতিক। শুনলেই কেমন হাত-পা ডীপ-ফ্রিজ হয়ে যায়।

পুলুদাও দেখলাম বরফ হয়ে গেছে। মানে ফের স্পিকটি-নট। বেঁচে গেল এ যাত্রায়।

“পনেরজন শ্যামকে ১ নম্বরে রেখেছিল। এদের মধ্যে দেখা গেল দশজন যদুকে দু’নম্বরে রেখেছে অার বাকি পাঁচজন রামকে দু’নম্বরে রেখেছে। এদের মধ্যে কেউই মধুকে দু’নম্বরে রাখেনি। এবার তাই শ্যামকে এলিমিনেট করে দশটা ভোট যদুকে অার পাঁচটা ভোট রামকে দেওয়া হল। হয়ে ফের গোনা হল—”

হরলিক্স শেষ হওয়া অবধি বিধুজ্যাঠা বলে চললেন। মুখে বলার চেয়ে টেবিলে দিলে বোঝার সুবিধে।

রাউন্ড—-রাম—-শ্যাম—-যদু—-মধু

১——–২০—-১৫—-২৫—-৪০

পয়লা রাউন্ড কাউন্টিঙের পরে এই অবস্থা। শ্যাম কেটে গেল, কিন্তু তার ব্যালটে সেকেন্ড প্লেস পাওয়ার জন্য যদু পেল এক্সট্রা দশটা ভোট, অার রাম পাঁচটা। তাহলে কী দাঁড়াল?

রাউন্ড—-রাম—-শ্যাম—-যদু—-মধু

১——–২০—-১৫—-২৫—-৪০

২——–২৫—-#—–৩৫—-৪০

সেকেন্ড রাউন্ড কাউন্টিঙের শেষে সবচেয়ে কম ভোট পেয়ে এলিমিনেট হয়ে গেলেন রাম। অাগেরবারের মত দেখা যাক রামের ব্যালটে সেকেন্ড পোজিশনে কে কে অাছে। মনে রাখতে হবে, রাম কিন্তু ২০টা ব্যালট জিতেছে, তার মধ্যে পাঁচটায় মধু সেকেন্ড হয়েছে, শ্যাম হয়েছে তিনটেতে, অার যদু বারোটায়। শ্যাম এর মধ্যে এলিমিনেট হয়ে গেছে বলে ওর তিনটে ভোট অার গোনা হবে না। তিন রাউন্ড কাউন্টিঙের পর তাহলে কী দাঁড়াল?

রাউন্ড—-রাম—-শ্যাম—-যদু—-মধু

১——–২০—-১৫—-২৫—-৪০

২——–২৫—-#—–৩৫—-৪০

৩——–#—–#—-৪৭—-৪৫

“তাহলে শেষমেশ যদুই জিতল?” পুলুদার গলায় কেমন হতাশা।

“জিতল বৈকি,” খালি হরলিক্সের কাপ নামিয়ে রেখে বিধুজ্যাঠা বললেন, “৪০জন ভোটার মধুকে প্রথম চয়েস রাখলেও সব মিলিয়ে যদুই বেশি জনপ্রিয় বলে যদু জিতল। অার বারবার ভোট হচ্ছে না বলে লোকের ভোটও পাল্টাবে না, খরচও কমবে।”

“এটা তো অনেক ভাল সিস্টেম,” অামি বললুম, “তাহলে সবাই এটা করে না কেন?”

খালি পাইপটা দাঁত দিয়ে চিপে বিধুজ্যাঠা বললেন, “তার কারণ, সবার পক্ষে ওরকম ক্রম অনুযায়ী সাজানো খুব মুশকিলের ব্যাপার। ভারতবর্ষের কথাই ধর। ১৩০ কোটি লোক প্রায়, বেশিরভাগই গ্রামেগঞ্জে থাকে, তাদেরকে ক্রম-ranking বোঝানো প্রায় অসম্ভব। তারা জানে একজনের নামে স্ট্যাম্প বা অাজকাল বোতাম টিপতে হয়। তাও অনেকে বুঝবে না বলে ভয়ে ভোট দেয় না। এবার ক্রমানুযায়ী করলে তো দশ শতাংশ ভোটও পড়বে না। লোকজনকে এডুকেট করা অত সহজ নয়।”

ঠিক বটে।

“প্রথম যে সিস্টেমটা কথা বললাম, FPTP, এর প্রচুর ড্রব্যাক অাছে। একটা প্রধান মুশকিল হল যদি ভোটাররা অাগের থেকেই বুঝে যায় যা তাদের পছন্দের প্রার্থীর জেতার কোন সম্ভাবনা নেই। ধর, শ্যাম যে ১৫টা ভোট পেয়েছে, এই পনেরজনের মধ্যে অন্তত দশজন যদি অাগে থেকেই বুঝে যায় যে শ্যামকে ভোট দিয়ে লাভ নেই, বরং মধুকে হারাতে হলে যদুকে দেওয়া ছাড়া উপায় নেই, তাহলে যদুর ভোট কিন্তু এক লাফে অনেকটা বেড়ে যাবে। রামের সাপোর্টাররাও যদি একই কথা ভাবে তাহলে যদু জিতেও যেতে পারে। ধর, রামের ২০টা ভোট পাওয়ার কথা, কিন্তু দশজন রামকে ভোট না দিয়ে যদুকে দিল—”

ফের টেবিল বানানো যাক।

পরিস্থিতি————রাম—-শ্যাম—-যদু—-মধু

যা পাওয়া উচিত——–২০—-১৫—-২৫—-৪০

শ্যামকে ছেড়ে যদুকে——২০—–৫—-৩৫—-৪০

রামকে ছেড়ে যদুকে——১০—–৫—-৪৫—-৪০
রাম ও শ্যামের দশজন করে ভোটার দলছুট হয়ে যদুকে ভোট দিয়ে জিতিয়ে দিল।

“ডুভার্জে নামে এক ফরাসি পলিটিকাল সায়েন্টিস্ট বলেছিলেন, FPTP সিস্টেমে কোন দেশ চললে শেষমেশ সে দেশে টু-পার্টি-সিস্টেম অাসতে বাধ্য। যেমন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। সেনেট বা হাউসে সব অাসনই হয় রিপাবলিকান নয় ডেমোক্র্যাটরা জেতে। তৃতীয় পার্টির অস্তিত্ব থাকলেও তাদের পক্ষে অাসন জেতা প্রায় অসম্ভব।”

“ভারতেও তো এরকম হচ্ছে, তাই না?” পুলুদা জিজ্ঞেস করল।

“এনডিএ অার ইউপিএ-কে যদি পার্টিসমষ্টি না ভেবে একক পার্টি ভাবো, তাহলে হ্যাঁ, সেদিকেই ব্যাপারটা যাচ্ছে বটে। এখনও প্রচুর ছোটবড় মাছ অাছে বটে পুকুরে, কিন্তু যদ্দূর মনে হয় অার বছর কুড়ির মধ্যে তারাও হয় ইক্যুয়েশ্যন থেকে বেরিয়ে যাবে, নয় ওই দু’টো ফ্রন্টের একটায় মিশে যাবে। অন্তত ডুভার্জের ল তাই বলছে।”

“কিন্তু এই FPTPতে ভুল কোথায়? সরকার গড়তে হলে মেজরিটি অাসন পেতে হবে, সেটা তো ঠিকঠাকই হচ্ছে, তাই না?” পুলুদা ফের প্রশ্ন করল। এটা অামারও প্রশ্ন। হ্যাঁ, FPTPর মত সিস্টেমে মধুরাই বেশি অাসন পাবে বটে, কিন্তু শেষমেশ তো তারাই সবচেয়ে বেশি মানুষের ফার্স্ট চয়েস, তাই না?

“জেরিম্যান্ডারিং কাকে বলে জানো?”

এককালে বিধুজ্যাঠা পাইপ খেতেন। এখন ছেড়ে দিয়েছেন। তবে নস্যির অভ্যেসটা এখনও অাছে। ডিজাইন করা সিল্কের নস্যিরঙের রুমালটা বের করে নস্যির ডিবেটা বের করে একটিপ নস্যি নিলেন। অামাদের মুখে ফের পিনড্রপ সাইলেন্সার লেগে গেছে।

“Gerrymandering,” বিধুজ্যাঠা নস্যি নিয়ে রুমাল দিয়ে নাক মুছে বললেন। “ভোটিং ডিস্ট্রিক্ট পাল্টে ভোটের ফল নিজের দিকে করে নেওয়াকে জেরিম্যান্ডারিং বলে। জেরিম্যান্ডারিং বা ওইরকম ঘটনা ঘটলে পপুলার ভোট কম পেয়েও নির্বাচনে জেতা যায়। যেমন এবার মার্কিনমুলুকে ট্রাম্প যেভাবে জিতল। যাই হোক, এটা বোঝানোর অাগে অারেকটা উদাহরণ দি। রাম-শ্যাম অনেক হল, এবার পার্টি নিয়ে হোক। ধর নির্বাচনে দুটো পার্টি অাছে। একটার নাম গুপী, একটার বাঘা।”

গুপীবাঘা? বিধুজ্যাঠা এসব দেখেন জানতুম না তো।

“ভোট হবে চারটে অাসনে — শুন্ডি, হাল্লা, হীরক ও অানন্দপুর।”

অানন্দপুর? ও, মনে পড়েছে। গুপীবাঘা ফিরে এল সিনেমায় ব্রহ্মানন্দ অাচার্য তো অানন্দপুরেই ছিলেন।

“সব মিলিয়ে ভোটার সংখ্যা সেই একশ। সমানভাবে চারটে অাসনে ভাগ হয়ে অাছে। শুন্ডিতে ২৫জন ভোটার, হাল্লাতে ২৫জন ইত্যাদি। ভোট হল। গুপীপার্টির ভোট গুনে দেখা গেল, তারা শুন্ডিতে ২০, হাল্লাতে ১৫, হীরকে ১৫ ও অানন্দপুরে ১০টা ভোট পেয়েছে। ওদিকে বাঘাপার্টি শুন্ডিতে ৫, হাল্লাতে ও হীরকে ১০টা করে, অার অানন্দপুরে ১৫টা ভোট পেয়েছে। তার মানে—”

“গুপীপার্টি তিনটে অাসন পেল, অার বাঘাপার্টি একটা — অানন্দপুর।”

“ঠিক তাই, পার্শে। অার সব ভোট একসঙ্গে গুনলে?”

অঙ্কে অামি কাঁচা, একথা পুলদাও বলবে না। এক নিমেষে উত্তর দিলুম, “গুপীপার্টি সবসুদ্ধু ৬০ ভোট পেয়েছে, অার বাঘাপার্টি ৪০ ভোট।”

টেবিল দেওয়া যাক।

পার্টির নাম—-গুপীপার্টি—-বাঘাপার্টি—-মোট ভোটার—-কে জিতল

শুন্ডি———-২০———৫———২৫———গুপীপার্টি

হাল্লা———-১৫——–১০———২৫———গুপীপার্টি

হীরক———-১৫——–১০———২৫———গুপীপার্টি

অানন্দপুর——-১০——–১৫———২৫———বাঘাপার্টি


মোট———-৬০——–৪০——–১০০———গুপীপার্টি (৩-১)

বিধুজ্যাঠা পাইপটা টেবিলে রেখে অামার দিকে একটা ছোট স্মাইল দিয়ে বলে চললেন, “তাহলে গুপীপার্টি ৬০% ভোট পেয়েছে, অার অাসন পেয়েছে ৭৫%। এ থেকে বোঝা যাচ্ছে গুপীপার্টিরই সরকারে অাসা উচিত, তাই তো?”

দু’জনেই মাথা নাড়লাম। ওপর-নীচ। হ্যাঁ। নিঃসন্দেহে।

“এবার অারেকটা সিনারিও ভাবো। ধর, এই একশজন ভোটার সমানভাবে চারটে অাসনে না থেকে অন্যভাবে ভাগ হয়েছে। ধরে নাও এবার শুন্ডিতে চল্লিশজন ভোটার—”

“সেকি কেন—” পুলুদা ফের লাফিয়ে উঠেই বিধুজ্যাঠার ভুরুর দিকে তাকিয়ে চুপ মেরে গেল।

“এটা থট এক্সপেরিমেন্ট, পুলু। হাইপথিসিস। শুন্ডিতে ৪০জন ভোটার, বাকি তিনটে অাসনে ২০জন করে ভোটার। ভোট হল। শুন্ডিতে গুপীপার্টির জয়জয়কার, তারা ৩৫ ভোট পেয়ে শুন্ডি জিতল। শুন্ডিতে বাঘাপার্টির ভরাডুবি। মাত্র ৫টা ভোট পেল তারা। হাল্লা অার হীরকে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হল। দু’টো অাসনেই গুপীপার্টি পেল ৯টা করে ভোট, অার বাঘাপার্টি ১১টা করে। সবশেষে অানন্দপুরে বাঘাপার্টি ১৩টা ভোট পেয়ে সহজেই জিতে গেল।”

টেবিল!

পার্টির নাম—-গুপীপার্টি—-বাঘাপার্টি—-মোট ভোটার—-কে জিতল

শুন্ডি———-৩৫———৫———৪০———গুপীপার্টি

হাল্লা———–৯——–১১———২০———বাঘাপার্টি

হীরক———–৯——–১১———২০———বাঘাপার্টি

অানন্দপুর——–৭———৭———২০———বাঘাপার্টি


মোট———-৬০——–৪০——–১০০———বাঘাপার্টি (৩-১)
“এবার কিন্তু শেষ ফল একেবারে উল্টো! বাঘাপার্টি ৩টে অাসন পেল, গুপীপার্টি মাত্র একটা পেল। মজার ব্যাপার হল, সব মিলিয়ে গুপীপার্টি কিন্তু সেই ৬০ ভোটই পেয়েছে। বাঘাপার্টি ৪০ ভোট পেয়েও তাহলে কীকরে জিতল?”

তাই তো? এ তো ভারী অন্যায়। কীভাবে হল?

পাইপটা অারেকবার মুখে কামড়ে ধরে বিধুজ্যাঠা বোঝালেন। “খুব সহজ। নম্বরগুলো খেয়াল কর। শুন্ডিতে গুপীপার্টি অাগেরবার ২০টা ভোট পেয়েছিল, এখন পেয়েছে ৩৫টা। বাঘাপার্টি সেই ৫টা ভোটই পেয়েছে। গত পাঁচবছর বাঘাপার্টি ক্ষমতায় ছিল, তারা ভোটের অাগে সার্ভে করে জানতে পেরেছে, ২৫জন করে ভোটার চারটে অাসনে সমানভাবে ভাগ হয়ে থাকলে ওই প্রথম টেবিলের অবস্থা হবে, এবং তারা ১-৩ অাসনে গুপীপার্টির কাছে হারবে। তাই তারা চুপচাপ হাল্লা হীরক অার অানন্দপুর থেকে কিছু ভোটার নিয়ে তাদেরকে শুন্ডির ভোটারতালিকায় ঢুকিয়ে দিল। বা হয়ত ভোটিং ডিস্ট্রিক্ট হিসাবে শুন্ডির বাউন্ডারিই পাল্টে দিল। প্রথম টেবিলে দেখ, হাল্লা ও হীরকে গুপীপার্টি ১৫টা করে ভোট পেত। তাদের থেকে ৬জন করে ভোটার এখন শুন্ডির ভোটিং লিস্টে এসে গেছে। তাই হাল্লা হীরকে গুপীপার্টি ৯টা করে ভোট পেয়েছে। অানন্দপুরে গুপীপার্টি ১০টা ভোট পেত, তাদের মধ্যে ৩জন শুন্ডির লিস্টে চলে গেছে। অানন্দপুরে বাঘাপার্টি ১৫টা ভোট পেত, সেখান থেকে ১জন করে ভোটার হাল্লা অার শুন্ডির লিস্টে ঢুকে গেছে। এইসব কান্ড করে শেষে তাই বাঘাপার্টিরই জয় হয়েছে।”

“একেই কি টম্যান্ডজেরি বলে?”

জেরিম্যান্ডারিং শব্দটা যে পুলুদা মনে রাখতে পারবে না, তাতে কি কোনও সন্দেহ ছিল কোনওদিনও?


#সোঘো, ১৯:৪৮, ৫ এপ্রিল, ২০১৭, তিলোত্তমা।

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s