{ডিট ডিট ডিট-টি ডিট ডিট। ডিডিডিডি, ডিডিডিডি। ডিডিডিডি, ডিডিডি…}

— এই তো, অাজ দিদিমণি ঠিক সময়ে স্কাই…
— বুঝলি দিদি, সিনেমা দেখাটা ছেড়ে দেব ভাবছি।
— ভাবছিস?
— ভাবছি।
— হঠাৎ এমন কী হল? বেশ তো সেদিন টার্কভস্কির সিনেমার জন্য অাবদার করছিলি।
— অারে না না, সেগুলো তো মাস্টারপীস। অামি বলছি হলে গিয়ে সিনেমা দেখার কথা।
— তাই? কেন, কী হয়েছে?
— কী অাবার হবে? জানই তো।
— জানি মানে? কী জানি?
— সেকি? কীকস করেছিলুম, দেখনি?
— কীক…ওফফ, পুলি, অাসল নামটা বল না। তোর এই বাংলাফিকেশ্যন বুঝতে অামার প্রাণ বেরিয়ে যায়।
— অাই বাঙালী, অামার মিশ্যন সবকিছু বাংলায় করা।
— মিশ্যনই বটে। তো হোয়াট্স্যাপের কী মেসেজ করেছিস শুনি?
— ওই যে, অাজ সিনেমা যাব বলেছিলুম।
— সিনেমা? ওয়াহ্, ভেরি গুড। অাজ গিছলি? কী দেখলি? বাহুবলী?
— অারে না না, ওটা তো দেখা।
— হ্যাঁ, এইটে অামার কাছে অাশ্চর্য লাগে। যে মেয়ে টার্কভস্কি ত্রুফো রেনোয়া দেখছে সে বাহুবলী?
— কেন, দেখাটা খারাপ বুঝি?
— একেবারেই নয়। কিন্তু ইকোয়েশ্যনটা মিলছে না।
— কোন ইকোয়েশ্যন নেই গো। অামার বিকেলের ক্লাস যে স্পনসর করবে বলেছিল না…?
— ও হ্যাঁ হ্যাঁ, তুই বলেছিলি বটে। কী যেন নাম? পার…পার…
— পার্বতীদি গো। পার্বতী ব্যানার্জি।
— ইয়েস ইয়েস, রাইট। সে তো তোদের জন্য একটা ক্লাসঘর ভাড়া করে দেবে বলেছে, তাই না?
— শুধু তাই নয়, শেখরদা, মানে পার্বতীদির বর, সে বলেছে অঙ্ক অার বিজ্ঞানের ক্লাস নেবে।
— দ্যাট ইজ গুড ন্যুজ তো।
— তা তো বটেই।
— কিন্তু তার সঙ্গে বাহুবলী…?
— ও। অারে, পার্বতীদি শেখরদা দুজনেই সিনেমাটার ভীষণ ভক্ত। বারে বারে গিয়ে দেখেছে। অামাকেও টেনে নিয়ে গিছল।
— হুম। কেমন লেগেছে?
— সে তো বলেইছি। দিব্যি। মানে অনেক সমস্যা অাছে, কিন্তু বেশ করেছে।
— সেটাই তো একটু অদ্ভুত লাগছে। যে মেয়ে হায়েস্ট লেভেলে সিনেমা দেখছে, অার্টফর্মটাকে বোঝার চেষ্টা করছে, সে এরকম বাজারী সিনেমা দেখবে কেন?
— না গো, হাইক্লাস সিনেমা দেখব মানে নাক সিঁটকে শুধু সেই সিনেমাই দেখব, তেমন সুশীল পাবলিক অামি নই। মোৎজার্টও শুনব, অাবার কুইন অাসলেও তাল ঠুকে শুনব।
— বাহুবলী ইজ ইকুয়েল টু কুইন?
— হিহি, না, তা হয়ত নয়, তবে সিনেমাটার একটা অ্যাপীল অাছে।
— হুম, তো এই পার্বতীশেখর জুটির অার কী কী গুণ অাছে?
— অাজও তো গেলুম সিনেমায়।
— ওদেরই সঙ্গে?
— হ্যাঁ গো। সকালে ওরা এসেছিল, অামি অার শেখরদা মিলে ক্লাস নিলাম…
— অার পার্বতী কী করলেন ততক্ষণ? মাছি মারলেন?
— অারে না না, মা’র সঙ্গে চুটিয়ে অাড্ডা মারলেন।
— মা’র সঙ্গে? ওয়াহ্ রে ওয়াহ্।
— অালোচনার টপিক জানো?
— না। শুনি।
— তুমি গত হপ্তা মা’কে “গোরিলা’জ ইন দ্য মিস্ট” বইটা পাঠিয়েছ…
— অডিওবুক।
— হ্যাঁ। সেইটে তো মা গোগ্রাসে শুনে ফেলেছে। এবার দেখা গেল পার্বতীদিও বইটি পড়েছেন…
— তাই? ভদ্রমহিলার বেশ ইন্টারেস্টিং ইন্টারেস্ট অাছে তো।
— গোরিলা নিয়ে অাছে। মা’র সঙ্গে দারুণ জমে গেল।
— ভেরি গুড তো। তারপর কী হল?
— তারপর অার কী? দুপুরে বাড়িতে সকলে খাওয়াদাওয়া করে সোজা সিনেমা হল।
— তিনজনে মিলে?
— তিনজনে মিলে।
— কী সিনেমা দেখলি?
— পাইরেট্স অফ দি ক্যারিবিয়ান। নতুনটা।
— বাপরে। অারও একটা এসেছে? এ নিয়ে ক’টা হল? চারটে?
— পাঁচটা। চার নম্বরটা তো ওই ফাউন্টেন অফ ইউথ…
— রক্ষে কর। অামার ওই প্রথমটাই যা পাতের লাগে। বারবোসা ফুল ফর্মে, অাঃ।
— হুম।
— জেফ্রি রাশ, বুঝলি। লোকটার একটা মুন্সিয়ানা অাছে। চরিত্রটাকে যেভাবে…মানে জ্যাকের সঙ্গে পায়ে পা মিলিয়ে ঝগড়া করাটা…হেভেনলি।
— ইয়ে, মানে, দিদি…
— অামার মনে হয় এই পাইরেট্স সিরিজের অাসল চরিত্র জ্যাক বা এলিজাবেথ বা উইল নয়, হেক্টর বারবোসা। বেস্ট ভিলেন, বেস্ট ক্যারেক্টার।
— হুম।
— কী ব্যাপার বল তো। এত হুম হুম করছিস কেন?
— হুঁ? না, কিছু না।
— সিনেমাটা কেমন লাগল অাগে সেটা বল।
— সিনেমাটা?
— সিনেমাটা।
— কেমন লাগল?
— এই, কী ব্যাপার বল তো? এরকম অ্যাভয়েড করছিস কেন? বাজে হয়েছে?
— বাজে? না, মানে ঠিক বাজে নয়…
— তাহলে? ভাল হয়েছে?
— না, না, ভাল তো হয়েইনি।
— তাহলে? এত রহস্য কেন?
— না মানে বাজে বললে ঠিক ব্যাপারটা ঠিক স্ট্রং হয় না।
— ও।
— হুম।
— বুঝেছি।
— হুম।
— মানে এতটাই…?
— হুম।
— তাহলে ডেপ…?
— ইজ কমপ্লিটলি অাউট অফ হিজ ডেপ্থ।
— চরিত্রটা?
— চড়ুইপাখি ঠিকই অাছে। তাকে বড়পর্দায় জীবন্ত করে তোলাতে ডেপের মুন্সিয়ানার তুলনা নেই। মুশকিল হল, গল্পের গ নেই, চরিত্রায়ণের চ নেই, এডিটিঙের এবিসিডি নেই, নির্দেশনার নিদর্শন শোচনীয়, অার প্লট প্লেটোর সঙ্গে হাওয়া খেতে গেছে।
— অালুনি খিচুড়ি?
— ডিম-জ্যাক্টলি!
— কী শোচনীয়! তাও ভাল বারবোসা অাছে। সেই বাঁচাবে, হি শ্যাল সেভ দ্য ডে।
— ঠিক ঠিক। বারবোসা তো অাছেই। যাই হোক, সিনেমা দেখে তো পার্বতীদি-শেখরদার খুব মন খারাপ।
— কেন? ওরাও ফ্যান নাকি?
— ভীষণভাবে। পার্বতীদি ভাবছে শপিং করবে, অামি ভাবছি স্টারমার্কে ঢুকব কিনা, এমন সময় শেখরদা ডিক্লেয়ার করে বসল সে ওয়ান্ডার উওম্যান দেখবে।
— অ্যাঁ?
— হ্যাঁ গো। শেখরদা কমিক্স-টমিক্স খুব পড়ে। কীসব ডিসি-মার্ভেল মুখস্থ বলে যেতে পারে।
— বুঝেছি। পাক্কা নার্ড।
— হ্যাঁ গো। নিজেকে ওই নার্ড গোছেরই কিছু একটা বলে।
— কী বলে?
— ওই যে, অ্যাস্টারিক্সে ছিল, এটাসেটামিক্স যেটা ছিল…
— ড্রুইড?
— রাইট। ড্রুইড। নিজেকে নার্ড ড্রুইড বলে। কেন জানি না অবিশ্যি।
— ম্যাজিক পোশ্যন বানায় নাকি?
— হিহি, জানি না, তবে সিনেমাহল থেকে বেরোতে গিয়ে কান্ড হয়েছে।
— কী হয়েছে?
— অারে, অামি তো সিনেমা শেষ হতেই তরতর করে নেমে গেছি, শেখরদা যে পেন খুঁজে পাচ্ছে না দেখিনি…
— এটা খুব বাজে করেছিস পুলি। অাগেভাগে দৌড়লি কেন?
— অারে অামি বাসট্রেনট্রামসিনেমা থামলেই বা ভাঙলেই দৌড় মারি। মানে মারতেই হয়। ওটা অামার জীনগত ব্যাপার।
— হুঁ। তুই যে কীকরে অামার বোন হলি…যাকগে, তারপর?
— তারপর তো অামি হল থেকে বেরিয়ে ওদের জন্য অপেক্ষা করছি। পাঁচ মিনিট, দশ মিনিট, নো পাত্তা।
— ফোন করলি না?
— করার চেষ্টা করলাম, কিন্তু ওখানে নেটওয়ার্কের যা অবস্থা। এদিকে হঠাৎ কোত্থেকে হাল্কা ফায়ার অ্যালার্মের অাওয়াজ শুরু হল। অাশেপাশে যারা রয়েছে তারাও দেখছি হাঁ, সবাই “অাগুন নাকি?” মুখ নিয়ে এদিকওদিক তাকাচ্ছে, অামিও চাচা-অাপন-প্রাণ-বাঁচা পণ নিয়ে দৌড় মারব কিনা ভাবছি, এমন সময় দেখি দুজনে মিলে চোরের মত বেরিয়ে অাসছে।
— সেকী, কী হয়েছিল?
— অারে ওরা কলম খুঁজছিল। অনেক কষ্টে ওখানকার স্টাফেদের সাহায্যে শেষে সেটা উদ্ধার করেটরে বেরোতে গিয়ে সম্পূর্ণ উল্টোদিকে মোড় নিয়ে শেষে একটা বন্ধ দরজার সামনে পৌঁছেছে।
— সেরেছে। তারপর?
— ধাক্কাধাক্কি করেছে। খোলেনি। খুলবে কেন, ওটা তো রাস্তাই না। দরজাটা সীল্ড।
— তারপর?
— এদিকে দরজার পাশে নাকি একটা বোতাম ছিল। শেখরদা ভেবেছে সেটাই দরজা খোলার বোতাম।
— টিপেছে।
— টিপেছে। মানে পার্বতীদি হাঁহাঁ করার অাগেই।
— ফলত?
— সেটা ফায়ার অ্যালার্ম ছিল।
— অ্যাঁ?
— হ্যাঁ।
— ওহ হো, সেই ফায়ার অ্যালার্মই তুই…?
— সেই ফায়ার অ্যালার্মই অামি শুনে কোমরে অাঁচল গুঁজে দৌড় দেবার প্ল্যান করছিলাম।
— হা হা হা হা, কী অবস্থা। ইশশ।
— শেখরদা কান্ডকারখানা শুনলে হেসে পেটের খিল ধরে যাবে।
— শুনব। তারপর কী হল? ওয়ান্ডার উওম্যান দেখলি?
— ফায়ার অ্যালার্ম বাজিয়ে ফেলে শেখরদার টেম্পোরারিলি মুখ চূণ হয়ে গিছল, কিছু হয়নি দেখে সাহসের বেলুনে অাবার হাওয়া ভরেটরে সে ডিক্লেয়ার করে বসল সে ওয়ান্ডার উওম্যান না দেখে যাবে না।
— বোঝো।
— পার্বতীদি অনেক করে বোঝাল, ডিসির সিনেমা অতি জঘন্য, অাগের দুটো সিনেমা দেখে কী অবস্থা হয়েছিল, এটা দেখলে মাথা অারও ধরবে, এক দিনে দুটো সিনেমা দেখে না ইত্যাদি।
— অাচ্ছা?
— শেখরদাও ছাড়বে না। শেষে রটেন টম্যাটোজ দেখিয়ে বলল, ৯৪% পেয়েছে, নির্ঘাত ভাল ছবি।
— তোরা রাজি হলি?
— হতে হল। টিকিট কেটে ঢুকলাম।
— কেমন সিনেমাটা? ডিসি তো শুনেছি থার্ডফোর্থক্লাস ছাড়া খেলে না।
— না গো, বেশ ভাল সিনেমাটা। প্রধান চরিত্র স্ট্রং মহিলা, মানে শারীরিকভাবে শুধু না, চরিত্রগত দিক থেকেও।
— সুপারহিরো তো, গায়ে জোর না থাকলে হয়?
— শুধু তাই নয়। এই সিনেমাতে সে সুপারহিরো হয়ে উঠছে। কিন্তু সিনেমাটা যতটা না সুপারহিরোদের সিনেমা তার চেয়েও বেশি যুদ্ধ নিয়ে, যুদ্ধ মানুষের কত ক্ষতি করে, মানুষে মানুষে দ্বেষ-দ্বন্দ্ব…
— মানে হাউল্স মুভিং কাসেলের মত অ্যান্টি-ওয়ার মেসেজ?
— খানিকটা গো। মিয়াজাকি লেভেলের নয়, তাও প্যাটি জেনকিন্স চেষ্টা করেছে। একটা সীন ছিল সেটা খুব সুন্দর। বেলজিয়ামের ভেল্ড গ্রাম জার্মানমুক্ত করে স্টিভ ট্রেভর অার ডায়ানা সন্ধ্যেবেলা বাজনার তালে দুলে দুলে নাচছে, অার হাল্কা তুলোর মত বরফ পড়ছে। সিড ফীল্ডের “স্ক্রীনপ্লে” বইটায় এইরকম কিছু সীনের কথাই বলে অাছে, যা দেখলে দর্শক সিনেমার সঙ্গে, চরিত্রগুলোর সঙ্গে একাত্মবোধ করবে।
— বুঝেছি। অামার ছোট বোনটা এই কমিকবুক ব্যাপারস্যাপার থেকেও ঘেঁটেঘুঁটে ঠিক ভাল রত্নটা বেছে নিয়েছে।
— বাকি সিনেমাটা ভাল, স্টিভ ট্রেভরের ভূমিকায় ক্রিস পাইন দারুণ করেছে। হ্যারি পটারের লুপিনও অাছে।
— কে? ডেভিড থ্যুলিস?
— হ্যাঁ গো।
— হুম। নট ব্যাড। দেখার যোগ্য? তাহলে ব্রেন্ডাকে বলি?
— বলে দেখতে পারো। ও-ও কমিক্স পছন্দ করে না?
— করে বৈকি, কিন্তু অামি দেখতে পারি না বলে চুপচাপ থাকে। অামি গিয়ে বললে লাফিয়ে পড়বে।
— তাহলে শুভস্য শীঘ্রম। দুজনে মিলে দেখে এস।
— যাই, বল?
— ইমিডিয়েট। অার বিলম্ব নয়। অার বিলম্ব নয় নয় অার বিলম্ব নয়!


#সোঘো, ২৩:৩৯, ৩ জুন, ২০১৭, তিলোত্তমা।

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s