— ওফ ওফ…
— কী হল রে? হাঁপাচ্ছিস কেন?
— হাঁ…ওফ…পাচ্ছি…ওফওফ…কী অার সা…ওফ…ধে…
— ব্যাপার কী? চ্যাম্পিয়ন সাঁতারু সদা সুপারফিট মিস পুলিপিঠের এরকম অবস্থা কেন?
— অারে…ওফ…অার বলো না। যা গরম…ওফ…দাঁড়াও…ওফ…ঠান্ডা জল…ওফ…
— হুম, গরম। তো?
— অাঃ, শান্তি। তো? তো অাবার কী? কিছুই না। ক্লাস নিচ্ছিলাম।
— সাঁতারের?
— অাবার কীসের? অামি একদলকে ব্যাকস্ট্রোক শেখাচ্ছি, ওদিকে ক্লাসঘরে শেখরদা অারেকদলকে ট্রিগনোমেট্রি শেখাচ্ছে।
— শেখর? অাজ এসেছিল? কই, দেখা করে গেল না তো।
— অারে পার্বতীদির সঙ্গে সিনেমা দেখবে বলে নাচতে নাচতে চলে গেল।
— সিনেমা? অাবার? কালই দু’খানা দেখল না?
— দেখল তো। অাজ ফের দেখবে। বাহুবলী।
— অাবার বাহুবলী!
— হ্যাঁ। মানে। হুম।
— সিনেমাটা এত ভাল বুঝি?
— খারাপ নয় গো।
— হুম। কিন্তু তুই হাঁপাচ্ছিলি কেন তো বুঝলাম না।
— ও। ভুলেই তো গিছলাম। শেখরদা।
— কী করেছে?
— মানিব্যাগ।
— মানিব্যাগ? হারিয়েছে?
— অারে না না, হারালে অামি হাঁপাবো কেন? ছিনতাই।
— ছিনতাই!
— একটা ক্লাস নিয়ে বোধহয় হাঁপিয়ে পড়েছিল, বাইরে বেরিয়ে জিরোচ্ছিল। কোনও অজ্ঞাত কারণে পকেট থেকে মানিব্যাগটা বের করে পাশে রেখে অন্যমনস্কভাবে একটা বই পড়ছিল। পাশ দিয়ে একটা লোক সাইকেল নিয়ে যাচ্ছিল, মানিব্যাগ দেখে সেটা খপ করে তুলে চম্পট!
— সেকী! শেখর সেই চোরের পেছনে দৌড়লো?
— শেখরদা? দৌড়? হা হা হা। মানিব্যাগ বেপাত্তা শেখরদার কোনও হুঁশই ছিল না।
— তাহলে? মানিব্যাগ গন?
— না, গন নয়। মানিব্যাগ ভেরি মাচ উইথ শেখরদা।
— এই পুলি, দেখ, ফেয়ার ওয়ার্নিং দিচ্ছি, ঝেড়ে কাশ, নয়তো…
— হিহি, অামি ছিলাম তো।
— ছিলি মানে?
— মানে ক্লাসের মাঝে ব্রেক নিচ্ছিলাম। ভাবলুম শেখরদার জন্য দামুদার দোকান থেকে চা নিয়ে যাই। তো সেই চা হাতে সবে ক্লাসঘরে পৌঁছেছি, দেখি সে ব্যাটা চোর চম্পট। অামিও দে-দৌড়।
— ফ্যাসিনেটিং? তারপর?
— সে ব্যাটা সবে পকেটে মানিব্যাগটা ঢোকাতে যাবে, এমন সময় বাজখাঁই গলায় “চোর চোর” শুনে তাকিয়ে দেখে…
— একটা বাচ্চা শাড়িপড়া মেয়ে তার দিকে ধেয়ে অাসছে?
— এই, অামি বাচ্চা? জানো না অামি কলেজে পড়ি।
— তাই বুঝি? ওরে অামার পুলিটা কত বড় হয়ে গেছে রে কলেজে পড়ে। রাতে গাপুচি কাছে না থাকলেও দিব্যি ঘুমোয়…
— গায়ায়া-পুউউউ-চিইইই…
— এই এই থাম, এখন না। গাপুচি ফাইন অাছে। একটু অাগেই পিকু বের করে ঝেড়েপুছে রেখেছে। অাগে গল্পটা শেষ কর।
— …ইইই। অাচ্ছা, গল্প। না মানে অামাকে ওভাবে চেঁচামেচি করে তেড়ে অাসতে দেখে সে ব্যাটা চোরকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে কী করবে ভেবে না পেয়ে প্যানিকট্যানিক করে উল্টোদিকে ছুট মারল।
— যাব্বাবা, এতে প্যানিকের কী অাছে? ঠিক কাজই তো করেছে।
— না গো মা, তুমি ব্যাপারটা বুঝছো না। চোরেরা মানিব্যাগ ছিনতাই করলে প্রথমেই টাকাফাকা বের করে মানিব্যাগটা ফেলে দেয়।
— দেয় বুঝি?
— দেয় বোধহয়? সেদিন পাড়াতে শুনছিলাম মনে হল।
— হবে হয়তো। বলতে পারব না রে, কোনওদিন মানিব্যাগ চুরি করিনি।
— হিহি। যাই হোক, সে ব্যাটাকে সেসব করার সময় তো দিইনি। অামাকে গাঁকগাঁক করে দৌড়ে অাসতে দেখে সেও লম্বা লম্বা ঠ্যাং ফেলে ছুট।
— ফ্যাসিনেটিং। তারপর?
— তারপর শুরু হল পাক্কা সিনেমার চেজ সিকোয়েন্স। চোর ব্যাটার ফিটনেস অাছে। ভাল লাফাতে-ঝাঁপাতে পারে। পাতলা চেহারা, ছোট ছোট গলিরখুঁজির মধ্যে দিব্যি সেঁধিয়ে যেতে পারে। দৌড়ের স্পীডও ভাল।
— হুঁ। কিন্তু তোর লেভেলে না?
— দেখো, অামি স্যুইমার, স্প্রিন্টার নই। দৌড়তে পারি, ভাল জোরেই পারি, কিন্তু অত তো প্র্যাক্টিস নেই। পিছিয়ে পড়ছিলাম।
— তারপর?
— তারপর? তারপর অাম।
— অাম?
— ন্যাপলাদা। সেই যে একসময় ইলেক্ট্রিসিটির কাজ করত, মনে অাছে?
— থাকবে না? একবার ফ্যান ঠিক করতে গিয়ে শক খেয়ে যায়-যায় অবস্থা। এখনও তাই করছে?
— না না, এখন সেলাইয়ের দোকান দিয়েছে। দর্জিগিরি করে।
— বাপরে। সে তাও জানে?
— বলে বাপ-ঠাকুর্দা নাকি দর্জিই ছিল। ন্যাপলাদাই ফুটবল খেলবে বলে জিদ ধরে শেষে মাঠে পা ভেঙে ইলেক্ট্রিকের কাজ ধরে।
— যাঃ। দর্জির দোকানে বসতে পারত তো।
— ন্যাপলাদার বাবা রাজি হননি। বলেছিলেন তিনি যদ্দিন অাছেন তদ্দিন সেলাইয়ের কলে ন্যাপলাদার হাত যেন না পড়ে। তিনি মারা যাওয়ার পর…
— বুঝেছি। কিন্তু অাম? অার চোর?
— ন্যাপলাদা অাম খেতে ভেরি ভালবাসে। ঘরের দোরে বসে হিমসাগর খাচ্ছিল, অার খেয়ে খেয়ে সামনে রাস্তায় অাঁটি ফেলছিল।
— এঃ।
— ওর’ম বলো না, নয়তো শেখরদার মানিব্যাগ অার ফেরত পাওয়া যেত না।
— কেন? চোর পা হড়কেছে বুঝি?
— ধড়াম-ধাঁই। সে কী অাছাড়! চোরটা তো ফ্ল্যাট হলই, মানিব্যাগটা ছিটকে সোজা নর্দমার কোণায় গিয়ে অাটকালো। অার অামের অাঁটিটা স্কিড খেয়ে সোজা ন্যাপলাদার কপালে গিয়ে অাব গজাল।
— অারিব্বাস। মেকানিক্সের মিরাক্যল তো। নিউটন খুশ হুয়া। পোয়েটিক জাস্টিস।
— এদিকে অামি কয়েকতাল গোবরের ওপর দিয়ে লংজাম্প মেরে সোজা চোরের সামনে।
— পুলিশে দিলি?
— অার পুলিশ? চোর ধরব কী, মানিব্যাগটা দেখি নর্দমায় পড়ব পড়ব করছে। কেঁচো নর্দমাটায় কোন জিনিস পড়লে অালাদিনের জিনেরও সাধ্য নিয়ে খুঁজে তুলে অানে। তাই চোর ছেড়ে লাফিয়ে গিয়ে মানিব্যাগ অাটকালুম। একেবারে কোণায় ব্যালেন্স করে ছিল, অারেকটু হলে কেঁচো নর্দমায় শহিদ হয়ে যেত। অার বেচারা শেখরদাও নিঃস্ব হয়ে পড়ত।
— নিঃস্ব? সেকি রে, কত টাকা ছিল তাতে?
— টাকা? গোটা কুড়ি টাকা ছিল।
— অ্যাঁ?
— তার সঙ্গে বিভিন্ন সাইজের কাগজের টুকরো ও চিরকুট। তাতে কীসব অাঁকিবুঁকি করা। দু’টো ভিজিটিং কার্ড। একটা রেভেন্যু স্ট্যাম্প। দুটো পচা রাবার ব্যান্ড। পাঁচটা অচল পঁচিশ পয়সার সিক্কা। তিনটে অচল এক টাকা ও দু’টাকার নোট। একটা অচল পাঁচ টাকার নোট। ভোটার কার্ড। ড্রাইভিং লাইসেন্স। কলেজের অাইডেন্টিটি কার্ড। অার একটা ছবি।
— এইসব হারালে সে নিঃস্ব হত?
— ব্যাপারটা বোঝার চেষ্টা কর। মানে যাকে বলে সমঝনে কি কোশিশ করো। এগুলো প্রত্যেকটা শেখরদার একেকটা প্রাণপাঁজর। হারালে কাতর হয়ে পড়বে।
— অার ছবিটা?
— ওটা গেলে তো হয়েই গেল। পতন অ্যান্ড মূর্ছা।
— কেন? পার্বতীর সঙ্গে ছবি নাকি?
— ইয়েস ম্যাডাম। সে ছবি সে অত্যন্ত যত্নসহকারে মানিব্যাগে রাখে।
— এত যত্ন, অার সেই কিনা মনের ভুলে মানিব্যাগ পাশে রেখে পড়তে লেগে গেল? ভারী ভুলো মন তো।
— অার বলো না। পার্বতীদির কী দুরবস্থা। অাপিস থেকে ফিরে ভাত রাঁধবে, চাল ভিজিয়ে রাখতে বলেছে শেখরদাকে। ফিরে দেখে শেখরদা বুকে বই নিয়ে বিছানায় ফ্ল্যাট হয়ে ঘুমোচ্ছে, অার বাটিতে চিঁড়ে ভেজানো।
— অ্যাঁ?
— দেখেটেখে শেখরদা বলার চেষ্টা করেছিল যে চাল অার চিঁড়ে বেসিকালি একই জিনিস…
— বোঝো।
— এদিকে দামুদা অামায় পেটাবে।
— সেকি, কেন?
— চা। দামুদা এমনিতে মাটির ভাঁড়ে চা দেয়। শেখরদা অাবার চায়ের দোকানের কাঁচের গ্লাস দেখলে অাত্মহারা হয়ে পড়ে, তাই দামুদাকে বলেকয়ে সেই গেলাসে চা নিয়ে অাসছিলাম। দৌড় দেওয়ার সময় সেগুলো মাটিতে পড়ে…
— হুম। পুলি। শোন।
— উঁ?
— দামুকে বিকেলে বাড়ি অাসতে বলবি একবার। বলবি বৈদ্যদি ডেকেছে। এক জগ স্পেশ্যাল চা যেন করে নিয়ে অাসে। অাগে যেমন করত।
— অাচ্ছা মা। বলব।
— তারপর? মানিব্যাগ ফেরত পেয়ে শেখর কী করল?
— কী অাবার? দেখে তো তার চোখ ছানাবড়া। এতশত হয়ে গেল, হুঁশ নেই।
— হা হা হা।
— যাই হোক, এতটা দৌড়েটৌড়ে টায়ার্ড হয়ে গেছি তো, তাই ঠান্ডা জল খাচ্ছি।
— খুব ঠান্ডা নয় তো? তাহলে গলায়…
— না গো মা, তেমন ঠান্ডাই নয়। ফ্রীজেও বেশিক্ষণ রাখা ছিল না। গ্লাসে ঢেলে কয়েকটা বরফের টুকরো দিয়ে নিয়েছি।
— বরফের টুকরো? অাইস কিউব দিয়ে জল খেলি?
— হ্যাঁ। দারুণ লাগে গো। গরমকালে জলের ওপর দিব্যি ভাসে…
— হুঁ, ভাসেই বটে। না ভাসলে তো সর্বনাশ হত।
— অ্যাঁ, মানে?
— মানে? মানে বরফ জলের চেয়ে হালকা না হলে তোর অার অামার এই কথাবার্তা চলত না। ইন ফ্যাক্ট, কোনদিনই কোন কথাবার্তা কথোপকথন হত না। জীবন বলে জিনিসটাই হয়ত পৃথিবীতে অাসত না?
— বল কী গো! ও মা ও মা বল না কেন।
— উঁহু, এখন নয়। এক্ষুণি সাঁতার থেকে ফিরেছিস, সাঁতারের শাড়ি গায়ে ঠান্ডা জল খেয়েছিস, এবারে ঠান্ডা লাগবে। যা গিয়ে চান করে চেঞ্জ করে শুকনো হয়ে অায়, বলব।
— রজার উইকলো, ডক্টর বৈদ্য!


#সোঘো, ২২:৫৩, ৫ জুন, ২০১৭, তিলোত্তমা।

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s