ডক্টর বৈদ্য নামকরা বৈজ্ঞানিক ছিলেন। কিছু বছর অাগে বিদেশে ল্যাবরেটরিতে কাজ করতে গিয়ে একটা দুর্ঘটনা অন্ধ হয়ে যান। গবেষণার জীবন থেকে অবসর নিয়ে কলকাতায় ফিরে তিনি দুই মেয়েকে মানুষ করা শুরু করেন। বড় মেয়ে নীলিমা বৈদ্য মায়ের মতই বৈজ্ঞানিক, ইদানীং পার্টনার ব্রেন্ডার সঙ্গে ইওরোপে অাছে। ছোট মেয়ে পুলি এখন কলেজের থার্ড ইয়ারে, ইতিহাস নিয়ে পড়াশুনো করছে। সে অাবার সাঁতারেও অত্যন্ত দক্ষ। মা ও মেয়ের কথোপকথনের মধ্যে কখনও-কখনও বিজ্ঞানের কিছু কিছু বিষয় উঠে অাসে। বৈদ্যবাটী সিরিজে তারই কয়েকটা দেওয়ার চেষ্টা করব।


— মা, মা, এসে গে…এই রে, সরি গো, রেওয়াজ করছিলে। ছিছি, বুঝতে পারিনি গো ক্ষমা করে দাও ক্ষমো মোরে ক্ষেমঙ্করে…
— উফফ, দিলি বারোটা বাজিয়ে। থার্ড মুভমেন্টটা ধরেছিলাম, অার…
— সরি গো মা সরি অার হবে না প্রমিস প্রমিস…
— ওরে বাবা ওরে বাবা অাচ্ছা অাচ্ছা ঠিক অাছে ছাড় ছাড় তোর গায়ে বড় জোর মরে যাবোওওও…
— হিহি, কী মজা কী মজা।
— থাক, অার হাততালি দিতে হবে না। বুঝেছি। খুব ফুর্তি হয়েছে। বাতাসে সোঁদা গন্ধ, গায়ে জল…ব্যাপার কী বলতো? তুই না হয় সারাদিন ভেজা শাড়িতে থাকতে পারিস, অামার ইম্যুনিটি তো অত স্ট্রং নয়, ওভাবে জড়িয়ে ধরে ভিজিয়ে দিলি, এবার নিউমোনিয়া হবে যে।
— ন্যুমোনিয়া? ধুসস, ওসব কিস্যু হবে না। জল তো। বলছি, ওগো মা, যাবে নাকি?
— যাব? কোথায় যাব?
— বাইরে। চল না দুজনে মিলে একটু বৃষ্টিতে ভিজে অাসি।
— হুম। তাই করি বসে বসে। শোন হে ছুঁড়ি, এখন…ক’টা বাজে দেখি…সাড়ে চারটে। অামি এখন নেক্সট দেড় ঘন্টা ভিভালডির সঙ্গে কাটাবো। সাড়ে ছ’টায় টিএসের কল অাসবে। তোমার ইচ্ছে হলে তুমি বৃষ্টিতে ভেজো গিয়ে।
— ও মা ও মা চলো না চলো না বেশ মজা হবে।
— হরগিজ নহী। হামি অাভি ভাওলিন বাজায়েগা। নহী বাজানে দেনে পর ভাওলেন্স করেগা।
— অাচ্ছা অাচ্ছা অাপস করা যাক। অামি চা বানিয়ে অানছি, অামরা বারান্দায় বসে বৃষ্টির ছাঁট পায়ে লাগাতে লাগাতে চায়ে চুমুক দেব অার তুমি অামায় বরফের গল্প বলবে।
— চা?
— চা।
— বারান্দায়?
— বারান্দায়।
— হুম।
— মা, চলো না, দারুণ হবে। বৃষ্টিভেজা বিকেল তো তোমার ফেভারিট। কতদিন বিকেলবারান্দায় বসে তোমার মুখে গল্প শুনিনি।
— হুম। অার্ডিনারি চা সে নেহি হোগা, এক্সট্রা-অার্ডিনারি চা…
— উফফ, বুঝেছি রে বাবা। অরেঞ্জ পিকো চা-ই চাই তো?
— ইউ, মিস পুলি, হ্যাভ অা ডীল।
— ট্রালালালা, ডিলাগ্রান্ডিমেফিস্টোফিলিস…যাই চা বানাই…
— কী গেরো। ভিভালডি, মায়েস্ত্রো, স্কুসা, মি দিসপিয়াচে। ক্ষমো মোরে। পেরদোনামি, পের ফাভোরে। মেয়েটা অামার নিতান্তই পাগল। কাল ফের তোমায় নিয়ে বসবো।

— কেমন লাগছে মা? চা’টা ভাল হয়েছে?
— লাগছে দিব্যি। চা’টা লা-জবাব। বিকেলটাও দারুণ। গাছের পাতা দিয়ে জল পড়ার শব্দ পাচ্ছি, দূরে কোথাও একটা উনুনের ধোঁয়ার হাল্কা অামেজ পাচ্ছি। বৃষ্টি পড়েছে, তাই বিকেলটাও যে নম্র সোনালি হয়েছে সেটাও বেশ ফীল করতে পারছি। লাভলি। থ্যাঙ্ক ইউ, মিস পুলি।
— ইউ অার ভেরি ওয়েলকাম মা।
— এই যে অামরা এই বিকেলটা এঞ্জয় করছি, পৃথিবীতে এই যে এত বিভিন্ন ধরনের প্রাণ সারাক্ষণ জীবনযাপনের রেসে ছুটছে, খানিক দাঁড়িয়ে জিরিয়ে নিচ্ছে, ফের ছুটছে, এইসব কোনও কিছুই হত না।
— হত না? ও, বরফ যদি জলের চেয়ে ভারী হত? পৃথিবীতে প্রাণই থাকত না?
— না থাকার চান্সটাই বেশি হত।
— হুম। অামি অাজ সারাদিন এই বিষয়ে ভাবনাচিন্তা করেছি।
— তাই? ক্লাসে মন না দিয়ে এইসব?
— অারে শোন না। ক্লাসে ঠিকই মন দিয়েছি। ক্লাসের মাঝে মাঝে ভেবেছি।
— হুম। তো কী বুঝলি শুনি।
— বরফ যদি ভারী হত…ভারীই বলছি, বেশি ঘন বলছি না…
— হ্যাঁ হ্যাঁ। ধরেই নেওয়া যায় দু’টোর মাস…
— ভর।
— …ভর এক। সুতরাং, গো অ্যাহেড।
— বরফ যদি বেশি ভারী হতো তাহলে সমুদ্রের বা নদীর…
— বা লেকের।
— বা হ্রদের তলায় জমত। তার মানে, যদি ছোটখাটো জলাশয় হয়, তাহলে পুরোটাই বরফ হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা।
— রাইট।
— কিন্তু তা বলে কি সমুদ্রও পুরোটা জমে যেতে পারে? অতটা জল, যতই নীচ থেকে বরফ হতে থাকুক, সবটা জমে যাওয়া তো এলাহি ব্যাপার।
— হুম। গুড কোয়েশ্চেন। হিমালয় গেছিস?
— অ্যাঁ? হিমালয়? না, মানে এখনও ব্রহ্মচর্য পালনের সময় অাসেনি তো…
— বেড়াতে। বেড়াতে গেছিস?
— গেলাম তো। বেমালুম ভুলে মেরে দিয়েছ। ২০১৫ সালে, কলেজের গ্রুপের সঙ্গে, কালিম্পং দার্জিলিং জলপাইগুড়ি অালিপুরদুয়ার…
— হুম। কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখেছিস তো? নিজের চোখে?
— হ্যাঁ মা, দেখেছি। তোমায় ফোন করে পুঙ্খনাপুঙ্খ বিবরণও দিয়েছি। রানিং কমেন্টারি।
— ইয়েস। অাই রিমেম্বার। তো, কাঞ্চন পাহাড়ের পীক ঝকমক করছিল তো?
— ঝকমক মানে? রীতিমত ঝলমল করছিল। একটানা চেয়ে থাকতে পারছিলাম না।
— কেন, সানগ্লাস?
— হ্যাঁ। মানে। ওই। খালি চোখে তাকিয়ে থাকতে…যাই হোক, একটু পরেই রোদচশমা পরে নিয়েছিলাম।
— গুড। চোখ বাঁচিয়ে। অলওয়েজ। এনিওয়ে, পীকটা অত ঝলমল করছিল কেন?
— রোদ পড়ে। বরফ তো, শাদা ধবধবে। সূর্যের অালোটা তো প্রায় সমস্তটাই প্রতিফলিত হচ্ছিল।
— ইন্টারেস্টিং। এই যে কথাটা বললি, মনে রাখ। এটা একটু পরে অাসবে।
— কোনটা? বরফে সূর্যের অালোর প্রতিফলন? অাচ্ছা, ভেড়ায় পুরে রাখছি।
— ভেড়…ইয়া অাল্লাহ্, র‌্যাম। এনিওয়ে, ব্যাক টু টপিক। পাহাড়ের ওপরটা অত ঝকমক…অাই বেগ ইয়োর পার্ডেন, ঝলমল করছে কেননা পাহাড়ের মাথায় এক তাল বরফ। এক তাল মানে কিন্তু অনেকটা। এতটা বরফ এল কোত্থেকে?
— কেন, বরফ পড়ে। তুষারপাত।
— ওকে। ধর শীতকালে বরফ পড়ল, পাহাড়ের মাথায় এক লেয়ার বরফ জমলো। কিন্তু নেক্সট গরমকালে সেই বরফ তো গলে জল হয়ে যাবে। তাই না?
— ওঃ। তাও তো বটে। প্রত্যেক গ্রীষ্মকালে যদি এমনভাবে বরফ গলে যায় তাহলে জমার তো কোনও সম্ভাবনা…রোয়েট।
— রোয়েট করব?
— রোয়েট রোয়েট। ধরো, যদি গরমকালে তাপমাত্রা অতটা না ওঠে? মানে ধরো, গরম হল, শীতকালে যতটা বরফ পড়েছিল তার খানিকটা গলে গেল। কিন্তু সবটা গলতে পারল না। কেননা…কেননা…দু’টো কারণ হতে পারে। এক, শীত বেশিদিন থাকে, গরম কমদিন। তাই বরফ বেশিদিন ধরে পড়ার সুযোগ পায়, বরফ গলার সুযোগ কম। দুই, ঠান্ডা এতটাই যে গরমকাল যতদিনই থাকুক না কেন সব বরফটা গলা সম্ভব নয়।
— ধরা যাক, ফর দ্য সেক অফ অার্গুমেন্ট…তর্কের খাতিরে ধরে নেওয়া যাক যে প্রথমটাই কারণ। ধরা যাক, শীতে যতটা বরফ পড়ল, তার অর্ধেক পরের সামারে গলে গেল। যদি তাই হয়, তাহলে নেক্সট শীতে কী হবে?
— অারেক অাস্তরণ বরফ পড়বে। মানে যতটা গত শীতে ছিল তার দেড়গুণ হবে।
— গুড। তার পরের সামারে?
— সেটা একগুণ হবে।
— বোঝার সুবিধের জন্য ধরে নে প্রথমবার একশ টন বরফ পড়েছিল।
— একশ টন একটু কম হয়ে গেল না মা?
— এটা অ্যাজাম্পশ্যন। সায়েন্স ইজ বিল্ট অাপন অ্যাজাম্পশ্যন্স দ্যাট অার ঈজি টু গ্রাস্প। প্রথম শীতে ১০০ টন বরফ। নেক্সট সামারে?
— সেটা অর্ধেক হয়ে ৫০ টন।
— ২য় শীতে?
— সেই ৫০ টন বেড়ে ১৫০ টন।
— রাইট। ২য় সামারে?
— সেটা কমে ১০০ টন।
— তার মানে কী দাঁড়াল? প্রতি বছর নেট ৫০ টন করে বরফ জমছে পাহাড়ের ওপর। তাই তো?
— হ্যাঁ, তাই।
— এবারে ভাব, পাহাড়গুলোর বয়স কত। হিমালয়ের খুব একটা বেশি না। মাত্র সাড়ে চার থেকে পাঁচ কোটি বছর অাগে ইন্ডিয়া অার ইউরেসিয়া টেকটনিক প্লেট…
— মাত্র! পাঁচ কোটি বছর মাত্র? ও মা।
— ফ্রম অা জিওলজিকাল স্ট্যান্ডপয়েন্ট, পাঁচ কোটি বছর কিছুই না। পৃথিবীর বয়সই সাড়ে চারশো কোটি বছর। হিমালয় পৃথিবীর এক পার্সেন্ট। বয়স অনুযায়ী।
— বাপরে। এদিকে অামরা পনের মিনিটের জন্য মরি।
— হুম। অাইরনি। এনিওয়ে, এতবছর ধরে বরফ জমছে, প্রতি বছর লেভেলটা একটু একটু করে বাড়ছে, তাহলে পীকের মাথাটা পুরোটা বরফে ঢাকা থাকাটা কি খুব অাশ্চর্যের?
— না। একদমই না। মেনে নিচ্ছি।
— তাহলেই ভাব, বরফ যদি ভারী হত, অার সমুদ্রের জলের তলায় ঠিক একইভাবে প্রতি বছর যদি লেয়ার বাই লেয়ার জমে উঠত, তাহলে, সমুদ্র যত গভীরই হোক না, একটা না একটা সময় তো পুরোটাই জমে বরফ হত। তাই না?
— হুম। হুমমম।
— এগ্রি?
— রোয়েট। না, নট এগ্রি। অাজ সকালেই বলছিলাম। বিষুবরেখার কাছাকাছি তো গরম, সেখানে বরফ তৈরী হবে কেন?
— হুঁ। গুড পয়েন্ট। সত্যিই তো, সেখানে বরফ হবেই বা কীকরে? গরম তো।
— হ্যাঁ, তা…এক মিনিট, এটা চালাকি প্রশ্ন, ট্রিক কোশ্চেন।
— নাইন নাইন, ইউ অার কারেক্ট ফ্রয়লাইন পুলি। বাট, কনসিড্যর…না, সেটায় পরে অাসছি। তার অাগে, একটু অাগে তুই একটা ফ্যাক্ট তোর র‌্যামে পুরে রেখেছিলি…
— বরফ ঝলমল করে।
— রাইট। কেন করে?
— কারণ বরফের প্রতিফলন শক্তি খুব বেশি। শাদা তো, যতটা অালো পড়ছে তার প্রায় সমস্তটাই ফেরত পাঠাচ্ছে।
— কারেক্ট।
— এইজন্যই গরমকালে লাইট কালারের জামা পরতে বলে।
— কোয়াইট সো। কিন্তু ধর এমন কোনও জায়গায় মাটিটা পাথুরে, পাথরটা ধর গ্র্যানাইট বা বেসাল্ট, প্রায় কালো রঙের, সেখানে কী হবে?
— সূর্যের অালো শুষে নেবে। বেশি গরম হবে। যেমন ধরো কালো ছাতা।
— ইয়েস। মন দিয়ে চাঁদের সারফেসটা স্টাডি করলে বোঝা যায়। কোথাও কোথাও সাংঘাতিক ব্রাইট, কোথাও কোথাও তার তুলনায় অনেক বেশি অনুজ্জ্বল।
— ঠিক বলেছ। মানে যে সব জায়গা বেশি উজ্জ্বল সেখান থেকে বেশি রোদ প্রতিফলিত হচ্ছে, অার বাকি জায়গায় কম?
— ইনডীড। কোন জিনিসের রিফ্লেক্টেন্স, মানে কতটা প্রতিফলন হচ্ছে, সেটা মাপা হয় তার অ্যালবিডো দিয়ে।
— অ্যালবিডো?
— দ্যাট্স রাইট। কথাটা ল্যাটিন, অারবী ভাষার অাল-বায়াদ থেকেও এসে থাকতে পারে। অাল-বায়াদ মানে হোয়াইটনেস, বাংলায়…বাংলায়?
— হোয়াইটনেস? শুভ্রতা।
— হুঁ। একেবারে কালো জিনিসের—যাকে অামরা ফিজিক্সে ব্ল্যাকবডি বলি, বাংলায় কৃষ্ণবস্তু—তার অ্যালবিডো শূন্য। অার উল্টো দিকে হোয়াইটবডির অ্যালবিডো এক। অ্যান্টার্কটিকায় বরফের অ্যালবিডো ০.৮। তার মানে সূর্যের এনার্জির মাত্র ২০% অ্যাবজর্ব হয়ে মাটি গরম করছে, বাকিটা ফেরত চলে যাচ্ছে।
— অার ওই পাথুরে জমির অ্যালবিডো কম? তার মানে বেশি তাপ শুষে নিয়ে বেশি গরম হচ্ছে?
— কোয়াইট সো।
— হুম। তার মানে, দাঁড়াও, তার মানে, উত্তর অার দক্ষিণ মেরুতে, মানে বরফ বেশি…
— শুধু বেশি নয়, সমুদ্রের ওপরে মাইলের পর মাইল অাইস শীটে ভর্তি।
— সেকি, অামরা বরফ ভারী বলে ধরছি না?
— ফর দ্য টাইম বীয়িং বরফ হাল্কা, জলে ভাসে, সেটা ধরেই এগোন যাক। বরফ ভারীর কেসটায় একটু পরে অাসছি। এবার বল, এইসব জায়গায় এত বরফ থাকলে কী হবে?
— সূর্যের অালো বেশিটাই প্রতিফলিত হয়ে ফেরত যাবে।
— কারেক্ট। অার তার ফলস্বরূপ?
— তাপমাত্রা কমবে?
— ইয়েস। যত টেম্প্যরেচ্যর কমবে তত কী হবে?
— ইয়ে, অারও বরফ হবে?
— অ্যাবসোল্যুটলি। অার যত বরফ হবে…
— তত অ্যালবিডো বাড়বে, তত ঠান্ডা হবে, তত অ্যালবিডো বাড়বে…তার মানে গোটা পৃথিবীটাই…
— গোটাটা না হলেও, অনেকটা বরফে ভরে যাবে। ইন ফ্যাক্ট, এরকম “স্নোবল অার্থ” বারকয়েক হয়েছে বৈকি।
— তাহলে প্রাণের কী হবে?
— বেশিরভাগই বিলুপ্ত হবে, ডাউটলেস। কিন্তু সব হবে না। বরফ তো জলের ওপর ভাসছে…
— সেকি, তুমি তো বললে সমস্ত জলই বরফ…
— অাজ সকালের ডিস্কাশ্যন ভুলে গেলি? খুব খুব কম টেম্প্যরেচ্যর না হলে ওপরের লেয়ারটাই শুধু বরফ হবে, বাকিটা…
— জল থাকবে। থুড়ি গো, ভুলে গিছলাম। তাহলে তুমি বলছ মাথার ওপরে পুরো জমাট বরফ থাকলেও জলের তলায় মাছ বেঁচে থাকতে পারে?
— মাছ হয়ত থাকবে না, কিন্তু প্ল্যাঙ্কটন বা ব্যাক্টেরিয়া শ্রেণীর প্রাণী থাকতেই পারে। সুতরাং এরকম স্নোবল অার্থ হলেও প্রাণ বিলুপ্ত হবে না। ইফ! ইফ অ্যান্ড ওনলি ইফ বরফ জলের চেয়ে হাল্কা হয়।
— ওওও, এবার বুঝেছি। বরফ যদি ভারী হয় তাহলে যত বরফ হয় সমুদ্রের নীচে গিয়ে জমা হবে, বছরের পর বছর, শতাব্দীর পর শতাব্দী…
— লাখ লাখ কোটি কোটি বছর স্কেলেও ভাবতে পারিস।
— হ্যাঁ, অত বছর ধরে বরফ জমতে জমতে শেষে গোটা পৃথিবীই…
— স্নোবল অার্থ অার নয়। অাইস অার্থ। নো মোর লাইফ, কারণ প্রাণের থাকার অার কোন জায়গাই নেই।
— অাচ্ছা, ডাঙায় থাকতে পারে না?
— ডাঙায়? সমস্ত জল জমে বরফ, অ্যালবিডো অত হাই, সূর্যের বেশিরভাগ এনার্জিই ফেরত যাচ্ছে, সারফেস টেম্প্যরেচ্যর কত হবে খেয়াল অাছে? অাইস এজ তো শিশু। নো, মিস পুলি, নো লাইফ।
— কিন্তু…কিন্তু…ধরো এই যে লাখ লাখ কোটি কোটি বছর ধরে সমুদ্রে বরফ জমছে, সমুদ্রের ওপর তো বরফ নেই?
— না, তা নেই।
— তাহলে তো অ্যালবিডো কম, তাই না? জলের অ্যালবিডো নিশ্চয় বরফের চেয়ে কম।
— কম বৈকি। সূর্য মাথার ওপর থাকলে জলের অ্যালবিডো ০.০৬। মানে সমস্ত তাপটাই শুষে নিচ্ছে। তার মানে জল গরম হচ্ছে।
— তাহলে তো নীচের বরফটাও গলে যাবে, তাই না?
— গলবে বটে।
— তাহলে, যত বরফ গলবে তত গরম অারও বাড়বে…এ তো উল্টো ব্যাপার। গরম বেড়েই চলবে।
— এগজ্যাক্টলি। এভ্রিথিং ডিপেন্ডস অন ইনিশিয়াল কন্ডিশ্যনস। যদি প্রথমে বরফ বেশি থাকে, অাইস শীট বেশি থাকে, তাহলে অ্যালবিডোও বেশি হবে, ঠান্ডাও তত তাড়াতাড়ি হবে। সমুদ্রের জল সমস্ত জমে বরফ হয়ে ডাঙার টেম্প্যরেচ্যর সব জায়গায় মাইনাস পঞ্চাশ-একশ হয়ে প্রাণ বিলুপ্ত।
— অার প্রথমে কম বরফ থাকলে?
— তাহলে উল্টো। জলে বরফ একেবারেই জমবে না, ডাঙার বরফও অাস্তে অাস্তে গলে যাবে, পৃথিবীও তত তেতে উঠবে। গরম বাড়তে বাড়তে সব জায়গায় সাহারা মরুভূমি। অ্যগেইন, প্রাণ বিলুপ্ত।
— তার মানে শাঁখের করাত। পানের থেকে চূণ খসলে হয় অাইসক্রীম, নয় কাবাব।
— দেয়ারফোর, মিস পুলি, বরফ যে জলের থেকে হাল্কা সেটা প্রাণের পক্ষে কোয়াইট মিরাকুলাস। অামাদের পক্ষেও তো বটেই।
— তা অার বলতে।
— ইউনিভার্সটা এইরকম অদ্ভুত অদ্ভুত ছোট ছোট ব্যালেন্সের ওপর দাঁড়িয়ে অাছে। যেমন…
— থুড়ি গো, একটু অাটকাচ্ছি। অাই হেব কোশ্চেন।
— করে ফেল।
— তুমি বললে স্নোবল অার্থ। মানে পৃথিবীর সমস্তটা বরফে মোড়া। সেটা দেখতে কেমন ছিল? সেটা কি অাদৌ সম্ভব…?
— বিসোয়াস হচ্ছে না মিস্টার মিটার?
— না, মানে, হচ্ছে…
— গুড। বুঝেছি। তোর প্রমাণ চাই। তাই তো?
— না, মানে, ভূতত্ত্ববিদরা নিশ্চয় প্রমাণ দিয়েছেন…
— অাই অান্ডারস্ট্যান্ড। সচক্ষে দেখা অার…তুই ছোটবেলায় দিদির সঙ্গে বাইনোকুলার দিয়ে স্টারগেজিং করতি, মনে অাছে?
— হ্যাঁ গো। দিদির সেই বইটা ছিল, তোমার দেওয়া। পিটার মুরের। দারুণ লাগত।
— জুপিটার দেখেছিলি কখনও?
— ওই দূরবীনে যতটা দেখা যায়…
— জুপিটারের স্যাটেলাইট দেখেছিস?
— স্যাটেলাইট…হুম, মনে পড়ছে না। তবে প্রধান তো বোধহয় তিনটে, তাই না?
— চারটে। চোখে টেলিস্কোপ লাগিয়ে গ্যালিলেও বৃহষ্পতির চারটে প্রধান উপগ্রহ অাবিষ্কার করেছিলেন। অায়ো, ইওরোপা, গ্যানিমীড, ক্যালিস্টো।
— হ্যাঁ হ্যাঁ, মনে পড়েছে।
— চারটে চার রকমের উপগ্রহ। এর মধ্যে সবচেয়ে ইন্টারেস্টিং ইওরোপা। কেন জানিস?
— না তো। কেন?
— ইওরোপার সারফেসটা পুরো বরফ।
— পুরো বর…বরফ মানে?
— মানে বরফ।
— দাঁড়াও দাঁড়াও, পৃথিবী ছাড়া অন্য জায়গায় জল অাছে নাকি…?
— কী মনে হয়?
— রোয়েট রোয়েট, দিদি এটা বলেছিল বটে। ইউরেনাস নেপচুনে বরফ অাছে বটে, কিন্তু সে বরফ জল-বরফ নয়, মিথেন বরফ।
— ঠিক। কিন্তু, ইন্টারেস্টিং ব্যাপার হল, ইওরোপার সারফেসের ওপর যে বরফের অাস্তরণ সেটা সত্যিই জলের বরফ!
— অ্যাঁ?
— এবং, এটাও মনে করা হয় যে সেই বরফের তলায় হয়তো তরল জলের সমুদ্রও অাছে!
— অ্যাঁ?
— হ্যাঁ। সুতরাং, দেয়ার ইজ ইয়োর এগজাম্পেল।
— কিন্তু…কিন্তু…কীকরে? ইওরোপা অত দূরে, নিশ্চয় প্রচন্ড ঠান্ডা, সেখানে কীকরে…অার…অার…তার মানে, যদি জল থাকে, তাহলে কি প্রাণও অাছে?
— পুলি।
— হ্যাঁ?
— ক’টা বাজল, খেয়াল অাছে?
— ক’টা…?
— তোর হুঁশ নেই, জানি। এখন বাজে সোয়া ছ’টা। সাড়ে ছ’টায় টিএসের কল অাছে।
— যাঃ। ইওরোপার গল্প শোনা হল না?
— হবে হবে। তোর বিকেলের ক্লাস নেওয়া নেই?
— অাছে। ওই সাড়ে ছ’টাতেই।
— দেন অ্য টীচার শুড অ্যটেন্ড টু হ্যর স্টুডেন্টস, উডন্ট ইউ সে, মিস বৈদ্য?
— রজার উইলকো ডক্টর বৈদ্য।


#সোঘো, ২১:৪৫, ৭ জুন ২০১৭, তিলোত্তমা।


পঞ্চভূত নিয়ে বৈদ্যবাটীর একটা সিরিজ করার চেষ্টা করছি। পঞ্চভূত অর্থাৎ মামদো-জামদো-ব্রহ্মদৈত্য-পেত্নী-শাঁকচুন্নি নয়, ক্ষিতি-অপ-তেজ-মরুৎ-ব্যোম। ক্ষিতি অর্থে মাটি, ভূমি, পৃথিবী। অপ মানে জল। তেজ মানে অাগুন, এনার্জি। মরুৎ মানে হাওয়া, বাতাস, উইন্ড/এয়ার। ব্যোম মানে অাকাশ হলেও অামি এটাকে মহাকাশ হিসাবেই ধরব। দেখা যাক, কোথাকার অপ কোথায় গড়ায়।

এটা পঞ্চভূত সিরিজের অপ সাবসিরিজের দ্বিতীয় লেখা।

#ডক্টরবৈদ্য #পুলিপিঠে #পুলিসিরিজ #পুলিওমা #ঘটিবাটী

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s