বৈদ্যবাটী : গ্যালেলিওর চারটি চাঁদ

ডক্টর বৈদ্য নামকরা বৈজ্ঞানিক ছিলেন। কিছু বছর অাগে বিদেশে ল্যাবরেটরিতে কাজ করতে গিয়ে একটা দুর্ঘটনা অন্ধ হয়ে যান। গবেষণার জীবন থেকে অবসর নিয়ে কলকাতায় ফিরে তিনি দুই মেয়েকে মানুষ করা শুরু করেন। বড় মেয়ে নীলিমা বৈদ্য মায়ের মতই বৈজ্ঞানিক, ইদানীং পার্টনার ব্রেন্ডার সঙ্গে ইওরোপে অাছে। ছোট মেয়ে পুলি এখন কলেজের থার্ড ইয়ারে, ইতিহাস নিয়ে পড়াশুনো করছে। সে অাবার সাঁতারেও অত্যন্ত দক্ষ। মা ও মেয়ের কথোপকথনের মধ্যে কখনও-কখনও বিজ্ঞানের কিছু কিছু বিষয় উঠে অাসে। বৈদ্যবাটী সিরিজে তারই কয়েকটা দেওয়ার চেষ্টা করব।


 

— ও মা।
— এ কী! পুলি? ঘুমোসনি?
— ঘুম অাসছে না।
— সারাদিন এত হুটোপাটি করলি, তাও ঘুম অাসছে না?
— না গো। একটু ঝিমুনি এসেছিল।
— তারপর?
— স্বপ্নে দেখলুম, চোরটা তোমার জায়রোস্কোপটা নিয়ে পালাচ্ছে।
— অ্যাঁ? তাই দেখলি?
— হ্যাঁ। ছুটছে বরফের চাঙড়ের ওপর দিয়ে। চাঙড়গুলো সমুদ্রের জলে ভাসছে।
— অার তুই?
— অামি পেছন পেছন ধাওয়া করছি। পায়ের তলার বরফ গলে জল হয়ে যাচ্ছে, অামরা লাফিয়ে লাফিয়ে যাচ্ছি।
— বাপরে। তারপর?
— অাকাশটা অন্ধকার।
— রাত?
— না গো, দিন।
— তাহলে?
— অাকাশটা অন্ধকার, কিন্তু সবকিছু বেশ দেখতে পাচ্ছি।
— কীভাবে?
— চোখ তুলে দেখি, অাকাশে প্রচুর তারা। একটা তারা খুব উজ্জ্বল, যেন একটা মহাজাগতিক সার্চলাইট। টিনটিনের উল্কা রহস্যে যেমন ছিল, তেমন। অার অন্যদিকে অাকাশ জুড়ে রয়েছে বিশাল একটা চাঁদ। তার গায়ে গেরুয়া রঙের গোল গোল চাকতির মত দাগ, অার একটা বিশাল লাল চোখ।
— পুলি! ওটা কী জানিস?
— না মা। মানে, জানা উচিত, দেখেছি, কিন্তু কিছুতেই…
— ওটা জুপিটার। বৃহষ্পতি! পুলি, তুই কি স্বপ্নে ইওরোপার মাটিতে পৌঁছে গিছলি?
— ও মা! কী বলছ? ইওরোপা? কিন্তু অামি তো ইওরোপাতে কখনও যাই…মানে, দূর ছাই, যাব কী করে? ইওরোপার কোনও ছবিও দেখিনি।
— অাজ অামাদের ইওরোপা নিয়ে অাড্ডা হয়েছে। ইওরোপাতে যে বরফ অাছে তোকে বলেছি। তুই মনে মনে তারই একটা ছবি বানিয়ে নিয়েছিস।
— সূর্যটা একটা সার্চলাইটের মত?
— খুব ব্রাইট একটা তারার মত। তাতে অালো হবে, কিন্তু তার সঙ্গে থাকবে জুপিটারের অালো।
— ওই গেরুয়া চাকতি? ওই লাল চোখ?
— জুপিটার একটা গ্যাস জায়ান্ট। অামাদের এই পৃথিবী বা শুক্র বা মঙ্গলের মত পাথুরে নয়। ওই ব্যান্ডগুলো গ্যাস ক্লাউড।
— মানে মেঘ?
— হ্যাঁ, কিন্তু বাষ্প নয়। মানে জল বাষ্প নয়। অ্যামোনিয়াম হাইড্রোসালফাইড গ্যাসের মধ্যে অ্যামোনিয়ার ক্রিস্টাল…
— মা! রসায়ন!
— অাচ্ছা অাচ্ছা ঠিক অাছে। নো কেমিস্ট্রি।
— রসায়ন ঠিক অাছে। কিন্তু দাঁত ভাঙা নাম হলেই প্রতিবাদ জানাব।
— হুম। নোটেড।
— অার ওই লাল চোখটা?
— ওটা একটা ঝড়। বলতে পারিস একটা বিশাল বড় সাইক্লোন।
— সাইক্লোন? বল কী!
— পৃথিবীতে একেকটা সাইক্লোন ক’দিন টেকে?
— এই, ধর, দিন দুয়েক। তিনদিন।
— চার-পাঁচ দিনও হতে পারে?
— হ্যাঁ। কিন্তু ওর চেয়ে বেশি…
— জুপিটারের এই বিশেষ সাইক্লোনটা প্রায় দু’শো বছর টিকে অাছে।
— অ্যাঁ?
— হ্যাঁ। ১৮৩১ সাল থেকে তো নির্ঘাত। ১৬৬৫ সাল থেকেও হতে পারে।
— বল কী গো? সেটা কী করে হয়?
— জুপিটারের ব্যাপারই অালাদা। এই যে মেগা-সাইক্লোন, এর নাম দ্য গ্রেট রেড স্পট। নামটা এরকম কেন নিশ্চয় বুঝছিস…
— এই, দাঁড়াও দাঁড়াও। রোক্কে রোক্কে।
— কী হল?
— অামি এই স্পটটা দেখেছি। লাল চোখটা অামার দেখা।
— হ্যাঁ, দেখবি না কেন? অবশ্য তুই অার নীলি তো বাইনোকুলার দিয়ে স্টারগেজ করতি। এটা দেখতে হলে টেলিস্কোপ লাগবে।
— না না, অামরা টেলিস্কোপেই দেখেছিলাম। স্পষ্ট মনে অাছে। দিদি বিধুজ্যাঠার কাছে নিয়ে গিছল। ওনার ছাতে…
— রাইট রাইট, বিধুবাবুর তো টেলিস্কোপ অাছেই।
— কিন্তু মা, পৃথিবী থেকে দূরবীনে দেখা যায়…তার মানে…লাল চোখটা তো বিশাল।
— বিশাল বলে বিশাল। ১৯৯৫ সালের হাবেল স্পেস টেলিস্কোপ থেকে মাপা হয়েছিল। প্রায় ২১ হাজার কিলোমিটার।
— একুশ…হাজার…কিলোমিটার?
— এখন কম হবে। বছর বছর অাড়াইশো কিলোমিটার করে সাইজ কমছে…
— অামাদের পৃথিবীর ব্যাস কত?
— পৃথিবীর? ব্যাস…ব্যাসটা কোনটা? ডায়ামিটার, না রেডিয়াস?
— ডায়ামিটার। রেডিয়াস ব্যাসার্ধ।
— রাইট। রেডিয়াস ৬৪০০ কিমি, তার মানে ব্যাস ওই ১৩ হাজার কিমি-র অাশেপাশে।
— তার মানে…তার মানে…
— হ্যাঁ। গোটা দুই পৃথিবী ঠেলাঠেলি করে ঢুকে যাবে।
— তুতের দিব্যি…এক মিনিট! কী বললে?
— বলছি দেড়খানা পৃথিবী এঁটে যাবে।
— না না, তার অাগে। ঝড়ের, মানে ওই গ্রেট রেড স্পটের অায়তন কমছে?
— কমছেই তো। বছরে ওই ২৫০ কিলোমিটারের মত।
— তার মানে অার…চার গুণ তেরো…বাহান্ন বছরে ঝড়টা অার থাকবে না?
— নাও থাকতে পারে। অার অামি যে ১৩ হাজার বললাম, সেটা ১৯৯৫-র হিসেব। এখন অারো কমেছে।
— তাহলে এত সুন্দর জিনিসটা মিলিয়ে যাবে?
— যেতেই পারে। যদিও অঙ্ক-টঙ্ক করে দেখা গেছে মেলাবে না। সিস্টেমটা স্টেব্যল।
— তাহলে? কমছে কেন?
— কী জানি। অসিলেট করছে বোধহয়। বলতে পারব না রে।
— লাল চোখটা মিলিয়ে গেলে তোমার দুঃখ হবে না?
— মানে চোখে দেখার দিক থেকে যে হবে না, সেটা স্পষ্ট…
— ও মা, সরি গো অামি…
— ওফফ, থাম তো। অাই ডোন্ট মাইন্ড। বলতে দে। এরকম একটা ইন্টারেস্টিং ফীচার হারিয়ে গেলে খারাপ লাগবে ঠিকই। কিন্তু কেন হারিয়ে গেল, কত তাড়াতাড়ি হারালো, কেন অত তাড়াতাড়ি হারালো, অাবার কি ফিরে অাসবে? এইসব নতুন নতুন প্রশ্ন উঠে অাসবে। বিজ্ঞানের কি প্রশ্নের অভাব অাছে রে? প্রশ্নই তো বৈজ্ঞানিকের অক্সিজেন।
— অার উত্তর? সেটা কি কার্বন ডায়ক্সাইড?
— হাঃ। উত্তর হল লাইক ফুচকা। হেভেনলি, বাট ফ্লীটিং।
— শিশিরবিন্দুর মত?
— প্রিসাইসলি।
— কিন্তু ইওরোপা?
— অাঃ, ইওরোপা। ইয়েস। ইওরোপা হল জুপিটারে দ্বিতীয় স্যাটেলাইট…
— উপগ্রহ।
— চাঁদ বলি? উপগ্রহ কথাটা কেমন…কমপ্লিকেটেড।
— অা-চ্ছা।
— মেসি। ইওরোপা সেকেন্ড মুন…
— দ্বিতীয় বলতে?
— দ্বিতীয় বলতে জুপিটারের থেকে দূরত্বে।
— অাচ্ছা, জুপিটারের তো চারটে উপগ্…চাঁদ? মানে চারটে প্রধান চাঁদ। যেগুলো গ্যালেলিও অাবিষ্কার করেছিলেন?
— দ্যাট্স রাইট।
— নামগুলো…তুমি বিকেলে বললে…একটা তো ইওরোপা। অারেকটা…
— প্রথমটা অায়ো। মানে যেটা জুপিটারের সবচেয়ে কাছে।
— হ্যাঁ হ্যাঁ। অায়ো। অামি এটাকে ইও উচ্চারণ করতাম, দিদি ঠিক করে দিয়েছিল।
— গ্রীক মতে সম্ভবত ইও হবে। শিওর নই। যাকগে, তার পরে ইওরোপা।
— হ্যাঁ হ্যাঁ। সবচেয়ে ইন্টারেস্টিং।
— ইয়েস ইনডীড। তারপর গ্যানিমীড। শেষে ক্যালিস্টো।
— নামগুলো কী সুন্দর, না? গ্যালেলিও নামকরণ ভালই করতে পারতেন।
— নামগুলো গ্যালেলিও দেননি।
— দেননি? কিন্তু উনিই তো…
— অাবিষ্কার করেছিলেন, ইয়েস, কিন্তু নাম দিয়েছিলেন ওনারই সমসাময়িক এক অ্যাস্ট্রোনমার। নাম যদ্দূর মনে পড়ছে সাইমন মারিয়ুস। এই মারিয়ুস ক্লেম…দাবী করেছিলেন যে এই চারটে চাঁদের অাবিষ্কর্তা উনিই,গ্যালেলিও নন।
— সত্যি? কে জিতেছিল?
— হারজিতের তো প্রশ্ন নয়। তদন্ত হয়, দেখা যায় মারিয়ুস হয়ত গ্যালেলিওর দিনদু’য়েক অাগে ওই চারটেকে অবজার্ভ করেছিলেন, কিন্তু খাতায় নোট নেওয়া শুরু করেন গ্যালেলিওর দিনদু’য়েক পরে। সুতরাং, ইনকন্ক্ল্যুসিভ।
— অথচ অামরা কেউই মারিয়ুসের নাম অবধি জানি না।
— সে তো বটেই। এমন কত সব বৈজ্ঞানিকের নাম ইতিহাসের পাতায় নেই। হয় লেখা হয়নি, বা পরে সময়ের চাপে মুছে গেছে। অাচ্ছা বল দেখি, ক্যালকুলাসের অাবিষ্কর্তা কে?
— ক্যালকুলাস? অাইজ্যাক নিউটন। কেন? নিউটন নন?
— না, কিন্তু নিউটন একা নন। লাইবনিৎজ সহ-অাবিষ্কর্তা। অথচ অামাদের মধ্যে মেজরিটি অাজ শুধু নিউটনের নামই জানে।
— কিন্তু মারিয়ুস…?
— ইয়েস। গ্যালেলিও চারটে চাঁদের নাম ফ্লোরেন্সের মেদিচি বংশের নামে নাম রাখতে চেয়েছিলেন। এদিকে কেপলারের…কেপলার কে জানিস তো?
— জানব না? ইয়োহানেস কেপলার। সূর্যের চারদিকে গ্রহগুলো যে বৃত্তাকারে নয়, উপবৃত্তাকারে ঘোরে, সেটা তো উনিই প্রথম দেখিয়েছিলেন।
— রাইট। এলিপ্টিকাল অরবিট্স। তো এই কেপলার তখন নামকরা অ্যাস্ট্রোনমার…
— জ্যোতির্বিদ।
— থ্যাঙ্ক ইউ। তাঁর সাজেশ্যন অনুযায়ী মারিয়ুস গ্রীক পুরাণ থেকে ধার করে এই চারটে চাঁদের নাম রাখেন।
— কিন্তু তাতে গ্যালেলিও রাজি হলেন?
— মাথা খারাপ? নাম নিয়ে এত গন্ডগোল যে বিংশ শতকের মাঝামাঝি অবধি জুপিটার এক, জুপিটার দুই এইরকম নামই চলত।
— বাপরে।
— হ্যাঁ। এদিকে চরিত্রের দিক থেকে চারটে চাঁদই ইউনিক। পৃথিবীতে ভলকেনো অাছে জানিস তো?
— যাব্বাবা, ইতিহাসের ছাত্রী, জানব না?
— ইতিহাস? ভলকেনোতে ইতিহাস কেন?
— ভিসুভিয়াস অাগ্নেয়গিরি…উফফ, মা, বিজ্ঞান নিয়ে কথা বলতে গেলে তোমার অার হুঁশ থাকেনা।
— রাইট রাইট, সরি সরি। অফ কোর্স। পম্পেই। তো, মঙ্গলেও এরকম ভলকেনো অাছে জানিস তো?
— রোয়েট, শুনেছি। সেটা নাকি এভারেস্টের চেয়েও উঁচু?
— অনেএএক বেশি উঁচু। অলিম্পাস মন্স। ছাব্বিশ না অাঠাশ কিমি হাইট। কিন্তু, অলিম্পাস মন্স অ্যাক্টিভ নয়। মানে হুট করে ইরাপশ্যন হবে না। সম্ভবত অার কোনওকালেই হবে না।
— সেকি?
— যা হবার লাখ কোটি বছর অাগে হয়ে গেছে। তখন সোলার সিস্টেম…সৌরজগত অনেক ইয়াং ছিল।
— রক্ত গরম ছিল বলছ?
— হাঃ! ইয়েস, ইউ ক্যান সে দ্যাট!
— হিহি।
— বাট, সেসব ভলক্যানিক অ্যাক্টিভিটি এখন ইতিহাস, এনশ্যেন্ট হিস্ট্রি।
— পৃথিবীতে তো এখনও অগ্ন্যুৎপাত হয়।
— হয়। অার হয় অায়োতে। এছাড়া, শনির চাঁদ এনসেলাডাস অার নেপচুনের চাঁদ ট্রাইটনেও হয়। এদের বাদ দিলে এই সৌরজগতে অ্যাক্টিভ ভলকেনো পাওয়া কঠিন।
— দাঁড়াও দাঁড়াও, তার মানে অায়োতে অাগ্নেয়গিরি অাছে? তাতে নিয়মিত অগ্ন্যুৎপাত হয়?
— হয় বৈকি। সেটা হয় প্রধানত জুপিটারের সাংঘাতিক গ্র্যাভিটির চোটে।
— হিহি, তার মানে ওই প্রকান্ড জুপিটারে টানের চোটে বেচারার হাঁসফাঁস অবস্থা?
— জুপিটার একদিকে টানছে, বাকি তিনটে চাঁদ অন্যদিকে। কস্মিক টাগ-অফ-ওয়ার। তাতে অায়োর শেপ-ও বদলাচ্ছে। অায়ো জুপিটারের চারদিকে একবার পাক খেতে সময় নেয় মাত্র পৌনে দু’দিন। এত তাড়াতাড়ি এত ঘনঘন অাকৃতি বদলানোর জন্য ভেতরে প্রচুর ফ্রিকশ্যন স্ট্রেস তৈরি হচ্ছে। তাই…
— পেট গরম হচ্ছে?
— হুঁ। তাই বটে।
— কিন্তু ইওরোপা?
— ইওরোপার জুপিটারের চারদিকে একবার ঘুরতে সময় নেয় সাড়ে তিনদিনের একটু বেশি। অায়োর দ্বিগুণ।
— দ্বিগুণ। মানে ঠিক দ্বিগুণ?
— না, প্রায় দ্বিগুণ। অায়ো ১.৭৭ দিন। ইওরোপা ৩.৩৫ দিন।
— তার মানে…
— শুধু তাই নয়, এর পরের চাঁদ, গ্যানিমীড, জুপিটারকে অর্বিট করে ৭.১৫ দিনে।
— দাঁড়াও, ১.৭৭ দুই দিয়ে গুণ করলে হয়…কত হয় যেন?
— ৩.৫৪।
— অার সেটাকে দুই দিয়ে গুণ করলে…?
— ৭.০৮।
— যাঃ, হল না।
— প্রায় হল। মোটামুটি রেশিওটা ১:২:৪। একে অর্বাইটাল রেজোনেন্স বলে।
— অার চার নম্বরটা? ক্যালিস্টো? সেও কি…? অাচ্ছা, ৭.১৫ কে দুই দিয়ে গুণ করলে…?
— ১৪.৩০। কিন্তু না, ক্যালিস্টো বেশি সময় নেয়, প্রায় ১৬.৭ দিন।
— যাঃ।
— তাতে কী? তিনটে জিনিসের মধ্যে এরকম অদ্ভুত সুন্দর মিল, খারাপ কী?
— না গো, সত্যি। প্রকৃতিতে, বিশ্বব্রহ্মান্ডে কত সৌন্দর্য। অামরা দেখতে শিখি নি, এই যা।
— হুঁ। অ্যারাইভাল সিনেমাটা দেখেছিস?
— অ্যাঁ?
— অ্যারাইভাল। দেখেছিস?
— হ্যাঁ গো। রঞ্জুদের সঙ্গে গিছলাম।
— শুনেছি খুব ভাল করেছে। এস্পেশ্যলি এলিয়েনদের অংশটা।
— হ্যাঁ। সাত পা-ওয়ালা জীব। সপ্তপদ। ইংরিজিতে হেপ্টোপড।
— সিনেমাটা অবভিয়াসলি দেখিনি। কিন্তু টেড চিয়াঙের অরিজিনাল গল্পটা অডিওবুকে শুনেছি। অার সিনেমাটার জিস্টটা ঠিক কেমন সে খবরও পেয়েছি।
— দারুণ করেছে গো। দেখার মত।
— তোর কী মনে হয়? এলিয়েন, ইটি, ভিনগ্রহের প্রাণী এরকম হতে পারে?
— পারতেই পারে। মানে সে গ্রহে বিবর্তন কীভাবে হয়েছে সেটা তো অামরা অার জানি না। শুধু অামাদের এই পোড়া সৌরজগতে পৃথিবী ছাড়া কোথাও প্রাণ নেই।
— নেই?
— নেই বলেই তো…ওওও, থুড়ি থুড়ি, ইওরোপা! ইশশ, অাজ বিকেলেও তো…
— হুঁ। কিন্তু ভেবে দেখ, ইওরোপা এত দূরে যে সূর্য একটা বড় সার্চলাইট মাত্র। এদিকে ঠান্ডা প্রচন্ড। তাহলে ইওরোপার গায়ে জল থাকে কী করে? ইমিডিয়েটলি জমে বরফ হয়ে যাবে না?
— অ্যাঁ? তাই তো।
— অার লিক্যুইড ওয়াটার না থাকলে প্রাণ থাকার চান্স…লো।
— তাহলে?
— ওই যে বললাম…রাদার, তুই বললি, অায়োর পেট খারাপ।
— হিহি। কিন্তু তার সঙ্গে ইওরোপার…?
— অায়োকে নিয়ে জুপিটার অার তার তিন সাঙ্গপাঙ্গ টাগ-অফ-ওয়ার খেলছে, তাই তার পেট গরম হয়ে একাক্কার অবস্থা। কিন্তু ইওরোপাও তো জুপিটার থেকে খুব দূরে নয়। তাকে নিয়েও টাগ-অফ-ওয়ার চলছে, কিন্তু অায়োর মত অত প্রচন্ড নয়।
— তার মানে ইওরোপার অ্যাসিডিটি হয়েছে?
— হাঃ! অাই নিউ ইট। এরকম কিছু একটা কমেন্ট এক্সপেক্ট করছিলাম।
— হিহি।
— সো, ডিউ টু টাইডাল ফ্লেক্সিং, ইওরোপার ভেতরে যথেষ্ট তাপ সৃষ্টি হয়। দ্যাট মেল্ট্স দ্য সাব-সারফেস অাইস ইন্টু ওয়াটার।
— সাব-সারফেস? তার মানে ইওরোপার মাটিতে…?
— পিওর অাইস। সম্পূর্ণ বরফে ঘেরা। অাইসবল ইওরোপা। হার্ড অ্যান্ড কোল্ড একস্টিরিয়র, সফ্ট অ্যান্ড ওয়ার্ম ইন্টিরিয়র।
— ঠিক তোমার মত?
— তাই বুঝি?
— হিহি।
— হুঁ। তো এই বরফের অাস্তরণের তলায় বিশাল সমুদ্র, তাতে জল, তরল জল, লিক্যুইড ওয়াটার। এদিকে সাব-ওশ্যানিক ওয়ার্ম ভেন্টস থাকতে পারে, সালফিউরিক বা অন্যরকম, তার চারপাশে প্রাণ জন্মাতেই পারে। পৃথিবীতেও সমুদ্রের তলায় এরকম অ্যানেরোবিক প্রাণ পাওয়া যায়।
— তাহলে ইওরোপাতে হেপ্টোপড…
— না। তার চান্স নেই বললেই চলে। প্রাণ পাওয়া গেলেও তা ওই ব্যাক্টেরিয়া বা ওই রকম মাইক্রোস্কোপিক কিছু হবে।
— ইশশ, ইওরোপাতে যেতে পারলে কী মজাটাই না হত।
— হুঁ। ঠান্ডায় জমে যেতিস।
— স্বপ্নে ইওরোপাই কেন দেখলাম কে জানে। অাচ্ছা, যাকগে। তার পরে? গ্যানিমীড?
— গ্যানিমীডও মজার চাঁদ। সৌরজগতে যত চাঁদ অাছে, গ্যানিমীড তাদের মধ্যে সবচেয়ে বড়।
— চাঁদ…মানে অামাদের চাঁদের চেয়েও বড়?
— অনেক বড়। এমনকি বুধের চেয়েও বড়।
— এই, কী বলছ? একটা উপগ্রহ গ্রহের চেয়ে বড়?
— দ্যাট ইজ দ্যা ফ্যাক্ট। গ্যানিমীড ইজ লার্জার দ্যান মার্ক্যুরি।
— তাহলে গ্যানিমীডকে…{হাই}…গ্রহ বললেই তো হয়।
— হয়? ভেবে দেখ তো কেন হয় না।
— ওহ…{হাই}…না, গ্যানিমীড তো বৃহষ্পতির চারদিকে…{হাই}
— পুলি।
— উঁ?
— অামার কোলে ঘুমিয়ে পড়লে দু’টো জিনিস হবে।
— উঁ?
— এক। তোর ঘাড় ব্যথা হবে।
— উঁ।
— অার দুই, অামার রাত দুটোর কলটা ধরা হবে না।
— উঁ? কল?
— টিএস। জরুরি। শোন, ওঠ। ঘরে যা। ঘুমিয়ে পড়। অার সেই চোরের পেছনে ধাওয়া করতে হবে না। জায়রোস্কোপটা ওই টেবিলে অাছে, ওটা তুই নিয়ে যা। বালিশের পাশে রেখে ঘুমিয়ে পড়।
— নিয়ে যাব?
— তাহলে তোর ভাল ঘুম হবে।
— অাচ্ছা মা।
— অার শোন। তুই ছোটবেলায় লাট্টু খেলেছিস?
— {হাই}…অ্যাঁ?
— লাট্টু। টপ? খেলেছিস?
— ইয়ে, মানে, হ্যাঁ। অবশ্যই।
— সাইকেল চালিয়েছিস?
— উফফ, মাঅা। সাইকেল অামি এখনও চালাতে পারি।
— উল্টে পড়ে না কেন? লাট্টু, সাইকেল। বা ধর জায়রোস্কোপ।
— অ্যাঁ? না, উল্টে পড়ে তো। মানে, না চললে। সাইকেলটা। লাট্টুটা ঘুরলে উল্টে পড়ে না। জায়রোস্কোপ…
— হুম। বাইসাইকেলের চাকা ঘুরলে, বা লাট্টু স্পিন করলে, বা জায়রোস্কোপ রোটেট করলে কেন উল্টে পড়ে না সেটা তোকে কাল বোঝাব। কেমন?
— অা-চ্ছা মা। তুমি ভাল মা। {হাই}
— বুঝেছি। ইউ নীড স্লীপ। গুড নাইট। টাইম ফর বেড মিস বৈদ্য।
— রজার উইলকো ডক্টর বৈদ্য।


#সোঘো, ২১:২৬, ৯ জুন ২০১৭, তিলোত্তমা।


পঞ্চভূত নিয়ে বৈদ্যবাটীর একটা সিরিজ করার চেষ্টা করছি। পঞ্চভূত অর্থাৎ মামদো-জামদো-ব্রহ্মদৈত্য-পেত্নী-শাঁকচুন্নি নয়, ক্ষিতি-অপ-তেজ-মরুৎ-ব্যোম। ক্ষিতি অর্থে মাটি, ভূমি, পৃথিবী। অপ মানে জল। তেজ মানে অাগুন, এনার্জি। মরুৎ মানে হাওয়া, বাতাস, উইন্ড/এয়ার। ব্যোম মানে অাকাশ হলেও অামি এটাকে মহাকাশ হিসাবেই ধরব। দেখা যাক, কোথাকার অপ কোথায় গড়ায়।

এটা পঞ্চভূত সিরিজের ব্যোম সাবসিরিজের প্রথম লেখা।

#ডক্টরবৈদ্য #পুলিপিঠে #পুলিসিরিজ #পুলিওমা #ঘটিবাটী

Advertisements

One thought on “বৈদ্যবাটী : গ্যালেলিওর চারটি চাঁদ

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

w

Connecting to %s