মিস মার্পেলের মেমোয়ার : অাট

মেজদির পাশের বাড়ির গৌরী অামার বিয়ের সম্বন্ধ এনেছিল। ছেলেটার মা নেই বাবা নেই। এক দিদি। দিদির বাড়িতেই থাকে। লাইফ ইন্শোরেন্সে চাকরী করে। ভাল চাকরী। খুব লম্বা নয়। অামাদের ভাড়াটে ছিল গৌর। ওই টাইপটা। মেয়ে দেখতে এসেছে দিদি-ভাই মিলে। মা অাছে সেখানে, মেজদিও অাছে, গৌরীও অাছে, কলকাতা থেকে দুজনে ট্রেনে করে অালাদা চলে এসেছে। কথাবার্তা হচ্ছে। ছেলের দিদি মা'র সঙ্গে রান্না নিয়ে দারুণ অাড্ডা মারছেন। মেজদি ছেলেকে জিজ্ঞেস করলো, বাবা, তুমি কিছু খাবে না? কী খেতে ভালবাসো? সে উত্তর দেওয়ার অাগেই তার দিদি বলে উঠলো, ও খুব লুচি খেতে ভালবাসে। মা'ও খুব খুশি। বললেন বাবু---মানে বাবা---খুব লুচি খেতে ভালবাসতেন। মেজদি অামার দিকে দেখিয়ে বললো, এর মতো লুচি করতে কেউ পারে না। এই রমু, যা তো, গরমগরম কয়েকটা লুচি করে অান তো। লুচি করতে কি অার অামার সময় লাগে? চটপট একথালা লুচি বানিয়ে দিলুম। কুমড়োর ছেঁচকি অার অালুভাজা দিয়ে সেও দেখলাম তারিয়ে তারিয়ে খেলো। খেয়েটেয়ে অাঙুল চাটতে গিয়েও চাটলো না। তারপর লাজুকভাবে অামার দিকে সোজা তাকিয়ে বললো, অার দুটো লুচি হবে? তিনদিন বাদে মেজদি টেলিগ্রাম করে জানালো, মেয়ে পছন্দ হয়েছে।

Advertisements

মিস মার্পেলের মেমোয়ার : সাত

শিবালয়টা প্রতাপবাবুর বানানো। প্রতাপবাবু, প্রতাপবাবুর ভাই পাদুসবাবু, বউ, ছেলে প্রত্যেকে খুব শিবভক্ত ছিলেন। । প্রতাপবাবু ডায়মন্ড হারবার কোর্টে উকিল ছিলেন। দুঁদে উকিল। প্রচুর টাকার মালিক। যেমন টাকা কামিয়েছেন বিলিয়েছেনও তেমন। হাত খুলে। শিবরাত্রির রাতে প্রতাপবাবু অার পাদুসবাবু পঞ্চাশটা শাড়ি বিলোতেন। বাবার সঙ্গে প্রতাপবাবু বিশেষ অালাপ সখ্যতা ছিল। সোনা তাই ফি বছর মা'র কাছে এসে কাকুতি করতো, ও ছোম্মা, বড়বাবুকে বলো না, একটা শাড়ি...

মিস মার্পেলের মেমোয়ার : ছয়

নাউ বলে মা'র একটা বেড়ালবাচ্ছা ছিল। ভালমন্দ খেয়ে বড় হচ্ছিল। কী স্বাস্থ্য! অার কী গায়ের রঙ! অার খাবারের ব্যাপারেও খুঁতখুঁতামি ছিল। খইমুড়িচিঁড়ে তো একেবারেই খাবে না। মা'র খুব প্রিয় ছিল। ইঁদুর মারতে বললেই নাউবাবাজির গায়ে জ্বর অার ল্যাজে পেটকামড়ানি শুরু হয়ে যেতো। সেজদির তখন বিয়ে হয়ে গেছে। জ্যাঁয়ুর সঙ্গে অাগ্রায় থাকে। মাঝে মাঝে ডায়মন্ডহার্বারে অাসে। এমনই এক কালিপুজোয় এসেছে। ওখানে তো দিওয়ালি, জ্যাঁয়ু ছুটি পেয়েছে। সেজদি এলেই তো হাতমুখপাধুয়ে সোজা রান্নাঘরে। মা থাকলে মা'র সঙ্গে বকবক, অার নয়তো অামায় ডেকে গপ্পোসপ্পো। রান্নায় সেজদির হাত সোনা। মা'র মতন না হলেও। এরকম একদিন সেজদি গিয়ে রান্নাঘরের উত্তরদিকের জানলার সামনে দাঁড়িয়ে অাছে। কী ভাবছে ওই জানে। হঠাৎ দেখে, জানলার বাইরে সেপটিক ট্যাঙ্কের ওপারে একটা ছোট্ট লাউচারা।

মিস মার্পেলের মেমোয়ার : পাঁচ

অাজ ভূতচতুর্দশী। ডায়মন্ড হারবারে কালিপুজো প্রচুর হতো। প্রায় প্রত্যেক মাসেই একটা না একটা কালিপুজো লেগেই থাকতো। কিন্তু কৃষ্ণপক্ষ শেষের কালিপুজোটাই সবচেয়ে বড় ছিল। হওয়ারই কথা। এটাই তো শহরের কালিপুজো। কালিপুজোর অাগের দিনটাও কিন্তু পালন করতাম অামরা। দিনটাকে ভূতচতুর্দশী বলা হতো। কেন জানি না। ছোটবেলায় শুনেছি দেবী চামুন্ডা নাকি চোদ্দ সাঙ্গপাঙ্গ নিয়ে দেশগ্রামনদীনালায় ঘুরে বেড়াতেন। কাঁচাখেকো অপদেবতা সবকটা, ভূত-পেত্নি-ডাইনি-শাঁকচুন্নি---কী নেই তাদের মধ্যে। সেজদি, মেজদি, ন'দি, অামি প্রত্যকে মিলে ঘরের চারদিকে চোদ্দপ্রদীপ দিতাম। মাটির তৈরী তেলের প্রদীপ। তাতে সলতে পাকিয়ে লাগাতো অান্না। যখন একটু বড় হয়েছিল। তার অাগে ভার ছিল অামার উপর। সবচেয়ে ছোটদের উপরেই এই দায়িত্ব পড়তো।

মিস মার্পেলের মেমোয়ার : চার

মেজদি ছোটবেলায় ভীষণ দুষ্টু ছিল। কালিঘাটের কালিবাবুর মিষ্টির দোকানের কথা তো বলেইছি। কীভাবে মেজদি বাবার নামে লিখিয়ে সেরসের মিহিদানা সীতাভোগ ইত্যাদি ইত্যাদি। তখন রাস্তায় এখনকার মতো এত গাড়িঘোড়া চলতো না। ফাঁকাই থাকতো। মিষ্টি-ফিষ্টি খাওয়া হয়ে গেলে কালিঘাট থেকে চেতলা অবধি মেজদির দুপদাপ ঘুরে বেড়াতো। একবার এদিক থেকে ওদিক, অাবার ওদিক থেকে এদিক। বাড়িতে তাকে পাওয়াই যেতো না বলতে গেলে।

মিস মার্পেলের মেমোয়ার : তিন

বাবার তখন কলকাতায় চাকরি। ডায়মন্ড হারবারে বদলি হয়ে অাসার অাগের ঘটনা। কালিঘাটে বাড়ি। সতুরা যেখানে থাকে, তার থেকে খুব বেশি দূরে না। কালিঘাটে এই বাড়ির উল্টোদিকে, মানে রাস্তার ওপাশে, একটা মিষ্টির দোকান ছিল। কালিপদবাবুর দোকান। ধার্মিক লোক ছিলেন কালিবাবু। নিয়ম করে রোজ মন্দির যেতেন। কালিঘাটের কালিবাবুর কালিভক্তি অপার, একথা পাড়ায়-বেপাড়ায় প্রচুর শোনা যেত। লোক ভাল ছিলেন, কিন্তু ব্যবসার বুদ্ধিও ছিল, দোকানও ভালই চলতো। এই কালিবাবুর দোকান থেকেই বাবা মিষ্টি কিনতেন।

মিস মার্পেলের মেমোয়ার : দুই

অাড্ডা ___________________ দাদা ছোটবেলায় খুব দুরন্ত ছিল। দুষ্টুমি তো করে বেড়াতোই, বোনেদের চুল ধরে টানা, গাঁট্টা মারা, এইসব লেগেই থাকতো। ইস্কুল থেকে ফিরে হাতমুখপা ধুয়ে মা'র তৈরি খাবার খেয়ে খেলতে যেত, ফিরে এসে পড়তে বসতো। বোনেরাও পড়তে বসতো। খানিক বাদেই ঝগড়া শুরু হতো, অার বোনেরা কাঁদতে কাঁদতে এসে মা'র কাছে নালিশ করতো। মা বললেন, দাঁড়া, পেন্তুর বন্দোবস্ত করছি।

মিস মার্পেলের মেমোয়ার : এক

রেস্কু ___________________ ছোটবেলার কথা। অামি তখনও হইনি, সেজদি মেজদি সব ছোট, ন'দি কোলে, দাদাও ছোট, ইস্কুলে পড়ে। বাবা বদলি হয়ে ডায়মন্ড হারবারে এলেন। বাড়ি তখনো হয়নি। অামরা থাকতাম নদীর কাছে পাঁচকড়িবাবুর বাড়িতে। ভাড়া বাড়ি। বাগান অাছে। মা বাগানে ফুলগাছ লাগিয়েছে, লেবুগাছ কারিপাত্তার গাছও অাছে। বাগান দেখাশোনা করে বনোয়ারি। হিন্দুস্তানি।